আজ রবিবার। দুপুরবেলা দোতলার ঘরে বসে রবীন্দ্রনাথের একটা বই পড়ছিলাম। বাইরে রোদ এমন ঝলসে উঠেছে, যেন আকাশ থেকে টপটপ করে আগুন ঝরে পড়ছে। সামনের গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত গরমের আঁচে কুঁকড়ে গেছে। জানালা দিয়ে যে আলো ঢুকছে, তাতেও তাপের কাঁপন স্পষ্ট চোখে পড়ে। আকাশের নীল রং ফ্যাকাশে হতে হতে প্রায় সাদা হয়ে গেছে। বাতাস থমকে আছে, যেন প্রকৃতি নিজেও এই দাবদাহে হাঁপিয়ে উঠেছে। এমন রোদে ছাতা ছাড়া বেরোলে বুঝি গায়ের চামড়াই ঝলসে যাবে। ঘরের ভেতরেও অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। মনে হয়, সময়ও এই ভ্যাপসা গরমে ক্লান্ত হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। চারদিক নিঝুম। মাঝে মাঝে দূরের কোনো পাখির ডাক সেই স্তব্ধতাকে একটুখানি ভেঙে দিয়েই আবার মিলিয়ে যায়। আমি বইয়ের পাতায় চোখ রাখি ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টি বারবার ফসকে যায় জানালার ওপারে, সেই আগুনঝরা আকাশের দিকে।
আমার পোষা বিড়ালটার জন্য জানালার পাশে একটা ছোটো বাটিতে পানি রাখা থাকে, যাতে দুপুরের এই ভ্যাপসা গরমে সে এসে পানি খেতে পারে। হঠাৎ জানালার ওপারে একটা অচেনা নড়াচড়া আমার চোখে পড়ল। মাথা তুলে ভালো করে তাকাতেই দেখি, এক বিশাল হুতুম পেঁচা এসে বসেছে। দুপুরবেলায় পেঁচা! বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি খেলে গেল। তার চোখদুটি বড়ো, গোল, আর গভীর। যেন নিস্তব্ধ দুপুরটাকে ভেদ করে সে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম, হয়তো তৃষ্ণার্ত হয়েই এসেছে। তাই চুপচাপ দেখতে লাগলাম। পেঁচাটা ধীরে ধীরে পানির বাটির দিকে এগিয়ে গেল। ঠোঁট নামিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি তুলে নিল, তারপর গিলল, যেন দীর্ঘ পিপাসা মেটাচ্ছে। পানি খাওয়া শেষ হতেই সে হঠাৎ ডানা ঝাপটাল, আর বাতাসে একটা অদ্ভুত শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। জানালার শিকের আরও কাছে এসে বসল সে, একেবারে আমার মুখোমুখি। তার উপস্থিতিতে ঘরটা কেমন যেন এক অদভূত রহস্যময় আবহে ভরে উঠল। বইয়ের পাতা হাতের মাঝে খোলা রেখেই আমি তাকিয়ে রইলাম পেঁচাটার দিকে।কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, সে একটুও নড়ছে না। ডানা গুটিয়ে সোজা হয়ে বসে আছে, পানি খাওয়ার পরেও। আমি পাত্তা না দিয়ে আবার বইয়ের দিকে মন ফেরালাম। কিন্তু অস্বস্তিটা কাটল না। বুকের ধুকপুকানি একটু একটু করে বাড়ছে। একটু পারে চোখ তুলে দেখি, সে ঠিক একই ভঙ্গিতে বসে আছে। না ডানা ঝাপটাচ্ছে, না কোনো শব্দ করছে। বিরক্তি আর কেমন একটা ভয় একসঙ্গে আমাকে গ্রাস করতে লাগল। বুক সোজা করে বসে দু'বার জোরে হাততালি দিলাম।
"এই হুস! হুস! যা এখান থেকে… যা!"
