রহমত সাহেব অফিস থেকে বের হয়ে প্রতিদিন পদ্মার পাড়ে বসতেন। এটা তাঁর বছর পনেরোর পুরনো অভ্যাস। নদীর জল দেখতে দেখতে মাথা ঠান্ডা হয়, গল্পের প্লট মাথায় আসে, আর পৃথিবীটাকে একটু কম বাজে মনে হয়। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ব্যাপারটা বেগড়বাই হয়ে গেছে। সেই পুরনো বেঞ্চির পাশ দিয়ে এখন একটা বিশাল রাস্তা হয়েছে। রাস্তায় সিএনজি, রিকশা, বাস, আর পথচারীদের এমন হুলুস্থুল যে ঠিকমতো চিন্তাও করা যায় না। রহমত সাহেব মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন। গল্পের প্লট আসে না। এই গল্পের প্লট না আসার কারণে সবচেয়ে বেশি মুশকিলে পড়েছে তাঁর ছেলে ইমতিয়াজ। ইমতিয়াজের বয়স আট। সে বাসায় কম্পিউটারে গেম খেলতে পারে না কারণ তার বাবা বলেছেন "চোখ নষ্ট হয়।" টেলিভিশন দেখতে পারে না কারণ তার মা বলেছেন "মাথা নষ্ট হয়।" বাইরে খেলতে যেতে পারে না কারণ পাড়ায় গরুর হাট বসেছে এবং গত মঙ্গলবার একটা ষাঁড় তাকে দৌড়ানি দিয়ে বাসার দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেছে। ফলে রহমত সাহেবকে প্রতি রাতে একটা করে নতুন গল্প বলতে হয়। আজ তিনি একটু ভিন্ন জায়গায় বসেছেন। সদরঘাটের দক্ষিণে, নদীর পাড়ের একটা নির্জন বেঞ্চি। সামনে নদী, আকাশে একটা বক উড়ছে অলসভাবে। মন একটু খুলে গেল।
'বাঁচা গেল।'
রহমত সাহেব জুতো খুলে পা তুলে দিলেন বেঞ্চিতে। চোখ বুজলেন।
"আস্সালামুয়ালাইকুম!"
রহমত সাহেব লাফ দিয়ে উঠে বসলেন। পাশে একজন লোক। রোগা, লম্বা, গায়ে ধূসর রঙের আধময়লা পাঞ্জাবি। মাথায় একটা টুপি যেটা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কানের উপর কাত হয়ে আছে। হাতে একটা পুরনো ব্যাগ, আর বুকের কাছে ঝুলছে একটা অদ্ভুত যন্ত্র। দেখতে অনেকটা ডাক্তারের গলায় ঝোলানো যন্ত্রের মতো, কিন্তু আকারে তার তিনগুণ বড়, রঙটা তামাটে, আর তার গায়ে হাতে কাটা দাগে নম্বর বসানো।
"ওয়ালাইকুমুস্সালাম,"
রহমত সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
"আপনি কি আমাকে ইচ্ছে করে ভয় দেখালেন?"
"ক্ষমা চাই, ক্ষমা চাই। বসতে দেবেন? পা ব্যথা করছে। হেঁটে এলাম অনেকখানি।"
"কোথা থেকে?"
লোকটা একটু থেমে বললেন,
"মোটামুটি... বারোশো বছর আগে থেকে।"
রহমত সাহেব আবার জুতো পরে নিলেন। কে জানে লাগবে কিনা। দৌড়াতে হতে পারে। লোকটার নাম জানা গেল ফরহান উদ্দীন। বয়স বলা কঠিন। মুখে বলিরেখা আছে, কিন্তু চোখ দুটো এমন উজ্জ্বল যে দেখলে মনে হয় সবকিছু সে অনেক আগে থেকেই জানে।
"আপনি কি লেখেন?" লোকটা জিজ্ঞেস করলেন।
"লিখতে চাই। সুযোগ হয় না।"
"সংসার?"
"সংসার, অফিস, আর ছেলে। তিন মিলে একটা মানুষকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আমার সবই আছে।"
ফরহান সাহেব মাথা নাড়লেন সহানুভূতির সাথে। তারপর বললেন,
"আমিও একসময় লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অভিজ্ঞতাগুলো এত বেশি যে কোথা থেকে শুরু করব বুঝি না।"
"কী ধরনের অভিজ্ঞতা?"
