ঠিক সাত দিন পর দ্বিতীয় সেশন। মাহফুজ কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সময়ে এল। হাতে এগারো পৃষ্ঠার একটা নোট।
আমি পৃষ্ঠাগুলো হাতে নিয়ে একটু অবাক হলাম।
হাতের লেখা তো বেশ ঝকঝকে। আপনি এগুলো কপি করে এনেছেন?
জি। মাহফুজ বিনীতভাবে হাসল।
ভোর চারটার সময় ঘুম থেকে উঠে যখন আমি ডায়েরি লিখি, তখন আমার অরিজিনাল হাতের লেখা দেখতে অনেকটা ভূমিকম্পের সিসমোগ্রাফের মতো লাগে। ভাবলাম আপনি পড়তে গিয়ে বিরক্ত হবেন, তাই আবার পরিষ্কার করে লিখে এনেছি।
পরের বার অরিজিনাল কপিটাই নিয়ে আসবেন। সিসমোগ্রাফ পড়া আমার পেশার অংশ।
আমি পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করলাম। বেশিরভাগ স্বপ্ন পুরোপুরি আবোলতাবোল। অবদমিত চিন্তার ক্লাসিক্যাল ম্যানিফেস্টেশন। এক জায়গায় লেখা, লিফটের ভেতর বিশাল সাইজের গরু দাঁড়িয়ে আছে। লিফটম্যান গরুকে জিজ্ঞেস করছে, কোন ফ্লোরে যাবেন? আরেক জায়গায় এক স্কুলশিক্ষক পরীক্ষার হলে গার্ড দিচ্ছেন, তার হাতে একটা বঁটি। তিনি বঁটি দিয়ে কই মাছ কাটছেন। আরেকটা স্বপ্নে বিখ্যাত কিন্তু মৃত এক অভিনেতা শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালাদের কাছে ছাতা বিক্রি করছেন।
আমি হাসব না গম্ভীর থাকব বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু এর মাঝে একটা স্বপ্ন আমার মনোযোগ আটকে দিল। স্বপ্নটা সম্পূর্ণ আলাদা। এর ভেতর কোনো অ্যাবসার্ডিটি নেই। বরং আছে নিরেট বাস্তবতা। মাহফুজ এটা লেখেনি। বর্ণনা পেয়েছি তার মুখ থেকে।
মাহফুজ স্বপ্নে দেখছিল, সে বসে বসে টেলিভিশন দেখছে। একজন খুব বিখ্যাত গায়ক মারা গেছেন। পুরুষ সংবাদ পাঠক সেই মৃত্যুর খবর পড়ছেন। তার পেছনের স্ক্রিনে সাদা পাঞ্জাবি পরা ওই গায়কের একটা স্থিরচিত্র ভাসছে। খবর পড়ার সময় ওই সংবাদ পাঠকের ঠোঁটে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। পুরোপুরি হাসি নয়। খুব সামান্য অনাকাঙ্ক্ষিত হাসি। মাহফুজ ওই গায়কের নামটাও লিখে এনেছে। লোকটা তখনো বেঁচে আছেন। বয়স্ক। দারুণ জনপ্রিয়।
আপনি কি জানতেন তিনি অসুস্থ?
আমি পাতা থেকে চোখ তুলে তাকালাম।
না।
সম্প্রতি তাকে নিয়ে টিভিতে বা পত্রিকায় কোনো খবর দেখেছিলেন?
না।
আপনি কি তার গানের ভক্ত?
তেমন একটা না।
তাহলে এই স্বপ্নটা লিখে রাখলেন না কেন? লিফটে গরু দেখার স্বপ্নের সাথে এর কোনো মিল নেই বলে?
জীবিত মানুষের মৃত্যুর খবর লিখে রাখতে আমার ভালো লাগে না ডাক্তার সাহেব। কেমন যেন অপরাধবোধ কাজ করে।
আপনার কি মনে হয় তাকে সতর্ক করা উচিত? মাহফুজ ক্লান্ত হাসি হাসল।
আমি আসলে মনে মনে চাইছিলাম আপনি আমাকে বলবেন তাকে সতর্ক না করতে।
আমি আপনাকে সেটাই বলছি। সতর্ক করার কোনো দরকার নেই।
গুড।
গুড কেন?
