ঢাকার বৃষ্টি কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করে নামে না।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে যায়। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে ব্যস্ত রাস্তাগুলো ভিজে যায়, রিকশার ঘণ্টা আর গাড়ির হর্ন মিশে যায় বৃষ্টির শব্দে। মানুষ ছুটতে থাকে—কেউ আশ্রয়ের জন্য, কেউ বাড়ি ফেরার জন্য, আর কেউ হয়তো এমন কোনো জায়গায় যাচ্ছে যেখানে তার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে।
রায়হান জানালার পাশে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার হাতে এক কাপ চা। চায়ের ধোঁয়া অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে, কিন্তু কাপটা সে এখনও নামায়নি।
আজ ঢাকায় তার তৃতীয় দিন।
তিন দিন—অথচ মনে হচ্ছে তিন বছর।
নতুন চাকরি, নতুন অফিস, নতুন শহর, নতুন মানুষ।
শুধু একটা জিনিসই পুরোনো—
তার একাকীত্ব।
রায়হান জানালার কাঁচে হাত রাখল।
বাইরে রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির পানিতে ঝাপসা হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে কোনো নাম নেই।
শুধু একটি অপরিচিত নম্বর।
রায়হান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কলটি ধরল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।
— হ্যালো? কে বলছেন?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একজন বৃদ্ধ মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
খুব ধীর, খুব শান্ত কণ্ঠ।
— তুমি কি রায়হান?
রায়হানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
— জি। আপনি কে?
বৃদ্ধ লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
— তোমার বাবা কি তোমাকে কখনো পুরোনো বাড়িটার কথা বলেছিলেন?
রায়হানের হাত থেকে চায়ের কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
পুরোনো বাড়ি।
শব্দ দুটো শুনতেই তার মনে পড়ল সেই ছোট্ট শহরের কথা।
শৈশবের বাড়ি।
একতলা টিনের ছাদ।
সামনের পুকুর।
বড় আমগাছ।
আর সেই বাড়ির পাশের তালাবদ্ধ ঘরটি।
যে ঘরে তাকে কখনো ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
বাবা সবসময় বলতেন,
“ও ঘরের কাছে যাস না।”
রায়হান কখনো কারণ জানতে পারেনি।
কারণ জানতে চাইলেই বাবা চুপ হয়ে যেতেন।
কখনো কখনো রাগ করতেন।
আর কখনো এমনভাবে তাকিয়ে থাকতেন, যেন কোনো পুরোনো দুঃস্বপ্ন হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ফোনের ওপাশের বৃদ্ধ আবার বললেন,
— রায়হান, তোমার বাবার মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে একটা জিনিস দিয়ে গিয়েছিলেন।
রায়হান উঠে দাঁড়াল।
— কী জিনিস?
— একটা চাবি।
— কিসের চাবি?
বৃদ্ধ এবার নিচু স্বরে বললেন,
— সেই ঘরের।
রায়হানের শরীর শীতল হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বলতে পারল না।
বৃদ্ধ বললেন,
— তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে আগামী শুক্রবার বিকেলে তোমার গ্রামের বাড়িতে যাবে।
— কিন্তু...
— একা যাবে।
— আপনি কোথায় থাকেন? আপনার নাম কী?
ওপাশ থেকে হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
তারপর উত্তর এল—
— আমাকে খুঁজতে হবে না। আমি তোমাকে খুঁজে নেব।
লাইন কেটে গেল।
রায়হান ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো—
এই বৃষ্টির শব্দের ভেতর কোথাও যেন তার অতীত তাকে ডাকছে।