FF.
ভূতের জংশন Book page

Chapter 1

ভূতের জংশন

Sep 20, 2026 24 min read

ভূতের জংশন

( সবগুলো ভূতের গল্প )

পার্থসারথি

লেখক পরিচিতি:

পার্থসারথি একজন আবেগপ্রবণ ও গল্পপ্রেমী বাংলাদেশী লেখক। গল্প লেখার মাঝে যেন নিজেকে সবসময় খুঁজে পান। লেখক জীবনের প্রথম দিকে বেশ প্রেমের কবিতা লিখতেন। তবে গল্প লেখায় সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু প্রথম গ্রন্থটি উপন্যাস 'সন্ত্রাসের পেয়ালায় জীবনযাপন' ১৯৯৭ সনে বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্পের আওতায় প্রকাশিত হয় এবং বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্প পুরস্কারে ভূষিত হন। তারপর লেখালেখিতে দীর্ঘকালের বিরতি; অবশ্য লিখে গেছেন কিন্তু কোথাও প্রকাশ করেননি। 

দীর্ঘ বিরতির পর দ্বিতীয় গ্রন্থ কিশোর উপন্যাস 'সোহান ও তার বন্ধুরা' কিডজ কারাভান পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০২৪ অর্জন করে এবং একই প্রকাশনা থেকে ২০২৫ বইমেলায় প্রকাশিত হয়।

লেখকের এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চারটি। তৃতীয় গ্রন্থ সামাজিক উপন্যাস 'বহতা জীবনের বাঁকে' ২০২৫ সনে এবং চতুর্থ গ্রন্থ গোয়েন্দা উপন্যাস 'টোপন হত্যা রহস্য'; দুটি উপন্যাস বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। বিবাহিত জীবনে এক সন্তানের জনক। জীবনসঙ্গীনি শিল্পী সরকার। সুলেখক পার্থসারথি জন্মেছেন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার তাড়াইল বাজার এবং ওখানকার আলোবাতাসেই বেড়ে উঠেছেন।

 

লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থ (হার্ড কভার):

*সন্ত্রাসের পেয়ালায় জীবনযাপন ( উপন্যাস), প্রকাশক- বাংলা একাডেমি, প্রকাশকাল: ১৯৯৭ ইং

 *সোহন ও তার বন্ধুরা (কিশোর উপন্যাস), প্রকাশক- কিডজ কারাভান, প্রকাশকাল: ২০২৫ ইং

*বহতা জীবনের বাঁকে (উপন্যাস),প্রকাশক- অনুপ্রাণন প্রকাশন, প্রকাশকাল: জুন, ২০২৫ ইং

*টোপন হত্যা রহস্য (গোয়েন্দা উপন্যাস)- প্রকাশক- অনুপ্রাণন প্রকাশন, প্রকাশকাল: জুলাই, ২০২৬ ইং

 

 

উৎসর্গ

শিশু-কিশোর যারা ভয়কে জয় করতে ভালোবাসে।

 

 

গ্রন্থস্বত্ত্ব

লেখক

 

 

ই-বুক প্রকাশকাল

সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

 

 

ই-বুক প্রকাশক

 Fictionfactory

ভূতের জংশন ( সবগুলো ভূতের গল্প )

 সারসংক্ষেপ:

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো গল্প শোনা। আর তা' যদি হয় ভূতের গল্প, তবে তো কথাই নেই। ভূতের গল্প শুনতে ও পড়তে শিশু-কিশোররা সর্বদাই উদগ্রীব হয়ে থাকে। ভূতে বিশ্বাস আছে কি নেই, তা' উর্ধ্বে রেখেই না-হয় চলি। আর তার জন্যই গল্পের ভেতর একেকটি গল্প একেকরকম; কখনও ভূতে বিশ্বাস আসবে আবার কখনও মনে হবে ভূত শব্দটিই মানুষের বানানো। যাই হোক, ভূতের এই গল্পগুলোর ভেতর শিশু অথবা কিশোর মনের রসালো খোরাক, অথবা কিছুক্ষণ ভয়ার্ত-রোমাঞ্চের ভেতর ডুবে থাকা, পাশাপাশি ভূতের গল্পগুলোর ভেতর রয়েছে কিছু উপদেশ যা উদ্বুদ্ধ করবে সকল শিশু-কিশোরদের।

‰ভূতের জংশন'- গল্পের বইয়ে কিশোর-কিশোরীরা পরিচিত হবে নানান রকমের ভূতের সাথে; ভয়ংকর ভূত, দুষ্ট ভূত, ভালো ভূত আর পাঁজি ভূতের সাথে। গল্পগুলো পড়লেই বুঝা যাবে ভূত কতটা ভয়ংকর হতে পারে আবার কোন কোন ভূত কত দুষ্ট হতে পারে, আবার এই ভূতই কত অমায়িক আর রোমাঞ্চকর হয় ।আশা করি, এই ভূতের গল্পগুলো সবারই ভালো লাগবে; সে যেই হোক না; শিশু অথবা কিশোর, অথবা হোক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। কারণ ভয়ার্ত-রোমাঞ্চের ভেতর রয়েছে ভালোলাগার মতো রসিকতা।- লেখক    

 

 

 

সূচিপত্র:

১. ভূতের কাঁথা

২. মেছো ভূতে কাণ্ড

৩. ভূত ও মিষ্টি

৪. ভূতের ডাকে

৫. ভূত সমাচার

 

 

 

 

 

 

 

 

ভূতের কাঁথা

*

স্কুল থেকে এসেই টুম্পামণি ও শম্পামণি মায়ের কাছে জানতে পারল যে, রাঙা মামা ফোন করে জানিয়েছে আগামি কাল আসবে। ফোন করেছে চট্টগ্রাম থেকে। রাঙা মামা আসবে তাই ওদের আনন্দের আর সীমা নেই। কারণ রাঙামামা এলেই বেশ আনন্দে দিন কাটে ওদের। বেশ সুন্দর সুন্দর গল্প শোনায়। তবে তার শোধ হিসেবে ভালো করে লেখাপড়া করতে হয়। যে ভালো লেখাপড়া করবে না তার সাথে রাঙামামার আঁড়ি চলে। আবার যদি ভালো লেখাপড়া করে তবে তার সাথে আঁড়ি থাকে না। আবার গল্প শোনায়।

এবার  টুম্পামণি ও শম্পামণির জন্য সুখবর! টুম্পামণি অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। আর শম্পামণি বার্ষিক পরীক্ষায় ক্লাশে প্রথম হয়ে সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। রাঙামামা এসে ওদেরকে ভীষণ আদর করবে। দু'বোন বেশ খোশ মেজাজেই আছে। খুশীতে নাচতে নাচতে এ'ঘর থেকে ও'ঘরে যাচ্ছে আর আসছে। মা ওদের আনন্দ দেখে মিটিমিটি হাসে।

পরদিন স্কুল থেকে এসেই অধীর আগ্রহে বসে আছে টুম্পামণি ও শম্পামণি। জানালার ধারে বসে পথ চেয়ে আছে। আর কতক্ষণ পরপর মাকে জিজ্ঞ্যেস করে- মা, রাঙামামা কখন আসবে?

