FF.
পর্ব ২ঃগোলকধাঁধা Book page

Chapter 2

পর্ব ২ঃগোলকধাঁধা

Nov 4, 2026 13 min read

আকাশটা গোমড়া হয়ে আছে কদিন ধরেই; বাতাস ভারী, তাতে একটা পোড়া মাটির গন্ধ আর বহু পুরোনো স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা ভাব। দীপ্ত ভাড়া মিটিয়ে যখন গেটের লোহার মরচে পড়া কপাট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল, ওর মনে হলো ও কেবল একটা বাড়িতে নয়, বরং সময়ের এমন একটা মৃত কূপে পা রাখছে যেখান থেকে আর ফেরা যায় না।

বাড়িটার সাথে হেমন্তবাবুর প্রথম আলাপটা খুব নাটকীয় কিছু ছিল না। সদর দরজার বারান্দায় পা রাখতেই একটা টিনের কৌটোতে বিড়ির ছাই ফেলতে ফেলতে বুড়ো খুকখুক করে কেশে উঠেছিল।

—“কী গো বাবু, কোন দেশের রাজা এসে পড়লে এই পোড়ো ভিটেয়? কলকাতা থেকে তো অনেক পথ!” হেমন্তবাবুর গলার সেই খসখসে স্বরটা প্রথম থেকেই দীপ্তের স্নায়ুতে একটা অস্বস্তি তৈরি করেছিল।

দীপ্ত তখন হাঁপাচ্ছিল, কলারের ঘাম মুছতে মুছতে বলেছিল, —“আমি আদিত্যর বন্ধু, দীপ্ত। ও কোথায় বলুন তো? গত সতেরো দিন ধরে ওর কোনো খোঁজ নেই।”

হেমন্তবাবু তখনো একটুও অবাক হননি। চাদর মুড়ি দিয়ে নির্বিকারভাবে একটা ভাঙা মোড়ায় বসতে বসতে বলেছিলেন, —“আদিত্য বাবু? ওই যে ওপরের রেকর্ড রুমে যেমন আসতেন, তেমনই আছেন। শহরের বাবুদের আবার নিখোঁজ কিসের? হয়তো কোনো কিতাব ঘাঁটতে ঘাঁটতে তলিয়ে গেছেন কোথাও। খাবেন কিছু নাকি শুধু আদিবাবু বলেই জান দেবেন?”

প্রথম দু-তিনটে দিন কেটেছিল এক অদ্ভুত ক্যাসুয়াল অথচ অস্বস্তিকর ছিমছামে। ঘোষালবাড়ির বিশাল রান্নাঘর বা ডাইনিংয়ে কোনো রাজকীয় আয়োজন ছিল না। হেমন্তবাবু নিজের হাতে প্রতিদিন দুপুরে একটা অদ্ভুত গন্ধওয়ালা সোঁদা চালের ভাত আর সেদ্ধ আলু ভাতে, কিংবা কোনোদিন ছাঁচরমারা মুসুর ডাল রেঁধে একটা অ্যালুমিনিয়ামের থালায় এনে দিতেন। খাওয়ার সময় দীপ্ত যখন জিজ্ঞেস করত, —“একি হেমন্তবাবু, আপনি নিজে কী খান?” বুড়ো কেমন একটা বাঁকা হাসি হেসে বলত, —“যা এই মরা বাড়ির ইঁদুর-বিড়াল খায়, আমারও তাই জোটে বাবু। তবে আপনার মতো শহরের বাবুদের তো আবার তেল-মশলা ছাড়া মুখে রোচে না। কদিন বাদে দেখবেন এই চালের ভাতই অমৃত মনে হচ্ছে।”

