টেবিলের ওপর কলম খুঁজছিলাম। একজন সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বারে কলম হারানোটা খুব সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও আমার কাছে বিষয়টা চরম বিরক্তিকর। আমার প্রধান কাজ দুটো। এক, মানুষের মনের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে অসুখগুলো শোনা। দুই, নিজের হারানো কলম খোঁজা। কলমটা কিছুক্ষণ আগেও আমার ডান হাতে ছিল, এখন নেই।
রিসেপশনিস্ট সালমা দরজা সামান্য ফাঁকা করে উঁকি দিল।
স্যার, প্যাশেন্ট আসছে।
আসতে বলো। আর শোনো সালমা... আমি ড্রয়ার ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললাম, তুমি কি আজও ওই প্লাস্টিকের গাছে পানি দিচ্ছ?
সালমা বিরক্ত মুখে তাকাল।
আরে স্যার, পানি না দিলে কি আর পাতার জৌলুস থাকে? কালকে এক ব্যাটা তো আইসাই পাতা ধইরা টান। আমি কইসি, খবরদার! বিদেশি মানিপ্ল্যান্ট। বেশি টানাটানি করলে মইরা যাইব।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি ড্রয়ার বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলাম।
প্লাস্টিকের গাছ মরে না সালমা। মরব আমি। এই চেম্বারে বসে বসে কলম খুঁজতে খুঁজতেই আমি একদিন মারা যাব।
সালমা আমার কথায় বিন্দু পরিমাণ গুরুত্ব দিল না।
হ্যায় কিন্তু স্যার আগেই চইলা আসছে। আমি কি ওনারে বাইরে বসতে কমু?
না, পাঠিয়ে দাও।
একজন প্রবীণ লোক ঢুকলেন।
প্রথমে তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সালমার কাছে নিচু গলায় কী যেন একটা বলে ক্ষমা চাইল।
এরপর এগুলেন আমার টেবিলের দিকে।
কারও বাসায় বা অফিসে সময়ের আগে যাওয়াটা অভদ্রতা। লোকটা একটু হাসল, খুব ম্লান একটা হাসি।
যাঁর কাছে যাওয়া হয়, তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। ভাবেন, আহারে, আমারই বুঝি দেরি হয়ে গেল। আপনাকে অপ্রস্তুত করার জন্য আমি লজ্জিত।
আমি দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকালাম।
দুপুর দুইটা তেপ্পান্ন বাজে।
আপনার লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আপনি আমাকে মোটেও অপ্রস্তুত করেননি।
আপনারা বোধহয় এই ট্রেনিংটা পান, তাই না?
কোন ট্রেনিং?
আমি ভুরু কোঁচকালাম।
এই যে... সামনের মানুষটা আপনাকে যা ফিল করাতে চাইছে, সেটা ফিল না করা। নির্লিপ্ত থাকার ট্রেনিং।
কথাটা তীক্ষ্ণ।
আমি লোকটার দিকে নতুন চোখে তাকালাম।
না ভাই, আমাদের ট্রেনিং অতটা নিখুঁত না।
লোকটা হাসল। তার হাসিতে হিমশীতল নির্লিপ্ততা। মানুষ তার চারপাশের জগৎ নিয়ে পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়লে চোখেমুখে এমন ভুতুড়ে প্রশান্তি ভর করে।
পেশেন্টের নাম মাহফুজ আলম।
সালমার দিয়ে যাওয়া ইনটেক ফর্ম অনুযায়ী, তার বয়স তেষট্টি, বিবাহিত, নিঃসন্তান। পেশায় কনসাল্টিং সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ফর্মে বাসার ল্যান্ডলাইন নম্বর এবং তেজগাঁওয়ে অবস্থিত একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের নাম লেখা। মোবাইল নম্বরও দিয়েছে একটা। পরামর্শের কারণ হিসেবে নির্ধারিত খালি জায়গায় সে মাত্র দুটো বাক্য লিখেছে:
আমি কিছু স্বপ্ন দেখি। পরবর্তীতে, সেই স্বপ্নগুলোর সামান্য পরিবর্তিত সংস্করণ বাস্তবে ঘটে যায়।