ট্রেন আধঘন্টা দেরি হওয়াতে নির্ধারিত আধঘন্টা পর এলো রাঙামামা। টুম্পামণি রাঙামামাকে প্রথমে দেখতে পেয়েই আনন্দে নেচে ওঠলো- রাঙামামা এসে গেছে! রাঙামামা এসে গেছে!

টুম্পামণি ও শম্পামণি এক দৌঁড়ে নিচে নেমে এলো। কাছে এসেই রাঙামামার কোলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। দু'জনকে আদর করে দু'গালে চুমু দিয়ে শম্পামণিকে কোলে তুলে নিল। আর টুম্পামণি রাঙামামার হাত ধরে প্রায় ঝুলতে ঝুলতে এলো।

স্নান সেরেই রাঙামামা টুম্পামণি ও শম্পামণিকে নিয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে চলে এলো। প্রায় প্রত্যেক দিনই টুম্পামণি ও শম্পামণি খেতে বসলে এটা-ওটা নিয়ে একটু-আধটু ঝগড়া বাঁধাবেই। তবে এটাকে আবার ঝগড়াও বলা যাবে না। কিন্তু এখন লক্ষ্ণীটির মতো রাঙামামার দু'পাশে বসে চুপচাপ খাচ্ছে। আর একটু পরপর মামাকে দেখছে। মা ওদের খুশী ভাব দেখে মুচকি মুচকি হাসছেন।

খাওয়া শেষে রাঙামামা বিছানায় হেলান দিলেন। টুম্পামণি ও শম্পামণি দু'পাশে শুয়ে শুয়ে রাঙামামার সাথে টুকটাক কথা বলছে। ওদের রেজাল্ট আগেই জেনেছেন। তবুও ওদেরকে আদর করতে করতে আনন্দ প্রকাশ করে কাছে টেনে নিলেন। তারপর বললেন- তোমরা দু'জনই খুব ভালো রেজাল্ট করেছো। আর মা-বাবার কথা সবসময় শোন। আমি খুব খুশী হয়েছি। তাই পুরস্কার স্বরূপ আজ রাতেই মজার একটা গল্প শোনাবো।

শম্পামণি নিজেকে সামলাতে না পেরে বলল- রাঙামামা এখন একটা গল্প বলো প্লিজ!

রাঙামামা কপট রাগ দেখিয়ে বললেন- মামণি, এখন গল্প বলার সময় নয়! রাতের লেখাপড়া শেষ করে শু'তে যাবার সময় গল্প হবে। তবে একটা কথা, লেখাপড়ার সময় কিন্তু কোন আজেবাজে চিন্তা করা চলবে না। লেখাপড়ার সময় শুধু লেখাপড়া। কী, ঠিক আছে?

টুম্পামণি ও শম্পামণি একই সাথে ঘাড় কা'ত করে ‰হ্যাঁ'-সূচক উত্তর দিলো।

দু'জনের গালে আলতো টোকা মেরে আদর করলেন রাঙামামা। তারপর বললেন- এখন বিকেল

হয়েছে। তোমরা মাঠে খেলাধূলা করতে যাবে। কিন্তু ঠিক সন্ধ্যার আগে খেলাধূলা শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসবে। এখন তোমরা খেলতে যাও। আমি একটু বিশ্রাম নিই।

আর কোন কথা না বলে টুম্পামণি ও শম্পামণি চলে এলো। এবং আজ মা যা যা বলছে সবই কথামতো করছে। যদিও অন্যান্য দিন একটু-আধটু দুষ্টুমি করে। কিন্তু আজ একেবারে শান্ত-লক্ষ্ণীটি।

*

টুম্পামণি ও শম্পামণি রাতের লেখাপড়া শেষ করলো ঠিকঠাক ভাবে । রাঙামামার সাথেই রাতের খাওয়া-দাওয়া করলো। হাতমুখ মুছেই রাঙামামার পিছুপিছু চলে এলো। দু'জন রাঙামামার দু'পাশ দখল করে শুয়ে পড়লো।

রাঙামামা বেশ শান্ত কন্ঠেই জানতে চাইলেন- তোমরা কি ভূতের গল্প শুনবে?- এই বলে একবার টুম্পামণির দিকে তাকালেন আবার তাকালেন শম্পামণির দিকে।

শম্পামণি ভূতের গল্প শুনতে চাইল। কিন্তু টুম্পামণি আমতা আমতা করছিল। যদিও শম্পামণি ছোট কিন্তু বেশ সাহস দেখালো।

অভয় দিয়ে রাঙামামা বললেন- ভূতের গল্প ঠিকই। কিন্তু ভয়ের তেমন ব্যাপার-স্যাপার নেই। তবে দারুণ মজার হবে।

এবার বেশ খুশী হয়েই টুম্পামণি বলল- ঠিক আছে রাঙামামা, ভূতের গল্পই শুনবো। আমি ভয়

পাবো না।

দু'পাশ থেকে  টুম্পামণি ও শম্পামণি রাঙামামাকে জড়িয়ে ধরে গল্প শোনার জন্য তাকিয়ে রইলো।

গলা খাঁকাড়ি দিয়ে রাঙামামা গল্প শুরু করলো। তবে এর আগে সুইচ টিপে বাতিটা নিভিয়ে দিলেন। হঠাৎ ঘরময় অন্ধকার যেন ঝাঁপিয়ে পড়লো। বাহির থেকে জানালার ফাঁক গলে একটু একটু আলো ঘরের ভেতর আসছে। রাঙামামার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না টুম্পামণি ও শম্পামণি। কিছুটা ভয় যেন ওদের ওপর আঁছড়ে পড়লো। ভয়েতে ওরা দু'জনই রাঙামামাকে আরও জড়িয়ে ধরলো।

তবে শোন। আমার এক বন্ধু হাসু। সে খুবই সাহসী এবং বুদ্ধিমান। ঘটনাটা কয়েক বৎসর আগের। সে তখন তাড়াইল স্কুলের বোর্ডিং-এ থেকে লেখাপড়া করতো। একদিন এক বন্ধুর নিমন্ত্রণে ওদের বাড়িতে গেল। ঐ বন্ধুটির বাড়ি ধলা গ্রামে। তাড়াইল স্কুল হতে দুই-তিন কিলোমিটার পথ হবে। নিমন্ত্রণ খেয়ে ফিরতে একটু দেরী হয়ে গেছে। রাত দশটা থেকে এগারোটা হবে। বন্ধু অবশ্য অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়ে গেছে।

