FF.
ভূতের জংশন Book page

Chapter 2

ভূতের জংশন

Sep 20, 2026 30 min read

ভূত ও মিষ্টি

*

আমরা দিনের বেলা কাজ করি আর রাতে বিশ্রামের জন্য ঘুমাই। দিনের বেলায় আমরা সবকিছু যেমনভাবে দেখতে পাই রাতের অন্ধকারে তত নয়। কিন্তু ভূতের বেলায় আমাদের ঠিক উল্টো। তারা সারারাত ঘুরে-ফিরে খাবার সংগ্রহ করে এবং নানাবিধ কাজ করে। আর দিনের বেলায় ওরা চোখে তেমন দেখতে পায় না যেমনটা রাতে দেখতে পায়। ভূতেরা সাধারণতঃ ছোট নদী, খাল অথবা ডোবার পাশে বড় বড় গাছে থাকে। আর যেখানে সরিষা ক্ষেত থাকবে সেখানে তারা কোনদিন বাসা বাঁধে না। তাই নতুন ভূত-দম্পতি মদন ও তাগারী বিশাল বটগাছটায় বাসা বেঁধেছে। কারণ পাশেই ডোবা রয়েছে। ধারে-কাছে কোন ক্ষেত-খামার নেই। সরিষা ক্ষেতের তো প্রশ্নই আসে না।

দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। প্রচণ্ড রোদ। এতটুকু বাতাস নেই। গাছের পাতা নিশ্চল। গতরাতে নতুন ভূত দম্পতি পেট ভরে খেতে পায়নি। তাই তাড়াতাড়ি ক্ষুধা লেগে গিয়েছে। দিনের ঘুমটা তেমন হচ্ছে না। একটু পরপর বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। এখন সময় একদম ফুরাচ্ছে না। মদন ভূত ও তাগারী ভূত গাছের ডালে শুয়ে শুয়ে গল্প করছে। মদন ভূত তার স্ত্রী তাগারী ভূতকে খুব ভালোবাসে। তাগারী ভূতও মদন ভূতকে খুব ভালোবাসে। মোটকথা দু'ভূতই দু'ভূতকে খুব ভালোবাসে। কোন কিছু পেলে ওরা সমান ভাগ করে খায়। এখন আলোচনা চলছে আজ রাতে কোথায় কোথায় যাবে। সবকিছু ঠিক করছে দু'জনে মিলে। হঠাৎ করে দু'জন লোকের কথা ভূত-দম্পতির কানে ভেসে এল।

নিচের দিকে তাকাল ভূত দম্পতি। দিনের বেলায় ওরা ভালো দেখতে পায় না। তবে আবছায়ায়

বুঝতে পারে দু'জন লোক বটতলায় বসে কিছু খাচ্ছে। লোকদুটি কী গল্প করে তা শোনার জন্য ভূত দম্পতি কান পেতে বসে রইলো।

প্রথম লোক- এই গদা, কেমন লাগছে?

দ্বিতীয় লোক- খুব ভালো লাগছে। আহা! জীবনে এমন স্বাদের মিষ্টি কখনও খাইনি।

প্রথম লোক- আমি বলেছিলাম। অথচ আমার কথা তুই এতদিন বিশ্বাসই করিসনি। আরে যা রটে তা অবশ্যই কিছু বটে।

দ্বিতীয় লোক- কিছু নয়। একেবারে সম্পূর্ণ সত্যি। অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল জামাইয়ের হাতের তৈরি মিষ্টি খাবো। আজ সেই ইচ্ছেটা পূরণ হলো। সত্যিই জামাইয়ের হাতের তৈরি মিষ্টির কোন তুলনা হয় না। মধুর চেয়েও মধুর। অপূর্ব স্বাদ এই মিষ্টির।

প্রথম লোক- আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। এতদিন ধরে শুধু শোনে এসেছি; ভোলাচং নতুন বাজারের জামাইয়ের হাতের তৈরি মিষ্টি একবার যে খায় সে জীবনে কোনদিন ভুলতে পারে না।

দ্বিতীয় লোক- আমারতো তাই মনে হচ্ছে। যতদিন বেঁচে থাকবো এই মিষ্টির কথা মনে থাকবে।

প্রথম লোক- এই গদা এবার উঠা যাক।– এই বলে লোক দুটো উঠে চলে গেল।

লোকগুলোর সব কথাই ভূত দম্পতি কান পেতে শুনেছে। ওদের ইচ্ছে হচ্ছিল মিষ্টির হাঁড়িটা নিয়ে নিতে। কিন্তু ওরা নিতে পারেনি। কারণ মধ্যদুপুর ছাড়া ওদের খাওয়া নিষেধ। খাইলে সমাজচ্যূত হতে হয়। তাগারী ভূত বায়নার সুরে বলল- ওঁগো, চঁলনা আঁজ জাঁমাইয়ের দোঁকান হঁতে মিঁষ্টি এঁনে খাঁই। গাঁছের ফঁলমূল, মাঁছ, মাঁনুষের রঁক্ত এঁগুলো খেঁতে খেঁতে মুঁখে অঁরুচি ধঁরে গিঁয়েছে। মুঁখের রুঁচিটা এঁকটু পঁরিবর্তন কঁরা দঁরকার।

মদন ভূত চিন্তিত হয়ে কী যেন ভাবল। তারপর বলল- তুঁমি কঁথাগুলো ঠিঁকই বঁলেছো। এঁকদম আঁমার মঁনের কঁথা বঁলেছো। কিঁন্তু মিঁষ্টি আঁনবো কীঁভাবে?

তাগারী ভূত উত্তরে বলল- তাঁ অঁবশ্য ঠিঁকই বঁলেছো।

ভূত দম্পতি ভাবতে লাগল। কিন্তু কোন বুদ্ধি খোঁজে পাচ্ছে না। অনেকক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। মদন ভূত হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বলল- এঁক কাঁজ কঁরলে কেঁমন হঁয়?

তাগারী ভূত জানতে চাইল- কীঁ কাঁজ?

মদন ভূত ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলল- সঁন্ধ্যার পঁর আঁমরা দু'জন যুঁবক সেঁজে জাঁমাইয়ের দোঁকান থেঁকে মিঁষ্টি কিঁনে আঁনবো।

তাগারী ভূত গালে দু'হাত ঠেকিয়ে কী যেন চিন্তা করতে লাগল। মদন ভূত একদৃষ্টে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। তাগারী ভূত লজ্জা পেয়ে বলল- অঁমন কঁরে কীঁ দেঁখছো?

ঠাট্টা করে মদন ভূত বলল- তুঁমি খুঁব সুঁন্দর। তাঁই তোঁমাকে মঁন ভঁরে দেঁখছি। তোঁমার অঁর্ধেক কঁপালের কাঁলি, গাঁলে থেঁকে থেঁকে কাঁলির ছোঁয়া আঁমাকে সঁত্যিই মুঁগ্ধ কঁরে।

সত্যিই স্বামীর মন জয় করার জন্য তাগারী ভূত পাতিলের তলার কালি রোজ রোজ সারা গায়ে ভাল করে লাগায়। ঠোঁটেও কালি লাগাতে কখনও ভুল করে না। প্রতিদিন সন্ধ্যার সময়

সাজগোজ করে তাগারী ভূত। তারপর স্বামীর সাথে বের হয়।

মদন ভূত নীরবতা ভেঙে বলল- কীঁ ভাঁবছো তুঁমি?

লজ্জা পেয়ে তাগারী ভূত বলল- নাঁ, কিঁছুই নাঁ। এঁমনিতেই।

মদন ভূত  আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল- আঁমি যেঁ বুঁদ্ধিটা এঁটেছি ওঁটা কেঁমন হঁবে?

অনেক ভেবে-চিন্তে তাগারী ভূত বলল- যঁদি কেঁউ বুঁঝে ফেঁলে তঁবে মিঁষ্টি আঁর কিঁনতে পাঁরবো না। তাঁছাড়া বাঁজারে গেঁলে নঁতুন মাঁনুষ দেঁখে সঁবাই তাঁকিয়ে থাঁকবে। উঁল্টো পাঁ দেঁখলেই বুঁঝে ফেঁলবে।

দু'ভূতই ভাবতে লাগল। কিন্তু আর কোন বুদ্ধি খোঁজে পাচ্ছে না।

মদন ভূত হাঁটুর উপর আঙুল ঠুকতে ঠুকতে ভাবছে। তাগারী ভূত তার স্বামীকে একবার আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখল। সত্যিই বড় ভাবনায় পড়ে গেছে স্বামীটি। ভাবছে যেহেতু একটা বুদ্ধি নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তাছাড়া মদনভূত অন্যান্য ভূতের চেয়ে একটু বেশি বুদ্ধিমান। যার জন্যই তাগারী ভূত মদন ভূতের প্রেমে মজেছিল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে মদন ভূত চেঁচিয়ে ওঠল- আঁরেকটা বুঁদ্ধি পেঁয়েছি!

