ট থেকে টাটা, বাই-বাই
সেদিন দুপুরের খাবারে কেবল দুটো জিনিসই ভালো ছিল। এক, খাওয়ার শেষের ফিল্টার কফি আর দুই, সুধার সঙ্গ। খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বেজে গেছে।
বিদায় নেওয়ার আগে চন্দর জিজ্ঞেস করল "তা, এরপর কী করার ইচ্ছে?"
"বিশেষ কিছু না, বাড়ি গিয়ে স্রেফ অলস সময় কাটানো। একটা সিনেমা দেখার খুব ইচ্ছে ছিল, কোনো বন্ধুকে রাজি করাতে পারলে যাব, নাহলে..."
"নাহলে কী?"
"নাহলে আর কী, আগামী সপ্তাহে তো ছবিটা আর হল-এই থাকবে না। দেখাই হবে না।"
"সিনেমাটা তো আমারও দেখার ইচ্ছে ছিল। কাউকে না পেলে আমায় জানাতে পারো, আমিই নাহয় সঙ্গী হব। এমনিতেও সিনেমা দেখার বাতিক আমার আছেই। সত্যি বলতে, আজ তোমার সাথে দেখা করার চক্কর না থাকলে আমি এতক্ষণে সিনেমা হলের অন্ধকারেই বসে থাকতাম।"
"আরে, কোনো না কোনো বন্ধু জুটে যাবেই, আর একান্তই না পেলে তোমাকে ফোন করে দেব।"
"পাকা কথা তো?"
"হ্যাঁ, একদম পাকা।"
"আচ্ছা চলি তবে, নিজের বিয়েতে কিন্তু নিমন্ত্রণ করতে ভুলো না!"
"আমি তো বিয়ে-থা করছিই না, তবে তুমি নিজের বিয়েতে আমায় অবশ্যই নিমন্ত্রণ কোরো।"
"কথা রইল! আর হ্যাঁ, যোগাযোগ রেখ।"
"নিশ্চয়ই। তোমার সাথে দেখা হয়ে সত্যিই খুব ভালো লাগল, নাহলে ওই অপদার্থটা তো মেজাজটাই খারাপ করে দিয়েছিল!"
" শোন, কারও সাথে দেখা করার পর ‘দেখা হয়ে ভালো লাগল’ কথাটা যদি মনেও আসে, মুখে উচ্চারণ কোরো না কখনো। কিছু কিছু অনুভূতি মুখে বললেই কেমন যেন পানসে হয়ে যায়।"
"ঠিক আছে, মনে থাকবে। চলো, বাই-বাই!"
"বাই-বাই! টাটা!"
রবিবারের রীতিনীতি
পরের রবিবার থেকে সুধার কাছে তার বাড়ির লোক এক নতুন পাত্রের নম্বর পাঠিয়ে দিয়েছিল, আর চন্দরের কাছেও চলে এসেছিল এক নতুন পাত্রীর নম্বর। দুজনেই সেই চেনা ক্যাফেতে পৌঁছে গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মানুষের সাথে দেখা করতে।
সুধা সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। চন্দর যে মেয়েটির সাথে দেখা করতে এসেছিল, সে-ও ততক্ষণে চলে এসেছে। চন্দর আর সুধা একে অপরকে দেখল, হাত নাড়ল এবং একটা ‘কী তাজ্জব ব্যাপার!’ মার্কা চাহনি দিল। সুধা যে পাত্রের সাথে দেখা করতে এসেছিল, মাত্র দশ মিনিটেই তার ওপর চরম বিরক্ত হয়ে উঠল। এদিকে চন্দরও যে মেয়ের সাথে দেখা করতে এসেছিল, তার দিকে মন না দিয়ে বারবার সুধার দিকেই তাকাচ্ছিল। কিন্তু চন্দর তো আর সুধার মতো অত ঠোঁটকাটা নয় যে মুখের ওপর মেয়েটিকে বলে দেবে যে তার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে নেই।
এমন সময় সুধা আচমকা চন্দরের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল এবং মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চরম গম্ভীর মুখে বলে উঠল "বোন, তোমার পাশে যে লোকটা বসে আছে না! এটা একটা আস্ত লম্পট । আমাকে দু-দুবার ওর সন্তানের মা বানিয়েছে, অথচ দেখ লজ্জা শরমের মাথা খেয়েও আজ তোমার সাথে দেখা করতে চলে এসেছে! এই লোকের একটা মেয়ের কাছ থেকে শুধু তিনটে জিনিসই চাই—লালসা, লালসা আর লালসা! বোন, মানবতার খাতিরে আমি তোমাকে শুধু সাবধান করে দিতে পারি। বাকিটা তোমার জীবন, আর লালসাটাও তোমার... মানে, বলতে চাইছি জীবনটা তোমার!"