এবার হাসু একা। বিদ্যুৎ না থাকায় পথ ঘাট কিছুটা অন্ধকার তবে ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়; আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে সবকিছুই। রাস্তার পাশে অনেক বড়বড় গাছপালা আছে। গ্রাম এলাকা। সাধারণত রাত নয়টার মধ্যেই রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ে। এখন চারদিকে শুনসান নীরবতা। মেইন রাস্তা ধরে হেঁটে সিকান্দারনগর মোড়টা পর্যন্ত এলো। তারপর ভাবল মেইন রাস্তা দিয়ে গেলে অনেকটা ঘুরতি হবে। এই ভেবে বন্দ আড়াআড়ি হাঁটা শুরু করলো।

আকাশে চাঁদ নেই। তবে খুব একটা অন্ধকার রাত নয়। কারণ এখানে কোন গাছপালা নেই। কাছের জিনিস মোটামুটি স্পষ্টই দেখা যায়। ক্ষেতের সরিষা ফুলে মাঠময় হলুদ হয়ে আছে। কিন্তু এখন তা' স্পষ্ট নয়। তাড়াইল হাইস্কুলটা আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। ক্ষেতের আইল পথ ধরে হেঁটে চলল হাসু। মনে মনে গুনগুন করে গানের কলি গাইছে। আর পথ হাঁটছে। হঠাৎ মিহিসুরের কান্না শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়াল। হাসু ভীষণ অবাক। এত রাতে এই নির্জন এলাকায় আবার কে কাঁদে! আশেপাশে তাকালো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। কতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এখন কোন কান্নার শব্দ নেই। সে ভাবল, হয়তো শুনতে ভুল শুনেছে। আবার হাঁটা শুরু করলো। কয়েক কদম এগোতেই আবার কান্নার সুর কানে ভেসে এলো। সারা গায়ের লোম কদম ফুলের মতো খাড়া হয়ে ওঠল তৎক্ষণাৎ। এমনিতে হাসু খুবই সাহসী ছেলে। এই ব্যাপারে স্কুলে বেশ নামডাক আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছুটা ভয় আর আতংক মনের ভেতর জেগে ওঠল। কানের ভেতর যেন গরম হাওয়া আনাগোনা করছে।ডানে-বায়ে, সামনে-পেছনে তাকাল। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কান্নার সুর এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ভয়েতে হাসুর হাত-পা কাঁপতে লাগল। কী করবে এই মুহূর্তে ভেবে পাচ্ছে না। সে বেশ সাহসী অথচ এখন ভয়ে রীতিমত কাঁপছে। কিন্তু বুদ্ধিমানতো তাই সে নিজেকে স্থির রাখলো। বুদ্ধিমানরা বিপদে হতবিহ্বল না হয়ে বুদ্ধির ওপর ভরসা রাখে। ধীরে ধীরে হাসু মনটাকে বেশ শক্ত করল। তারপর কাউকে দেখতে না-পেয়েও জিজ্ঞ্যেস করল- আপনি কে? কাঁদছেন কেন?

কোন উত্তর নেই। কান্নার সুর আরো চড়া হলো। এবং সুরটা খুব কাছেই মনে হচ্ছে। হাসু আবার জিজ্ঞ্যেস করলো।

নাকি সুরে উত্তর এল- আঁমি এঁকজন সাঁধারণ ভূঁত।

নাকি সুরের কথাটা শুনে হাসু কিছুটা ভয় পেলেও ভেঙে পড়েনি। সাহস করে আবার জিজ্ঞ্যেস করল- কী কারণে কাঁদছো?

কুচকুচে কালো মানুষের মতো একটা ছায়ামূর্তি কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই আবার নাকি সুরে বলল- আঁমি বিঁপদে পঁড়েছি ভাঁই। এঁকটু সাঁহায্য কঁরো আঁমাকে।

ভূতটাকে আচমকা দেখতে পেয়ে হাসু বেশ ভড়কে গেল। তবে ভূতের কাঁদু কাঁদু অনুরোধ শোনে হাসু বুকের ভেতর কিছুটা সাহস পেল। ভূতটা কোন ক্ষতি অন্ততঃ করবে না মনে হচ্ছে। কারণ সে নিজের মুখেই বলছে বিপদে আছে। তবে ভূতকে এত সহজে বিশ্বাস করতে নেই। হাসু মনে মনে ভাবছে। কিন্তু কোন কথা বলছে না দেখে ভূতটা আবারো বলল- আঁমাকে এঁকটু সাঁহায্য কঁরো ভাঁই।আঁমি খুঁব বিঁপদে পঁড়েছি!

হাসু এবার সত্যি সত্যি সাহসী কন্ঠে বলল- ঠিক আছে বলো। তোমার কী বিপদ।

ভূতটা এবার কান্না থামিয়ে বলল- ওঁই পাঁশের ক্ষেঁতে আঁমার কাঁথাটা পঁড়ে গেঁছে। এঁকটু এনে দাঁও ভাঁই!

হাসু এতক্ষণে আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল। তবু বিশ্বাস করতে পারছে না। আশেপাশে খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখে নিল কোন ডোবা আছে কিনা।না নেই। তাছাড়া যে খালটা আছে ওটাতে পানি নেই। হাসু নিশ্চিত হল যে, অন্ততঃ পানিতে নিতে পারবে না।

টুম্পামণি আগ্রহভরা কন্ঠে জানতে চায়- আচ্ছা রাঙামামা, হাসু পানি নিয়ে এত ভাবছে কেন?

কারণ পানিতে টেনে নিতে পারলে ভূতেরা মানুষকে ঘাড় মটকে মারতে পারে।

এই কথা শুনে টুম্পামণি ও শম্পামণি ওদের রাঙামামাকে ভয়েতে আরো জড়িয়ে ধরলো।

রাঙামামা আবার বলতে শুরু করলো- তবে সাঁতার জানা থাকলে সহজে মারতে পারে না।

টুম্পামণি ও শম্পামণি একই সঙ্গে বলে ওঠলো- সত্যি বলছো মামা?

হ্যাঁ মামণিরা, একদম  সত্যি বলছি।– এই বলে রাঙামামা টুম্পামণি ও শম্পামণিকে জড়িয়ে আদর করতে করতে বলল- তোমরা কি সাঁতার জানো?

দুজনই একসঙ্গে দুঃখিত কন্ঠে বলে ওঠল- না মামা!

ঠিক আছে। তোমরা চিন্তা করো না। এবার তোমাদের দুজনকেই সাঁতার শিখিয়ে যাবো। হ্যাঁ, যা বলছিলাম- তারপর হাসু বলল- তোমার কাঁথা পড়ে গেছে তাতে কান্নার কী আছে? গিয়ে নিয়ে নাও।

আঁমি আঁনতে পাঁরলে কিঁ এঁতক্ষণ বঁসে থাঁকি?- এই বলে আবার নাকি সুরে কান্না শুরু করল ভূতটা।

কেন? নিজের কাঁথা নিজে গিয়ে নিয়ে এসো।– হাসু জেনেও কথাটা বলল। কারণ সে জানে ভূতরা কখনও সরিষা কিংবা সরিষা ক্ষেত ছোঁয় না। কারণ তাতে নাকি মাথার চুল সব ঝরে পড়ে যায়। আর মাথায় চুল না থাকলে ভূত সমাজে জায়গা হয় না। একঘরে করে রাখে এবং কঠোর শাস্তি দেয়।

নিঁজে আঁনতে পাঁরলে কীঁ আঁর তোঁমাকে বঁলি! লঁক্ষ্ণী ভাঁই আঁমার কাঁথাটা এঁনে দাঁওনা!