তাগারী ভূত খুব কাছাকাছি হয়ে বলল- শুঁনি কীঁ রঁকম বুঁদ্ধি পেঁয়েছো।

মদন ভূত তার নতুন বুদ্ধিটা তাগারী ভূতের কানে কানে বলল- বুদ্ধিটা দু'জনেরই পছন্দ হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। সময় কাটতে চাচ্ছে না। একেকটা মিনিট যেন একেকটা বছর মনে হচ্ছে। শেষ বিকেলের ঘুমটা প্রতিদিনই গাঢ় হয়। কিন্তু আজ মিষ্টির কথা শোনার পর চোখের পাতায় কিছুতেই ঘুম আসছে না। মদন ভূতের একটু একটু ঘুম আসছে। চোখের পাতা দুটো এক হতেই তাগারী ভূত নাড়া দিয়ে বলে- এঁখন আঁর ঘুঁমাচ্ছো কেঁন? উঁঠো সঁন্ধ্যা হঁলো প্রাঁয়। এঁকটু পঁরেই আঁমরা বেঁর হঁবো। তাঁড়াতাড়ি উঁঠে দাঁত মেঁজে তৈঁরি হঁও।

দুষ্টুমি হাসি হেসে মদন ভূত বলল- কীঁ ব্যাঁপার! মিঁষ্টির কঁথা শোঁনার পঁর বুঁঝি চোঁখে ঘুঁম আঁসছে নাঁ!

এই কথাতে তাগারী ভূত ভীষণ লজ্জা পেল। সত্যিই মিষ্টির কথা শোনার পর মনটা অধীর হয়ে আছে। সময় একদম এগোচ্ছে না। নিজেকে সামলে নিয়ে তাগারী ভূত বলল- এঁসো দাঁত মাঁজি।– এই বলে মদন ভূতকে টেনে তুলল।

*

রাত বারোটা। ভোলাচং নতুন বাজার একেবারে নীরব। সব দোকানদার ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। বাজারের ভেতরে বটগাছে মদন ভূত ও  তাগারী ভূত বসে আছে। কারণ কয়েকজন ময়রাসহ জামাই এখনও মিষ্টি বানাচ্ছে। আগামিকাল আধ মণ মিষ্টি সাপ্লাই দিতে হবে। বিয়ে বাড়ির অর্ডার। রাত তিনটা নাগাদ মিষ্টি বানানো শেষ হল। সবকিছু গুছানো শেষ করে জামাই ঘুমাতে যাবে এমন সময় ভূত দম্পতি হাজির হল।

মদন ভূত ডাক দিল- জাঁমাই দোঁকানে আঁছেন?

বিছানায় শুয়ে থেকেই জামাই উত্তর দিল- কে?

জাঁমাই, আঁমরা বিঁদেশী লোঁক।– জবাবে মদন ভূত বলল।

জামাই বিছানায় শুয়ে থেকেই জবাব দিলো- এত রাতে কী কাজে এসেছেন?

মদন ভূত বলল- কিঁছু মিঁষ্টি নিঁতে এঁসেছি।

জামাই ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললেন- দয়া করে সকালে আসুন।

এঁকটু কঁষ্ট কঁরে এঁখনই দেঁন জাঁমাই।– মদন ভূত অনুরোধ করে বলল।

উত্তরে জামাই বললেন- বললামতো সকালে আসুন।

মদন ভূত চালাকি করে বলল- আঁমাদের ভোঁরের লঞ্চে চঁলে যেঁতে হঁবে। এঁকটু কঁষ্ট কঁরে এঁখন দিঁলে ভাঁলো হঁয়।

জামাই উত্তরে কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। কতক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। কোন উত্তর না পেয়ে মদন ভূত আবার অনুরোধ করে বলল- অঁনেকদিন থেঁকেই আঁপনার হাঁতের তৈঁরি মিঁষ্টি খাঁওয়ার ইঁচ্ছে ছিঁল। এঁদিক দিঁয়ে যাঁচ্ছি যঁখন ভাঁবলাম আঁপনার হাঁতের তৈঁরি মিঁষ্টি নিঁয়ে যাঁই। খুঁব ইঁচ্ছে আঁপনার মিঁষ্টি খাঁবো।

এতগুলো কথা শুনে জামাইয়ের মনটা গলে গেল। মনে মনে ভাবলেন, বিদেশী লোক। হয়ত কারো কাছে শুনেছে। অনেক আশা নিয়ে এতরাতে এসেছে। ফিরিয়ে দিলে বেচারা ভীষণ কষ্ট পাবেন। এই ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে এলেন জামাই। দরজা খুলে দেখেন দু'জন যুবক বয়সী ছেলে। প্যান্ট-শার্ট পরিহিত। দেখতে বেশ ভদ্রই মনে হচ্ছে। মনটা একটু নরম হলো। তারপর চোখ কচলাতে কচলাতে জামাই বললেন- আপনাদের কতটুকু মিষ্টি লাগবে?

মদন ভূত বলল- দঁশ কেঁজি দিঁলেই চঁলবে।

জামাই হাত জোড় করে বললেন- ক্ষমা করবেন। এত মিষ্টি দেয়া যাবে না। কারণ বিয়ে বাড়ির

অর্ডার দেয়া মিষ্টি। বড় জোর পাঁচ কেজি দিতে পারবো।

এতক্ষণে ছদ্মেবেশী তাগারী ভূত মুখ খুলল- দঁশ কেঁজি দিঁলে ভাঁলো হঁয়। কাঁরণ বাঁড়িতে অঁনেক লোঁকজন। পাঁচ কেঁজি মিঁষ্টিতে কিঁছুই হঁবে নাঁ।

জামাই খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন- আমার একটু অসুবিধা হবে। তবু আপনাদের দিচ্ছি। কিন্তু মিষ্টি নিবেন কীসে করে।

মদন ভূত বলল- আঁমরাতো সঁঙ্গে কঁরে কিঁছুই নিঁয়ে আঁসিনি।

জবাবে জামাই বললেন- কিন্তু আমার এখানে কোন অতিরিক্ত পাত্র নেই।

এঁক কাঁজ কঁরুন, আঁপনার এঁখান থেঁকে এঁকটা বঁড় পাঁতিল দেঁন। দাঁম দিঁয়ে দেঁব।– মদন ভূত বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে বলল।

কথাটা শুনে জামাই কিছুই বললেন না। কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর ঘরের ভেতর থেকে ঘুরে এসে বললেন- হ্যাঁ, দেয়া যাবে। আপনারা দোকানের ভেতরে আসুন। আমি এক্ষুণি মিষ্টি মেপে দিচ্ছি।

ভূত দম্পতি এক সঙ্গে বলল- ঠিঁক আঁছে, ধঁন্যবাদ। বাঁইরে দাঁড়াতে আঁমাদের কোঁন অঁসুবিধা হঁবে নাঁ। আঁপনি মিঁষ্টি মেঁপে নিঁয়ে আঁসুন। আঁমরা এঁখানেই দাঁড়াচ্ছি।

কিছু না বলে জামাই দোকানের ভেতর ঘরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একটা পাতিলসহ হাজির হলেন। এসেই বললেন- এই নিন দশ কেজিই দিলাম।– এই বলে পাতিলটা এগিয়ে

দিলেন। মদন ভূত পাতিলটা হাতে নিল। টাকা না দিয়েই ভূত দম্পতি মিষ্টির পাতিল নিয়ে

রাস্তার দিকে হাঁটা শুরু করল।

মিষ্টির দাম দিয়ে গেলেন না!- এই বলে জামাই ভূতদের পেছন পেছন ছুটলেন। জামাই এখনও টের পাননি যে, ওরা দু'জন মানুষ নয়। ওরা ভূত। আসলে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে চোখ জুড়ে শুধু ঘুম। নইলে ভূতদের নাকালো কন্ঠটা অন্ততঃ বুঝতে পারতো।

মদন ভূত হাঁটতে হাঁটতে বলল- আঁপনি আঁমাদের সাঁথে আঁসুন। মেঁইন রাঁস্তায় আঁমাদের বাঁবা দাঁড়িয়ে আঁছেন। উঁনিই আঁপনাকে টাঁকা দিঁবেন। আঁমার কাঁছে কোঁন টাঁকা নেঁই।

জামাই ভূত দম্পতির পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলেন। ব্রীজটা পেরিয়ে এলেন মেইন রাস্তায়। রাস্তা একেবারে ফাঁকা। কোন লোকজন নেই। রাস্তা পেরিয়ে চাতালের দিকে পা বাড়াতেই জামাই বললেন- কী ব্যাপার! আপনারা ঐদিকে কোথায় যাচ্ছেন। মদন ভূতের সরল জবাব- আঁমদের সাঁথেই আঁসুন। জামাই এবার বেশ বিরক্ত হয়েই বললেন- কিন্তু ওদিকে কেন?

