জারা। নামটা মাথায় আসতেই চোখের সামনে ভেসে উঠে অনেকগুলো খন্ড চিত্র। প্রথমেই টোলপড়া গাল। কবির উপমায় খুব আকর্ষনীয় মনে হলেও রাহুলকে তেমন একটা আকর্ষন করে না। তার কাছে মনে হয় ছোটবেলায় আছাড় খেয়ে হয়তো কেটে গেছে। এখনও তার গভীর দাগ রয়ে গেছে। তাই জারা কখনও হাসলে তার গালের টোল দেখে রাহুলের মন খারাপ হয়ে যায়। পুরো হাসিতেই কেমন একটা অসহায় অসহায় ব্যাপার ফুটে উঠে।
উন্নত নাসিকা বলে যে একটা ব্যাপার আছে- জারার ক্ষেত্রে সেটা যেন মুখের উপরে বসানো আইফেল টাওয়ারের রেপ্লিকা।
পটলচেরা চোখ বলেও একটা বিষয় রাহুল শুনেছে। ব্যাপারটা কি খারাপ অর্থে না ভালো অর্থে ব্যবহার করা হয় সেটা সে জানে না। তবে ম্যাগাজিন আর পত্রিকায় জারার চোখকে পটলচেরা চোখই বলা হয়। তার মানে ভালোই হবে। কিন্তু রাহুলের কাছে জারার চোখকে আস্ত পটলের মতোই মনে হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ একটু বড়ই। একটু ট্যারা ভাবও আছে। লোকে ল²ী ট্যারা বলে। তাই তো মনে হয় ফটোসেশনের সময় সে অমন ব্যাকাত্যাড়া করে তাকায় যাতে বুঝা না যায়। অন্তত রাহুলের কাছে তাই মনে হয়।
এরপর আসে জারার ফিগার। ম্যাগাজিনের ভাষায় জিরো ফিগার। ফিমেল মডেলদের ভেতরে মোষ্ট অ্যাট্রাকটিভ। কিন্তু রাহুল ওসব জ্যামিতিক মাপজোখের অনেক কিছুই মেলাতে পারে না।
এই হচ্ছে রাহুলের চোখে তার প্রেমিকা, জিএফ, বেস্টি অথবা অতি চরম শত্রু- জারা। শহরের নামকরা মডেল। বেশ কিছু প্রথম সারির প্রজেক্টে কাজ করে ইতিমধ্যেই সে সবার নজর কেড়েছে। কিছু শর্টফিল্মে কাজ করে বেশ কিছু নামীদামী পুরস্কারও বাগিয়ে নিয়েছে।
রাহুল হলো শহরের উঠতি কবি। যদিও লেখালেখির বয়স পঁচিশ পেরিয়েছে। তবু গা থেকে উঠতি কবি, তরুণ কবি এসব তকমা এখনও মুছে যায় নি। আদতে সে কবি কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা যেতে পারে। কারণ তার কবিতা কোথাও চোখে পড়ে না। না পত্রিকায় না বইয়ের পাতায়। তবু সে কবিই। যেহেতু সে নিজেকে কবি হিসেবেই পরিচয় দেয়। সেই সূত্রে কবিই। কবি রুদ্র রাহুল। চেহারা দেখতে তেমন সুশ্রী বলা চলে না। তবে লম্বা চুল, দাঁড়ি, গোঁফ মিলিয়ে একটা অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। জারার কাছে চেহারা ফ্যাক্ট না। ব্যাপার হচ্ছে পার্সোনালিটি মানে ব্যাক্তিত্ব। তার চোখে রাহুল হচ্ছে স্মার্টটেস্ট পুরুষ- তার বাবার পরে। বিশেষ করে তার চরম বৈরাগ্য, চরম তাচ্ছিল্য ভাব, সহজেই দূরে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা জারাকে বেশ টানে। আর সেই কারণেই হয়তো জারা তার শত ব্যস্ততার মাঝে কুড়িয়ে পাওয়া টুকরো অবসরের পুরোটাই রাহুলের জন্যই বরাদ্দ রাখে। এই ব্যাপারটাই রাহুলের অনেক দুর্ভাগ্যের মধ্যে অন্যতম একটি। কোথায় সে দুপুরে গাঁজায় টান দিয়ে বুড়িগঙ্গায় নৌকায় ভাসবে কিংবা সন্ধ্যায় নেশায বুঁদ হয়ে শিল্পকলার বারান্দায় পড়ে থাকবে। তা না করে এই কঙ্কালসার প্রাণীটির পাশে বসে থাকতে হবে। রিকশা করে ঘুরতে হবে। অথচ তার পাশে বসলে রাহুলের কাছে পুরো শহরটাকেই ফিকে মনে হয়। তার উপরে মানুষজনের আদিখ্যেতা দেখলে গা জ¦লে যায়।