দিতে পারি এক শর্তে।– হাসু মাথায় বুদ্ধি এঁটে বলে।

ওঁখান থেঁকে কাঁথাটা এঁকটু তুঁলে এঁনে দিঁবে তাঁও আঁবার শঁর্ত!- ভূতটা বেশ অভিমানের সুরেই বলল।

এমনি এমনি আমি তোমার কাঁথা এনে দিতে পারবো না। তাহলে তুমি নিজেই তোমার কাঁথাটা তুলে নাও। এই বলে হাসু হাঁটা শুরু করলো। ভূতটা সামনে এসে দাঁড়াল। এবার হাসু ভূতটাকে একদম স্পষ্ট দেখতে পেল। সামনের দুটো দাঁত বেশ বড়সড় এবং সাদা ঝকঝকে। চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। পুরো গা লম্বা এবং কুঁচকুঁচে কালো লোমে ঢাকা। পা দুটো বেশ মোটাসোটা এবং পায়ের গোঁড়ালি উল্টা। ভয়েতে হাসুর বুক ঢিপ ঢিপ করে কাঁপছে।যদি আক্রমন করে তাহলে উপায় নেই। কিন্তু ভূতটা হাত জোড় করে বলল- ভাঁই লঁক্ষ্ণী আঁমার কাঁথাটা এঁনে দাঁও!

হাসু কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এক কথায় হাসুর অবস্থা কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ভূতটা আবার বলল- ঠিঁক আঁছে তোঁমার শঁর্তটা বঁল।

হাসু অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে বলল- আমাকে এমন একটা জিনিস দেখাও যা এর আগে কেউ কখনও দেখেনি। এবং এটা হবে তোমাদের ভূত সমাজের।

ভূতটা আমতা আমতা করছিল। কিন্তু হাসুকে নাছোড়বান্দা দেখে বলল- ঠিক আছে শোন। আমাদের সমাজে দু'ধরণের ভূত আছে; মন্দ ভূত আর ভালো ভূত। প্রতিমাসে আমাদের সমাজের সবার বিচার হয়। পূর্ণিমা রাতের দ্বিপ্রহরে এই বিচার বসে। তুমি এই বিচারটা দেখতে পারো।

হাসু এক কথায় রাজী হয়ে গেল। কিন্তু ভূত বলল- তঁবে কিঁছু নিঁয়ম আঁছে সেঁগুলো তোঁমাকে

মেঁনে চঁলতে হঁবে।

আমি কোন শর্ত মানতে রাজী নই।– হাসু একটু রেগেই বলল।

 আঁহা রাঁগ কঁরছো কেঁন ভাঁই! শঁর্তগুঁলো অঁবশ্যই মাঁনতে হঁবে। নঁয়ত তোঁমার আঁমার দুঁ'জনারই ক্ষঁতি হঁবে।

ঠিক আছে বলো।

তুঁমি যঁদি ভূঁতের বিঁচার দেঁখতে চাঁও তঁবে তোঁমাকে এঁক সঁপ্তাহ এঁকটাও মিঁথ্যা কঁথা বঁলা চঁলবে নাঁ।

কেন?- হাসু জানতে চাইল।

কাঁরণ যাঁরা মিঁথ্যেবাদী তাঁদেরকে আঁমরা দেঁখতে পাঁই। আঁর যাঁরা সঁত্যবাদী তাঁদেরকে দেঁখতে পাঁই নাঁ। কিঁন্তু যাঁরা সঁত্যবাদী তাঁরা আঁমাদের দেঁখতে পাঁয়। তাঁই তুঁমি এঁই শর্তটা পাঁলন কঁরলে আঁমাদের বিঁচার দেঁখতে পাঁরবে। কিঁন্তু তোঁমাকে কোঁন ভূঁতই দেঁখতে পাঁরবে নাঁ। তাঁহলেই তুঁমি আঁর আঁমি দুঁ'জনই নিঁরাপদ। যঁদি মিঁথ্যে কঁথা বঁলো তঁবে তোঁমাকে ওঁরা দেঁখে ফেঁলবে। তাঁহলে কিঁন্তু দুঁ'জনেরই বিঁপদ!

হাসু বেশ খুশী হয়েই বলল- ঠিক আছে। আমি রাজী।

ঠিঁক আঁছে এঁখন আঁমার কাঁথাটা এঁনে দাঁও!- ভূত তাড়া দিয়ে অনুরোধ করল।

কোথায় তোমার কাঁথা?- হাসু জানতে চায়।

আঙ্গুল উঁচিয়ে ভূত হাসুকে কাঁথাটা দেখাল।

ঠিক আছে। এনে দিচ্ছি। কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়াল হাসু। তারপর বলল- তোমার কাঁথা এখন আমি তোমাকে দেবো না। কারণ তোমার কথা মিথ্যেও হ'তে পারে। তোমাদের বিচার দেখে তারপর তোমার কাঁথা দেবো।

তুঁমি আঁমার কঁথা বিঁশ্বাস কঁরছো নাঁ?- খুবই ভারাক্রান্ত মনে ভূতটা বলল।

তোমার কথা না-হয় বিশ্বাস করলাম। কিন্তু মিথ্যে হলে পরে তোমাকে কোথায় পাবো?- হাসু ভূতটাকে বুঝিয়ে বলল।

ঠিঁক আঁছে। তোঁমার যেঁমন খুঁশী।– ভূতটা মনমরা হয়ে বলল।

আচ্ছা, সামনের বিচারটা কোনদিন কোথায় হবে?- ভূতের কাছে হাসু জানতে চাইল।

আঁসছে পূঁর্ণিমায় হঁবে। রাঁত বাঁরোটার পঁর। তোঁমাদের স্কুঁলের পঁশ্চিম পাঁশে যেঁ খাঁলি জাঁয়গাটা সেঁখানে হঁবে। তুঁমি স্কুঁলের ক্লাঁশ রুঁমে লুঁকিয়ে বঁসে দেঁখতে পাঁরবে।

এত দূর থেকে কিছু শুনতে পারবো কী?- হাসু বলেই ভূতের দিকে তাকিয়ে রইল।

নিঁশ্চয়ই শুঁনতে পাঁরবে। যঁতদূর থেঁকেই আঁমরা কঁথা বঁলি নাঁ কেঁন, তুঁমি ঠিঁকই শুঁনতে পাঁরবে। তঁবে তোঁমাকে অঁবশ্যই সঁত্যবাদী হঁতে হঁবে।