বিকেলগুলো কাটত অদ্ভুত এক ঝিমধরা শূন্যতায়। বাড়িতে কোনো বিদ্যুৎ নেই, ফলে সন্ধ্যা নামার আগেই হেমন্তবাবু একটা সিসে-ওঠা কেরোসিনের লণ্ঠন ধরিয়ে দীপ্তর হাতে ধরিয়ে দিতেন। বারান্দায় বসে চা খাওয়ার কোনো উপায় ছিল না, তাই বারকয়েক হেমন্তবাবুর সাথে তামাকের কটু গন্ধ আর লণ্ঠনের পিটপিটে আলোয় কথা হয়েছে দীপ্তের। বুড়ো সারাদিন কী করে? বাড়ির এদিক থেকে ওদিক ঘুরে বেড়ায়, মরা চামড়ার মতো খসে পড়া পলেস্তারা কুড়ায়, আর একা একা কি সব বিড়বিড় করে। দীপ্ত যখনই তার নিখোঁজ বন্ধু আদি সম্পর্কে কিছু জানতে চাই, হেমন্তবাবু প্রতিবার একটা প্যাঁচালো উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যেতেন—“যে পাখি একবার এই খাঁচার কার্নিশে বসেছে, তার আর ওড়ার রাস্তা থাকে না বাবু। আদিবাবুও তো প্রথমে খুব চঞ্চল ছিলেন, এখন বেশ শান্ত হয়ে গেছেন।”

কিন্তু আসল বিভ্রমটা শুরু হলো চতুর্থ দিন থেকে।

সেদিন বিকেলবেলা মাথাটা যখন বড্ড বেশি জ্যাম হয়ে আসছিল, তখন একটু হাওয়া বদলানোর জন্যই দীপ্ত পুরনো ভারী কপাট ঠেলে বাড়িটার বাইরে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন অকাল বর্ষণের পর চরাচর ভেজা ও থমথমে। ঘোষালবাড়ির ঠিক সামনেই বহরমপুরের গ্রামীণ মেঠো রাস্তা—দু-ধারে জঙ্গল আর জংলি বুনো ঘাসের বন। বাতাসে পচা পাতা আর ভেজা মাটির তীব্র গন্ধ। দীপ্ত পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ও পা বাড়াল গ্রামের দিকে।

খানিক দূর এগোতেই একটা ছোট গ্রামীণ হাট বা চায়ের দোকান মতো পড়ল। গুটিকয়েক স্থানীয় মানুষ মাটির উনুনের পাশে বসে চা খাচ্ছিল। দীপ্তকে দেখেই তাদের ফিসফিসানি থেমে গেল। সবাই কেমন যেন পাথরের মতো চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো কোলাহল নেই, কারো মুখে কোনো কথা নেই—যেন এক মরা জনপদ। একটা বয়স্ক লোক ভাঙা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে খ্যাপার মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দীপ্তের পিঠের দিকে।

দীপ্ত আর সেখানে দাঁড়াল না। অস্বস্তি কাটাতে ও উল্টো দিকের মেঠো পথ ধরে হাঁটা দিল, যেখানে বহু দূরে একটা ভাঙা শিবমন্দির দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ও যতই হাঁটছিল, ততই ওর মনে হচ্ছিল ওই মেঠো পথটা সোজা না গিয়ে যেন একটা গোল বৃত্তের মতো ঘুরে ঘুরে বারবার একই জায়গায় ফিরে আসছে। একটু বাঁকা চোখে খেয়াল করতেই দীপ্ত শিউরে উঠল—ওই তো সেই তেঁতুল গাছটা, যেটার পাশ দিয়ে ও মিনিট দশেক আগে হেঁটে গিয়েছিল! একই ভাঙা ইঁট, একই গাছের শেকড়—যেন ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে হেঁটে ও আবার নিজের জায়গাতেই ফিরে আসছে।

শরীরের ভেতরটা হিম হয়ে এল দীপ্তের। তখনই পেছন থেকে একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা কানে ফিসফিস করে বলে উঠল—*‘কোথায় পালাবেন বাবু? শেকড় তো ওই বাড়িতেই পোঁতা!’*

বজ্রাহতের মতো চমকে পেছনে ফিরে তাকাল দীপ্ত। কেউ নেই। শুধু দিগন্তের কোণে কুয়াশা ভেদ করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশ্রী, অভিশপ্ত ঘোষালবাড়িটা। মাথার ভেতরটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। একটা অদৃশ্য, শক্তিশালী টান যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। ও আর এগোতে পারল না—পায়ের গতি আপনিই ওই বাড়ির দিকে ফিরে চলল। মনে হলো, এই মায়া কাটানোর কোনো রাস্তা নেই; ওকে ওই বাড়ির ভেতরেই ফিরে যেতে হবে, যেখানে অন্ধকার ভল্টের চাবি ওর জন্য অপেক্ষা করছে।