কোন উত্তর নেই। জামাই আর কোন কথা বাড়ালেন না। তাদের পেছন পেছন হাঁটছেন। চাতালের মধ্যে যে বড় বটগাছটা ওরা সোজা সেদিকে হাঁটছে। ভূত দম্পতির পিছু পিছু জামাই হাঁটছেন। হঠাৎ কেমন বিশ্রী একটা গন্ধ জামাইয়ের নাকে এসে লাগলো। কী ব্যাপার! প্যান্ট-শার্ট পরা অথচ শরীর থেকে এমন বিশ্রী গন্ধ আসছে কেন? হাতের আঙুলে নাক চেপে ধরলেন জামাই। আরও কয়েক কদম এগোতেই জামাইয়ের চোখ-জোড়া প্রায় কপালে ওঠে এলো- একি! ওদের পা জোড়া যে উল্টা। নিশ্চয়ই ভূত।

জামাই থমকে  দাঁড়ালেন। সারা শরীরের লোমকূপগুলো সজাগ হয়ে ওঠল। ভয়ে বুকটা ধুকপুক

করতে লাগলো। ভূত দম্পতি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফিরে তাকালো। তারপর মদন ভূত বলল- কীঁ ব্যাঁপার জাঁমাই আঁসছেন নাঁ কেঁন?

জামাই কোন কথা বলতে পারছেন না। ভাবতে লাগলেন পেছন ফিরে দৌঁড় দিবেন কিনা। কিন্তু ভয় পাওয়া সত্ত্বেও মনটাকে শক্ত করলেন।ভূত দম্পতি হাঁটতে হাঁটতে বটগাছের ওখানে গিয়ে থামল। এতক্ষণ খেয়াল করেননি। এখন চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুটো দাঁত মুখ থেকে চার আঙুল বেরিয়ে আছে।জামাইকে কয়েকবার ডাকল। জামাই কোন সাড়া-শব্দ করলেন না।

মদন ভূত এবার জোরে ডাক দিলো- কীঁ হঁলো জাঁমাই, আঁসছেন নাঁ কেঁন?

জামাই ভয়েতে রীতিমতো কাঁপতে লাগলেন। স্পষ্টই বুঝতে পারছেন পায়ে হাঁটার মতো কোন শক্তি নেই। গায়ের লোমসব খাড়া হয়ে আছে। সে ঘেমে-নেয়ে একাকার। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।

কোন উত্তর না পেয়ে মদন ভূত বলল- ঠিঁক আঁছে, আঁপনি সঁকালে এঁসে পাঁতিল নিঁয়ে যাঁবেন। পাঁতিলের ভেঁতর টাঁকা রেঁখে দেঁব।– এই বলে এক কদমে লম্বা পা ফেলে ভূত দম্পতি গাছের মগডালে উঠে গেল।

এই দৃশ্য দেখে জামাই নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। ধপাস করে চাতালের মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। যখন চোখ মেলে তাকালেন তখন চোখ জোড়া গিয়ে সবে উদীয়মান সূর্যে আটকে গেল। পাশেই খালি পাতিলটা পড়ে আছে। শরীরটা টেনে খুব কষ্টে উঠে বসলেন। দেখলেন কথামত পাতিলের ভেতর টাকা রাখা আছে। গুনে দেখলেন সব ঠিকঠাক। আশ্চর্য হয়ে

মনে মনে ভাবলেন- ভূতগুলো মন্দ ভূত নয়।

 ভূতের ডাকে

*

সূর্য ও নিশান দুষ্টের শিরোমণি। লেখাপড়ায়ও সবসময়ই বাজে। শুধু খেলা আর খেলা। কার গাছে কী ফলেছে তা চষে বেড়ানোই ওদের নেশা। পাড়ার সবাইকে সবসময় অতিষ্ঠ করে তোলে। প্রতিদিন অন্ততঃ একটা-দুটো নালিশ ওদের নামে আসবেই। মা-বাবার ভীষণ অবাধ্য ওরা। কোন কথাই তেমন শোনে না। পশ্চিমে যেতে বললে যাবে পূবে। আর উত্তরে যেতে বললে যাবে দক্ষিণে। আর একটা বাজে অভ্যাস আছে; মার্বেল খেলা আর সিগারেটের খালি প্যাকেট দিয়ে তাস খেলা। এবং তা পয়সা দিয়ে পর্যন্ত খেলে। যা এলাকার গুরুজনরা ভালো নজরে দেখেন না কখনও। স্কুল থেকে এসেই মার্বেল অথবা তাস খেলায় মত্ত থাকে।

খুব ভোর বেলায় ঘুম থেকে ওঠেই বাজার থেকে সিগারেটের খালি প্যাকেট কুড়িয়ে আনে। আজ শনিবার। তাড়াইল বাজারে হাটবার ছিল। অথএব আগামিকাল ভোরে সিগারেটের অনেক খালি প্যাকেট পাওয়া যাবে। তাই খেলা শেষে সূর্য ও নিশান বড় জামগাছ তলায় দাঁড়িয়ে পরামর্শ করছে। পরামর্শ অনুযায়ী খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে সিগারেটের খালি প্যাকেট কুড়াতে যাবে।

সূর্য নিশানকে বলল- নিশান, যে আগে ঘুম থেকে উঠবে সে অন্যজনকে ডাক দিবে।

ওরা দু'জন যখন বড় জামগাছ তলায় দাঁড়িয়ে এই পরামর্শ করে তখন গোধূলী পেরিয়ে চারদিক বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। আর ওরা যখন কথা বলছিল তখন জামগাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে ওদের সব কথা শুনছিল দুষ্ট ভূতটা। ওদের কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসল। আর মনে

মনে বলল, দাঁড়া তোদের মজা দেখাচ্ছি। এই ভেবেই ডালে কয়েকটা ডিগবাজি দিলো মনের

আনন্দে। সূর্য কিংবা নিশান ভূতের এই খবর কিছুই জানতে বা বুঝতে পারলো না।

সূর্য ও নিশান খুব খোশ মেজাজে রাতের ঘুম ঘুমাতে গেল। অথচ আগামীকাল স্কুলের যে লেখাপড়া আছে তা নিয়ে কোন মাথা ঘামাল না। ওরা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ক'দিন পরেই বার্ষিক পরীক্ষা। তবুও লেখাপড়া নিয়ে ওদের কোন মাথা ব্যথা নেই।

*

রাত গভীর। চারদিক খুব নীরব। কোন মানুষজনের চলাফেরা নেই। শুধু মাঝে-মধ্যে বাজারের পাহারাদার চেঁচাচ্ছে- হেই হেই, খবরদার! হেই হেই, সাবধান! একজনের চিৎকার অন্যজনের কানে পৌঁছাতেই সে-ও একইভাবে হাঁক দিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। ঠিক শেয়ালের মতো। আবার মাঝে-মধ্যে বাজারের নেড়ী কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ওঠছে। বাজারের রাস্তার এক প্রান্ত থেকে দৌঁড়ে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। থেকে থেকে হুঁতোম পেঁচা বুক কাঁপিয়ে ভয়ানকভাবে ডেকে ওঠছে। এমন সময় বাইরে একা বের হওয়া সম্ভব নয়। অমাবস্যা রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তাকালে চোখে কিছুই দেখা যায় না। কারণ তাড়াইল বাজারে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। শুধু বাজারের রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাইট পোস্টের বক্সে হারিকেন বাতি জ্বালানো রয়েছে। তাতে খুব একটা দূর পর্যন্ত আলোকিত হয় না। তাছাড়া সূর্য ও নিশানদের বাড়ি পাড়ার একটু ভেতরে। যদিও ওদের বাড়ি বাজার এলাকায় কিন্তু কোন লাইট পোস্ট নেই। ওদের দু'জনের বাড়ি প্রায় পাশাপাশি। মাঝখানে গুটিকতক ঘর।

রাত তখন আনুমানিক তিনটা হবে। বাড়ির সকলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। গেছো ভূতটা সূর্যদের

বাড়ির কাছে এসে নিশানের স্বর নকল করে ডাক দেয়- সূঁর্য তাঁড়াতাড়ি ওঁঠ। অঁনেক বেঁলা হঁয়ে যাঁচ্ছে।

দু'তিনবার ডাক দেয়ার পর সূর্য চোখ মেলে তাকাল। ভূতটা যখন আবার ডাক দিল তখন সূর্য হুড়মুড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বলল- একটু দাঁড়া নিশান, আমি এক্ষুণি আসছি।

শার্টটা গায়ে দিতে দিতেই সূর্য ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসেই ঘুম জড়ানো চোখে বলল- নিশান, তুই কোথায়?