হাসু আর কোন কথা না বাড়িয়ে সরিষা ক্ষেতের ভেতর থেকে কাঁথাটা তুলে নিয়ে এলো।

আচ্ছা রাঙামামা, কাঁথাটা দেখতে কি আমাদের কাঁথার মত?- শম্পামণি রাঙামামাকে প্রশ্নটা না

করে পারল না।

রাঙামামা বুঝিয়ে বলল- না, ওদের কাঁথা থাকে তুলতুলে নরম আর কুঁচকুঁচে কালো। হ্যাঁ, যা বলছিলাম- হাসু ভূতের কাঁথাটা তুলে নিয়ে এসে বলল- এই নাও তোমার কাঁথা।– এই বলে কাঁথাটা ভূতের সামনে মেলে ধরল।

ভূতটা আঁতকে ওঠে কয়েক কদম পেছনে চলে গেল আর ভয়ার্ত কন্ঠে বলল- ওঁমা ওঁতে সঁর্ষে লেঁগে আঁছে! এঁকটু পঁরিষ্কার কঁরে দাঁও ভাঁই।

কেন? তুমি নিজে পরিষ্কার করে নিও।

ভাঁই, আঁমিতো সঁর্ষে ধঁরতে পাঁরবো নাঁ। তাঁহলে আঁমার সঁর্বনাশ হঁয়ে যাঁবে।

ব্যাপারটা হাসু জানে যে, ভূতরা কখনও সরিষা ছুঁ'তে পারে না। তবুও টেষ্ট করে দেখল; ঠিকই আছে। তারপর বলল- আমি এখন বসে বসে সর্ষে বাছতে পারবো না। বরং কাঁথাটা এখন আমার কাছে থাকুক। যেদিন বিচার দেখতে পারব তার পরেরদিন এসে নিয়ে যেও। স্কুলের মাঠে মান্দার গাছের নিচে রেখে আসবো।

সঁত্যি বঁলছো তোঁ?

হাসু তিন সত্যি কেটে বলল যে, কাঁথাটা সঠিক সময় ফেরৎ দেবে।

তারপর ভূত বলল- যঁদি তুঁমি ঠিকঠিক ফেঁরৎ দাঁও তঁবে তোঁমাকে অঁনেক উঁপকার কঁরবো।

কথা দিচ্ছি ঠিকঠিক তোমার কাঁথা ফেরৎ দেব। তবে আজ যাই অনেক রাত হয়েছে।

ঠিঁক আঁছে।– এই বলে ভূতটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

*

ভূতের তুলতুলে কালো কাঁথাট বগলে নিয়ে হাসু স্কুল বোর্ডিং-এ চলে এলো।

টুম্পামণি উদগ্রীব হয়ে বলল- রাঙামামা, ভূতের কাঁথাটা তুমি দেখেছো?

না মা, হাসু ভূতের কাঁথাটা কাউকে দেখায়নি।

শম্পামণি খুব আফসোস করে বলল- ইস! তুমি যদি দেখতে পেতে তবে খুব মজা হতো। তাই না রাঙামামা?

হ্যাঁ মা, সত্যি খুব মজা হতো।– রাঙামামার কন্ঠেও না-দেখতে পাবার কষ্টটা ফুটে ওঠল।

রাঙামামা, তারপর কী হলো?- টুম্পামণি আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছে না। বাকী গল্পটা শোনার জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করছে।

রাঙামামা আবার গল্পে চলে এল; হাসু বোর্ডিং-এ এসেই কাঁথাটা যত্ন করে ট্রাংকের ভেতর রেখে দিলো। সারারাত আর ঘুম হয়নি। অজানা এক রহস্যময় উত্তেজনায় সারাটা রাত ছটফট করে কেটে গেল। একদম ঘুমাতে পারেনি। থেকে থেকে বারবার শুধু ভূতের সাথে কথা বলার মুহূর্তগুলো মনে পড়ল। সে কী ভয়ানক!

পরদিন থেকেই ভূতের কথা মত সত্য বলার চর্চা শুরু হয়ে গেল। অবশ্য সদা সত্য বলতে গিয়ে প্রথম প্রথম বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে অনেকে হাসুর ওপর ভীষণরকম অখুশী হয়েছে। তবে হাসু এসব পাত্তা দেয়নি। কারণ একটা বিষয় হাসু বুঝতে পেরেছে যে, সদা সত্য কথা বললে মনে বেশ জোর থাকে। কিছু কিছু লোক অখুশী হলেও বেশির ভাগ লোক বেশ সমীহ করে চলে। যেমন, সত্য বলা শুরু করার পর থেকেই ক্লাশের মধ্যে হাসুর আলাদা দাম বেড়ে গেল। ক্লাশের সবাই ওকে ভীষণ ভয় পেত। কারণ সে সাহসী ও বুদ্ধিমান। আর এখন পাশাপাশি সে অকাট্য সত্যবাদীও। স্কুলে ওর বেশ সুনাম ছড়িয়ে পড়লো। সব স্যারেরাও ওকে বেশ আদর করা শুরু করল। কারণ সত্য কথা রক্ষা করতে গিয়ে অনেক কাজ করতে হচ্ছে। যেমন স্কুলের লেখাপড়া তাকে আগের চেয়ে বেশি করে করতে হচ্ছে। অবশ্য নিজের কাছে নিজেকে এখন বেশ ভালো লাগে। হাসু এই ক'দিনেই লেখাপড়ায় বেশ ভালো হয়ে গেছে।

*

পূর্ণিমা রাতের আর মাত্র একদিন বাকী। হাসুর বুকের ভেতরটা মাঝে-মধ্যে কেমন যেন ধড়ফড় করে ওঠে। আবার মাঝে মাঝে কল্পনা করে যে, একসঙ্গে অনেকগুলো ভূত বসে আছে। তখনই ভয়েতে গায়ের লোম কদম ফুলের মত কাঁটা দিয়ে ওঠে। আবার মনের অজান্তে আনন্দও জাগে এমন একটা দৃশ্য দেখতে পাবে বলে।রাত শেষ হয়ে পরের দিন। দিনটি ভীষণ উৎকন্ঠায় কেটেছে। আজ সারাদিন রুম থেকে তেমন একটা বের হয়নি। রুমে বসে বসে শুধু লেখাপড়া করেছে। তুলনামূলকভাবে আজ লেখাপড়া অনেক কম হয়েছে। কারণ মনটা বারবার উদাস হয়ে যাচ্ছিল। কল্পনার রাজ্য পেরিয়ে অনেক রাত হয়ে গেল।