সময় নিয়ে একটা অদ্ভুত কারসাজি টের পাচ্ছিল দীপ্ত। প্রথমে ও ভেবেছিল বোধহয় মানসিক চাপ আর ক্লান্তি থেকেই এটা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাগুলো যখন একের পর এক ঘটতে লাগল, তখন ওর পিলে চমকে যাওয়ার উপক্রম হলো। সেদিন দুপুরে দীপ্ত যখন নিজের কবজির রিস্টওয়াচটার দিকে তাকিয়ে দেখল ঘড়িতে তখন সবে বিকেল সাড়ে চারটে বেজে দশ মিনিট, ঠিক তখনই নিচতলার সেই বিশাল হলঘরে দাঁড়ানো অবস্থায় এক অবাস্তব কাণ্ড ঘটল। ও হেমন্তবাবুকে একটা কথা বলার জন্য ডাকতে যাচ্ছিল, আর বুড়ো রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই বৈঠকখানার দেওয়ালে ঝুলে থাকা সেই বিশালাকার পুরোনো অ্যান্টিক ঘড়িটা হঠাৎ সজোড়ে বেজে উঠল—টং টং করে ছ’টা বাড়ি পড়ল! দীপ্ত চমকে নিজের হাতের ঘড়িটা দেখল—না, ঘড়িতে এখনো সাড়ে চারটেই বাজছে। কিন্তু হেমন্তবাবু রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে শান্ত গলায় বলে উঠলেন, —“সন্ধ্যা তো হয়েই এল বাবু, আর কত রাত জাগবেন?” দীপ্ত থমকে গিয়েছিল। তার মানে তার ঘড়ি কি পিছিয়ে চলছে, নাকি বাইরের পৃথিবী এক ঘণ্টা এগিয়ে গেছে?

এই গোলমেলে ব্যাপারটার রেশ কাটতে না কাটতেই পরের দিন রাতে আরেক কাণ্ড ঘটল। দীপ্ত তার খাতার ওপর একটা পেন দিয়ে আদির নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাব্য দিনগুলো হিসাব করছিল। কলমের ডগাটা কাগজের ওপর রেখে ও মাত্র একটা সেকেন্ডের জন্য চোখ বুজেছিল। এরপর চোখ খুলতেই ও দেখল ঘড়ির কাঁটা আর একটুও এগোয়নি, অথচ টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসের জলটা নিজে থেকেই যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রুমালটা যা একটু আগে টেবিলের বাঁ দিকে রাখা ছিল, সেটা এখন একদম ডান কোণায় পরিপাটি করে ভাঁজ করা! অথচ গত কয়েক সেকেন্ডে ঘর দিয়ে কেউ যাতায়াতই করেনি।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগল তার পরের দিন দুপুরে। দীপ্ত যখন পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেমন্তবাবুর সাথে কথা বলছিল, ঠিক তখনই উঠোনের ঠিক মাঝখানে একটা মরা কাক পড়ে থাকতে দেখল। দীপ্ত নিজের চোখে দেখল, কাকটার ডানা থেকে একটা কালো পালক ধীরে ধীরে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ওপরের দিকে উঠছে—মহাকর্ষের নিয়ম উল্টে দিয়ে পালকটা মাটির দিকে না নেমে সোজা ছাদের দিকে উড়ে গেল। শুধু তাই নয়, হেমন্তবাবু একটা হাত বাড়িয়ে সেই পালকটাকে শূন্যে ধরে ফেলে খলখল করে হেসে উঠলেন।

দীপ্ত চিৎকার করে উঠেছিল, —“এ কী হচ্ছেটা কী! এটা ফিজিক্যালি পসিবল নয়! 