সাইকিয়াট্রি পেশাটা বড্ড ক্লান্তিকর। এখানে প্রতিদিন মানুষ আসে তাদের জীবনের নোংরা, ভীতিকর মিথ্যেগুলো বলতে। কেউ দাবি করে তার ওপর জিনের আছর আছে। কেউ বলে পুলিশ তার পেছনে চর লাগিয়েছে। কেউবা ভাবে তার স্ত্রী খাবারে বিষ মেশাচ্ছে। কেউ আবার মানসিক সমস্যার বাহানা দিয়ে সজ্ঞানে করা নিজের অপরাধ ঢাকতে চায়।
কিন্তু এই লোকটার বাক্যে কোনো সস্তা নাটক নেই। সে যা বিশ্বাস করে তা-ই লিখেছে। এর আলাদা প্রমাণ দেওয়া বা আমাকে ইমপ্রেস করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই।
আমি লোকটার বাহ্যিক রূপ পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলাম। তার পরনে হালকা নীল রঙের শার্ট, ডার্ক ট্রাউজারের ভেতর পরিপাটি করে গোঁজা। পায়ে পুরোনো কিন্তু সযত্নে পলিশ করা বাদামি জুতো। বগলের নিচে ভাঁজ করা খবরের কাগজ, সম্ভবত আজকের। চুল প্রায় পুরোটাই ধূসর হয়ে এসেছে। অথচ, ভ্রু জোড়া এখনো কুচকুচে কালো। তার ডান চোখের ঠিক ওপরে চেহারায় খুব সামান্য অসামঞ্জস্য রয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু মুখ দেখলে মনে হয় এরা বুকের ভেতর আস্ত গোরস্তান বয়ে বেড়াচ্ছে। এই লোকটার চোখেও সেরকম নিবিড়, জমাট বাঁধা শূন্যতা।
লোকটা আমার উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসল।
প্রথমে সে তাকাল জানালার পাশের সেই কৃত্রিম মানিপ্ল্যান্টের দিকে।
তারপর দেয়ালঘড়ির দিকে। আমি আমার নোটবুকটা খুললাম। লোকটার হাত দুটো একদম স্থির। নিঃশ্বাস স্বাভাবিক। চোখের দৃষ্টিতে কোনো প্যারানোয়া নেই।
আচ্ছা, এবার আপনার স্বপ্নগুলোর ব্যাপারে বলুন।
মাহফুজ সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল। চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত গলায়, যেন আবহাওয়া নিয়ে কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে বলল, ডাক্তার সাহেব, আপনি কি প্রিকগনিশন বা পূর্বজ্ঞানে বিশ্বাস করেন?
না।
তার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটল।
খুব দ্রুত উত্তর দিলেন তো।
আপনি জানতে চেয়েছেন আমি কী বিশ্বাস করি। আমি কী প্রমাণ করতে পারি, তা তো জানতে চাননি।
তা ঠিক। মাহফুজ মাথা নাড়ল।
আপনি কি পূর্বজ্ঞান বিশ্বাস করেন?
আমি ঠিক জানি না।
গুড।
গুড কেন?
কারণ গোঁয়ার গোবিন্দ রোগীর চিকিৎসা করা মুশকিল। নিজের সমস্যা আছে, এটা বুঝতে পারা, রিকগনাইজ করা, সুস্থতার প্রথম ধাপ।
মাহফুজ তার খবরের কাগজটা ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে গুঁজে দিল। অতঃপর অন্য পকেট থেকে অফ-হোয়াইট ধরনের একটা পরিষ্কার রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল।
তাহলে আমার প্রথম স্বপ্নটার কথাই বলি। ঘটনাটা মোহাম্মদপুরের একটা ফার্মেসির...। মাহফুজ একটু নড়েচড়ে বসল।
ফার্মেসির ঘটনাটা তিন মাস আগের।
পকেট থেকে খবরের কাগজটা বের করে আবার সামনে রাখল।
আমি স্বপ্নে দেখলাম, মোহাম্মদপুরের একটা ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা কোন এক ছেলে ওরাল স্যালাইন কিনছে। রাস্তার একেবারে ফুটপাত ঘেঁষে সবুজ রঙের বাস এসে থামল। ফলের ভ্যানের পাশে মোটরসাইকেল পার্ক করা ছিল, কেউ হাত দেয়নি, এমনিতেই ধপাস করে পড়ে গেল। ফলওয়ালা চোটপাট শুরু করল বাস ড্রাইভারের সাথে। বাসটা সামনে এগোতে গিয়ে চাকার নিচে পেঁপের ঝুড়ি পিষে ফেলল।
আমি নোটবুকে খসখস করে কয়েকটা শব্দ লিখলাম।
আর ফার্মেসির ভেতরে?