ভূতটা একটু দূরত্ব বজায় রেখেই বলে- আঁমি এঁইখানে, তাঁড়াতাড়ি আঁয়।

ভূতের সুরটা বেশ নাকালো। কিন্তু সূর্য গভীর ঘুম থেকে উঠে এসেছে। চোখের তন্দ্রালুভাব এখনও লেগে আছে। তাছাড়া তাস কুড়াতে যাবে সেই নেশা মিলিয়ে ভূতের স্বরটা সূর্য ধরতে পারেনি। মোটকথা ভাববারও কোন ফুসরৎ নেই। তাড়াতাড়ি তাস কুড়াতে হবে। খুব দ্রুত পা চালাচ্ছে সূর্য। মনে মনে ভাবলো নিশান অনেক আগে চলে যাচ্ছে, তাই সূর্য বলল- নিশান, একটু দাঁড়া এক সাথে যাই।

উত্তরে ভূতটা বলল- তাঁড়াতাড়ি হাঁটা দেঁ। দেঁরি কঁরলে তাঁস পাঁবো নাঁ। অঁন্যেরা তাঁস কুঁড়িয়ে নিঁয়ে যাঁবে।

ঘুম জড়ানো চোখে সূর্য দ্রুত পায়ে হেঁটেই যাচ্ছে। ভূতটা যেদিক থেকে ডাকছে সূর্য সেদিকেই হাঁটছে। তবে কোনদিকে যাচ্ছে তা টেরই পাচ্ছে না সূর্য। ভূতের তো পোয়া বারো অবস্থা। ভুল পথে সূর্যকে আনতে পেরে ভীষণ খুশী। নাচতে নাচতে গেছো ভূতটা আগে আগে যাচ্ছে। সূর্য এখনও বুঝতে পারেনি আগে আগে যে যাচ্ছে সে নিশান নয়, ভূত। সূর্য এখন বাজারের মাঝরাস্তা দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে অথচ কিছুই টের পাচ্ছে না। চোখে ঘুম ঘুম ভাব এখনও লেগে আছে। বাজারের রাস্তা শেষ করেই ভূতটা নদীর রাস্তার দিকে পা বাড়াল। তারপর সূর্যকে ডেকে বলল- তাঁড়াতাড়ি আঁয় সূঁর্য, নঁইলে তাঁস এঁকটাও পাঁবো নাঁ।

সূর্য রীতিমতো দৌঁড়ে ছুটছে। ভূততো নাচতে নাচতে আগে আগে চলছে। মাঝে কয়েকটা ডিগবাজিও দিয়ে নিল। নদীর পাড়ে এসে সূর্য ঘুম জড়ানো চোখে তাকাল। কিন্তু কিছুই টের পেল না। খুব জোরে ডেকে বলল- নিশান, তুই কোথায়?

গেছো ভূতটা চালাকি করে পানিতে কয়েকবার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে বলল- আঁমি সাঁতার শুঁরু কঁরেছি। তুঁই তাঁড়াতাড়ি নেঁমে আঁয়। নঁদীর ঐঁ পাঁড়ে যেঁতে হঁবে।

সূর্য কথাগুলো শুনেছে ঠিকই কিন্তু কিছুই বুঝে ওঠতে পারেনি। তাই চিৎকার করে বলে ওঠল- আমিও আসছি। প্যান্টটা খুলে নিই।

সূর্যের শেষ কথাটি শুনে এবং ভূতটি দেখতে পাচ্ছে যে, সূর্য এখনই পানিতে নামতে যাচ্ছে। এখনই ঘাড় মটকিয়ে তাজা রক্ত খেতে পারবে। তাই গেছো ভূতটা মহাআনন্দে কয়েকটা ডিগবাজি দিয়েই হঠাৎ মনমরা হয়ে মাটিতে লেপটে বসল। আর দু'হাত দু'গালে রেখে বসে রইল- মনে মনে বলতে লাগল; এঁকটুর জঁন্য আঁমার সঁব প্ল্যাঁন শেঁষ!

সূর্য যখন শেষ কথাগুলো বলল তখন বাজারের এক পাহারাদার কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। সমূহ বিপদ বুঝতে পেরে এক মুহূর্তেই দৌঁড়ে এসে জাপটে ধরে সূর্যকে কোলে তুলে নিল। সূর্য হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করছে আর বলছে- আমাকে ছাড়ো। আমি তাস কুঁড়াতে যাচ্ছি।

পাহাড়াদার সূর্যকে চিনে ফেলল। তারপর পাঁজাকোলে করে ওদের বাড়িতে নিয়ে এল। বাড়িতে

আনার পর হুলস্থূল কাণ্ড বেঁধে গেল। শুধু কান্নাকাটি শুরু হতে বাকি। দেখতে দেখতে সকাল হয়ে এল। সকালে সূর্যদের বাড়িতে লোকজনের ভীড় জমে গেল। সবাই বলাবলি করছে- ভাগ্যটা খুব ভালো। একটুর জন্য বেঁচে ফিরেছে। নিশ্চিত অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলো। পাহারাদার সময় মতো না দেখলে ভূত নদীতেই ঘাড় মটকে ফেলে রাখতো।

যখন ঘটনা ঘটেছে তখন সূর্য কিছুই বুঝতে পারেনি। সে ভেবেছে নিশানই তাকে ডেকেছে। কিন্তু নিশানকে ডেকে এনে জিজ্ঞ্যেস করা হলো। সে সূর্যকে ডেকেছে কিনা। নিশান বলল যে, সূর্যকে ভোর বেলায় ডাকার কথা ছিল। কিন্তু সে ঘুম থেকেই জাগতে পারেনি।

কথাগুলো শুনে সূর্য ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ভূতের ডাকে পেছন পেছন দৌঁড়ে নদীর পাড় পর্যন্ত গিয়েছে। ভাবতেই সূর্যর করুণ অবস্থা। ভয়েতে সারা গায়ের লোম কদম ফুলের মতো খাড়া হয়ে ওঠল। ভূতের ডাকের কথা শুনে নিশান ভয়েতে একেবারে কাঁচুমাচু হয়ে গেল।

এরপর থেকে সূর্য ও নিশানের দুষ্টুমিটা কমে গেল। মন দিয়ে লেখাপড়া শুরু করল। মা-বাবার কথা সবসময় শোনে। কারো গাছের উপর চড়াও হয় না। আর আসল কথা হলো- যেখানেই থাকুক সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে চলে আসে।

এবার দু'জনের পরীক্ষার ফলাফল দেখেতো সবাই অবাক। সূর্য ও নিশান ক্লাশে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে। সবাই ওদের অনেক অনেক আদর এবং ভালোবাসা জানিয়ে গেল। কেউ কেউ আবার সুন্দর উপহার দিয়েছে। সূর্য ও নিশান এখন অনেক বদলে গিয়েছে। সবাই ওদেরকে এখন খুব ভালোবাসে।

***

ভূত সমাচার

*

স্কুল ছুটি। বারান্দায় এসে চিনুদা বইখাতা হাতে নিয়ে দাঁড়াল। তারপর একে একে সবাই এসে পাশাপাশি দাঁড়াতেই চিনুদা বলল- বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে সবাই চলে আসবি জায়গামতো।

কিন্তু আমার যে!- আদুর কথা থামিয়ে দিয়ে চোখ ছানাবড়া করে বলল- কোন কিন্তু নয়, সবাইকে আসতে হবে ব্যস্। এখন লক্ষ্ণীছেলের মতো যার যার বাড়ি চলে যা। তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে তিড়িং বিড়িং করে সোজা ঐ জায়গায় চলে আসবি। আর কোন কথা না বাড়িয়ে চিনুদা বাড়ির উদ্দ্যেশে পা বাড়াল।

বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই একে একে সবাই হাজির। শুধু সুনীল পাল ওরফে সুইন্যা এখনও পৌঁছায়নি। তার জন্যে অবশ্য ওরা বসে নেই। সবাই খোশগল্পে মোটামুটি ব্যস্ত।

ওদের আড্ডাস্থানটা হল গতবছরের কালবৈশাখি ঝড়ে হেলে পড়া কড়ই গাছটা। স্কুল পুকুরের পূব পাড়ে। স্কুল ঘরেরও পূব পাড়। কেউ গাছের আধ-গোড়ায়, কেউ এ'ডালে আবার কেউবা অন্য ডালে তবে সবাই কাছাকাছি হয়ে মুখোমুখি বসেছে।দূর থেকে দেখতে বেশ ভালোই লাগে। ওদের এই জমজমাট আড্ডা দেখে অনেকেই হিংসে করে। প্রীতম নিজেও একসময় খুব হিংসা করতো। তারপর আস্তে আস্তে এসে ওদের দলে মিশেছে। অবশ্য এক্ষেত্রে চিনুদা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

আগে এই গ্রুপে ছিল চারজন। বর্তমানে প্রীতমসহ পাঁচজন। চিনুদা দারুণ গল্পবাজ ছেলে। ওর

গল্প শুনতে সবাই খুব পছন্দ করে। যদিও সব আজগুবি মার্কা গল্প বলে। কিন্তু অসাধারণ!

প্রীতম নীরবতা ভেঙে বলল- কী ব্যাপার! সবাই যে দিনের প্যাঁচার মতো বসে আছিস?

কী বললি?- চিনুদা কিছু রাগতঃ কন্ঠেই মুখ ভেংচি কেটে বলল- বসে থাকবো না! তবে কি বানরের মতো লাফালাফি করবো?

সবাই প্রীতমের দিকে অবাক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। উত্তরে সে কী বলে তা শোনার জন্য। কিন্তু প্রীতম উত্তরে কিছুই না বলে চুপচাপ বসে রইলো।

কথার মোড় পাল্টে অমল বলল- আচ্ছা চিনুদা, পণ্ডিত স্যার যে ভূত-প্রেতের কথা বলল ওগুলো কি তোর বিশ্বাস হয়?

চিনুদা অমলের দিকে তাকায়নি এবং উত্তরেও কিছু বলেনি। যেভাবে বসেছিল ঠিক সেভাবেই বসে আছে। কোনরকম ভাবান্তর নেই।

অবশেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রীতম বলল- না বিশ্বাস করার কী আছে?

কিন্তু!- এই বলে অমল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চিনুদার দিকে তাকিয়ে বলল- আমিতো কোনদিন কোথাও কোন ভূত-টূত দেখিনি!

আরে অনেকের কাছে ভূতের  সত্য ঘটনা শুনেছি। তাহলে ওগুলো কি মিথ্যা?- বিশ্বাস করানোর জন্য প্রীতম আবারও বলল- আমার আপন বড় মামাও পর্যন্ত ভূত দেখেছে।

আরে ধ্যেৎ! ওসব ভূতে-টূতে আমার কোন বিশ্বাস নেই।– বেশ তাচ্ছ্যিলের সুরেই আদু বলল- যদি কোনদিন দেখাতে পারিস তবে দেখাস দেখি।

আয়, আজ তোর পায়ের নলা  না ভেঙ্গে ছাড়ছি না।– এই বলে চিনুদা এবার আড়মোড়া ভেঙে

বসল। আর দৃষ্টি জোড়া স্কুল গেইটের এদিকে। চিনুদার মেজাজ দেখে সবাই গল্পগুজব বন্ধ করে দিল। সবার দৃষ্টি এখন সুইন্যার আসার পথে। সে হনহন করে এগিয়ে আসছে। তবে দৃষ্টিটা এদিকে সবার দিকে। হাতে কাগজের একটা পুটলা। গায়ে নতুন শার্ট। বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। হাঁটার ভঙ্গীটাই যেন অনেক পাল্টে গেছে।

সুইন্যা এসে পৌঁছাতেই চিনুদা রাগে তেলে-বেগুনে জ্বলে লাল হয়ে বলল- তুই জানিস না! দেরী করলে আমি কতরকম শাস্তি দেই। তারপরও তুই এত দেরী করে আসলি?

রাগ করিস না ভাই!- অনুনয়ের সুরে সুইন্যা বলল- আগে আমার কথাটা শোন!

না! কোন কথাই আজ আমি শুনতে রাজি নই।– গ্রাম্য মাতব্বরের মত মুখ ভেংচি কেটে চিনুদা আবারও বলল- রোজ রোজ আর কত বলব যে, সময়কে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্য দিবি। তবে জীবনকে বাদ দিয়ে নয়।

কী হয়েছিলরে সুইন্যা?- পরিস্থিতিট স্বাভাবিক করার প্রয়াসে প্রীতম বলল- স্কুল ছুটির পর বলে গেলেই পারতি।

বাড়িতে গিয়ে দেখি।– সুইন্যাকে থামিয়ে দিয়ে চিনুদা বলল- থাক! আর মামার বাড়ির গল্প করতে হবে না।

আহা চিনুদা, শোন্ না আগে কী হয়েছিল!- পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক করার জন্য প্রীতম বলল।

আর কোন কথা না বলে চিনুদা চুপচাপ বসে রইল। দৃষ্টি আকাশের দিকে। মনটা হয়তো

এখানেই পড়ে আছে।

অনেক দিন পর মামা এসেছে।– সুইন্যা বলতে শুরু করল।

মামার কোলে বসেছিলি এতক্ষণ!- চিনুদা বেশ রেগে গিয়েই বলল- চলে এলি কেন! আমরা তোর জন্য ফিডারে করে দুধ পাঠাতাম।

তুই ভাবছিস, আমি মিথ্যে বলছি?- হাতের প্যাকেটটা দেখিয়ে বিজয়ের সুরে সুইন্যা বলল- এই দেখ, মামার আনা আঙুর তোদের জন্যে এনেছি।

আঙুরের কথা শুনে নীরবতা ভেঙে চিনুদা কাছে ডাকল সুইন্যাকে। সুইন্যা গাছে উঠে চিনুদার পাশে গিয়ে বসল। আঙুরের সুবাদে সুইন্যা চিনুদার কাছে বসার চান্সটা পেয়ে গেল। চিনুদার কাছাকাছি বসে গল্প শোনার মজাই আলাদা। যাই হোক, ফুরফুরে বাতাস থাকা সত্ত্বেও কেমন যেন একটু গরম গরম লাগছিল এতক্ষণ। এখন একটু হালকা বোধ হচ্ছে। এখন সবাই একটু নড়েচড়ে বসলো।

আঙুরের পুটুলিটা চিনুদার হাতে পৌঁছে গেল। একটা একটা করে আঙুর মুখে চালান দিচ্ছে আর হাসি মুখে সুইন্যাকে দেখছে। তারপর সবার উদ্দ্যেশে বলল- তোরা যেন কী বলাবলি করছিলি এতক্ষণ?- কারো দিকে না তাকিয়ে বেশ বিজ্ঞের মতো জিজ্ঞ্যেস করল চিনুদা।

ভূতের কথা হচ্ছিল।– গল্প শোনার জন্য প্রীতম তড়িঘড়ি করে বলল- আদু আর অমল ভূতে একদম বিশ্বাস করে না।

বিশ্বাস অবিশ্বাস আবার কী!- চিনুদা আঙুর চিবাতে চিবাতে আবারও বলল- যে দেখবে সে

বিশ্বাস করবে। আর যে দেখবে না, সে বিশ্বাস করবে না ব্যস্।

তাহলে আমি যে- প্রীতমের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে চিনুদা বলল- থাকুক আর বলতে হবে না। একটা সত্য ঘটনা বলি শোন।

এবার সবাই একটু নড়েচড়ে বসল। সবার দৃষ্টি চিনুদার দিকে। অজানা শিহরণে সবাই বেশ পুলকিত হলেও কিছুটা যেন শংকিত। সন্ধ্যার এখনও অনেক বাকি। তবুও কেন যেন একটা হিমহিম ভাব সবার মধ্যে ঝেঁকে বসল।

মিথ্যা কথা কিন্তু একটাও বলতে পারবি না।– অভিমান ভরা কন্ঠে আদু গাল ফুলিয়ে বলল- তোর তো শুধু বাড়িয়ে বাড়িয়ে গল্প বলা।

ঠিক আছে। কোন গল্পই বলার দরকার নেই।– মুখে একটা আঙুর ছুঁড়ে ফেলে পা দুলিয়ে চিনুদা বলল- এমন ভাব দেখাচ্ছিস যে, গল্প না বললে আমার পেটের ভাত হজম হবে না!