কারণ মোহাম্মদপুরের একজন রিটায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ার স্বপ্নে আপনার মৃত্যু দেখেছে। একজন বিখ্যাত গায়ককে আমি এই কথাটা কীভাবে বোঝাব, সেই পথ আমার জানা নেই। লোকটা নির্ঘাত আমাকে পাবনার বাসে তুলে দিত।
আমি হাসলাম।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি বুঝতে পারছিলাম, লোকটার ব্রেন খুব নিখুঁতভাবে লজিক্যাল লুপ তৈরি করছে। এই লুপটা ভাঙতে হবে। আমি আমার ড্রয়ার টানলাম। সেখান থেকে বিশটা নম্বর দেওয়া খাম বের করলাম।
এখন থেকে, আমি খামগুলো টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললাম, আমরা এই খামের পদ্ধতি ব্যবহার করব।
খামের পদ্ধতি?
প্রটোকলটা একদম ইজি। যদি আপনি কখনো এমন কোনো অতি-বাস্তব স্বপ্ন দেখেন, যার নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে, তবে ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে সেটা লিখে ফেলবেন। কোনো নিজস্ব ব্যাখ্যা বা ইন্টারপ্রিটেশন দেবেন না। যা দেখেছেন, ঠিক তা-ই। তারপর কাগজটা খামের ভেতর ঢুকিয়ে আঠার ওপর আড়াআড়িভাবে সাইন করবেন।
আমি একটা খাম এগিয়ে দিলাম।
তারপর সেটা আমার রিসেপশনিস্ট সালমার কাছে দিয়ে যাবেন। আমি খামটা না খুলেই সেই স্বাক্ষরের ওপর আমার কাউন্টার সাইন করব। ভবিষ্যতে যদি ওই স্বপ্নের সাথে বাস্তবের কোনো মিল পাওয়া যায়, একমাত্র তখনই আমরা সেই খামটা খুলব। তার আগে নয়।
মাহফুজ প্রথম খামটা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
ব্যাপারটা তো খুব আইনি মনে হচ্ছে। আপনি কি আমাকে এখন একটু বেশি বিশ্বাস করছেন?
সে চোখ তুলে তাকাল।
না।
একটু কম?
না।
তাহলে এই আয়োজনের মানে কী?
আমি সোজা হয়ে বসলাম।
কারণ অবিশ্বাসেরও নিরেট প্রমাণ থাকা উচিত। আমি প্রমাণ করতে চাই যে, ঘটনা ঘটার পরই আপনার ব্রেন স্মৃতিগুলো এডিট করে।
মাহফুজ কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো রাগ অপমানবোধ নেই। স্থির কৌতূহল।
আমি আপনার যুক্তিটা পছন্দ করেছি ডাক্তার সাহেব।
দ্বিতীয় সেশনের ঠিক তিন মাস পর, সেই বিখ্যাত গায়ক মারা গেলেন। ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। সেদিন সন্ধ্যায় আমি চেম্বারে বসে মেডিকেল জার্নাল পড়ছি। আমার ইন্টারকমে সালমা জানাল মাহফুজ আলম কল করেছেন।
হ্যালো?
আমি জানি, আমি ফোন ধরেই বললাম।
আমি টিভিতে নিউজ দেখেছি।
সংবাদ পাঠক কি হেসেছেন?
মাহফুজের গলা শান্ত।
না। বিন্দুমাত্র না। তার মানে আপনার ভবিষ্যৎবাণী ভুল।
আমি মজা করছিলাম। মাহফুজের গলায় খুব ক্ষীণ হাসির রেশ।
আপনি কি নিউজটা পুরোটা দেখেছিলেন?