রাস্তার পাশের চোখগুলো যেন জারাকে গিলে খায়। আর পাশে পেলে ! এখনতো আর অটোগ্রাফের যুগ নেই। সেলফির যন্ত্রনা। পুরো ব্যাপারটাতে রাহুল একমাত্র উপদ্রব হয়ে থাকে। অথবা পুরো ব্যাপারটাই রাহুলের কাছে উপদ্রব বলে মনে হয়। তবু সে এই উপদ্রবটুকু মেনে নেয়। ডানা কাটা পরির পাশে বসে তিন চাকার পঙ্খিরাজে উড়ে চলে। সময়টাও উড়ে চলে। রাহুলই উড়িয়ে দেয়। জীবনটাকেও যেমন সে উড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবে- এত অপচয় বিধাতা কি সইবেন? ভাবনাই সই। এক ফুঁয়ে এত বড় জীবন উড়িয়ে দিতে পারলে তার মনে হয় খারাপ হবে না। কিন্তু খটকা লাগে এই অপচয়ের জীবনে জারাকে জড়িয়ে ফেলে। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন থাকে। সে তো জারাকে জড়ায় নি। উল্টো সে নিজেই জড়িয়ে গেছে। সে তো ভালোই ছিল। গাঁজা খেয়ে শিল্পকলার বারান্দায় পড়ে থাকতো। ভেতরে তো কোনোদিন উঁকি দেয়নি। বরং জারাই তার কোন শর্টফিল্মের উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে রাহুলের গায়ে উস্টো খেয়ে পড়েছ্।ে পড়েছে তো পড়েছেই- কোন অতলে তা রাহুল জানে না। যদিও জারা বলে প্রেমে পড়েছে। কিন্তু প্রেম কি এমন হয়! এই যে মাঝে মাঝে জারা আউটডোর শুটিং এ যায় পনের দিন-একমাসের জন্য। কই রাহুল তো তখন তেমন কিছু ফিল করে না। মাঝে মাঝে জারার সাথে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, প্রোডিউসার, ডিরেক্টর কিংবা মডেলদের জড়িয়ে বিভিন্ন রগরগে খবর পত্রিকার বিনোদন পাতায় আসে। সেটা পড়ে তো তার হিংসে কিংবা কষ্ট হয় না। জারা এসে ডাক দিলেই সে তার পাশে চলে যায়। বাতাসে উড়ে সময়টা চলে যায়।
এই যে মাসখানিক হলো জারার সাথে তার দেখা নেই। সেটা নিয়ে সে মোটেও উদ্বিগ্ন ছিল না। জারা কোথায় আছে সেটা সে জানতোও না অথবা জানতে চাইতোও না। যদি না পুলিশ সেদিন সাত সকালে তাকে এনে লকাপে না ঢুকাতো। এখনও যে সে খুব একটা জানতে চেষ্টা করছে তা না। তবু কিছু কিছু শুনছে। কোনো এক প্রভাবশালীর আদুরে সন্তান ধর্ষনের পর তাকে খুন করেছে। কিন্তু বাপ এতই প্রভাবশালী যে কেউ তার নাম মুখে নিতেও সাহস করছে না। পুলিশ প্রথমে সুইসাইড কেইস বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সুবিধা করতে না পেরে মোবাইল কন্টাক্ট লিস্টের সূত্র ধরে রাহুলকে ফাঁসিয়েছে। তার বিরুদ্ধেই সাজিয়েছে খুনের মামলা। আদালতে যতবার অভিযোগগুলো শুনে রাহুল মনে মনে হাসে। এসব আইন আদালত সে কোনোদিন বুঝেনি। এখনও বুঝতে চায় না। সে শুধু ভাবে- উস্টোটা তো জারা খেয়েছে কিন্তু সে গাঁতায় পড়লো কেন!