কাঁচের গ্লাসে বরফ গলে পানি হওয়ার শব্দটাও নীরবতায় স্পষ্ট হয়ে বাজছে।
আরিয়ান স্টাডি টেবিলের ওপর মাথা নিচু করে বসে আছে। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা ডিম লাইটের নীলচে আলোয় তার ছায়াটা দেওয়ালে বিরাট এক দানবের মতো দেখাচ্ছে। হাতের ল্যাপটপ স্ক্রিনটা অন করা, কার্সারটা টিক টিক করে জ্বলছে আর নিভছে। ফাঁকা সাদা স্ক্রিনে একটা শব্দও যোগ হয়নি গত তিন দিনে।
সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের জনপ্রিয় লেখক আরিয়ান চৌধুরী আজ নিজেই এক অদ্ভুত ব্ল্যাঙ্ক পেইজের মতো থমকে আছে।
হঠাৎ দোতলার শোয়ার ঘর থেকে একটা ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। 'ঠাস!'
আরিয়ান চমকে উঠে দাঁড়াল। হাত থেকে কফির মগটা খসে পড়ে কার্পেটে ছড়িয়ে গেল কালচে তরল। ঘড়িতে তখন রাত তিনটা বেজে পনেরো মিনিট।
"মায়া?" আরিয়ান আস্তে করে ডাকল। কোনো সাড়া নেই।
সে সিড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। কাঠের সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে তার পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনি তৈরি করছে। মায়ার শরীরটা গত কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছিল না, হয়তো ভুল করে কিছু ফেলে দিয়েছে।
শোয়ার ঘরের দরজাটা অর্ধেক খোলা। ভেতরের আলো নেভানো। আরিয়ান সুইচে হাত দিয়ে আলো জ্বালাতেই দৃশ্যটা দেখে তার গায়ের রক্ত জমে বরফ হয়ে গেল।
ঘরের মাঝখানে মেঝেতে পড়ে আছে মায়ার পছন্দের সিরামিকের ফুলদানিটা—চুরমার হয়ে ভাঙা। আর তার ঠিক পাশেই, ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় খোদাই করে লেখা একটা বাক্য। লাল রঙের কিছু দিয়ে লেখা, যা আয়নার কাঁচ বেয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে।
"গল্পের শেষ চরিত্রকে মরতেই হবে।"
"মায়া!" আরিয়ান চিৎকার করে উঠল।
পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজল সে। বাথরুম, বারান্দা, ছাদ—কোথাও মায়া নেই। মোবাইল ফোনটা নাইটস্ট্যান্ডের ওপর রাখা, পাশেই তার হ্যান্ডব্যাগ। কিন্তু মায়া গায়েব। আর ড্রেসিং টেবিলের আয়নার নিচে, ফ্লোরে ছোট এক ফোঁটা তাজা রক্ত।
পরদিন সকাল আটটা। আরিয়ানের বসার ঘরে ড্রয়িংরুমে বসে আছেন ইন্সপেক্টর রফিক। তিনি আরিয়ানের মুখোমুখি বসে ডায়েরিতে কিছু নোট নিচ্ছেন।
"মিস্টার আরিয়ান, আপনি বলছেন রাত তিনটায় শব্দ শুনে উঠে দেখেন আপনার স্ত্রী নেই?" রফিকের তীক্ষ্ণ চোখ আরিয়ানের মুখের ওপর আটকে আছে।
"হ্যাঁ, অফিসার! আমি পুলিশে ফোন দেওয়ার আগে পুরো বাড়ি খুঁজেছি। কোথাও নেই সে!" আরিয়ানের গলা কাঁপছিল।
রফিক ঘরের আয়নার ওপর লেখা লেখাটার দিকে একবার তাকালেন, তারপর আরিয়ানের দিকে ফিরে বললেন, "আপনাকে দেখে বেশ ক্লান্ত আর অস্থির লাগছে। আচ্ছা, আপনার শেষ বইয়ের প্লটটা যেন কী ছিল? একটা নিখোঁজ মেয়ে আর তার সন্দেহভাজন লেখক স্বামী... তাই না?"