লোকটা একটু হাসলেন। তারপর বললেন,
"ধরুন, গত সপ্তাহে আমি এই নদীর পাড়েই ছিলাম। তবে এই সময়ে নয়।"
"তাহলে কোন সময়ে?"
"সেটা ছিল আরবি হিজরি চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি। এই জায়গায় তখন কোনো শহর নেই। ঘন জঙ্গল। আর সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা কাফেলা যাচ্ছে। উট, ঘোড়া, মশাল। সওদাগরদের দল। আমি একটা গাছের আড়াল থেকে দেখলাম, তারা এসে এই নদীর পাড়ে থামল, ওজু করল, মাগরিবের নামাজ পড়ল।"
রহমত সাহেব কান খাড়া করলেন। বললেন,
"তারপর?"
"তারপর দলের সর্দার একটা বিশাল মাছ ধরলেন। এত বড় মাছ যে দুই হাতে তুলতে পারছেন না। অথচ পুরো দলে খুশির কোনো চিহ্ন নেই। সবাই মুখ গোমড়া।"
"কেন?"
"কারণ দলে একজনও রান্না জানত না। সর্দার মাছ ধরতে পারেন, কিন্তু রান্না করতে পারেন না। বাকিরাও পারে না। তারা বিশাল মাছ নিয়ে বসে রইল আর পেটে ক্ষিদের আগুন জ্বলতে লাগল।"
রহমত সাহেব হাসি চাপলেন।
"শেষে কী হলো?"
"শেষে সর্দার কাঁচা মাছ খাওয়ার উদ্যোগ নিলেন। সেই মুহূর্তে আমি গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম।"
"তারপর?"
"তারপর আমাকে দেখে পুরো কাফেলা দৌড় দিল। তারা আমার পোশাক দেখেনি। আমার মুখ দেখেনি। তারা দেখেছিল আমার এই যন্ত্রটা।" ফরহান সাহেব বুকের যন্ত্রটায় হাত দিলেন।
"এটা দেখে তারা মনে করল এটা কোনো অস্ত্র। আর আমি বোধহয় জিন।"
"তারপর?"
"তারপর আমি একা বসে সেই মাছটা রান্না করে খেলাম। বেশ বড় মাছ ছিল। তিনদিনের খোরাক হয়ে গেল।"
এবার রহমত সাহেব সত্যিই হাসলেন। আস্তে আস্তে ফরহান সাহেবের গল্প এগোতে লাগল। সন্ধ্যা নামল, নদীতে লঞ্চের বাতি জ্বলে উঠল, দূরে রাজশাহী শহরের আলো ঝিকমিক করছে।
"এই যন্ত্রটা কীভাবে কাজ করে?" রহমত সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
"এই দুটো নল কানে গোঁজে। ডান দিকের সুইচ টিপলে ভবিষ্যত, বাম দিকে টিপলে অতীত। আর এই চাকায় সাল বেছে নিতে হয়।"
"মানে আমিও যেতে পারব?"
"সবাই যেতে পারে না। নির্দিষ্ট শর্ত আছে।"
"কী শর্ত?"
ফরহান সাহেব একটু গলা খাঁকারি দিলেন। তারপর বললেন,
"যার মাথার টাক এবং তার জুতার মাপ সমান হবে, শুধু সে-ই এই যন্ত্রে ভ্রমণ করতে পারবে।"
রহমত সাহেব থ' হয়ে গেলেন।
"মানে?"
"ধরুন কারো মাথায় টাক আছে। সেই টাকের ব্যাস যদি ইঞ্চিতে মাপা হয়, আর তার জুতার সাইজ যদি একই সংখ্যা হয় তাহলেই যন্ত্র কাজ করবে।"
রহমত সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর বললেন,
"এরকম লোক কি দুনিয়ায় আছে?"
"একজনকে পেয়েছিলাম। নারায়ণগঞ্জের লোক। তার টাকের ব্যাস ছিল সাত ইঞ্চি, আর জুতার মাপ ছিল সাত। নিখুঁত মিল।"
"তিনি কোথায় গেলেন?"
"মুঘল আমলে। ঢাকায়। সুবেদার ইসলাম খাঁর দরবারে গিয়ে সোজা হাজির হয়ে গেলেন। সেখানে তাঁর পোশাক দেখে সবাই ভাবল ইনি পাগল। তাঁকে গারদে ভরা হলো।"
"তারপর?"