ফার্মেসির ভেতরে একজন বয়স্ক মহিলা দোকানদারকে জিজ্ঞেস করছিলেন, কফ সিরাপ খেলে ঘুম পায় কি না।
কেউ আহত হয়নি?
না।
নেহাত প্রাত্যহিক দৃশ্য। তারপর?
নয় দিন পর, মাহফুজ এবার একটু সামনে ঝুঁকে এল।
তার চোখের জমাট বাঁধা শূন্যতার ভেতরে হঠাৎ তীক্ষ্ণ আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল।
আমি তাজমহল রোড দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটা ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, স্কুলের পোশাক পরা একটা ছেলে স্যালাইন কিনছে। একটা মোটরসাইকেল ধপাস করে পড়ে গেল। আর একটা বাস সামনে এগিয়ে গিয়ে ফল পিষে ফেলল।
আমি কলম থামিয়ে তার দিকে তাকালাম।
হুবহু মিলে গেল?
না। মাহফুজ মাথা নাড়ল।
বাসটা সবুজের বদলে নীল রঙের। ফল ছিল পেয়ারা। তাছাড়া ফার্মেসির ভেতরের ওই মহিলা অ্যালার্জির বড়ি নিয়ে কথা বলছিলেন।
একই ফার্মেসি ছিল?
না।
ছেলেটা? একই ছেলে?
আমার তা মনে হয় না।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
টেবিলের ওপর ঝুঁকে বললাম, নো অফেন্স, মাহফুজ সাহেব। মানুষের ব্রেন কম্পিউটার ফাইল সংরক্ষণ এর মতো কাজ করে না। সাইকোলজির ভাষায় একটা কথা আছে, কনফার্মেশন বায়াস। আপনি অস্পষ্ট স্বপ্ন দেখেছেন। পরে বাস্তব জীবনে কাছাকাছি কিছু একটা ঘটার পর, আপনার ব্রেন অবচেতনভাবে পুরোনো স্বপ্নটাকে এডিট করে ফেলেছে। যাতে বাস্তবের সাথে জাদুকরী মিল তৈরি হয়।
মাহফুজ শান্তভাবে শুনল। তার মুখে আত্মরক্ষার তাগিদ নেই। বরং এক ধরনের অদ্ভুত ক্লান্তি ভর করেছে সেখানে।
তার মানে, আপনি বলছেন ঘটনা ঘটার পর আমি অবচেতনভাবে আমার স্বপ্নটা পুনর্নির্মাণ করছি? সজ্ঞানে কোনো মিথ্যে না বলেই?
হ্যাঁ। এটাই সবচেয়ে লজিক্যাল ব্যাখ্যা।
এটা মেনে নেওয়া তো বেশ সুবিধাজনক।
কার জন্য?
আমার জন্য।
মাহফুজ সোফায় হেলান দিল।
কারণ তাহলে ব্যাপারটা নেহাতই সাধারণ একটা মানসিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো অতিপ্রাকৃত বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরতে হয় না।
আমি এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলাম। মানুষের মন কত অদ্ভুত। কেউ সাধারণ জীবন থেকে পালাতে চায়, স্পেশাল হতে চায়। অন্যদিকে এই লোকটা পাগলের মতো চাইছে তার জীবনটা দশজনের মতো স্বাভাবিক সাধারণ হোক। একাকিত্বের এই রূপ আমার চেনা। আমি প্রতিদিন অজস্র মানুষের মনের ভেতর উঁকি দিই। তারপর দিন শেষে নিজের ভেতরে গাঢ় শূন্যতা নিয়ে বাসায় ফিরি।
ফারহানার মুখটা হঠাৎ মনে পড়ল। ওর সাথে কাল রাতের পর থেকে একটু মন কষাকষি হয়েছে। আচ্ছা, ফারহানা কি জানে ওর অভিমান ভাঙানোর বিদ্যা আমার কোনো সাইকোলজির মোটা বইয়ে লেখা নেই?