কিন্তু পাখিটা এতটুকুও নড়ল না। যেন তার ভেতরে কোনো প্রাণই নেই। বুকের ভেতর একটা চাপা ধ্বনি বেজে উঠল। অস্বস্তি আর কৌতূহল একসঙ্গে মিশে গেছে। নিজেকেই বললাম,
"থাক, গিয়েই তাড়াই।"
ধীর পায়ে জানালার দিকে এগোলাম। হাত পাঁচেক দূরে দাঁড়াতেই খেয়াল করলাম, পাখিটা সাধারণ হুতুম পেঁচার মতো নয়। অস্বাভাবিক বড়ো আর ভারী। পালকগুলো গাঢ়, কালচে-ধূসর, আর তাতে কেমন এক অদ্ভুত ঝিলিক। যত এগোচ্ছি, বুকের ধুকপুকানি তত বাড়ছে। ঘরের বাতাস যেন ঘন হয়ে এসেছে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। পাখিটা তখনও এক বিন্দু নড়েনি। আমি একেবারে কাছে পৌঁছে গেলাম। আমার হাত ঠেকল জানালার শিকে। হঠাৎ পাখিটার মাথা ঘুরে গেল। স্বাভাবিকভাবে নয়, একেবারে একশো আশি ডিগ্রি! দুই চোখ মুহূর্তে পেছন থেকে সামনে চলে এল, আর সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। সবুজ, জ্বলজ্বলে চোখ। এমন চোখ আমি কোনো পেঁচার দেখিনি। পেঁচার আবার সবুজ চোখ হয় নাকি! ভয় আর বিস্ময় মেশানো দৃষ্টিতে আমি তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, ওই দৃষ্টি আমার শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, শিরদাঁড়ার প্রতিটি স্নায়ুতে গেঁথে বসছে। বুকের ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল, যেন কেউ বরফগলা পানি ঢেলে দিয়েছে, শিউরে উঠলাম। তবু পাখিটা নড়ল না, মৃতের মতো নিশ্চুপ। ঠোঁট সামান্য ফাঁক, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। শুধু তার চোখে জ্বলছে সেই অদ্ভুত সবুজ আভা। সেই আভা যেন ঘর ভরিয়ে তুলছে, এমনকি আমার নিজের হাতটাও সবুজ আলোয় মোড়া। আমি পলক না ফেলে তাকিয়ে রইলাম। ঠিক তখনই মনে হলো, পাখিটার চোখের ভেতর কী যেন দেখা যাচ্ছে। কোনো দৃশ্য, কোনো ছবি। বুক ধড়ফড় করে উঠল। চোখ সরাতে চাইলাম, পারলাম না। ওই সবুজ চোখদুটো যেন আমাকে বেঁধে ফেলেছে, নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছে। পা দুটো থমকে গেছে। এক অদৃশ্য শূন্যতা আমাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, চাইলেও আর এক পা এগোনোর সাধ্য নেই। পাখিটার দৃষ্টি কোনো সাধারণ পাখির নয়। নিস্তব্ধ, মৃতের মতো নিস্পন্দ, অথচ তাতে এক অদ্ভুত জীবন্ত শীতলতা। যেন বহু শতাব্দীর অন্ধকার আর গোপন রহস্য জমে আছে তার চোখের সবুজ কুয়াশার ভেতর। দু'এক পা পিছিয়ে এলাম। বুকের ধুকপুকানি এমন বেড়েছে, মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা বুঝি বেরিয়েই আসবে। কোনোমতে সরে এসে বিছানায় বসে পড়লাম। হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে, আঙুল কাঁপছে। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন কাঁপছি, যেন কেউ আমার সারা শরীর নাড়িয়ে দিতে চায়, অথচ আমি নড়তে পারছি না। পেঁচাটা তখনও জানালায় একই ভঙ্গিতে বসে, চোখদুটি থেকে সবুজ কুয়াশার মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। আমি অপলক তাকিয়ে আছি, ঠিক তখনই সে হঠাৎ ডানা মেলে দিল। ডানার ঝাপটায় বিকট শব্দ উঠল, যেন ঘরের ভেতর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। জানালার শিকগুলো কেঁপে উঠল, বইয়ের পাতা তীব্র হাওয়ায় বারবার উলটে গেল। আঁতকে উঠে তাকালাম। সবুজ চোখদুটো আর নেই। পেঁচাটা এক দমকা শব্দে উড়ে গেল দূরে, মিলিয়ে গেল দুপুরের আগুনঝরা আলোয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। বুকের কাঁপুনি তখনও থামেনি। মনে হচ্ছিল, কোনো স্বপ্ন দেখে ফেললাম না তো। তবু একবার জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালাম। কোথাও পেঁচার চিহ্ন নেই। শুধু একটা জায়গায় মাটিতে পড়ে আছে দু'তিনটে কালচে পালক, তাতে হালকা সবুজ আভা মেশানো। আমি আর বেশি কিছু ভাবলাম না। নিজেকে জোর করে শান্ত করলাম। আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখলাম, যেন কিছুই হয়নি, সবই এক মুহূর্তের ভ্রম।