একথা শোনার পর মেয়েটি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ওখান থেকে হনহন করে চলে গেল এবং যাওয়ার আগে চন্দরের দিকে একটা ‘কী চরিত্র রে বাবা!’ মার্কা চাহনি ছুঁড়ে দিল।
মেয়েটি বিদায় হতেই সুধা বলে উঠল "কেমন লাগল আমার অভিনয়?"
"চরম বাজে!"
"কেন? তোমার জীবনটা তো ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলাম।"
"তুমি কী করে জানলে যে আমার জীবন ধ্বংসই হতো?"
"তুমিই তো বলেছিলে তোমার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে নেই!"
"হ্যাঁ, বলেছিলাম বটে। তবে তার মানে এই নয় যে এই জীবনে আর কোনোদিন বিয়েই করব না!"
"তুমি আসার আগে ওই মেয়েটা ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে ফোনে কথা বলছিল। বলছিল 'এই অপদার্থটাকে আধ ঘণ্টার মধ্যে বিদায় করে আসছি!' "
"আমাকে অপদার্থ বলছিল ও? কী আম্পর্ধা!"
"হ্যাঁ, তা আর বলতে! তোমাকে অন্য কেউ অপদার্থ বলবে আমি দুনিয়ার সব সহ্য করতে পারি, কিন্তু আমার বাইরে অন্য কেউ তোমাকে অপদার্থ বলবে, এটা কিছুতেই সইব না, হা হা!"
"এটাও নিশ্চয়ই তোমার অভিনয় ছিল?"
"তা নয়তো কী! তোমার কী মনে হয়েছিল?"
"অভিনয়টা কিন্তু তুমি ভালই করো। সিনেমা-টিনেমাতে চেষ্টা করছ না কেন?"
"জাঁহাপনা! আনারকলি বরফের পাহাড়ে শাড়ি পরে স্লো-মোশনে নাচতে পারবে না, বুঝলেন! তাই থিয়েটার করি। কলেজে যখন পড়তাম, তখন তো রীতিমতো 'লাইভ থিয়েটার' করতাম!"
"থিয়েটার তো শুনেছি, তা এই 'লাইভ থিয়েটার' আবার কী জিনিস?"
"দিল্লিতে যখন আমরা কলেজ থেকে ফেরার জন্য বাসে উঠতাম, আর দেখতাম কোনো বখাটে ছেলে কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করছে, আমি অমনি আমার সাথের বন্ধুটাকে কষে একটা থাপ্পড় মেরে চেঁচামেচি জুড়ে দিতাম। এতে হতো কী, যে লোকটা সত্যি সত্যি ইভটিজিং করছিল, তার পিলে চমকে যেত! আমরা পরের স্টপেজেই এই বলে নেমে পড়তাম 'চল, তোকে আজ থানায় নিয়ে যাচ্ছি!' আর তারপরের স্টপ থেকে অন্য বাস ধরে বাড়ি ফিরতাম। আমার চক্করে পড়ে আমার বন্ধুদের যে কত থাপ্পড় খেতে হয়েছে!"
"তা, এখন আর সেই থাপ্পড় মারার 'লাইভ থিয়েটার' করো না?"
"মাঝে সাঝে করি, এই যেমন একটু আগে ওই মেয়েটার সামনে করলাম। তবে এখন মঞ্চেই থিয়েটার করি। আসলে জীবনটাও তো এক ধরণের অভিনয়ই, তাই না? কেউ ভালো অভিনয় করে গুছিয়ে নেয়, কেউ আবার একদম লেজেগোবরে করে ফেলে। যা-ই হোক, আমার নাটকের পরের শো-তে তোমাকে ডাকব কিন্তু। আসবে তো?"
"হ্যাঁ, অবশ্যই! আমি এক পায়ে রাজি।"
"তা, আজকের বাকি দিনটার প্ল্যান কী? আর কারও সাথে দেখা-টেখা করার আছে নাকি?"