হেমন্তবাবু কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল একটা জং ধরা চাবি দীপ্তর হাতের তালুতে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, —*“পদার্থবিদ্যা তো শহরের বইয়ে থাকে বাবু, এই ঘোষালবাড়ির দেওয়ালে কেবল কালচক্রের নিয়ম চলে। এখানে সকালের পর দুপুর না এসে সোজা গতকালের রাতও চলে আসতে পারে। বুদ্ধি দিয়ে মাপতে যাবেন না, মাথা ঘুরে মরে যাবেন।”*

এই ছোট ছোট অসম্ভব ঘটনাগুলো, ঘড়ির কাঁটার নিজের ইচ্ছায় লাফিয়ে লাফিয়ে চলা বা থেমে যাওয়া, এবং হেমন্তবাবুর ওই গোলমেলে কথাগুলো দীপ্তর অবচেতন মনকে এমনভাবে গ্রাস করতে শুরু করল যে ও আর বাস্তব আর বিভ্রমের তফাত করতে পারছিল না। ও বুঝতে পারছিল, ওর চারপাশে একটা অদৃশ্য টাইম লুপ তৈরি হচ্ছে—যেখানে সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পাক খাচ্ছে, আর ও নিজেই সেই কালচক্রের মাকড়সার জালে জড়িয়ে পড়ছে অজান্তে।

আর ঠিক এর ফলেই মনের মধ্যে জমতে থাকা এই সমস্ত গোলকধাঁধা আর খিটখিটে মেজাজ একদিন চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে পৌঁছাল।

সেদিন রাতেও দীপ্ত ঘুমোতে পারেনি। ঘরের মধ্যে ভ্যাপসা গরম আর মাথার ভেতর কালচক্রের চিন্তাগুলো পাক খাচ্ছে। ল্যাপটপটা তখনো টেবিলে খোলা, যদিও কারেন্ট না থাকায় পাওয়ার ব্যাঙ্কের চার্জ দিয়ে ওটা কোনোমতে অন রাখা হয়েছে। এমন সময় ঘরের বাইরে করিডোরে কার যেন জুতোর আওয়াজ পাওয়া গেল। দীপ্ত দরজা খুলে দেখল হেমন্তবাবু লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

মেজাজটা এমনিতেই চড়ে ছিল, দীপ্ত কড়া গলায় জিজ্ঞেস করে বসল, —“আচ্ছা হেমন্তবাবু, একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি আপনাকে... এই বাড়ির মেইন সুইচবোর্ডগুলো তো সব ডেড, অনেক বছর ধরে এখানে বিদ্যুৎ নেই। তাহলে আদিত্য ওর ওই ল্যাপটপটা চালাত কী করে? জেনারেটর ছিল নাকি বাড়িতে?”

হেমন্তবাবু লণ্ঠনটা একটু নিচু করলেন। টিনের চিমনিতে তেল ফুরানোর মতো একটা হালকা শোঁ শোঁ আওয়াজ হলো। বৃদ্ধ খুকখুক করে হেসে উঠলেন।

—“জেনারেটর? এই পোড়ো ভিটেয় তেল কেনার পয়সা দেবে কে বাবু? কারেন্ট তো এই বাড়িতে তিরিশ বছর আগে থেকেই নেই। তবে আদিত্য বাবু যখন প্রথম দিন আসেন, ওই নীল রঙের ব্যাগে ওনার দুটো ভারী পাওয়ার ব্যাংক আর সোলার চার্জার ছিল। তা ছাড়া... ওই ওপরের রেকর্ড রুমে এমন একটা ব্যবস্থা আছে, যেটা শহরের বাবুদের চোখে পড়ে না। সবকিছুর উত্তর কি আর এক দিনে পাওয়া যায় বাবু?”

দীপ্তর মেজাজটা এবার পুরোপুরি সপ্তমে চড়ে গেল। হেমন্তবাবুর এই প্যাঁচালো ও এড়িয়ে যাওয়ার মতো উত্তর শুনে পিত্তি জ্বলে গেল। ও একটু কড়া গলায় বলল, —“বেশি পেঁচিয়ে কথা বলো না তো বুড়ো! সোজা সাপটা বলো, আদি এখানে ঠিক কী নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করত? আর তুমি নিজে এই বাড়িতে সারাদিন কী কর, রাতে কোথায় থাকো? একটু আগে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তো পাত্ত্তা দিলে না! কানে কম শোন নাকি?”