আমি একটু থমকে গেলাম। সংবাদ পাঠক আসলেই হাসেননি। তবে, নিউজ চলাকালীন সময়ে, স্ক্রিনের নিচে মৃত্যুর শোকসংবাদটা স্ক্রল করাকালীন, চ্যানেলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুই সেকেন্ডের জন্য একটা বিজ্ঞাপন এসে আবার চলে যায়। বিজ্ঞাপনে একজন হাস্যোজ্জ্বল নারী হাতে সাদা গুঁড়ো দুধের প্যাকেট ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
পরদিন সকালে মাহফুজ তার অরিজিনাল স্বপ্নের জার্নালটা নিয়ে চেম্বারে এল। সেই নির্দিষ্ট পাতাটায় মৃত্যুর তিন মাস আগের তারিখই লেখা। আমি ডায়েরিটা টেনে নিলাম।
সেখানে লেখাঃ
পুরুষ সংবাদ পাঠক মৃত্যুর খবর পড়ছেন। পেছনের ছবিতে গায়কের পরনে সাদা কাপড়। ভুল সময়ে ভুল হাসির দৃশ্য। নিচের দিকে একটা সাদাটে আকার। হয়তো দাঁত, হয়তো কোনো প্যাকেট।
আমি শেষ লাইনটা দুবার পড়লাম। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হয়তো দাঁত, হয়তো কোনো প্যাকেট! দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম। সাইকিয়াট্রিস্টদের অবাক হতে নেই।
এটা কি কাউন্ট হবে?
মাহফুজ জানতে চাইল।
না।
আমি ডায়েরিটা ফেরত দিলাম।
কেন?
প্রথমত, এই স্বপ্নটা আমাদের খাম-প্রটোকল শুরু হওয়ার আগের। এটা সিলগালা করা ছিল না। দ্বিতীয়ত, এই মিলটা খুব দুর্বল।
কিন্তু গায়ক তো মারা গেছেন।
তার বয়স হয়েছিল সত্তর বছর। সত্তর বছর বয়সী একজন মানুষ মারা যাবেন, এটা তো খুব স্বাভাবিক।
ঊনসত্তর। মাহফুজ শুধরে দিল।
আমি কলম দিয়ে টেবিলে টোকা দিলাম।
আপনি স্বপ্নে দেখেছেন একজন বয়স্ক বিখ্যাত মানুষ মারা গেছেন। সংবাদ পাঠক কিন্তু হাসেননি। হাসির দৃশ্যটা এসেছে একটা বিজ্ঞাপন থেকে।
কিন্তু আমি তো প্যাকেট শব্দটা লিখেছিলাম।
আমি চোখে চোখ রেখে বললাম, আপনি লিখেছিলেন, হয়তো প্যাকেট।
নোটবুক বন্ধ করলাম। গায়কের মৃত্যু নিয়ে দেখা স্বপ্নটা অদ্ভুত হলেও, তা প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট না। তবে এটা বুঝলাম, লোকটার অবচেতন মন তার চারপাশের সাধারণ ইনফরমেশনগুলো নিয়ে খুব ভয়ংকর এবং নিখুঁত খেলা খেলছে। আমাদের সিলগালা করা খামের প্রটোকল পুরোদমে শুরু হলো। পরবর্তী আট মাসে, মাহফুজ আমাকে সাঁইত্রিশটি সিলগালা করা খাম জমা দেয়। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে আমরা এর মধ্যে মাত্র তিনটি খাম খুলেছিলাম।
৪ নম্বর খামে ছিল গাজীপুরের সড়ক দুর্ঘটনার কথা। খাম খোলার পর দেখলাম, স্বপ্নে মাহফুজ লিখেছে, সাদা মাইক্রোবাস কংক্রিটের ডিভাইডারে কাত হয়ে পড়ে আছে। হলুদ শার্ট পরা একজন লোক ইট দিয়ে গাড়ির জানালার কাঁচ ভাঙার চেষ্টা করছে। রাস্তার পাশে নীল প্লাস্টিকের পানির ড্রাম কাত হয়ে পড়ে আছে।
খামটা আমরা যেদিন খুললাম, তার ঠিক বাইশ দিন আগে টেলিভিশনের খবরে একটা দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। আমি আর মাহফুজ বসে নিউজ ক্লিপটা মিলিয়ে দেখলাম। সিলভার রঙের মাইক্রোবাস। লোকটার পরনে ছিল কমলা শার্ট। সে লোহার রড দিয়ে কাঁচ ভাঙছিল। পানির ড্রাম ঠিকই সেখানে ছিল এবং ওটার রঙ নীল। সিল করা খামের ভেতরে ঠিক যে কোণ এবং দূরত্বের বর্ণনা দেওয়া, হুবহু সেভাবেই ড্রামটা কাত হয়ে পড়ে ছিল।