আরিয়ানের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?"
"আমি কিছু বলছি না, মিস্টার আরিয়ান। তবে অপরাধের দৃশ্যে রক্তের ফোঁটা আর এই নাটকীয় বার্তা... এগুলো কোনো সত্যি অপরাধের চেয়ে আপনার উপন্যাসের পাতা বলেই বেশি মনে হচ্ছে।"
ঠিক তখনই দরজার বেল বেজে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ড. সায়ান—আরিয়ানের সাইকিয়াট্রিস্ট।
ড. সায়ান ভেতরে ঢুকে ইন্সপেক্টর রফিককে দেখে কিছুটা চমকালেন, তারপর আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"অফিসার রফিক," ড. সায়ান শান্ত গলায় বললেন, "আপনাকে একটা বিষয় জানানো দরকার। আরিয়ান গত ছয় মাস ধরে আমার অধীনে থেরাপি নিচ্ছে। সে 'ডিটোচড মেমরি' বা ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিভ্রমের সমস্যায় ভুগছে। মারাত্মক স্ট্রেস বা ব্লকের কারণে সে মাঝে মাঝে এমন কিছু কাজ করে ফেলে, যা সে পরে একদম মনে রাখতে পারে না।"
আরিয়ান শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। "কী বলছেন আপনি, ডক্টর? আমার কোনো স্মৃতিভ্রম নেই!"
ড. সায়ান পকেট থেকে একটা ছোট ভয়েস রেকর্ডার বের করে টেবিলে রাখলেন। প্লে বাটনে চাপ দিতেই একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—আরিয়ানের নিজের কণ্ঠ।
রেকর্ডিংয়ে আরিয়ান বলছে: "...আমি আর নিতে পারছি না, ডক্টর। মায়া আমাকে সহ্য করতে পারছে না। কখনো কখনো আমার মনে হয়, সে যদি আমার জীবন থেকে চিরতরে মুছে যেত... তবেই হয়তো আমি শান্তিতে লিখতে পারতাম।"
শব্দটা বন্ধ হতেই ঘরে এক চরম নীরবতা নেমে এল।
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে না সে ডক্টরকে শেষ কবে এই কথা বলেছিল। কিন্তু কণ্ঠটা তো নিশ্চিতভাবেই তার!
তবে কি... সে নিজেই কাল রাতে মায়াকে...?
ইন্সপেক্টর রফিক উঠে দাঁড়ালেন। "মিস্টার আরিয়ান, আপাতত আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।
থানায় যাওয়ার পথে আরিয়ান পুলিশের গাড়ির পেছনের সিটে বসে কাঁপছিল। পকেটে হাত দিতেই সে একটা শক্ত কাগজের টুকরো অনুভব করল।
পকেট থেকে কাগজটা গোপনে বের করতেই তার বুক ধপধপ করে উঠল। সেটা একটা রেস্তোরাঁর টিস্যু পেপার, আর তাতে তার নিজের হাতের লেখায় লেখা—
"খাঁচায় পাখি নেই, কিন্তু শিকারী ধরা পড়েছে।"
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে ভাবল—কাগজটা তার পকেটে এল কীভাবে? সে কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে, নাকি তাকে কেউ সূক্ষ্মভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে?
পাঠকদের উদ্দেশ্যে:
💭 আরিয়ান কি সত্যিই স্মৃতিভ্রমের কারণে নিজের স্ত্রীকে গায়েব করে দিয়েছে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো বড় ষড়যন্ত্র? আপনার কী মনে হয়? কমেন্টে আপনার মন্তব্য জানান!
পরবর্তী পর্ব (২য় পর্ব) আসছে খুব শীঘ্রই... সঙ্গেই থাকুন!