এখন রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে।আর মাত্র আধঘন্টা সময় হাতে আছে। এক ফাঁকে ট্রাংকটা খুলে দেখল কাঁথাটা ঠিক আছে কি-না। হ্যাঁ, ঠিকই আছে। অজানা ভয়ে গলাটা বারবার শুকিয়ে আসছে। পরপর কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে নিল। তারপর চুপচাপ বোর্ডিং-এর বারান্দায় এসে দাঁড়াল। চারদিক নিঃস্তব্ধ, শুনসান নীরব।প্যাঁচার উদ্ভট ডাকটা কানে আসতেই কেমন যেন ভয় ভয় করছে। ধীরে ধীরে গায়ের লোম সব খাঁড়া হয়ে ওঠল। বাইরে কোন লোকজন নেই। যদি কোথাও কেউ থাকে তবে স্কুলের দপ্তরি কাম গার্ড আঈনউদ্দীন ভাই থাকতে পারে। উনাকে ফাঁকি দিয়ে যেতে হবে। নয়তো পিছু লাগবে। খুব সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিক তাকাল কোথাও আঈনউদ্দীন ভাই আছে কি-না। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল। ইটের টুকরো নিয়ে পরপর দুটো ঢিল ছুঁড়ল স্কুলের টিনের চালে। আঈনউদ্দীন ভাইয়ের কোন সাড়া-শব্দ নেই। নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রায় নিশ্চিত হয়ে বারান্দার পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে নেমে এল হাসু। স্কুলের পশ্চিম দিকের ক্লাশরুমগুলোর দিকে পা বাড়াল। ষষ্টশ্রেণীর রুমটাতে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই জানালার কাছে চলে এল। একটা বড় ছিদ্র থাকাতে আর জানালা খুলতে হলো না। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। কেউ নেই। হাসুর বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আবার তাকালো। না, এখনও আসেনি। শুধু ঢালু জায়গাটায় কয়েকটা টিলামত জায়গা অনঢ় দাঁড়িয়ে আছে। হাসু মনে মনে বলল; বিচারের জায়গাটা বেশ সুন্দর হয়েছে। পাশে অবশ্য খালের শেষাংশটা এসে থেমেছে।

হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে হাসুর শরীরের রক্ত চলাচল কিছুক্ষণের জন্য যেন থেমে গেল। ভয়েতে হাত-পা রীতিমত কাঁপতে লাগল। একটা ভূত খালের ওপারের বড় একটা গাছ হতে বিরাট লম্বা পা ফেলে এক কদমে টিলাটার উপর চলে এল। ভীষণ অবাক হয়ে গেল হাসু। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভূতদের মিটিং শুরু হয়ে গেল। একটা ভূত সবচেয়ে উঁচু টিলাটার উপর আসন গেঁড়ে বসল। দেখতেই বুঝা যাচ্ছ এই ভূতটা বেশ বড়সড় এবং বয়স্ক ও মাতব্বর। ওর দু'পাশে আরও কয়েকটা ভূত দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে মাতব্বর ভূতটার বডি গার্ড। একেকটার চেহারা বিশ্রী রকমের ভয়ানক। চোখগুলো কেমন যেন আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। ভূতগুলো ইয়া লম্বা ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। স্কুলের দিকে তাকাতেই হাসু সরে এল। ভীষণ ভয় পেয়ে গেল হাসু। যদি দেখে ফেলে তবে রক্ষা নেই। একটু সাহস সঞ্চয় করে আবার ফিরে এল জানালার ফাঁকে। কারণ এই ক'দিনে সে কোনরকম মিথ্যা কথা বলেনি। অতএব ভূতরা ওকে দেখতে পাবে না। জানালার ফাঁক গ'লে তাকিয়ে আছে হাসু।

সবার আগে মাতব্বর ভূতটা কথা বলল- আঁজ গেঁন্ধু ভূঁত আঁর মঁক্কু ভূঁতের বিঁচার হঁবে। তোঁরা দুঁ'জন আঁলাদা হঁয়ে বঁস।

কথামতো দুটো ভূত একটু ফাঁকা জায়গায় সরে এলো। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। এমন ভয়ংকর চেহারার ভূতগুলো কেমন জবুথবু হয়ে বসে আছে। হাসুর দেখতে বেশ ভালোই লাগছে।

প্রথমে গেন্ধু ভূতটাকে মাতব্বর ভূত বলল- তুঁই ঐঁ মেঁয়েটাকে কেঁন ধঁরেছিলি?

গেন্ধু ভূত মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। কোন টু-শব্দটি পর্যন্ত করছে না।

মাতব্বর ভূত ধমক দিয়ে আবারো বলল-  কঁথা বঁলছিস নাঁ কেঁন? মাঁথাটা সোঁজা কঁর।

গেন্ধু ভূত এবার সোজা হয়ে বসল। সে যে অপরাধী তা' স্পষ্টট বুঝা যাচ্ছে। গলা খাঁকাড়ি দিল। গলা খাঁকাড়ি তো নয় যেন ঢোলের বাদ্য। যাই হোক, তারপর গেন্ধু ভূত বলল- আঁমি সাঁরাদিন ঘুঁমিয়ে সঁন্ধ্যায় সঁন্ধ্যায় ঘুঁম থেঁকে উঁঠেই ঐঁ বঁড়ুই গাঁছটার গোঁড়ায় হেঁলান দিঁয়ে বঁসে দাঁত মাঁজছিলাম। তঁখন ঐঁ ছেঁমরীটা আঁমার ঘাঁড়ে পাঁ রেঁখে গাঁছে উঁঠল। আঁমি ঘাঁড়ে ভীঁষণ ব্যঁথা পেঁয়েছি। তাঁই রাঁগ সাঁমলাতে পাঁরিনি।

মাতব্বর ভূতটা রেগে গিয়ে বলল- তুঁই সঁত্যি বঁলছিস?

গেন্ধু ভূত কাঁদু কাঁদু কন্ঠে জবাব দিল-  সঁত্যি বঁলছি, আঁমি সঁন্ধ্যায় সঁন্ধ্যায় ঐঁ বঁড়ুই গাঁছটার

গোঁড়ায় হেঁলান দিঁয়ে বঁসেছিলাম।

মাঁনুষজন যেঁ পঁথে চঁলাচল কঁরে সেঁ পঁথে সঁন্ধ্যায় সঁন্ধ্যায় কেঁউ আঁর চঁলাফেরা কঁরবে নাঁ। সঁন্ধ্যা হঁলে তাঁরপর থেঁকে আঁমাদের চঁলাফেরা কঁরতে হঁবে। কীঁ মঁনে থাঁকবে তোঁ?- মাতব্বর ভূতটা সব ভূতদের উদ্দ্যেশে বলল।

গেন্ধু ভূতসহ সকল ভূত ঘাড় কা'ত করে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিল।

মাতব্বর ভূত আবার বলল- আঁর হ্যাঁ, তোঁরা কেঁউ কঁখনও মাঁনুষদেরকে অঁনর্থক অঁত্যাচার কঁরবি নাঁ অঁথবা ভঁয়ও দেঁখাবি নাঁ। ঠিঁক আঁছে?