আহা! রাগ করছিস কেন? ঘটনাটা বল, আমরা শুনবো।– সুইন্যা বেশ অনুরোধ করে বলল।

কথার মধ্যে বাগড়া দিলে মেজাজটাই গরম হয়ে যায়।– চিনুদা পা দুটো দোলাতে দোলাতে বলল।

আচ্ছা, ঠিক আছে।– মুচকি হেসে আদু বলল- স্যরি, কথার মাঝখানে আর কোন কথা বলবো না।

চিনুদা এখন বলতে পারিস।– তাড়া দিয়ে প্রীতম বলল- আমরা কেউ কোন কথা বলবো না।

বেলা বেশি নেই চিনুদা।– আকাশের দিকে তাকিয়ে অমল বলল- তাড়াতাড়ি গল্পটা শুরু করে

দে।

ভয় পাচ্ছিস মনে হচ্ছে। তাহলে এখনই সোজা বাড়ি চলে যা। তোর গল্প শোনার দরকার নেই।– চিনুদা বেশ নিরাসক্ত কন্ঠেই বলল।

আরে না, ভয় পাচ্ছি না। মানে...- আমতা আমতা করে অমল বলল- সন্ধ্যার পর দেরি করে বাড়ি ফিরলে মা বকুনি দিবে।

তা অবশ্য ঠিক বলেছিস। তারপর একে একে সবার হাতে আঙুরের ভাগ পৌঁছে গেল। খালি কাগজটা তালগোল পাকিয়ে পুকুরের জলে ফেলে হাত ঘষে ঘষে চিনুদা বলল- সন্ধ্যার পরে পড়তে বসতে হবে। যতকিছুই করি না কেন, আমাদের লেখাপড়া সবসময় ঠিক রাখতে হবে।

কথাটা শুনে প্রীতম মুচকি মুচকি হাসল। তবে চিনুদা একদম টের পায়নি।

চিনুদার আসল নাম চিন্ময় সরকার। সবাই চিনু নামেই ডাকে। আগে প্রীতমদের থেকে দুই ক্লাশ উপরে পড়তো। পরপর দু'বার ফেল করে এখন এদের সাথে। প্রথম প্রথম সবাই চিনু'দা বলেই ডাকতো। কিছুদিন যাওয়ার পর চিনুদা নিজেই সবাইকে বলল নাম ধরে ডাকার জন্য। আর আপনি নয় তুই ডাকলেই ভালো। কিন্তু তবু সবাই দাদা ডাকে। তবে বন্ধু হওয়ার পর সবাই ঠিক করলো যে, চিনুদা ডাকবে এবং তুই তোকারিও চলবে। সেই থেকে চিন্ময় সরকার ওরফে চিনুর নামই এখন চিনুদা হয়ে গেছে। চিনুদা নিজেই লেখাপড়ায় লাড্ডু আবার সবাইকে লেখাপড়ার কথা বলে। তাই প্রীতমের হাসি পাচ্ছিল। তবে এটা ঠিক যে, প্রীতমদের সাথে মেলামেশার পর থেকেই চিনুদা লেখাপড়ায় অনেকটা মনোযোগী হয়েছে।

বুঝলি, ঘটনাটা বেশ মজার।– এই বলে আঙুর খেতে খেতে জিহ্বায় একটা চাট্টি মেরেই চিনুদা

বলল- ঘটনাটা বেশিদিন আগের নয়। মাস তিনেক হবে বড় জোর। আমার নেতা মামাকে চিনিস তো? কেউ কোন জবাব দেয়নি বলে চিনুদা বলল- ঠিক আছে, চেনার দরকার নেই।

একদিন বিকেল বেলা বসে মামা পার্টির আলাপ করছিল কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে। হঠাৎ করে ভূতের আলোচনা শুরু হল। সবাই স্বীকার করল যে, ভূত না দেখলেও সে সম্পর্কে বেশ ভয় আছে। এর মধ্যে একজন ভূতই বিশ্বাস করে না।

ঠিক আছে। তুই যখন ভূতে বিশ্বাস করিস না। রাতের অন্ধকারে শ্মশানের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসবি। তবেই বুঝবি ভূত কাকে বলে।– ওই বন্ধুকে মামা বলল।

এটা কোন ব্যাপার হলো নাকি!- তাচ্ছ্যিলের স্বরে বন্ধুটি বলল- আজ রাতেই শ্মশানে যাব। পরিবর্তে বাজী রইল দুইশ' টাকা।

ঠিক আছে। সবাই সাক্ষী থাকলো।– হাত নেড়ে মামা বলল- তবে একটা শর্ত, ভয় পেলেই আমার জিত। কি ঠিক আছে?

সবাই তখন সম্মতিসহ সাক্ষী রইল।

*

শ্মশানের ভেতর একটা বাঁশের টুকরা ফেলে রাখা হয়েছে। সেটি তুলে নিয়ে আসতে হবে। যাতে করে বুঝা যাবে যে, সে শ্মশানের মধ্যে সত্যিই গিয়েছিল। কথা হলো, রাত বারোটার পরে শ্মশানে যেতে হবে।

কথামতো রাত বারোটা বাজতেই সবাই বিদায় দিল। বন্ধুটি শ্মশানের উদ্দ্যেশে রওনা হল।

চারদিক নীরব-নিঃস্তব্ধ, এর মাঝে শুধু একজন লোক দৃঢ় পদে সতর্ক দৃষ্টিতে হাঁটছে। শ্মশানটা লোকালয়ের বাইরে এবং চারদিক ঘন ঝোঁপঝাড়ে ঘেরা। ফলে এখানে অন্ধকারের আঁচটা একটু বেশি। একটা পেঁচা অদ্ভুত কন্ঠে ডেকে ওঠতেই গায়ের সব লোম কদম ফুলের মতো খাড়া হয়ে ওঠল। কয়েকটা কাকও পরপর ডেকে ওঠলো। সামনে দিয়ে হঠাৎ করে কী যেন একটা দৌঁড়ে গেল। থমকে দাঁড়ালো এবং বুঝতে চেষ্টা করলো ব্যাপারটা। না, আর কোন শব্দ নেই। ঝোঁপঝাড়ের রাস্তা পেরিয়ে এবার শ্মশানের রাস্তা শুরু। শ্মশানের পথে পা বাড়াতেই শিয়ালের হুক্কা-হুয়া ডাকে সারা গা ছমছমিয়ে কেঁপে ওঠলো।

রাস্তাটা এঁকেবেঁকে শ্মশানে পৌঁছেছে। রাস্তার দু'পাশে আরো ছোটখাটো ঝোঁপঝাড় এবং গাছপালা। পথে হুমড়ি খেয়ে পড়া গাছের ডালে হাত লাগতেই থমকে দাঁড়াল। মনের অজান্তেই শরীরের রক্ত সঞ্চালন যেন বেড়ে গেল। সামনে কী যেন একটা দাঁড়িয়ে আছে। ঝোঁপঝাড়ের আবছা অন্ধকারের জন্য স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না। তবে মানুষের মতই মনে হচ্ছে। দেখতে বেশ বড়সড়। রাস্তার পশ্চিম প্রান্তে থমকে দাঁড়াল। পলকিবিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। কিন্তু একই রকম দেখাচ্ছে, কোনরকম পরিবর্তন হচ্ছে না। মনে খটকা লাগছে। শেষ পর্যন্ত তাহলে পথেই ভূতের সাক্ষৎ! মনকে শক্ত করার চেষ্টা চলছে অবিরত। কিন্তু তবুও এক অজানা ভয়ের শিহরণে বুকটা ধুকপুক করছে। নিজেই বুকে থু থু দিল। মনে মনে ভাবছে পেছন ফিরে দৌঁড় দিবে কিনা। কিন্তু ভূতের অনেক গল্প শুনেছে- পেছন ফিরে তাকাতে নেই। তবেই ভূত আস্কারা পেয়ে যায় এবং ঘাড় মটকে দেয়। সাহস করে সামনেই যেতে হবে মন স্থির করল।

হালকা বাতাসে কলাপাতাটা নড়ে ওঠতেই স্পষ্ট বুঝতে পারল। এই পথে তেমন একটা আসা-

যাওয়া নেই। তাই কলাগাছের কথা মনেই ছিল না। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার সামনে এগিয়ে চলল।

আচ্ছা গাছ কি পথে একটাই ছিল?- জিজ্ঞাসু কন্ঠে আদু বলল।

এই যে কথার মধ্যে বাগড়া। আমি গল্প বলা বন্ধ করলাম।– এই বলেই চিনুদা চোখ জোড়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল।

তোর এই অভ্যাসটা গেল না!- শাসনের সুরে সুইন্যা বলল- শুধু শুধু বকবক করিস।

ঠিক আছে, আর কোন কথা বলব না।– আদু দুঃখ প্রকাশ করে বলল।

ওখানে কী আমি ছিলাম নাকি?- বেশ রাগ করেই চিনুদা বলল- তোর ভালো না লাগলে উঠে চলে যেতে পারিস। কেউ তোকে আটকাবে না

আহা! এত রাগ করিস কেন?- বিনীত কন্ঠে আদু বলল- আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম। সরি, আর কোন কথা বলবো না।

ঠিক আছে, আর কোন কথা বলবি না।– পরিবেশটা শান্ত করার জন্য প্রীতম বলল- এবার শুরু করা যাক। কী বলিস চিনুদা?