হেমন্তবাবু কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি ভাঙা কাঠের টেবিলে লণ্ঠনটা রেখে একটা নোংরা বিড়ি ধরাতে লাগলেন। দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালার আলোয় তাঁর কুঁচকে যাওয়া মুখের চামড়াটা আরও অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। দেশলাই নিভিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, —“কোথায় থাকি? এই দেওয়ালগুলোর গায়ে গায়ে তো আমার ঘর বাবু। যে মাটির নিচে আদিবাবু হারিয়ে গেছেন, তার ওপরের ঘরেই তো এই বুড়োর শোওয়ার মাদুর পাতা। আর সারাদিনের কাজ? এই পোড়ো বাড়ির মড়া ইঁদুর তাড়ানো আর আগাছা পরিষ্কার করা। যে বাড়ি নিজেই মরে ভূত হয়ে গেছে, তার আবার কাজ কী?”

—“বালছাল বকা বন্ধ করুন!” দীপ্ত আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ওর দুচোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। —“আমার বন্ধু সতেরো দিন ধরে নিখোঁজ, আর তুমি এখানে বসে পঁয়ত্রিশটা পেঁচে কথা বলছ! পুলিশের কাছে সব কটা কেস ফাইল খোলা আছে বুঝলে? ফাজলামো হচ্ছে? বলো, ওই ভল্টের চাবি কোথায়?” 

হেমন্তবাবু একটুও ভয় পেলেন না। বরং তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা কুৎসিত হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি ভাঙা চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, —“পুলিশের ভয় আমায় দেখিয়ে লাভ নেই বাবু। এই জঙ্গলে ঘেরা বহরমপুরের পোড়ো ভিটেয় পুলিশ কবে থেকে আসা শুরু করেছে? আর মেজাজটা একটু ঠান্ডা রাখুন। আদিত্য বাবুও ঠিক এই ভাষায় কথা বলতেন প্রথম দিন। বলতেন, ‘তোকে সোজা লকআপে ঢুকিয়ে দেব হারামজাদা।’ তারপর কী হলো? ওনার ওই স্যুটকেসটাই কেবল ওপরের ঘরে পড়ে রইল, আর তিনি নিজে চিরকালের মতো এই বাড়ির মাটির নিচে সেঁধিয়ে গেলেন।”

—“হারামজাদার বাচ্চা!” দীপ্ত আর সহ্য করতে পারল না। ও এক পা এগিয়ে গিয়ে টেবিলে সশব্দে একটা থাপ্পড় কষাল। —“গাঁড়মাজাকি হচ্ছে, না? আদি কোথায় বের করো বলছি, নইলে কলার ধরে ঝুলিয়ে দেব এখুনি!”

হেমন্তবাবু ভ্রু কুঁচকে দীপ্তের দিকে তাকালেন। একটুও না ঘাবড়ে তিনি নিজের পুরোনো জোব্বার পকেট থেকে একটা ভারী, মরচে পড়া লোহার চাবি বের করে টেবিলের ওপর ফেলে দিলেন। জং ধরা চাবিটার সঙ্গে কাঠের টেবিল ঠোকার একটা খটাস শব্দ হলো।

—“ঝুলিয়ে তো আদিত্য বাবুও দিতে চেয়েছিলেন,” হেমন্তবাবু ফিক করে হেসে উঠলেন। —“এই নিন চাবি। আদিবাবুও এই চাবিটার জন্যই আমার পায়ে পড়েছিলেন। আমি বারণ করেছিলাম, শুনলেন না। ওই তহশিলখানার দরজা একবার খুললে আর ফেরা যায় না। সাহস থাকে তো ওই অন্ধকার সুড়ঙ্গে একা নেমে যান বাবু... দেখবেন, আপনার আদিত্য বাবু কোন অতলে বসে আপনার জন্যই হাত বাড়িয়ে ডাকছেন!”

