রাত তখন ২টা ১৭ মিনিট। ঢাকার আকাশে বৃষ্টি নেই। তবু বাতাসে অদ্ভুত এক স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। দিনের ব্যস্ততা অনেক আগেই নিভে গেছে। দূরের কোনো গলিতে মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার পাতলা পর্দার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত প্রহরীর মতো।
ডিটেকটিভ আরমান কবির জানালার পাশে বসে ছিলেন।
তার সামনে একটি পুরোনো কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ, কয়েকটি ফাইল, একটি নোটবুক এবং কালো রঙের একটি পুরোনো ফাউন্টেন পেন। গত তিন দিন ধরে তিনি একটি অদ্ভুত নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে কাজ করছিলেন।
কোনো লাশ নেই।
কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই।
কোনো মুক্তিপণের দাবি নেই।
এমনকি নিখোঁজ ব্যক্তির মোবাইল ফোনটিও পাওয়া যায়নি।
শুধু একটি জিনিস পাওয়া গিয়েছিল—
একটি ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছিল একটি অন্ধকার ঘর। ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ার। আর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন মানুষ।
মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু তার ছায়া।
আর ছায়ার নিচে কালো কালি দিয়ে লেখা—
“সে ফিরে এসেছে।”
আরমান ছবিটা তৃতীয়বারের মতো দেখছিলেন।
ঠিক তখনই তার টেবিলের ওপর রাখা ফোনটি বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
অপরিচিত নম্বর।
আরমান কিছুক্ষণ ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর কলটি রিসিভ করলেন।
হ্যালো?
ওপাশে কোনো কথা নেই।
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
খুব ধীর।
খুব নিয়ন্ত্রিত।
আরমান আবার বললেন,
কে বলছেন?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর একটি পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
কণ্ঠটি অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
আপনি কি ছায়ার মানুষটাকে খুঁজছেন?
আরমানের চোখ মুহূর্তেই টেবিলের ওপর রাখা ছবিটির দিকে চলে গেল।
আপনি কে?
ওপাশ থেকে হালকা হাসির শব্দ এল।
আপনি ভুল মানুষটাকে খুঁজছেন, ডিটেকটিভ।
তাহলে আসল মানুষটা কে?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
যাকে আপনি খুঁজছেন, সে কোনো মানুষ নয়।
কলটি কেটে গেল।
আরমান কয়েক সেকেন্ড ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর দ্রুত কল-লগ খুললেন।
নম্বরটি দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু নম্বরের পাশে অদ্ভুত একটি লেখা—
NO SIGNAL
তিনি ভ্রু কুঁচকে গেলেন।
এটা সম্ভব নয়।
কল আসার সময় ফোনে নেটওয়ার্ক ছিল।
আরমান উঠে দাঁড়ালেন।
ঠিক তখনই দরজায় তিনবার শব্দ হলো।
ঠক।
একটু বিরতি।
ঠক।
আরেকটু বিরতি।
ঠক।
আরমান স্থির হয়ে গেলেন।
তার বাড়ির দরজায় এই সময় কেউ আসার কথা নয়।
তিনি ধীরে ধীরে টেবিলের ড্রয়ার খুললেন।
ভেতর থেকে অস্ত্রটি বের করে হাতে নিলেন।
তারপর নিঃশব্দে দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন।
দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়া দেখা যাচ্ছে।
একজন মানুষ।
আরমান দরজার লকের ওপর হাত রাখলেন।
কে?
কোনো উত্তর নেই।
তিনি আবার বললেন—
কে সেখানে?
এবার খুব নিচু স্বরে উত্তর এল।
“আমি আপনার জন্য একটা জিনিস রেখে যাচ্ছি।”
আরমান দরজা খুলে ফেললেন।
করিডোর ফাঁকা।
কেউ নেই।
কিন্তু দরজার ঠিক সামনে পড়ে আছে একটি ছোট কালো বাক্স।
আরমান কয়েক মুহূর্ত বাক্সটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে সেটি তুলে ঘরে নিয়ে এলেন।
বাক্সের ওপর কোনো নাম নেই।
শুধু একটি সাদা কাগজে লেখা—
“খুলবেন না।”
আরমান মৃদু হাসলেন।
যে জিনিস খুলতে নিষেধ করা হয়, সেটাই সাধারণত আগে খুলতে হয়।
তিনি বাক্সটি খুললেন।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো ছবি।
একটি বাড়ির ছবি।
ছবিটির পেছনে লেখা—
“বাড়িটা আপনি চেনেন।”
আরমান ছবিটি হাতে নিয়ে জমে গেলেন।
কারণ বাড়িটা সত্যিই তার পরিচিত।
খুব ভালোভাবেই পরিচিত।
ছবির বাড়িটি ছিল—
তার নিজের শৈশবের বাড়ি।
আর ছবির নিচে আরও একটি লাইন লেখা ছিল—
“তুমি ভুলে গেছ, আরমান। কিন্তু আমি ভুলিনি।”
আরমানের বুকের ভেতর হঠাৎ অজানা এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি বহু বছর ধরে সেই বাড়ির কথা মনে করতে চাননি।
কারণ সেই বাড়িতেই—
পনেরো বছর আগে একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল।
আর সেই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি কখনোই পুলিশের নথিতে ওঠেনি।
আরমান ধীরে ধীরে ছবিটা উল্টে দিলেন।
ছবির পেছনে এবার তার চোখে পড়ল আরও একটি ছোট বাক্য।
এত ছোট করে লেখা যে প্রথমবার তিনি খেয়ালই করেননি।
তিনি টেবিলের বাতিটি কাছে টেনে আনলেন।
তারপর পড়লেন—
“আগামীকাল রাত ২টা ১৭ মিনিটে দ্বিতীয় মানুষটি হারিয়ে যাবে।”
আরমানের হাত থেমে গেল।
ঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি।
২টা ১৭ মিনিট।
ঠিক সেই মুহূর্তে—
তার ফোন আবার বেজে উঠল।
এবার স্ক্রিনে কোনো নম্বর নেই।
শুধু একটি শব্দ—
SHADOW
আরমান কলটি রিসিভ করলেন।
ওপাশ থেকে সেই একই কণ্ঠ—
“প্রথম অধ্যায় শেষ, ডিটেকটিভ।”
তারপর—
“এবার আপনার পালা।”
কলটি কেটে গেল।
আরমান জানালার দিকে তাকালেন।
অন্ধকার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বুঝতে পারলেন—
প্রতিবিম্বের পেছনে আরেকটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেন।
কেউ নেই।
শুধু খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে।
আর টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেই পুরোনো ছবি।
ছবিটির বাড়ির একটি জানালা—
এখন আর বন্ধ নেই।