রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
ঢাকার শহর কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না। রাত যত গভীর হয়, শহরের শব্দগুলো তত বদলে যায়। দিনের ব্যস্ততা হারিয়ে যায়, কিন্তু থেকে যায় কিছু অদ্ভুত শব্দ—দূরের ট্রেনের হুইসেল, ছাদের ওপর বৃষ্টির আঘাত, কোনো অচেনা কুকুরের ডাক কিংবা পাশের ফ্ল্যাটের দেয়ালের ওপাশ থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট কথোপকথন।
নীরার মনে হতো, রাতের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। শুধু মানুষ সেই ভাষা বুঝতে শেখেনি।গত তিন বছর ধরে সে রাত জাগে।
কখনো বই পড়ে, কখনো লেখে, কখনো কোনো কারণ ছাড়াই জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। তার ঘরে সবকিছুই প্রায় অপরিবর্তিত। দেয়ালের পাশে কাঠের বুকশেলফ, জানালার কাছে একটা পুরোনো চেয়ার, টেবিলের ওপর কালো কফির কাপ আর ডান পাশের ড্রয়ারে রাখা কয়েকটি পুরোনো ছবি।
ছবিগুলো সে কখনো ফেলে দিতে পারেনি।বিশেষ করে একটা ছবি।
সেখানে আরহাম তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। নীরা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আরহামের চোখ ক্যামেরায় নয়—নীরার মুখে।নীরা ছবিটা উল্টে রাখল।
ঠিক তখনই দরজার নিচে কিছু একটা শব্দ হলো। খসখস।সে প্রথমে গুরুত্ব দিল না। ভাবল, হয়তো বাইরে কোনো কাগজ পড়ে গেছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার শব্দ হলো।
এবার সে উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে নিচে তাকাতেই দেখতে পেল একটি সাদা খাম।
খামটির ওপর কালো কালিতে লেখা— নীরা রহমান।
হাতের লেখাটা পরিচিত। এতটাই পরিচিত যে তার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ব্যথা শুরু হলো।
সে দরজা খুলে বাইরে তাকাল।করিডোর ফাঁকা। লিফটের দরজা বন্ধ। সিঁড়ির পাশে হলুদ আলো জ্বলছে। কোথাও কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই।নীরা খামটা হাতে নিয়ে দরজা বন্ধ করল। তারপর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।খামটা খোলার সাহস হচ্ছিল না।কারণ সে জানত, এই হাতের লেখা কার।
তিন বছর আগে একটি দুর্ঘটনার পর পুলিশ তার হাতে যে কাগজটা দিয়েছিল, সেখানেও এই একই হাতের লেখা ছিল - আরহাম।
নীরা ধীরে ধীরে খামটা খুলল। ভেতরে একটি ছোট কাগজ __মাত্র তিনটি লাইন।
"প্রিয় নীরা"
তুমি কি এখনো বৃষ্টির রাতে জানালাটা খোলা রাখো?
আর তুমি কি এখনো বিশ্বাস করো যে আমি মারা গেছি?"
নীরার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। তার মনে হলো, ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে। সে কয়েকবার চোখ বন্ধ করল। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, এটা কোনো নিষ্ঠুর রসিকতা। হয়তো কেউ তাকে ভয় দেখাতে চাইছে। হয়তো রাফি , কিন্তু খামের ভেতর আরেকটি জিনিস ছিল। একটি ছোট কালো কাগজ।
তার ওপর সাদা রঙে আঁকা অর্ধেক চাঁদ। নীরা ছবিটা চিনতে পারল। আরহাম সবসময় তার নোটবুকের শেষ পাতায় এই চিহ্ন আঁকত।একবার জিজ্ঞেস করায় বলেছিল,
"এটা এমন একটা চাঁদ, যেটা কেউ পুরোপুরি দেখতে পায় না।"
"কেন?"
"কারণ পৃথিবীতে কিছু সত্য আছে, যেগুলো অর্ধেক জানাই ভালো।"
নীরা সেদিন হেসেছিল। আজ তার হাসি পেল না। সে ফোন তুলে রাফিকে কল করল।একবার।
দুইবার।
তিনবার। কেউ ধরল না.......
তারপর হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে একটি মেসেজ ভেসে উঠল।
Unknown Number:
তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে আগামী শুক্রবার রাত ৩টা ১৭ মিনিটে পুরোনো রেলস্টেশনে এসো। একা।
নীরা মেসেজটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে নিজের ডায়েরি খুলল।
শেষ পাতায় সে লিখল— "আজ আরহাম ফিরে এসেছে। কিন্তু আমি জানি না, আমি তাকে ফিরে পেতে চাই, নাকি তার কাছ থেকে পালাতে চাই।"
সেদিন রাতে নীরা আর ঘুমায়নি। শুধু ভোরের দিকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু জানালার কাচ একটা অদ্ভুত জিনিস দেখা যাচ্ছিল।
তার নিজের প্রতিবিম্বের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ -- একজন পুরুষ।কালো শার্ট পরা ,মুখটা স্পষ্ট নয় । নীরা দ্রুত পেছনে তাকাল ,কেউ নেই। আবার কাচের দিকে তাকাতেই প্রতিবিম্বটাও অদৃশ্য হয়ে গেল।
শুধু কাচের ওপর আঙুল দিয়ে লেখা একটি বাক্য রয়ে গেল— "তুমি সবকিছু মনে করতে চাও না, নীরা।"