৯ নম্বর খামে আছে জনসভার স্বপ্ন। মাহফুজ দেখে, মঞ্চের ওপর দিয়ে হঠাৎ একঝাঁক কবুতর উড়ে যাওয়ায় একজন বক্তা মাঝপথে তার বক্তব্য থামিয়ে দেন। লোকটা হেসে উঠে বলেন, ওরাও দেখি চলে যেতে চাইছে। ছয় সপ্তাহ পর, সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে, মঞ্চের ওপরের বৈদ্যুতিক তারে বেলুন আটকে যায়। বক্তা তার বক্তব্য থামিয়ে দিয়ে বলেন,
ওরাও মনে হয় পালাতে চাইছে।
দুর্বল প্রমাণ। কবুতর বেলুন এক জিনিস নয়। এটাকে কাকতালীয় বলা শ্রেয়। মাহফুজও কোনো তর্ক করল না।
কিন্তু ১৪ নম্বর খামটা ছিল অন্যরকম। মাহফুজ স্বপ্নে প্রাইভেট কোন হাসপাতালের করিডোর দেখেছিল। বেগুনি রঙের শাড়ি পরা এক নারী হাত থেকে একটা স্টেইনলেস স্টিলের প্লেট ফেলে দেন। একজন নার্স চিৎকার করে ওঠেন, এখানে না, এখানে না! বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কারও হাসির শব্দ ভেসে আসে।
চার মাস পর, মাহফুজ তার স্ত্রীকে নিয়ে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যায়। সেখানে বেগুনি রঙের শাড়ি পরা এক নারী হাত থেকে একটা মেটাল ট্রে ফেলে দেন। একজন নার্স বলে ওঠেন, এখানে না আপা, এখানে না! পাশের একটা ঘর থেকে তখন টেলিভিশনে চলা কোনো কমেডি নাটকের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।
ষষ্ঠ সেশনের দিন আমি ১৪ নম্বর খাম টেবিলের ওপর রাখলাম।
মাহফুজ সাহেব, আমি মজার এক প্যাটার্ন খেয়াল করেছি।
কী প্যাটার্ন?
আপনার স্বপ্নগুলো ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে খুব বাজে। কিন্তু... মেমোরি বা স্মৃতি হিসেবে এগুলো ভীতিকর রকমের নিখুঁত।
সে ভ্রু কোঁচকাল।
ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে বাজে অথচ স্মৃতি হিসেবে নিখুঁত? এটা কীভাবে সম্ভব?
ভাবুন। আপনার স্বপ্নগুলো আসলে কী দেখাচ্ছে? নীল রঙের পানির ড্রাম। মেটাল ট্রে। অন্য ঘর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দ। আপনার ব্রেন যদি কোনো সড়ক দুর্ঘটনার ভবিষ্যৎবাণী করত, তাহলে আমি আশা করতাম, মূল ঘটনাটা অবিকৃত থাকবে। কে আহত হলো, কোথায় হলো, কেন হলো। কিন্তু তার বদলে, মূল ঘটনাটা বদলে যাচ্ছে, বেঁচে থাকছে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আজেবাজে জিনিসগুলো।
এটার সাথে স্মৃতির কী সম্পর্ক?
কারণ স্মৃতি ঠিক এই কাজটাই করে।
আমি চেয়ারে হেলান দিলাম।
বাবার মৃত্যুর ঠিক আগে ডাক্তার আপনাকে কী বলেছিল, তা আপনি ভুলে যাবেন। অথচ ওই ডাক্তারের আঙুলে যে কালির দাগ ছিল, সেটা আপনার ঠিকই মনে থাকবে। রঙের শেড বদলে যায়, মানুষের মুখ বদলে যায়, কিন্তু একটা অপ্রাসঙ্গিক বস্তু ঠিকই টিকে থাকে।
মাহফুজ চুপ করে রইল।
আমি একটু ঝুঁকে এসে বললাম, আমি যদি দায়িত্বহীন ডাক্তার হতাম, তাহলে বলতাম, আপনি ভবিষ্যতের ঘটনা আগে থেকে দেখতে পাচ্ছেন না। আপনি সেগুলোকে মনে করছেন।
মাহফুজ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর হাসল।
এটা তো আরও বেশি ভয়ংকর।
হ্যাঁ।
ঘটনাগুলো তো এখনো ঘটেইনি।