FF.
পেঁচা ২ Book page

Chapter 2

পেঁচা ২

Oct 13, 2026 6 min read

কেন যে করলাম!

কথাটা মনের ভেতর থেকে আপনিই বেরিয়ে এল। নিচু হয়ে পেঁচাটার দিকে তাকালাম। একদম নিথর, ঠান্ডা। মনে হলো, একটু হাওয়া পেলেই বুঝি সে ডানা মেলে উড়ে যাবে। কিন্তু কিছুই ঘটল না। বুকের ভেতর অপরাধবোধ গেঁথে বসল। এভাবে তো ওকে ফেলে রাখা যায় না, কিছু একটা করতেই হবে। চারদিক এমন নিস্তব্ধ, যেন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। ঘড়িতে হয়তো রাত তিনটে পেরিয়ে গেছে। বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে। দূরের আকাশে থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। একটা পুরোনো খবরের কাগজে পেঁচাটাকে জড়িয়ে নিলাম। এক হাতে কোদাল, অন্য হাতে কাগজে মোড়া সেই দেহ নিয়ে হেঁটে গেলাম বাড়ির পেছনে। সেখানে পুরোনো পুকুরটার ধারে এক বিশাল তেঁতুল গাছ। তার নিচে থামলাম। কোদাল বসিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম। মাটি হালকা ভেজা, তাই সহজেই কাটছে। তবু প্রতিটি কোপে বুক কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি আঘাতে রাতের স্তব্ধতা ফেটে চৌচির হচ্ছে।

খচ্... খচ্...

কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট্ট একটা গর্ত হলো। কাগজে মোড়া পেঁচাটাকে আস্তে করে তার ভেতরে শুইয়ে দিলাম। শেষে মাটি সমান করে গাছের গোড়ার ঝরা পাতা ছড়িয়ে দিলাম ওপরে, যেন কেউ বুঝতেই না পারে, একটু আগে এখানে একটা প্রাণ চাপা পড়েছে। ঠিক তখনই আকাশ চিরে এক দমকা হাওয়া ছুটে এল। তেঁতুল গাছের পাতা কেঁপে উঠল, ডালগুলো দুলে উঠে তুলল অদ্ভুত এক শব্দ।

খররর... খররররর...

বুকটা হিম হয়ে গেল। কোদালটা কাঁধে তুলে বাড়ির দিকে দৌড় দিলাম। ভেতরে ঢুকতেই যেন আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামল। দরজা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম দোতলায়। ঘরটা আধো অন্ধকারে ঢাকা। ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো তোয়ালেতে গা মুছে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

দু'দিন কেটে গেল। পেঁচাটার কথা প্রায় ভুলেই গেছি। দিনের ক্লান্তি আর ছোটোখাটো চিন্তায় মন অন্য খাতে বইছে। তবু মনের এক কোণে সেই রাতের স্মৃতিটা রয়ে গেছে, নিঃশব্দে। বাইরে নরম হাওয়া। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের আলো এসে বিছানার পায়ার কাছে জমে আছে। দূরের রাস্তা শুনশান, শুধু মাঝেমধ্যে কোনো ভবঘুরে কুকুরের ডাক ভেসে আসে। আমি গভীর ঘুমে ডুবে আছি।ঠিক তখনই রাতের বুক চিরে কানে এল এক তীব্র কর্কশ শব্দ, যেন কেউ ধাতব কিছু ঘষে ঘষে কান ফাটিয়ে দিচ্ছে। এক মুহূর্তে সমস্ত নিস্তব্ধতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখি ঘর অন্ধকার। জানালার পর্দা দুলছে, কিন্তু বাতাসটা কেমন ভারী, আর তার সঙ্গে মিশে আছে তীব্র পচা গন্ধ। মনে হলো, বহুদিনের পচা কোনো মৃতদেহ যেন ঘরে ঢুকে পড়েছে। স্যাঁতসেঁতে সেই দুর্গন্ধে নাক জ্বলে যাচ্ছে। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। চারদিক নিঃশব্দ, অথচ সেই নিঃশব্দতার ভেতরেই যেন কেউ ধীরে ধীরে নিশ্বাস নিচ্ছে। অচেনা একটা উপস্থিতি ঘরটাকে ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিছানায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। মনে হচ্ছে, অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ নীরবে আমাকে দেখছে। বুকের ভেতর ঢেউ তুলছে এক অজানা আতঙ্ক। লোডশেডিং আমাদের গ্রামে নিত্যদিনের ব্যাপার, আজও তাই। হাত বাড়িয়ে টেবিলের পুরোনো হারিকেনটা টেনে নিলাম। কাচে ধুলো জমেছে, তেলও তলানিতে। তবু কাঁপা হাতে সলতেটা জ্বালালাম। ছোট্ট শিখাটা প্রথমে দুলে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে স্থির হলো। ঘরটা যেন একটু প্রাণ ফিরে পেল। সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিতেই শিখা ফুলে উঠল। তবু অন্ধকার পুরোপুরি গেল না। আলো যত ছড়াচ্ছে অন্ধকারটা ততই আমার পেছনে গা ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছে। শিখার কাঁপনের সঙ্গে দেওয়ালের ছায়াও দুলছে, যেন কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে ঘরের ভেতর। আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম সেই আলো-ছায়ার নাচের দিকে।

