FF.
গ থেকে গল্প Book page

Chapter 1

গ থেকে গল্প

Oct 2, 2026 7 min read

গ থেকে গল্প

‘আমাদের কি আগে কোথাও দেখা হয়েছে?’

সুধা বাচ্চাদের মতো দুষ্টুমিভরা হাসি মুখে বলল, ‘হয়তো!’ 

‘হয়তো! কোথায়?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

সুধা বলল, ‘হতেই পারে কোনো বইয়ের পাতায় দেখা হয়েছে।’

‘মানুষ কলেজে, ট্রেনে, ফ্লাইটে, বাসে, লিফটে, হোটেলে, ক্যাফেতে—এমন সব জায়গায় যেকোনো খানেই দেখা করতে পারে, কিন্তু বইয়ের পাতায় কেউ কীভাবে দেখা করতে পারে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

এবার আমার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে সুধা বলল, ‘দুই মিনিটের জন্য মেনেই নিন না। আমরা যদি এমন কোনো বইয়ের চরিত্র হই যা এখনও লেখাই হয়নি, তাহলে?’ 

এইকথা শুনে আমি চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিলাম এবং বললাম, ‘ঠাট্টাটা কিন্তু আপনি বেশ ভালই করতে পারেন।’



ব থেকে ব্যাটা বিয়ে করে নে

 

চন্দরের মোবাইলে বাবার নম্বর থেকে একটা এসএমএস এল, যাতে একটা মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। সে কেবল নম্বরটা পড়ছিল, এমন সময় বাবার ফোন থেকেই মায়ের কল এল। ফোনে নিজের আর চন্দরের কুশল বিনিময় ছাড়া মা শুধু এটুকুই জানালেন যে রবিবার দুপুর ১২টায় কফি হাউসে এক মেয়ের সাথে দেখা করতে যেতে হবে। এটাও বললেন যে মেয়েটি সেখানে একাই আসবে। 

 

অবশ্য, মেয়ের একা আসার ব্যাপারটা এতবার মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, চন্দর এখন আর বিশ্বাসই করে না যে বিয়ের জন্য কোনো মেয়ে একা দেখা করতে আসতে পারে। মেয়ের সাথে সবসময় তার এমন কোনো 'ক্লোজ ফ্রেন্ড' চলে আসে, যার জন্মই যেন হয়েছে শুধু আপনাদের বিয়ের জন্য আপনার ভাইভা নেওয়ার জন্য।’ 

 

যাই হোক, চন্দর অনিচ্ছা সত্ত্বেও কফি হাউসে সময়ের ঠিক ১৫ মিনিট আগেই পৌঁছে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল একটা টেবিলে এক ছেলে আর এক মেয়ে একসাথে বসে আছে। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল, আরও ১৫ মিনিট দেখে নিয়ে তারপর ১২টার সময় ফোন করবে। 

 

চন্দর যখন নিজের মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে বারবার আনলক আর লক করছিল, ঠিক তখনই ওই ক্যাফেতে বসা মেয়েটির গলার আওয়াজ চড়তে শুরু করল। চন্দরের কানে যা আসছিল, তা ছিল কিছুটা এইরকম, "আচ্ছা, বিয়ের পর যদি তোমাকে ২ বছরের জন্য আমেরিকা যেতে হয়, তবে আমি এখানে নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে তোমার সাথে যাবো! তোমাদের মতো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের কী মনে হয় বল তো আমেরিকা যাওয়াই বুঝি ক্যারিয়ার? না, তোমরা নিজেদের ভাবোটা কী? বিয়ের পর যদি মেয়েদের দিয়ে শুধু বাচ্চাই মানুষ করাতে হয়, তবে তোমাদের ওয়ার্কিং ওম্যান চাই-ই বা কেন, বলো না? …. আরও কত কি!" 

মেয়েটির কথা শুনে চন্দর বেশ মজা পেতে শুরু করল। মেয়েটি কম করে হলেও ২০ মিনিট একটানা কথা বলে গেছে। এই সময়ের মধ্যে ওই বেচারা ছেলেটি শুধু 'হুম' বলে একপর্যায়ে উঠে চলে গেল। 

 

ইতিমধ্যে চন্দরের ঘড়ির দিকে নজর গেল সোয়া বারোটা বেজে গেছে। চন্দর ভাবল, ফোন করে জানিয়ে দেওয়া যাক যে সে পৌঁছে গেছে। চন্দর ফোন করলো এবং ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ শোনার আগেই বলে উঠল  ‘হ্যালো, শুধু এটুকুই বলার ছিল যে আমি ক্যাফেতে পৌঁছে গেছি। আপনি আস্তে-ধীরে আসুন।’

‘আমিও ক্যাফেতেই আছি।’

‘আচ্ছা! আমিও তো ক্যাফেতে ২০ মিনিট ধরে আছি!’