টেবিলে পড়ে থাকা সেই জং ধরা চাবিটার দিকে তাকিয়ে দীপ্তর সারা শরীর দিয়ে একটা বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। রাগের মাথায় গালিগালাজ বেরিয়ে গেলেও বুকের ভেতরটা এখন অজানা এক আতঙ্কে আবার কুঁকড়ে আসছে। আদি সত্যি কি এই ভল্টের ভেতরেই কোথাও হারিয়ে গেছে, নাকি এই বুড়ো আক্ষরিক অর্থেই কোনো ভয়ংকর খেলা খেলছে?

হেমন্তবাবু তখন আর দীপ্তর দিকে তাকাচ্ছেন না। তিনি টেবিলের ওপর থেকে লণ্ঠনটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ালেন।

—“পিছে পিছে আসুন বাবু। একা ওই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলে ফের যদি মাথা ঘুরে পড়ে যান, তখন আর হেমন্ত বাঁচাতে আসবে না।”

দীপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুক কাঁপানো আতঙ্ককে জোর করে দাবিয়ে ও টেবিল থেকে সেই ভারী, মরচে পড়া লোহার চাবিটা তুলে নিল। হাতের তালুতে চাবিটা রাখতেই একটা হিমশীতল অনুভূতি ওর কব্জি বেয়ে রক্তে ছড়িয়ে গেল। পেশাদার মনস্তত্ত্ববিদের মাথাটা এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ব্যস্ত নেই; এখন কাজ করছে কেবল একজন উদ্বিগ্ন বন্ধু ও গবেষকের বেঁচে থাকার এবং সত্য খোঁজার জেদ।

দুজনে মিলে আবার সেই ভাঙা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলেন। নামার সময় প্রতিটা পদক্ষেপে সিঁড়ির কাঠগুলো এমনভাবে মড়মড় করে উঠছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি ভেঙে পড়ল কোনো অতল গহ্বরে। বাইরের অকাল বর্ষণ তখন আরও তীব্র হয়েছে; ঝোড়ো হাওয়ায় জানলার গ্লাসগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

নিচতলায় নেমে হেমন্তবাবু সোজা প্রধান হলঘরের পেছনের দিকে একটা সরু ও চাপা করিডোরের দিকে এগিয়ে গেলেন। এই দিকটা দিনের আলোতেও কখনো পরিষ্কার দেখা যায় না। দেওয়ালগুলো ভেজা ও নোনাধরা, মনে হবে যেন পলেস্তারা নয়, কোনোরকম গলিত চামড়া ঝুলে রয়েছে। করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছতেই চোখে পড়ল একটা লোহার ভারী ডোর ফ্রেম, যার গায়ে লাগানো রয়েছে বহু যুগ পুরোনো একটা কাঠের পাল্লা। পাল্লার গায়ে কোনো লক বা তালা নেই, রয়েছে একটা বিশাল মরচে পড়া হ্যাজবোল্ট আর তার নিচেই সেই তহশিলখানার ভারী তালা।

—“এই সেই দরজা,” হেমন্তবাবু লণ্ঠনটা উঁচুতে ধরে দাঁড়ালেন। —“ভিতরে নামার জন্য পাকা সিঁড়ি বাঁধানো আছে, তবে সাবধানে নামবেন। ওদিকে অনেক বছর আলো বাতাস ঢোকে না। ভ্যাপসা গন্ধে দম আটকে যেতে পারে।”

দীপ্ত পকেট থেকে টর্চটা বের করে জ্বালল। টর্চের জোরালো সাদা আলো ওই মরচে পড়া তালার ওপর পড়তেই পরিষ্কার বোঝা গেল, তালাটা সম্প্রতি কেউ খুলেছিল এবং আবার আলগা করে লাগিয়ে রেখেছিল। অর্থাৎ, আদি এখানে ঠিকই নেমেছিল।

দীপ্ত চাবিটা তালার ফুটোয় ঢোকাল। একটু কসরত করতেই একটা ভারী ‘কট্‌’ শব্দ করে বহুদিনের পুরোনো তালাটা খুলে গেল। হ্যাজবোল্টটা সরাতেই সেই কাঠের ভারী দরজাটা একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ করে খুলে গেল, আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক বুকচাপা, বরফশীতল বদ্ধ বাতাস—সাথে বহু পুরোনো কাগজ আর পচা পাতার গন্ধ।