বিছানায় ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পায়ের সঙ্গে কী একটা ঠেকল। নরম, অথচ ভারী। বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। নিচু হয়ে হারিকেনটা এগিয়ে ধরলাম। আর পরমুহূর্তেই শরীরে সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল। মেঝেতে পড়ে আছে আমার পোষা বিড়ালটা। কিন্তু ওটাকে আর চেনা যাচ্ছে না। চোখদুটো নেই। কেউ যেন নির্দয়ভাবে খুবলে তুলে নিয়েছে। সেই ফাঁকা গহ্বরে হারিকেনের কাঁপা আলো পড়ে কেমন এক ভুতুড়ে আভা তৈরি করেছে। পেটের মাঝ বরাবর লম্বা, গভীর একটা চেরা দাগ। ভেতরের সবকিছু বের করে নেওয়া হয়েছে। দেখে মনে হয়, কেউ সময় নিয়ে, ধীরেসুস্থে, বিকৃত আনন্দে কাজটা করেছে। আর সেই গন্ধ। যে পচা গন্ধে ঘুম ভেঙেছিল, এতক্ষণে বুঝলাম সেটা আসছিল এখান থেকেই।

হাত কাঁপছে। হারিকেনটা প্রায় ফসকে গেল। চিৎকার করতে চাইলাম, গলার কাছে শব্দটা আটকে রইল। চোখ সরাতে পারছি না। মনে হচ্ছে, ওই ফাঁকা গহ্বরদুটো সোজা আমার দিকেই চেয়ে আছে। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত নেমে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। শরীর পাথর হয়ে গেছে। পলক ফেলতেও ভয় লাগছে। ঠিক তখনই ঘরের নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল। এমন এক শব্দে, যা মানুষের নয়, পশুরও নয়। তাতে মিশে আছে যন্ত্রণা, মৃত্যু আর এক অদ্ভুত আক্রোশ। শব্দটা বাতাস চিরে ঢুকে আমার হাড়ে হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিল। জানালাটা খোলাই ছিল, একটু ঠান্ডা হাওয়ার আশায়। বুকের কাঁপুনি চেপে ধীরে ধীরে সেদিকে তাকালাম। জানালার ঠিক ওপাশে বসে আছে সেই পেঁচাটা। সবুজ, দপদপে চোখদুটো সোজা আমার দিকে স্থির। নড়ছে না, অথচ তাতে যেন জ্যান্ত আগুন জ্বলছে। উজ্জ্বল, তবু বরফের মতো ঠান্ডা। সেই দৃষ্টির ভেতর এমন কিছু ছিল, যা আমাকে স্তব্ধ করে দিল। মনে হলো, কেউ আমার বুকের ভেতর দিয়ে একটা শীতল ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে। আমি ওকে চিনি। এ সেই পেঁচা, দু'দিন আগে নিজের হাতে যাকে মাটির নিচে পুঁতে এসেছি। এখনও মনে আছে, তেঁতুল গাছের নিচের সেই ছোট্ট গর্ত, ভেজা মাটি। অথচ সে এখন আমার জানালায়। আগের চেয়ে অনেক বড়ো, অনেক বিকৃত। পালক ভিজে জট পাকিয়ে গেছে। ডানার ডগা থেকে টুপটাপ করে কী যেন ঝরছে। আমি স্তব্ধ হয়ে সেই শব্দ শুনছি। কিন্তু আজ তো বৃষ্টি নেই! আকাশ পরিষ্কার, জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে। তাহলে ও ভিজল কীভাবে?