‘আমিও।’ 


 

এ থেকে এক দিনের কথা

 

চন্দর ততক্ষণে বেশ বুঝে গেছে যে, এই মেয়েটির সাথেই আজ তার বিয়ের বিষয়ে কথা বলতে আসার কথা ছিল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা মেয়েটির টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটি কিছু আঁচ করার বা কোনো কথা বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই চন্দর ফোড়ন কেটে বলল ‘জানি না শুনে আপনার কেমন লাগবে, তবে আমিও কিন্তু একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার!’

"হা হা হা! সত্যিই দুঃখিত, আপনাকে এতটা সময় অপেক্ষা করতে হলো। আমি সুধা।"

"আরে না না, ও কিছু না। আপনি কিন্তু চমৎকার কথা বলেন! আমি চন্দর।"

"আপনি আমাদের সব কথা শুনছিলেন নাকি?"

"আরে না, ইচ্ছে করে শুনছিলাম না; আসলে কথাগুলো এমনিই কানে আসছিল।"

"আমি কি খুব বেশি চেঁচিয়ে কথা বলছিলাম?"

"হ্যাঁ, তা আর বলতে!"

"ধুর ছাই! কোথা থেকে যে সব আপদ চলে আসে। যাই হোক..."

"কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?"

"হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, বলুন।"

"আমার পরেও কি আজ আর কারও সাথে আপনার দেখা করার শিডিউল আছে? থাকলে জানাতে পারেন, আমি সেই অনুযায়ী কেটে পড়তাম আর কি।"

"আরে না না, একদিনে দুটো পাত্র দেখাই যথেষ্ট!"

"তা, আপনি কী করেন?"

"আমি একজন আইনজীবী, ফ্যামিলি কোর্টে প্র্যাকটিস করি। চাইলে আমাকে 'ডিভোর্স স্পেশালিস্ট'-ও বলতে পারেন’"

"বাহ্! কোনো নারী আইনজীবীর সাথে আজই আমার প্রথম আলাপ হচ্ছে। তা, সত্যিই ডিভোর্স করিয়ে দেন নাকি?"

"সত্যি বলতে কী, ডিভোর্স তো আদালতে আসার আগেই হয়ে যায়। আমরা তো কেবল আইনি সিলমোহরটুকু মারতে আর দেনাপাওনার হিসেব-নিকেশটা চুকিয়ে দিতে সাহায্য করি।"

"মানুষ ডিভোর্স করে কেন বলুন তো?"

"কারণ কি আর একটা থাকে!"

"তবুও, সবচেয়ে বড় কারণটা কী বলে মনে হয়?"

"কারণ, অধিকাংশ মানুষ নিজেই জানে না যে তারা জীবন থেকে আসলে কী চায়।"

"আপনি জানেন, আপনি জীবন থেকে কী চান?"

"খানিকটা হয়তো আন্দাজ করতে পারি। আর আপনি?"

"আমি তো বিন্দুমাত্র জানি না কী চাই।"

"ধুর ছাই, ছাড়ুন তো! কোথায় এই ভরদুপুরে ডিভোর্সের কিসসা নিয়ে বসলাম আমরা।"

"তা, প্রতিদিন আদালতে এত এত ভাঙনের গল্প দেখেও আপনার বিয়ে করার সাধ জাগে?"

"সত্যি বলতে, আমি বিয়ে করতেই চাই না। বাড়ির লোক যাতে মাথা না খায়, তাই বাধ্য হয়ে দেখা করতে চলে আসি। তারপর কোনো না কোনো ছুতোয় ছেলেদের রিজেক্ট করে দিই।"  

"সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের তো দেখাই করার আগে রিজেক্ট করে দেওয়া উচিত! তাহলে অন্তত দেখা করার ঝক্কিটুকু পোহাতে হয় না।"

"ঠিক বলেছেন, পরের বার থেকে এই বুদ্ধিটাই খাটাব।"

"আচ্ছা, রিজেক্ট যখন করবেনই, তখন একটা উপকার করে দিন না। আপনি বাড়িতে আগেই বলে দিন যে পাত্র আপনার পছন্দ হয়নি। নাহলে খামোখা আমার বাড়ির লোক পেছনে লেগে থাকবে।"

"ঠিক আছে,সে কথায় রইল। তা, আপনি বিয়ে করতে চান না কেন?" 

"উঁহু, ইচ্ছে নেই।" 

"কেন? প্রেম-ট্রেমের কোনো চক্কর আছে নাকি?"

"হ্যাঁ, হয়তো... না... ধুর, হয়তো... জানি না ভাই! আর আপনার?"