রাত অনেক হয়েছে। আমি তখনও বসে বসে বই পড়ছি। রাত জেগে বই পড়ার অভ্যাস আমার বহুদিনের। বইয়ের পাতায় হলুদ আলোর ঝাপসা আভা ছড়িয়ে আছে। চারদিক এমন নিস্তব্ধ যে ঘড়ির টিকটিকও আর কানে আসছে না। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে, তাতে বইয়ের পাতার কোণ নড়ে উঠছে, পর্দা দুলছে। বাতাসে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। নিশুতি রাতে সবকিছুই অদ্ভুতভাবে স্থির।চোখে ঘুম জমে আসছে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। ঠিক তখনই কানে এল দমকা হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো একটা শব্দ। চমকে মুখ তুলে জানালার দিকে তাকালাম। বুকটা ধক করে উঠল।
সে এসেছে। সেই পেঁচাটা।
দুপুরে যাকে দেখেছিলাম, সেই সবুজ চোখের হুতুম পেঁচা বসে আছে জানালার ওপাশে। কিন্তু এবার তার রূপ অন্যরকম। আরও বিশাল, আরও ভয়ানক। তার পালক কালচে সবুজ আভায় মেশানো, যেন রাতের অন্ধকার থেকেই জন্ম নিয়েছে। চোখদুটো সেই একই সবুজ আলোয় জ্বলছে, তবে আরও তীব্র। ডানা গুটিয়ে রেখেছে, তবু তার আকার একটুও কমেনি। বরং মনে হচ্ছে, জানালার ফ্রেম ছাপিয়ে সে ক্রমেই বড়ো হচ্ছে, ক্রমেই ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। বাইরে নিকষ অন্ধকার। দূরে মেঘ গর্জে উঠছে ঢাকের মতো গম্ভীর শব্দে। তারপরই বাজের ঝলকানি জানালা গলে ঘরে ঢুকে মুহূর্তের জন্য সবকিছু সাদা আলোয় ভাসিয়ে দিল। সেই আলোয় পেঁচাটার মুখ, পালক, ডানা যেন এক পলকে অন্য আকার নিল। দেখলাম, তার পালক খাড়া হয়ে উঠেছে, যেন কোনো যুদ্ধের আগে সে নিজেকে প্রস্তুত করছে। অকারণেই এক চাপা ভয় আমার ভেতরে জন্ম নিল। বুকের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম, আর তখনই চোখের সামনে যা ঘটল, তা বিশ্বাস করা কঠিন।পেঁচাটা তার বিশাল অথচ অদ্ভুত নমনীয় শরীরটা নিয়ে জানালার শিকের ফাঁকের দিকে এগিয়ে এল। সে ফাঁক এতই সরু যে একটা কবুতরও সহজে গলতে পারত না। অথচ সে বাতাসের মতো হালকা হয়ে অবলীলায় ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঘর মুহূর্তে আরও ঠান্ডা হয়ে গেল, বাতাস যেন শরীরের চারপাশে জমাট বাঁধল। আলো নেভেনি, তবু ঘন ছায়া নেমে এসেছে আর সেই ছায়ার মাঝখানে জ্বলতে লাগল দুটি সবুজ চোখ। আমার হাত-পা অবশ হয়ে এল। মনে হলো, চিৎকার করার শক্তিটুকুও আর নেই। পেঁচাটা ধীরে ধীরে মেঝেতে হাঁটতে শুরু করল। নখরের ঘষায় খসখসে আওয়াজ উঠছে। আমি অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছি। প্রতিটি মুহূর্তে সে যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। ভয় বুকের ভেতর চেপে বসেছে। হঠাৎ, কিছু না ভেবেই, হাতের বইটা শক্ত করে ধরে ছুড়ে মারলাম পেঁচাটার দিকে। বইটা সোজা গিয়ে লাগল তার মাথায়। পরমুহূর্তেই এক বিকট শব্দ! এমন শব্দ আমি কোনোদিন শুনিনি। না পাখির ডাক, না মানুষের চিৎকার। যেন কোনো ভয়ংকর পশু আর মানুষের আর্তনাদ একসঙ্গে মিশে গেছে। পেঁচাটা মেঝের ওপর ডানা ছড়িয়ে দিল, কয়েকটা পালক ছিটকে পড়ল চারদিকে, যেন সবুজাভ ছায়ায় ঢাকা এক টুকরো মৃত্যু নেমে এল ঘরে। তারপর দপ করে সবকিছু থেমে গেল। চিৎকার থামল, বাতাস থামল। ঘরের মাঝখানে, আমার চোখের সামনে, নিথর হয়ে পড়ে রইল সেই বিশাল পেঁচাটা। ডানা আধখোলা, চোখদুটো নিভে গেছে, চারপাশে ছড়িয়ে আছে পালক। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।