"না না, তেমন কোনো তাড়া নেই।"
"একটা নাটক দেখতে যাবে আমার সাথে?"
"কোনটা?"
"যেকোনো একটা হলেই হলো, যেটা এখন চলছে। থিয়েটারের কথা বলতে বলতে হুট করে একটা নাটক দেখার ভূত মাথায় চাপল।"
"চলো, তবে নাটকের মাঝখানে আমাকে একটা থাপ্পড় কষিয়ে আবার তোমার ওই 'লাইভ থিয়েটার' শুরু করে দিয়ো না যেন!"
ন থেকে নাটক
মুম্বাইতে নাটক দেখার জায়গা তো অনেক আছে। তবে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি কেন্দ্র হলো 'পৃথ্বী থিয়েটার' আর অন্যটি 'এনসিপিএ' (NCPA)। এই দুটির কোনো একটিতেও যদি নাটক না দেখা হয়, তবে ধরে নেবেন আপনার মুম্বাই দর্শনটাই অধরা থেকে গেল। সুধা আর চন্দর জুহুর পৃথ্বী থিয়েটারে গেল। পৃথ্বী থিয়েটার মূলত পৃথ্বীরাজ কাপুরের স্মৃতিবিজড়িত। যেখানে প্রায়শই শশি কাপুর সাহেবকে উনার হুইলচেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। উনি মুখে কিছুই বলেন না, শুধু একদৃষ্টে সবাইকে দেখতে থাকেন; আর উনার দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালে উনার চোখের কোণে জমে থাকা জল একটু বেশিই ঘন বলে ভ্রম হয়।
প্রতিদিন মুম্বাই স্টেশনে শুধু কিছু মানুষ নামেন না, নামে শত শত শহর, হাজারো মানুষ আর লক্ষ লক্ষ স্বপ্ন। যে কটা স্বপ্ন এখানে পা রাখে, তাদের প্রত্যেকের পেছনে একটা করে গল্প থাকে। কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে আসে, কেউ বা নিজের যথসর্বস্ব বেচে, আবার কেউ আসে একদম খালি হাতে। এই গল্পগুলো শোনার মতো ফুরসত কারও নেই, অথচ এই প্রতিটা গল্পই নিজের জায়গায় একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চলচ্চিত্র। মুম্বাইতে একটা সাধারণ গল্প থেকে সিনেমা হয়ে ওঠার মাঝের দূরত্বটা এতটাই দীর্ঘ যে, কত শত স্বপ্ন হাঁটতে হাঁটতে, দিকবিদিক হারিয়ে, হোঁচট খেতে খেতে মাঝপথেই দম ফুরিয়ে মরে যায়। রোজ লক্ষ লক্ষ স্বপ্ন মুম্বাইয়ের বুকে এভাবেই শেষ হয়ে যায়, তবুও পরদিন স্টেশনে নামা নতুন স্বপ্নের ভিড়ে বিন্দুমাত্র কমতি থাকে না। ভারী অদ্ভুত শহর, তাই না!