দেখ প্রীতম, এত উকালতি করিস না।– তারপর হাত বাগিয়ে বলল- তবে এমন এক গাট্টা দেবো যে, এই জনমের সব কথা ভুলে যাবি।

আচ্ছা, ঠিক আছে। আর কোন কথা বলবো না।– এই বলে প্রীতম আগ্রহভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলল- এবার তাহলে শুরু করা যাক।

কথা শেষ করতে না দিয়েই চিনুদা বলল- টু-শব্দটি পর্যন্ত যেন না হয়। কী, ঠিক আছে?

সবাই সম্মত হলো; গল্পের মাঝখানে আর কোন কথা বলবে না। তারপর সবাই একটু নড়েচড়ে চিনুদার কাছাকাছি হয়ে বসলো। প্রীতম হাত ফসকে পানিতে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বসল প্রীতম। চিনুদা এবার গলা খাকাড়ি দিয়ে গল্প শুরু করল: তারপর মামার বন্ধুটি সব ভয় কাটিয়ে শ্মশানের কাছে চলে এলেন। কিন্তু এখন পড়েছেন মহাভাবনায়। শ্মশানের ভেতর ঢুকবেন কী ঢুকবেন না।

কাছের ঝোঁপেই ভেণ্ডী গাছটা এপাশ-ওপাশ দুলতে লাগল। অথচ কোনরকম বাতাস বইছে না। ভয়ে সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। কান দিয়ে শাঁ শাঁ করে গরম বাতাস যেন বের হচ্ছে ক্রমাগত। গাছটার দিকে আবার তাকালেন। গাছটা যে দুলছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। নিজের গায়ে নিজেই চিমটি কাটলেন- অনুভূতি তো ঠিকই আছে, তাহলে! তিনি সাহস করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন গাছটার দিকে। একসময় গাছটা একেবারে শান্ত হয়ে গেল।

তারপর কিছুটা সাহস সঞ্চয় করেই শ্মশানের ভেতর পা বাড়ালেন। কিছুদূর এগোতেই ঝুনঝুন করে কী যেন বেজে ওঠল।আচমকা সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। প্রতিটি লোম যেন শরীর ছেড়ে উড়ে চলে যেতে চাচ্ছে। একই শব্দ আবার বেজে ওঠল। এখন পায়ে চলার শক্তিও যেন ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে।

আঙ্কেল হাতে লাগানো লোহার তাবিজটা ভাল করে দেখে নিলেন। তাবিজ ঠিকঠাক মতোই আছে। যতই ভয় দেখাক, গায়ে হাত লাগাতে পারবে না। মনের ভেতর সাহস সঞ্চয় করে সামনের দিকে পা বাড়ালেন। কী একটা অদ্ভুত স্বর ঠিক সামনের ঝোঁপটা থেকে আসছে। কিন্তু ধারে-কাছে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনে মনে ভাবলেন; সামনে এসে যেহেতু কিছুই করছে না সুতরাং নিরাপদ। চিনুদার গল্পের ভয়ে সবাই যেন জড়সড় হয়ে যাচ্ছে।

আঙ্কেলটা খুবই সাহসী!- গুয়ামুড়ি হেসে সুইন্যা বলল- আমি যদি এমন সাহসী...।– মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে চিনুদা বলল- থাক, থাক অনেক হয়েছে! আর এগোতে হবে না। সাহস থাকে তো, এখান থেকে এখন একা একা বাড়িতে যা!

সুইন্যা একেবারে চুপচাপ। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। কেমন যেন একটু ভয় ভয় ভাব সবার মনের ভেতর ভর করেছে। প্রীতম নিজেকে সামলে নিয়ে বলে- চিনুদা, তারপর?

দু'হাতের আঙুলে মাথায় বিনুনি কেটে চিনুদা শুরু করলো- তারপর হাঁটতে হাঁটতে আঙ্কেল নির্ধারিত বাঁশের টুকরাটির কাছে পৌঁছাল। অতি সন্তর্পণে যখন বাঁশের টুকরাটি তুলতে যাবে ঠিক তখনই ধপাস করে একটি ঢিল এসে ঠিক সামনে আছড়ে পড়ল। হেচকা টানে নিজেকে টেনে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলেন- ধারে কাছে কোন কিছু আছে কিনা। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। ভূত যদি থেকেই থাকে তবে নিশ্চয়ই মানুষকে কিছুটা ভয় পায়। নইলে দূর থেকে এমন করবে কেন? এই ভেবে কিছুটা সাহস যোগাতে চেষ্টা করলেন মনে মনে। নিজের গায়ে হাত রাখলেন। গা ভিজে একেবারে জবজবে হয়ে গিয়েছে। কখন এমন অবস্থা হলো একদমই টের পাননি।

যতই সাহস দেখান না কেন! মধ্যরাতে এই নির্জন শ্মশান এলাকায় একা একা আসা সত্যিই কল্পনাতীত।শত হলেও মানুষ। অতি নির্জনতায় কিছু না কিছু ভয় থাকবেই।

সাহস ওপর ভর করে বাঁশের টুকরাটা হাতে তুলে নিলেন। বাঁশের টুকরাটা হাতে নিয়ে

ফিরতেই মাথায় যেন বিদ্যুৎ চমকে ওঠল। আবছায়া হলেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- কতগুলি কাঠি যেন হেলে-দুলে নাচছে। নিশ্চয়ই কংকাল! মাথার ভেতর সবকিছু কেমন যেন বিকল হয়ে আসছে। বুদ্ধি এতটুকুও কাজ করছে না। ইতিমধ্যে দুই পা যেন একেকটা টনী-পাথর হয়ে গেছে। নড়াচড়ার এতটুকু শক্তি শরীরের কোন অঙ্গেই বোধ হচ্ছে না।

কংকালটি ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ভঙ্গীতে নাচছে। মাঝে মাঝে আবার ঘটাঘট, ঘটাঘট শব্দ হচ্ছে। পুরো গা ক্রমশঃ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। নিজের গায়ে নিজেই চিমটি কাটলেন। অনুভূতি শক্তি একেবারে ক্ষীণ। কোন অনুভূতি নেই বললেই চলে। মনের ভয় কাটিয়ে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছেন। একসময় মনের অজান্তেই হাতের বাঁশ দিয়ে বসালেন কয়েক ঘা। কংকাল পাশের ঝোঁপে গিয়ে ছিটকে পড়ল। তারপর কতক্ষণ সময় থমকে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি নিজেই জানেন না।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতেই তিনি দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করলেন। হাটছেন ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন টেনে ধরলো। মুখে কোন ভাষাই ব্যক্ত করতে পারলেন না। এমনটি মুখ থেকে একটি চিৎকার পর্যন্ত বের হলো না। তিনি ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলেন।

তার মানে, ভূতে টেনে ধরেছে? তুই শুধু শুধু বাড়িয়ে বলছিস!- ভীত কন্ঠে আদু বলল।

আমার দায় পড়েছে বাড়িয়ে বাড়িয়ে মিথ্যে বলার।– চোখ জোড়া গরম করে চিনুদা বলল- ঠিক আছে। আর কিছুই তোদের বলবো না।

প্রীতম শাসনের সুরে বলল- আদু, তুই কেন বার বার কথার মাঝে বাগড়া দিচ্ছিস?