—“আমি কি আপনার সাথে নিচে নামব বাবু? নাকি বাইরে এই চেয়ারটাতেই পাহারা দেব?” হেমন্তবাবু একটু ব্যঙ্গভরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

—“না, আপনার নিচে নামার দরকার নেই। আমি একাই দেখছি।” দীপ্ত টর্চটা শক্ত করে ডান হাতে ধরে সিঁড়িতে প্রথম পা রাখল।

সিঁড়িগুলো ইট দিয়ে বাঁধানো, কিন্তু তাতে শেওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে। দীপ্ত সাবধানে এক এক পা করে নিচের দিকে নামতে শুরু করল। ওপরের লণ্ঠনের আলো ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল। এখন দীপ্তের একমাত্র ভরসা তার হাতের ওই টর্চের সামান্য আলোটুকু। সিঁড়ি শেষ হওয়ার পর ও টের পেল যে ও এসে পৌঁছেছে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ ঘরে—যেটা এই ঘোষালবাড়ির গোপন তহশিলখানা।

টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘোরাতেই দীপ্তের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বিশাল ঘরটার চারপাশে সারি সারি কাঠের র‍্যাক সাজানো। র‍্যাকের ওপর থরে থরে সাজানো রয়েছে ব্রিটিশ আমলের পুরোনো মোটা খাতা, লেদার বাইন্ডিং করা রেজিস্টার, আর নীল রঙের ফিতে দিয়ে বাঁধা কিছু দলিলপত্র। এই সেই এস্টেটের মেইন ভল্ট, যেখানকার ইতিহাসের পাতা উল্টালে জমিদার বাড়ির অন্ধকার দিকগুলো বেরিয়ে আসে।

দীপ্ত র‍্যাকগুলোর মাঝ দিয়ে হেঁটে এগিয়ে গেল। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের বড় টেবিল রাখা, যার ওপরে ছড়িয়ে রয়েছে কিছু ছাই এবং একটা ভাঙা ল্যাম্প। ঠিক তার পাশেই মাটিতে পড়ে রয়েছে আদির সেই চেনা নোটবুকটা—যেটা ও সবসময় পকেটে রাখত।

দীপ্ত তাড়াতাড়ি মাটিতে বসে পড়ে নোটবুকটা তুলে নিল। পাতাগুলো ওল্টাতেই একটা কাগজ খসে পড়ল নিচে। টর্চের আলোয় দীপ্ত দেখল, কাগজটা একটা পুরোনো দলিলের অংশ, যার ওপরে লাল কালিতে কিছু নাম কাটা রয়েছে এবং ঠিক নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা—*‘সব মিথ্যে, এই রক্তের দাগ কখনো মুছবে না।’*

হঠাৎ করেই দীপ্তের পিঠের ঠিক পেছনে একটা শব্দ হলো—*‘খসখস… খসখস…’*

শব্দটা চেনা। ঠিক সেই শব্দ, যেটা আদির ফোনের ওপ্রান্ত থেকে শোনা গিয়েছিল। কেউ যেন ওই অন্ধকার আন্ডারগ্রাউন্ডের কোনো এক কোণে দাঁড়িয়ে অবিরত পুরোনো খাতার পাতা উল্টে চলেছে।

দীপ্ত বুক কাঁপানো আতঙ্ককে জোর করে দমন করে টর্চটা সজোরে শব্দের উৎসের দিকে ঘোরাল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই—কেবল র‍্যাকের আড়ালে জমে থাকা ঘুটঘুটে অন্ধকার আর তার ভেতরের এক অমোঘ শূন্যতা। ঠিক তখনই মাথার ওপরের সুড়ঙ্গের মুখ থেকে হেমন্তবাবুর খসখসে গলা ভেসে এল—‘খুঁজছেন কেন বাবু? যাকে খুঁজছেন, সে তো অনেক আগেই এই কালচক্রের ভেতরে হারিয়ে গেছে!’*


Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.