সেই অগাধ স্বপ্নেরই কিছু কিছু অংশ রোজ সন্ধ্যায় এই পৃথ্বী থিয়েটারে এসে ভিড় জমায়। তাই পৃথ্বীর পরিমণ্ডলটা সবসময় এক দারুণ আমেজে মেতে থাকে। ওখানকার প্রতিটি টেবিলে যেন নতুন কোনো সিনেমার গল্প ডানা মেলে। কিছু লেখক গোছের মানুষ নোটপ্যাড হাতে ডুবে থাকেন নিজেস্ব ভাবনায়। টেলিভিশন কিংবা রূপালি পর্দার চেনা মুখগুলোকেও এখানে প্রায়ই দেখা যায়। এখানকার প্রতিটি মানুষকে কোনো না কোনো বড় ব্যক্তিত্ব কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন। মুম্বাইয়ের বুকে মানুষ শুধু একটা মুখের কথা কিংবা একটা মিটিংয়ের ভরসায় গোটা জীবন পার করে দিতে পারে। এখানে একটি বইয়ের দোকানও আছে, যেখানে হিন্দি বইয়ের সংখ্যা কম হলেও খোঁজ করলে ঠিকই মিলে যায়।
সুধা আর চন্দর যখন পৃথ্বী থিয়েটারে পৌঁছাল, ততক্ষণে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তবে সুধা কোনো না কোনো উপায়ে ঠিকই টিকিটের একটা জোগাড় করে ফেলল। সুধা নাটকটা এতটাই তন্ময় হয়ে দেখছিল যে, ওর চোখের পলক পড়াই যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নাটকের আবহে সুধার সাথে দু-একবার এমনও হলো যে, ওর অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে দু-চার ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। চন্দরের মন অবশ্য নাটকের চেয়ে সুধার ওপরেই বেশি ছিল। থিয়েটারের আলো যেভাবে রঙ বদলাচ্ছিল, ঠিক ততটাই দ্রুততার সাথে মঞ্চের কুশলীদের মুখের অভিব্যক্তিও পাল্টে যাচ্ছিল; আর ঠিক একই তালে সুধার মুখের আলোর দ্যুতিও রূপ নিচ্ছিল ভিন্ন আভায়। নাটকটি যখন শেষ হলো, তখন সুধা, থিয়েটারের আলো আর মঞ্চের অভিনেতা—তিনটি মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গেল।
নাটক শেষ হওয়ার পর সুধা বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলল না। চন্দর যখন রাতের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করল, তখন সুধা বলে উঠল "নাটকটা কেমন লাগল তোমার?"
"মন্দ নয়, ভালোই।"
"শুধু ভালো? খুব ভালো লাগেনি?"
"আচ্ছা বাবা, খুব খুব ভালো লেগেছে। তা, তুমি দেখি কাঁদতেও পারো?"
"কেবল নাটকের সময়েই।"
"আসলেই কাঁদছিলে, নাকি ওটাও অভিনয় ছিল?"
"তোমার কী মনে হয়?"
"আমার মনে হয়, মানুষ আর যা-ই করুক, চোখের জলের ওপর কখনো মিথ্যে অভিনয় খাটায় না।"
"হুম, তোমার কথায় মুগ্ধ হলাম!"
"তাহলে ডিনারটা সেরে নেওয়া যাক?"
"একদম ইচ্ছে নেই।"
"ইচ্ছে তো আমারও নেই।"
"তাহলে খামোখা জিজ্ঞেস করলে কেন?"
"ভাবলাম, এই উসিলায় যদি আরও কিছুটা সময় একসাথে থাকা যায়!"
"শুরু হয়ে গেল তো তোমার ফ্লার্ট করা! ফ্লার্ট করারও একটা নিয়ম আছে যা বলতে চাও, কোনো বাহানা না খুঁজে সোজাসুজি বলে দেওয়াই ভালো।"
"সুধা..."
"কী?"
"না, কিছু না।"
"আরে বলোই না, এভাবে মাঝপথে কথা ঝুলিয়ে রেখো না তো!"
"আরও কিছুটা সময় কি দুজনে একসাথে কাটানো যায়?"
"চলো, কাছেই তো সমুদ্র, ওখানেই যাওয়া যাক।"
"সমুদ্র খুব টানে তোমাকে?"
"ভীষণ। আর তোমার?"
"আমার আবার পাহাড় বেশি পছন্দ।"
"তাহলে তো হানিমুনে ওই উটি-টুটি কোথাও যাবে, কী বলো?"
"না, হানিমুনে আমি মুসৌরিতে যাব।"
"বিশেষ কোনো কারণ?"
"মুসৌরিতে ঢোকার মুখেই 'হানিমুন ইন' নামে একটা হোটেল আছে। ব্যস, প্রথমবার যখন মুসৌরিতে গিয়েছিলাম, তখনই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম যে হানিমুন করতে এলে এখানেই আসব।"
"যাক বাঁচা গেল, আমাদের বিয়েটা হচ্ছে না! নাহলে আমাদের প্রথম ঝগড়াটা ওই হানিমুনের জায়গা নিয়েই বেঁধে যেত!"
"কেন, তোমার হানিমুনে কোথায় যাওয়ার ইচ্ছে শুনি?"
"যেখানেই হোক, শুধু সেখানে যেন একটা দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্র থাকে।"
"হানিমুনে তোমার এমন জায়গায় যাওয়া চাই যেখানে সমুদ্র আছে, অথচ এদিকে তুমি বিয়েই করতে চাও না! তুমি কি একটু আধটু পাগল আছ নাকি?"