সব ভূত এক সঙ্গে জবাব দিল। তারা আর কোনদিন মানষকে অনর্থক কিছু করবে না।

গেন্ধু ভূতের বিচার শেষ হলো। এবার মক্কু ভূতকে ডাক দিল মাতব্বর ভূত। চোখ জোড়া বড় বড় করে তাকাল মক্কু ভূতের ওপর। মক্কু ভূতকে ঠিক রাক্ষসের মত দেখাচ্ছে। দাঁত দুটো বেশ বড় হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে প্রায় দুই হাত লম্বা হবে। ঠিক বয়স্ক হাতির দাঁতের মতো। মক্কু ভূত একটু খাটো ধরণের কিন্তু বটগাছের মতো মোটা। দেখতে খুব হিংস্র দেখাচ্ছে। তবে মাতব্বর ভূতের চোখে চোখ রাখতে পারছে না। বুঝাই যাচ্ছে সে অপরাধী। মাতব্বর ভূত মক্কু ভূতের ওপর ভীষণ চটে আছে চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। চোখ দুটো আরও বড়বড় করে মক্কু ভূতকে বলল- তুঁই খাঁমোকা বুঁড়ো মঁহিলাকে ভঁয় দেঁখিয়েছিস কেঁন?

কথাটা শুনেই মক্কু ভূত দাঁত নাচিয়ে ফিক করে হেসে ওঠল। মাতব্বর ভূততো রেগে আগুন।  

হাসুও ভয়েতে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ধপাস করে বেঞ্চটার উপর বসে পড়ল।

বেশ জোরে ধমক দিয়ে ওঠল- তুঁই হাঁসছিস কেঁন? আঁমিতো হাঁসির কোঁন কঁথা বঁলিনি!

মক্কু ভূত এবার কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল- আঁমার ভুঁল হঁয়ে গেঁছে। মাঁফ কঁইরা দেঁন।

মাতব্বর ভূতটা একটু শান্ত হল। তারপর শান্তভাবেই বলল- ঠিঁক আঁছে। এঁবার আঁসল কঁথা বঁল।

আঁমি এঁকদিন ঐঁ বুঁড়ীর বাঁড়ির বাঁগানের গাঁব গাঁছে বঁসে আঁছি। তঁখন শুঁনতে পেঁলাম, আঁমাদেরকে ভীঁষণ গাঁলিগালাজ কঁরছে। আঁমারও চঁরম রাঁগ হঁল। তাঁরপর ঐঁ রাঁতেই সাঁমনে গিঁয়ে দাঁড়ালাম।

বেশ রেগেই মাতব্বর ভূত বলল- তোঁরা খাঁরাপ কাঁজ কঁরবি তোঁ তোঁদেরকে ভাঁলো বঁলবে নাঁকি! আঁগে নিঁজে ভাঁলো হঁয়ে চঁলিস। তাঁরপর কেঁউ খাঁরাপ বঁললে তঁখন রাঁগ দেঁখাবি। কঁথাটা মঁনে থাঁকে যেঁন!

মক্কু ভূত ঘাড় কা'ত করে জবাবে বলল- ঠিঁক আঁছে। মঁনে থাঁকবে।

মাতব্বর ভূত বিচার সভার সমাপ্তি ঘোষণা করল।

তারপরের দৃশ্য দেখে তো হাসু একেবারে হতবম্ভ। অনেকগুলো ঝুড়ি ভর্তি কমলালেবু, আঙুর, নেসপাতি, আপেল বিভিন্ন রকমের ফল। আবার এক ঝুড়ি ভর্তি তাজা মাছ। মাছগুলো এখনও লাফাচ্ছে। যার যেটা খুশি নিয়ে নিয়ে নিয়ে খাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব খেয়ে শেষ করে ফেলল। হঠাৎ মাতব্বর ভূতটা বলল- তাড়াতাড়ি কর, একটু পরই সূর্য ওঠে যাবে। আমাদের রাত প্রায় শেষ।

সূর্য ওঠার সাথে সাথেই সব ভূত চলে গেল। হাসু এখনও চুপচাপ বসে আছে। কীসব দেখল ভেবেই কূল-কিনারা পাচ্ছে না। ভূত সমাজেও তাহলে বিচার আছে! ভীষণ আশ্চর্য লাগছে হাসুর। কোথায় দিনদিন মনুষ্য সমাজে বিভিন্ন অপরাধ বেড়েই চলছে আর ভূত সমাজে কিনা কঠোর বিচার। হাসু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল- সবসময় সত্য কথা বলবে আর সৎ পথে থাকতে চেষ্টা করবে। যেন মানব সমাজের কোন কলংঙ্ক না হয়। হাসু উঠার চেষ্টা করল। কিন্তু শরীরটা কেমন যেন অসার হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ পর বেঞ্চ থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে এলো। তখন আকাশ কিছুটা ফর্সা হয়ে গেছে। পাখির ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে।

আজ রাতে কাঁথাটা ফেরৎ দিতে হবে। হাসু মাঝে মাঝে ভাবে কাঁথাটা ফেরৎ দেবে কিনা। আবার ভাবে রেখেই হবে কী। কথামতো ফেরৎ দেয়াই ভালো। ভূতকে বিশ্বাস নেই। আবার কখন রেগে যাবে। তারপর কতরকম ক্ষতিই করতে পারে। শেষে স্থির করল কাঁথাটা ফেরৎ দিয়ে দিবে। রাত দশটার দিকে কাঁথাটা নিয়ে হাসু রওনা হল। ভূতটার কথামতো থানার পেছনের মান্দার গাছটার কাছে গেল। যদিও জানে ভূতটা কিছুই করবে না তবু ভীষণ ভয় ভয় করছিল হাসুর। চারদিকে তাকাল কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তারপর একা একাই বলল- আমি কাঁথা নিয়ে এসেছি। ভূতবন্ধু তুমি কোথায়?

গাছের উপর থেকে কন্ঠ ভেসে এল- কাঁথাটা এঁকটু ভাঁলো কঁরে পঁরিষ্কার কঁরে দাঁও। এঁখনো সঁর্ষে ফুঁল লেঁগে আঁছে।

হাসু উত্তরে বলল- আমিতো কাঁথা খুব ভালো করেই পরিষ্কার করেছি।

নাঁ বঁন্ধু এঁখনো  সঁর্ষে ফুঁল লেঁগে আঁছে।

ঠিক আছে বন্ধু। দেখে দেখে আমি ঝেড়ে পরিষ্কার করছি। এই বলে হাসু কাঁথাটা চাঁদের আলোয় মেলে ধরলো। সরিষা ফুল কোথায় কোথায় লেগে আছে খুব একটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবুও আন্দাজ করে করে টোকা মেরে মেরে পরিষ্কার করতে লাগলো। এক ফাঁকে ভূতের উদ্দ্যেশে হাসু বলল- গত রাতে তুমি কি বিচারে ছিলে না?