রকম আরও কিছু স্বপ্ন ছিল, মাহফুজ আমার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে আবার শুরু করল।
একটার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিয়েবাড়ি। সাদা মরিচবাতি। লাল শাড়ি পরা কনে। কোন বাচ্চার হাত থেকে কাঁচের গ্লাস পড়ে যাওয়া আর ঠিক সাথে সাথেই কারেন্ট চলে যাওয়া। অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে উঠল, জেনারেটরটা ছাইড়া দে।
তারপর?
ছয় মাস পর, আমার স্ত্রীর কাজিনের বিয়েতে একটা বাচ্চার হাত থেকে স্টিলের গ্লাস পড়ে যাওয়ার ঠিক পরপরই লোডশেডিং হয়। কনের পরনে ছিল মেরুন শাড়ি। প্যান্ডেলের সাথে স্বপ্নের মিল ছিল না। কিন্তু অন্ধকারের ভেতর জেনারেটরের পাশ থেকে কেউ একজন ঠিকই চিৎকার করে উঠেছিলঃ মনসুর, জেনারেটরটা ছাইড়া দে!
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। চেম্বারের গুমোট ভাবটা নিমিষে কেটে গেল।
আরে ভাই, বাংলাদেশে কারেন্ট যাবে। বড় অনুষ্ঠান বা ভিআইপি ইভেন্টে কারেন্ট গেলে জেনারেটর স্টার্ট করবে। আমি তো যেকোনো ইভেন্টে গেলে অন্তত দুবার লোডশেডিং হবে, এটা মেনে যাই।
বাচ্চাদের হাত থেকে গ্লাসও পড়তে পারে, মাহফুজ নির্বিকার গলায় যোগ করল।
অবশ্যই পারে! এগুলো তো খুব সাধারণ ঘটনা।
তাহলে আমাকে কোনটা ভাবাচ্ছে বলুন তো?
কোনটা?
ঘটনার ক্রম।
মাহফুজ আবার তার শান্ত, হিমশীতল চোখে আমার দিকে তাকাল।
গ্লাস। অন্ধকার। কণ্ঠস্বর। যে জিনিসগুলো মেলেনি, সেগুলো আমাকে খুব একটা ভাবায় না।
বিপদটা তো ঠিক ওখানে!
আমি কলমটা খাতার ওপর আছড়ে ফেললাম। আমার গলায় একটু বিরক্তি ঝরে পড়ল।
আপনি শুধু সেই জিনিসগুলোই মনে রাখছেন, যেগুলো বাস্তবের সাথে মিলছে। এটাকে বলে সিলেক্টিভ মেমোরি।
মাহফুজ মাথা নাড়ল।
আমি আশা করছিলাম আপনি ঠিক এ কথাটাই বলবেন।
কেন?
কারণ আমি এটা নিয়ে আগেই পড়েছি। আমি শুধু জানতে চাইছিলাম, আমি এর বাইরে কোনো থিওরি মিস করছি কি না।
লোকটার ইন্টেলেক্ট আমাকে মুগ্ধ করছিল।
আমি চেয়ারে হেলান দিলাম।
আপনার এই অবচেতন এডিটিং ঠেকানোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার মাহফুজ সাহেব।
কীভাবে?
আজ রাত থেকে, ঘুম থেকে ওঠার পর প্রতিটি স্বপ্ন সাথে সাথে লিখে রাখবেন। এমনকি অর্থহীন প্রলাপ হলেও।
লিখে রাখলে কী প্রমাণ হবে?
এতে একটা সমস্যার সমাধান হবে। বাস্তব ঘটনার পর পুরোনো স্বপ্নকে অবচেতনভাবে রি-রাইট করার যে তত্ত্বটা আমি দিচ্ছি, সেটা বাতিল হয়ে যাবে। আমরা একটা নিরেট প্রমাণের ওপর দাঁড়াতে পারব।
মাহফুজ মাথা নাড়ল।
গুড।
আপনাকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে।
আমি তো পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার, মাহফুজ ম্লান হাসল।
যে সমস্যাগুলোকে আলাদা করে আইসোলেট করা যায়, সেগুলো আমাকে খুব স্বস্তি দেয়।