"হ্যাঁ, তা একটু আধটু বটে! আসলে প্রতিটি মানুষের মধ্যেই তো কিছুটা পাগলামি লুকিয়ে থাকে।"
"আমি কিন্তু মোটেও পাগল নই।"
"তাহলে নিজের ভেতরের পাগলামিটা এবার খুঁজে বের করো।"
"তাতে কী লাভ হবে?"
"খানিকটা পাগল না হলে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীকে সহ্য করা যায় না।"
সুধার এই পাগলামির কথাটা চন্দরের মনকে এক অদ্ভুত উপায়ে ছুঁয়ে গেল। একথা শোনার পর সে কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে রইল। যে কথাগুলো আমাদের মনের গভীরে নাড়া দেয়, সেগুলো তো এভাবেই আমাদের আলতো করে ছুঁয়ে শান্ত করে দেয়।
চন্দর যখন দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলল না, তখন সুধা ডেকে উঠল "কী অত ভাবছ বলো তো?"
"কিছু না।"
"বলেই ফেলো না! এত ভাবলে কিন্তু শেষমেশ প্রেমে পড়ে যাবে!"
"যদি সত্যিই প্রেমে পড়ে যাই, তখন?"
"তখন একটা কাজ কোরো।"
"কী কাজ?"
"আমাকে ভুল করেও বলতে যেয়ো না!"
"আরে, তুমিই না এইমাত্র বললে যে মনে যা থাকে সবটাই সোজাসুজি বলে দেওয়া ভালো!"
"সে তো ফ্লার্ট করার কথা বলেছিলাম, ভালোবাসার জন্য থোড়াই বলেছি! আচ্ছা, এবার ওঠা যাক।"
"চলো, তোমাকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসি।"
"আরে থাক, দয়া করে আর সৌজন্যতা দেখাতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব। পুরুষেরা যদি এতটা যত্নশীল হওয়ার ভান না করত, তবে বোধহয় এই পৃথিবীটা আর একটুখানি বাসযোগ্য হতো!"
"তা ঠিক... তা, আবার কবে দেখা হচ্ছে আমাদের?"
"কবে হবে তা তো বলতে পারছি না, তবে কোথায় হবে সেটা বলে দিতে পারি।"
"কোথায়?"
"ঠিক ওই ক্যাফেটাতেই।"
"তোমার নাটকের শো থাকলে কিন্তু অবশ্যই ডেকো।"
"পাকা কথা, ডাকব। চলো, বাই-বাই!"
"টাটা! বাড়ি পৌঁছে একটা এসএমএস করে দিয়ো কিন্তু।"
"বাহ্! এত দরদ! আমি কোনো এসএমএস-টেসেমেস করছি না , আর আমার কিছু হবে না। 'চিন্তা কোরো না, আজকের দিনটা দারুণ কাটল' এইসব আদিখ্যেতা মার্কা কথা বলে দয়া করে ন্যাকামি করতে বলো না!"
এই সাক্ষাতের পর দুজনেই যে যার বাড়ির পথ ধরল। চন্দর যখন পোশাক বদলে কেবল শুতে যাবে, ঠিক তখনই সুধার একটা এসএমএস এসে হাজির হলো "নিরাপদে পৌঁছে গেছি। দেখা হয়ে ভালো লাগল।"
এই এসএমএস এর পিঠে কত শত জবাব যে চন্দর ওর মোবাইল ফোনের পর্দায় টাইপ করল আর মুছল, কিন্তু শেষমেশ কোনো শব্দই আর ওপার পর্যন্ত পৌঁছাল না।
জীবনের যেকোনো নতুন কিছুর শুরুতে এক ধরণের অদ্ভুত দ্বিধা আর জড়তা জড়িয়ে থাকে। এই সামান্য একটুখানি বুক ঢিপঢিপানি বা ঘাবড়ে যাওয়াটা আসলে বড্ড প্রয়োজন; কারণ কোনো পদক্ষেপে যদি বিন্দুমাত্র ভয় বা সংশয় না থাকে, তবে বুঝতে হবে যে হয় সেই কাজটি আপনার জীবনে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব বহন করে না, আর না হলে কাজটি আদও করার মতোই নয়।