হ্যাঁ, ছিঁলাম তোঁ।– ভূতটা উত্তরে বলল।

কিন্তু তোমাকে তো দেখতে পেলাম না।

লুঁকিয়ে লুঁকিয়ে ছিলাম বন্ধু।

কিন্তু কেন?- হাসু জানতে চায়।

কাঁথাটা সাঁথে ছিঁল নাঁ তাঁই। আঁমাদের কাঁথা সবসময় সাঁথে রাঁখতে হঁয়।

হাসু এবার অন্য প্রসঙ্গে এল- আচ্ছা বন্ধু, গত রাতে তোমরা যে এত ফল খেলে তা এনেছ কোথা থেকে?

আঁপেলগুলো অঁষ্ট্রেলিয়া থেঁকে আঁর বাঁকি ফঁলগুলো ইঁন্ডিয়া থেঁকে।       

আর মাছগুলো?- হাসু জানতে চায়।

মাঁছগুলো সুঁনামগঞ্জের হাঁওড় থেঁকে।

তোমাদের কত সুবিধা বন্ধু। পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে যখন খুশী তখন ভালো ভালো জিনিস খেতে পারো। তাই না?- হাসু এই কথা বলে ভূতের দিকে তাকাল। ভূতটা পা ঝুলিয়ে গাছের ডালে বসেছিল। এবার নিচে নেমে এল। তারপর হাসুকে জিজ্ঞ্যেস করল- তুঁমি কিঁছু

খেঁতে চাঁও বঁন্ধু?

এখন এনে দিতে পারবে?- হাসু জানতে চাইল।

হ্যাঁ, অঁবশ্যই। আঁমার বঁন্ধু খেঁতে চাঁইছে আঁর আঁমি পাঁরবো নাঁ! তাঁ কিঁ হঁয়? তুঁমি সঁরিষা ফুঁল বাঁছতে থাঁকো। আঁমি গিঁয়ে নিঁয়ে আঁসছি।– এই বলে ভূতটা বড় বড় লম্বা পা ফেলে মাঠটা পেরিয়েই অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার হাসুর একটু ভয় ভয় লাগছে। ভূত হোক এতক্ষণ তো বন্ধু মতো একজন ছিল। এখন যে একেবারে একা। হাসু ভয়ার্ত চোখে আশেপাশে তাকাল। পাশের ডোবাটায় চোখ পড়তেই বুকটা দুরু দুরু করে কাঁপতে লাগল। এখন বসে থাকবে নাকি ফিরে চলে যাবে দু'টানায় পড়ে গেল। বাম হাতে মায়ের দেয়া লোহার তাবিজটা আছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। এবার কিছুটা আশ্বস্ত হল।  তারপর কাঁথাটা ঝেঁড়ে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটা বড় ঝুড়িতে করে আপেল, আঙুর, নাসপাতি, আর কমলালেবু ভরে নিয়ে ভূতটা হাজির হলো। হাসু তো ভীষণ অবাক। কী এক অবাক করা কান্ড! ভূত বন্ধুটা গেল আর ফিরে এলো। হাসু ভাবল ভালোই হলো। বোর্ডিং-এর সবাই মিলে খাওয়া যাবে। এবার হাসু কাঁথাটা ভূতের উদ্দ্যেশে বাড়িয়ে দিয়ে বলল- বন্ধু, এই নাও তোমার কাঁথাটা।

ভূত বলল- মাঁটিতে রাঁখো।  

হাসু বেশ অবাক হয়েই বলল- কেন? আমার হাত থেকে নিয়ে নাও।

ভূতটা জবাবে বলল- তোঁমার হাঁতের কোঁন জিঁনিস আঁমি ছুঁতে পাঁরবো নাঁ।

কেন? কী হবে?- হাসু জানতে চাইল।

তোঁমার হাঁতে লোঁহার তাঁবিজ লাঁগানো আঁছে। আঁর এঁর ভেঁতরে আঁবার সঁরিষা আঁছে।

আর কথা না বাড়িয়ে হাসু কাঁথাটা মাটিতে রাখল।

কাঁথাটা হাতে নিয়ে ভূত বলল- বঁন্ধু, তোঁমার উঁপকার চিঁরদিন মঁনে থাঁকবে। আঁমি সাঁরাজীবন তোঁমার বঁন্ধু হঁয়ে থাঁকতে চাঁই। তুঁমি আঁমার বঁন্ধু হঁবে?

হাসু বেশ খুশি হয়ে বলল- নিশ্চয়ই! আজ থেকে আমরা বন্ধু। তাছাড়া তুমি ভূত ঠিকই কিন্তু তুমি খুবই ভালো।

হাসু এবার আমতা আমতা করে বলল- বন্ধু, তুমি যদি মনে কিছু না কর। এই ফলের ঝুড়িটা আমার রুমের কাছে পৌঁছে দিবে? তাহলে আমি আমার সব বন্ধুদের এই ফল খাওয়াবো।

হ্যাঁ, অবশ্যই পৌঁছে দেবো। চলো।– এই বলে ভূতটা হাসুর সাথে সাথে বোর্ডিং পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

তারপর ভূতটা বলল- এঁই ধঁরো বঁন্ধু যাঁদুর বাঁশিটা। যঁখনই আঁমাকে ডাঁকবে আঁমি তোঁমার কাঁছে চঁলে আঁসবো।

বাঁশিটা দেখতে ঠিক ঠিক বাঁশের বাঁশির মতই। তবে ছিদ্র একটা এবং দেখতে অপূর্ব সুন্দর।

হাসু অপলক দৃষ্টিতে বাঁশিটা দেখছে।

যঁখনই মঁনে পঁড়বে বাঁশিতে এঁকা ফুঁ দিঁবে। তোঁমার সাঁমনে এঁসে হাঁজির হঁবো।

ঠিক আছে বন্ধু।– হাসু বেশ খুশী হয়েই বলে।

এবার ভূতটা একটু করুণ সুরে বলল- বন্ধু, তাহলে এবার আসি।

কথাটা শোনামাত্রই হাসুর মনটা মুহূর্তেই বিষন্ন হয়ে ওঠল। সত্যিই এই ক'দিনেই ভূতটার সাথে বেশ হৃদ্যতা গড়ে ওঠেছে। মন খারাপ করা কন্ঠেই বলল- ঠিক আছে বন্ধু। ভালো থেকো।

মন খারাপ করো না বন্ধু। আমাদের দেখা হবে।– এই বলেই ভূতটা আচমকা অদৃশ্য হয়ে গেল।

হাসু ফলের ঝুড়িটা নিয়ে চুপচাপ রুমে চলে এল।

গল্প শেষ করে রাঙামামা বলল- কেমন লেগেছে?

টুম্পামণি ও শম্পামণি খুশীতে ডগমগ হয়ে লল- খুব সুন্দর হয়েছে রাঙামামা।

তারপর শম্পামণি আবদারের সুরে বলল- রাঙামামা, আরেকটা গল্প বলো প্লিজ।

রাঙামামা আদুরে কন্ঠে বলল- এখন অনেক রাত হয়েছে মামণি। আজ আর নয়। আগামীকাল আরেকটা সুন্দর গল্প বলবো। তোমাদেরকে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠতে হবে। এখন ঘুমাও। 

***

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.