"তারপর তিনি যন্ত্র টিপে আবার ফিরে এলেন। কিন্তু গারদের ভয় এতটাই লেগে গিয়েছিল যে এরপর থেকে তিনি ঘর থেকেই বের হতেন না। বলতেন, 'অতীত ভবিষ্যত বাদ দেন, বর্তমানেই বিপদ কম না।'"
রহমত সাহেব খিলখিল করে হাসলেন। এতটা হাসি অনেকদিন হাসেননি।
"আপনি কি আমাকে যন্ত্রটা একটু পরিয়ে দেবেন?"
ফরহান সাহেব বললেন,
"দেখতে পারি। তবে কাজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।"
"তাও একটু দেখি।"
নল দুটো কানে গোঁজা হলো। ফরহান সাহেব বললেন,
"চোখ বন্ধ করুন। মনে মনে ভাবুন আপনি কোথায় যেতে চান।"
রহমত সাহেব চোখ বন্ধ করলেন। মনে মনে ভাবলেন "সুলতানি আমল। বাংলা। পলাশীর যুদ্ধের আগে।"
সুইচ টিপল।
কিছু হলো না।
আরেকটু চাপা হলো।
কিছু হলো না।
"না, হলো না," ফরহান সাহেব বললেন।
রহমত সাহেব চোখ খুললেন।
"কেন হলো না?"
"আপনার মাথায় কোনো টাক নেই।"
"টাক না থাকলে যাওয়া যাবে না?"
"না।"
রহমত সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর হঠাৎ বললেন,
"আমার শ্বশুর সাহেবের মাথায় বিশাল টাক।"
"তাঁর জুতার মাপ কত?"
"মনে হয় নয়।"
"টাকের ব্যাস নয় ইঞ্চি হওয়া কঠিন।"
"শ্বশুর সাহেব মাশাআল্লাহ অনেক বড় মানুষ। সব দিক দিয়েই।"
ফরহান সাহেব একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
"পরেরবার আনুন। দেখব।"
এমন সময় দূর থেকে এশার আজান ভেসে আসতে শুরু করল। রহমত সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
"নামাজ পড়তে হবে। আসি।"
"কাল আসবেন?"
"দেখা যাক। অনেক কাজ পড়ে আছে। পলাশীর যুদ্ধটা একটু সরেজমিনে দেখতে হবে। ইতিহাসের বইয়ে যা লিখেছে তার সাথে মিল আছে কিনা সন্দেহ।"
"আর?"
"আর ঢাকার নামকরণটা নিয়েও একটা খটকা আছে মনে। ঢাক বাজিয়ে রাজধানী ঘোষণা হয়েছিল, নাকি ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে নাম, নাকি অন্য কিছু সেটাও একবার যাচাই করতে চাই।"
"তবে শেষবার গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছিলাম আমি।"
"কী ঝামেলা?"
"ভুল সালে গিয়ে পড়লাম। যে সময়ে যেতে চেয়েছিলাম তার চেয়ে দুইশো বছর আগে গিয়ে হাজির। সেখানে ঘন জঙ্গল। রাস্তাঘাট নেই। একটা বিশাল সাপ আমার পা দিয়ে যাচ্ছিল। আমি নড়লাম না। সাপও নড়ল না। দুজনে মিনিট পাঁচেক মুখোমুখি বসে রইলাম। শেষে সাপ নিজেই চলে গেল।" বলে তিনি হাসলেন।
"যন্ত্রটার কি ভুল হয় ?"
"সস্তায় তৈরি। একেবারে দেশীয় উপকরণে। একটু এদিক-ওদিক হয়। তবে,"
একটু গলা নামিয়ে বললেন,
"পশ্চিমের বৈজ্ঞানিকরা এটা এখনো বানাতে পারেনি। কাজেই সস্তা হলেও লজ্জার কিছু নেই।"
রহমত সাহেব হাসলেন।
ফরহান সাহেব থলি কাঁধে নিলেন। তারপর হঠাৎ বললেন,
"একটু হাত বাড়ান তো।"
"কেন?"
"নাড়িটা দেখি। ভ্রমণের উপযুক্ত শরীর কিনা বলতে পারব।"
রহমত সাহেব হাত বাড়িয়ে দিলেন। ফরহান সাহেব নাড়ি ধরলেন এবং চোখ বুজে মিনিটখানেক কী ভাবলেন।
"বললেন, শরীর ঠিকঠাক আছে। তবে রাতে ভাত কম খাবেন।"
"আচ্ছা।"
"আসি তাহলে। আল্লাহ হাফেজ।" বলে ফারহান সাহেব চলে গেলো।