তারপরে তোর মামা বাজিতে জিতেছিল।– সুইন্যা জিজ্ঞ্যেস করল।

তোরা যে যা'ই বলিস, আমি ভাবছি মামার বন্ধুটির সাহস আছে বটে!- কমল বেশ চিন্তিত হয়েই বলল।

কমলের কথাতে চিনুদা বেশ খুশীই হলো। যা'ই হোক কমল ওর গল্পটা বেশ বিশ্বাস করছে; চিনুদা মনে মনে ভাবল।

সবাই একের পর এক কথাই বলে যাচ্ছে। চিনুদা একেবারে নিরব। তারপর বেশ রাগ করেই চিনুদা বলল- ঠিক আছে। তোরা কথা বল। আমি উঠলাম।

প্রীতম হালকা ধমকের সুরে সবার উদ্দ্যেশে বলল- সবাই চুপ কর তো! গল্পের বাকিটা শুনি। তারপর কথা বলা যাবে।

মুড নেই। আর কোন গল্প বলতে পারবো না।– চিনুদা বেশ রেগে আছে এখন।

কিসে তোর মুড আসবে?- প্রীতম জানতে চাইল।

এমন ভাব করছিস যেন, সাত রাজার ধন চাইলে তা'ও এনে দিবি!- চিনুদা ব্যঙ্গ করে বলল।

বম্বে চানাচুরে মন ভরবে তো?- পকেটে হাত দিতে দিতে প্রীতম বলল- বাজারে কে যাবি?

আদুকে যেতে হবে।– চিনুদা বলল- তুই কথায় কথায় বেশি বাগড়া দিয়েছিস। এটাই তোর শাস্তি। যা এখনই। এক মুহূর্ত দেরি করবি না। এক দৌঁড়ে যাবি আর আসবি।

কোন কথা না বলে আদু গাছ থেকে নেমেই বাজারের দিকে দিল এক ভোঁ দৌঁড়। আদু ফিরে

আসার পর সবার হাতে চানাচুর পৌঁছে গেল। তবে সিংহ ভাগ চিনুদার হাতে। চানাচুর হাতে নিয়ে এক মুঠ মুখে চালান দিল। তারপর চিবোতে চিবোতে চিনুদা আবার শুরু করল- মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরে পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল। বন্ধুটির জ্ঞান ফিরছে না দেখে একে একে সবাই ঝোঁপের আঁড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন।

আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। ভূত বলতে আবার কিছু আছে নাকি?- বেশ খুশি খুশি ভাব নিয়ে কমল বলল।

তাহলে তুই ভয় পাস কেন?- চোখ রাঙিয়ে চিনুদা বলল- সন্ধ্যার পরেইতো তুই গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিড়ালের মত মিউ মিউ করে গানের কলি আওড়াস কেন!

ভয় পেলাম আবার কোথায়!- ভাঙা ভাঙা স্বরে কমল বলল- গান তো সবাই গায়।

আহা! আবার কথার মোড় ঘুরে যাচ্ছে।– বিরক্ত হয়ে সুইন্যা বলল- গল্প তো শেষ হয়নি। আর এদিকে বেলা প্রায় শেষ।

চিনুদা চানাচুর শেষ করে কাগজটা জলে ছুঁড়ে ফেলে গল্প শুরু করল- তারপর সেকি অবস্থা! মামার বন্ধুটিতো যায় যায় অবস্থা। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। সকাল বেলায় জ্ঞান ফিরল। ভয়ে ভয়ে একবার তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করলেন। পরদিন দুপুর নাগাদ কিছুটা সুস্থ হলেন। তবে উনি বেশ সাহসী থাকাতে বেঁচে গেছেন।– কমলকে উদ্দ্যেশ্য করে চিনুদা বলল- তোর মতো হলে, এই জনমে আর মামার কোলে বসতে পারতি না এই বুড়ো বয়সে!

কমলকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সুইন্যা বলল- কাণ্ডগুলো কিভাবে ঘটল তা'তো ভীষণ

খটকা লাগছে- তোর মামা আর অন্য বন্ধুরা সেই সময় শ্মশানে কেন?

ব্যাপারটাইতো এখানে।– চিনুদা বেশ রহস্য করে বলল- সব খুলে বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোন।

যখন মামা ও সকল বন্ধুদের মাঝে কথা হলো- রাত বারোটার পর বন্ধু বিমল শ্মশানে যাবে। কথা শেষে সবাই চলে গেল। তারপর মামা বন্ধু বিমল ব্যতীত সববন্ধুকে ডেকে এনে পরামর্শ করল যে, বিমলকে যেভাবেই হোক ভয় দেখাতে হবে এবং ভূত বিশ্বাস করাতে হবে।

আসল কথা হল যেভাবেই হোক ভয় দেখানো। কারণ বিমল খুব বেশি রকম সাহসী। যার দরুণ প্রতিটি ক্ষেত্রে উনার কদর সবচেয়ে বেশি এবং সকলের কাছে সমাদৃত। তাই মামার কথায় সবাই রাজী হয়ে গেলেন।

পথে তেমন কোন সংকেত ব্যবহার করেনি। যদি ঘটনা টের পেয়ে যায়। শ্মশানে ঢোকার পথে প্রথমে ঝোঁপের আঁড়ালে বসে মামা ভেণ্ডী গাছটা নেড়েছিল। যখন দেখল যে বন্ধু বিমল তেমন ভয় পাচ্ছে না তখন নিরাশ হয়ে গাছ নাড়ানো থামিয়ে দিলো। মামা অবশ্য ঘাবড়ে গিয়েছিল। যদি কারণ খুঁজতে বিমল গাছের কাছে চলে আসে। তাই দ্রুতই গাছ দোলানো বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর আরেক বন্ধু প্যাঁচার ডাক ডেকেছিল। কিন্তু শব্দটা যে কিসের হয়েছিল তা' কেউ বুঝতে পারেনি। তবে শুনতে বেশ বিশ্রী রকমের হয়েছিল এবং ভয় জাগানিয়া শব্দ। কিন্তু তা'তেও যখন ভয় তেমন পাচ্ছিল না তখন অন্য বন্ধু ঝুমঝুমি বাজিয়েছিল। কিন্তু হাতের কাঁপুনিতে ওটার শব্দও একটু অন্যরকম হয়ে গেল। কিন্তু তা'তেও ফল না দেখে মামা উনার জায়গা থেকে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। তারপর ফেরার পথে অনন্যোপায় হয়ে কংকাল দেখিয়েছিলেন।

উনাদের ইচ্ছে ছিল অল্প ভয় পাইয়ে উনারা জয়ী হবেন। তাই প্রথম দিকে কংকাল দেখাননি। যদি বেশি ভয় পেয়ে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়। কিন্তু অবশেষে কংকাল দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও যখন দেখা গেল, বন্ধু বিমল জয়ের মালা ছিনিয়ে নিচ্ছে তখনই মামা শেষ মুহূর্তে উনার শার্টটার কোণায় টেনে ধরেছিলেন। তারপরই উনি জ্ঞান হারিয়ে ধরাশায়ী হলেন।

নিজেকে সামলাতে না পেরে প্রীতম বলল- চিনুদা, যত কিছুই বলিস তোর মামার বন্ধুটি দুর্দান্ত সাহসী। প্রীতমের কথায় সবাই সায় দিল।

গল্পটা তোদের কেমন লেগেছে?- চিনুদা জানতে চাইল।

সবাই সমস্বরে বলে ওঠল- দারুণ লেগেছে।

আশেপাশে তাকিয়ে চিনুদা বলল- কখন সন্ধ্যা হয়ে গেল টেরই পেলাম না। তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।– বলেই গাছ থেকে লাফিয়ে নামল। তারপর একে একে সবাই গাছ থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নামল। চারদিক বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। কেউ কারও কাছে প্রকাশ করছে না। কিন্তু সবার মাঝেই এক অজানা ভয় ঝেঁকে বসেছে। ওদের চলনেই তা' স্পষ্ট; সবাই গা ঘেষাঘেষি করেই হাঁটছে। আর ফাঁকে ফাঁকে এদিক-ওদিক ভয়ার্ত চোখে তাকাচ্ছে। তবে চিনুদা ভয়হীন পায়ে এগিয়ে চলছে। হাঁটতে হাঁটতে চিনুদা বলল- আগামীকাল একই সময় আসবি। আরেকটা মজার গল্প বলবো।

সবাই বেশ খুশী হয়ে বলল- ঠিক আছে।

শেষ

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.