ফোঁটাগুলোর দিকে ভালো করে তাকালাম। হারিকেনের আলোয় প্রতিটি ফোঁটা চিকচিক করছে লালচে রঙে। ওগুলো পানি নয়।

রক্ত।

পেঁচাটা ধীরে ধীরে মাথা কাত করল। বাঁকানো ঠোঁট সামান্য ফাঁক হলো, আর সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে এল একটা শব্দ। হাসিও নয়, শিসও নয়, দুয়ের মাঝামাঝি কোনো অমানুষিক ধ্বনি। ওর দৃষ্টি আমাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং জমাট বরফের মতো শিরায় শিরায় ঢুকে আমাকে অবশ করে দিচ্ছে। পা দুটো যেন মেঝের সঙ্গে গেঁথে গেছে। শরীরের প্রতিটি রক্তকণা ধীরে ধীরে বরফ হয়ে যাচ্ছে। তারপর, এক ঝটকায়, পেঁচাটা ডানা মেলে দিল। বাতাসের ঝাপটায় হারিকেনের শিখা লাফিয়ে উঠল, দেয়ালের ছায়াগুলো যেন নেচে উঠল ঘরময়। আর সেই সঙ্গে ফেটে পড়ল এক বীভৎস চিৎকার। আমার কানের পর্দা ফাটিয়ে সোজা বুকে গিয়ে আঘাত করল সেটা। ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসতে লাগল। সবুজ চোখদুটো আরও জ্বলে উঠল। দুটো আগুনের গোলা যেন ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে, আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ওর শরীরটা ফুলে উঠছে, আরও বিশাল, আরও বিকৃত। পালক থেকে ঝরছে সেই লালচে ফোঁটা,

টুপ... টুপ... টুপ...

আর সহ্য হলো না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে। সে আওয়াজ নিজের কানেই অচেনা ঠেকল। তারপর হারিকেনের আলো দপ করে নিভে গেল। অন্ধকারে শেষবারের মতো ঝলসে উঠল সেই সবুজ চোখদুটো। আর আমি ঘরের মাঝখানেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম।

চোখ খুলতেই দেখি, দুপুর গড়িয়ে গেছে। বাইরের আকাশ আগুনের মতো জ্বলছে, উঠোনের ধুলোয় তাপের ঢেউ কাঁপছে। জানালা গলে সোনালি রোদ এসে মেঝেতে আর আমার মুখে উজ্জ্বল দাগ কেটেছে। দোতলার নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। শরীরটা ভারী, হাত-পা ঠান্ডা আর অবশ। পাশে বসে আছেন মা। চোখদুটো ফোলা, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট । আলতো করে আমার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁর চোখের গভীরে একটা ভয় লুকিয়ে আছে। যেন রাতের সেই অদ্ভুত ঘটনা কোনোভাবে তাঁকেও ছুঁয়ে গেছে। কাঁপা গলায়, কোনোমতে নিজেকে সামলে, সবকিছু খুলে বললাম। রাতে যা দেখেছি, যা টের পেয়েছি, একটুও বাদ দিলাম না। প্রথমে সবাই ভাবল, ঘুমের ঘোরে ভুল দেখেছি। কিন্তু আমার চোখেমুখের আতঙ্ক দেখে কেউই আর ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারল না। মা আমার হাত চেপে ধরলেন। বাবা মাথা নিচু করে বিছানার কোণে চুপচাপ বসে রইলেন। ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে দাদু আর কাকা, তাঁদের চোখেও আতঙ্কের ছায়া। শেষে সিদ্ধান্ত হলো, আমাকে আর এ বাড়িতে রাখা হবে না। শহরে মামার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। মা প্রথমে অনেক আপত্তি করলেন, তারপর নিঃশব্দে মাথা নেড়ে রাজি হলেন। সেদিনই বাবার সঙ্গে রওনা হলাম। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। দোতলার সেই জানালাটা তখনও খোলা, হাওয়ায় পর্দা দুলছে।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.