"একটা চক্কর ছিল বটে, তবে এখন চুকে গেছে। সত্যি বলতে, আমি বিয়ে-টিয়েতে ঠিক বিশ্বাস করি না।"

"তাহলে নিজের বাড়ির লোকেদের এবার বুঝিয়ে বলুন না। আর কত সফটওয়্যার ওয়ালা ছেলের বারোটা বাজাবেন।"  

"হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা বলেছেন। এবার বাড়িতে গিয়ে ঠিক এই কথাটাই বুঝিয়ে বলব।"

"আপনি তো আজ নিজেকে বাঁচিয়ে নিলেন, কিন্তু আমার কপালে যে আরও কতগুলো রবিবার নষ্ট হওয়া লেখা আছে কে জানে! কোনো মোক্ষম উপায় বাৎলে দিন না।"

"এমন কোনো উপায় যদি জানাই থাকত, তবে আজ ওই অপদার্থটার সাথে দেখা করতে আসতাম নাকি!"

"এখান থেকে যাওয়ার পর আমাকেও বোধহয় ওই একই বিশেষণে ডাকবেন?"

"হ্যাঁ, ডাকতেও পারি। কেন, কোনো আপত্তি আছে?"

"না, আপত্তির কী আছে। আচ্ছা, তাহলে আমি আসি। ভালো থাকবেন। যোগাযোগ রাখিয়েন, আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগল।"

"যোগাযোগ রাখার কথা বলে লাভ নেই, আমরা একে অপরকে চিনিই বা কতটুকু!"

"বেশ, আমার সম্পর্কে জানার মতো এটুকুই আছে যে আমি আমার চাকরিটা একদমই পছন্দ করি না। দু-তিন বছর আমেরিকায় থেকে চাকরি করেছি, কিন্তু মন টেকেনি। এখন প্রায়ই দু-তিন বছরের জন্য আমেরিকায় যাওয়ার অফার আসে, কিন্তু প্রতিবারই কেন যেন মন টানে না, না করে দিই। ক্রিকেট ম্যাচ ছাড়া টিভিতে আর কিচ্ছু দেখি না। প্রতি উইকেন্ডে একাই সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখি, থিয়েটার দেখাও বেশ পছন্দের। বই কিনি প্রচুর, কিন্তু তেমন পড়া হয় না। সকালের চায়ের কাপে চুমুক না দিলে খবরের কাগজটা ঠিক জমিয়ে পড়া যায় না। আর ভবিষ্যতে জীবন নিয়ে কী করব, তা নিয়ে খুব একটা স্পষ্ট ধারণা নেই। তা, আমি যখন নিজের হাঁড়ি এভাবে উপুড় করেই দিলাম, তখন আপনিও নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন!" 

"আমি একটা হোস্টেলে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকি। সেখানকার বেশির ভাগ মেয়ের সাথেই আমার ঠিক বনিবনা হয় না। তবে নিজের কাজটা আমি ভীষণ ভালোবাসি। ভারতের সেরা আইনজীবী হওয়াই আমার লক্ষ্য। সিনেমা কেবল বড় পর্দায় দেখতেই ভালো লাগে, টিভিতে নয়। উইকেন্ডে শখ করে থিয়েটার করি, আসলে ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের ভূতটা মাথায় চেপে আছে। আর হ্যাঁ, সবচেয়ে জরুরি কথা, আমি কিন্তু ভার্জিন নই। তা, আপনার কী খবর?"

"আমার... মানে?"

"আপনি ভার্জিন?"

"আরে ধুর, ওসব ছাড়ুন তো! এই দেখুন একটা বেজে গেছে। কোথাও লাঞ্চটা সেরে নেওয়া যাক, নাকি আপনার কোথাও বেরোনোর তাড়া আছে?" 

"আমার সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার বেশ পছন্দ, সেটাই খাওয়া যাক?"

"সাউথ ইন্ডিয়ান আমার খুব একটা মুখে রোচে না, তবে চলুক না! আপনার সাথে কি আর জীবনভর খেতে হচ্ছে!"

"আরে পছন্দ না হলে অন্য কিছু খাওয়া যেতেই পারে।"

"না না, ঠিক আছে ভাই। একটা দিনেরই তো ব্যাপার!"

চন্দর আর সুধার এটাই ছিল প্রথম দেখা। যেকোনো প্রথম কিছুর রেশ সবসময়ই একটু আলাদা হয়। কারণ, প্রথম না হলে তো দ্বিতীয়টি আসে না, দ্বিতীয় না হলে তৃতীয়। তাই প্রথম পদক্ষেপটিই সারাজীবনের পথের গন্তব্যগুলো ঠিক করে দেয়। প্রথমের সেই জাদুর পর আমরা আসলে কেবল নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করে যাই, আর প্রতিটা পুনরাবৃত্তির মাঝে শুধু ওই 'প্রথমবার'-এর রোমাঞ্চটুকুকেই খুঁজে বেড়াই। 


Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.