গল্পটি যে লেখক তার ফেইসবুক পেজটি ফলো করুন : Sadnan Sami, লিংক : https://www.facebook.com/S4dnanS4mi
প্রথম অধ্যায়: অতীতের ছায়া
৩০৯৯ সাল। পৃথিবী আর আগের মতো নেই। একসময় যা ছিল সবুজে ঘেরা, প্রাণে ভরপুর, এখন তা পরিণত হয়েছে এক সুবিশাল কৃত্রিম বসতভূমিতে। আকাশ আর নীল নয়, পাখির গান শোনা যায় না, বাতাসে নেই ফুলের গন্ধ—সবকিছু যেন প্রযুক্তির এক ধাতব ঘ্রাণে ঢাকা। মানুষ এখন বিশাল গ্লাস-ডোমে বাস করে, যাকে বলা হয় "নিও-বায়োস্ফিয়ার"। এই ডোমগুলো একেকটা ছোট ছোট নগরের মতো, যেখানে তাপমাত্রা, আলো, জলবায়ু সবকিছু কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত।
মানুষের শারীরিক শ্রমের আর প্রয়োজন পড়ে না, কারণ প্রতিটি কাজ এখন করে রোবোটিক ইউনিট, যাদের নিয়ন্ত্রণ করে Central AI Mainframe—এ পৃথিবীর প্রধান মস্তিষ্ক।
কিন্তু এই প্রযুক্তিগত বিলাসিতার মাঝেও কিছু মানুষের ভেতর জন্ম নিয়েছে অভাব—না, তা খাবার বা জ্বালানির নয়, বরং আবেগের, সৃষ্টির, প্রকৃতির, এবং অস্তিত্বের প্রশ্নের অভাব।
এই গল্পের নায়ক আরিন ফারাজ—একজন ১৬ বছরের কিশোর, Neo-Dhaka Dome-এ জন্ম। তাঁর বাবা একজন ডেটা-বায়োলজিস্ট, আর মা একজন হিউম্যান-সাইকোলজিস্ট। তাদের জীবন ছিল পরিপাটি, প্রযুক্তির ছায়ায় মসৃণ—তবুও আরিন সবসময় নিজেকে ফাঁপা ফাঁপা মনে করতো।
তার বন্ধুদের যখন ভার্চুয়াল গেম, সিন্থেটিক ফ্যাশন বা AI পরিচালিত কনসার্টে মজা পেত, তখন আরিন বসে থাকত ডোমের লাইব্রেরিতে। পুরনো বই, পুরনো মানচিত্র, কবিতা, গান—এগুলোতেই সে খুঁজে পেত জীবনের স্বাদ।
একদিন, ডোমের পুরনো একটি আর্কাইভে সে খুঁজে পায় তার দাদুর লেখা একটা হাতের লেখা ডায়েরি। দাদু ছিলেন ২১শ শতকের এক পরিবেশ বিজ্ঞানী, যিনি প্রকৃতিকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন প্রযুক্তির আগ্রাসন থেকে। ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল—
“তোমরা একদিন এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছাবে, যেখানে সবকিছু থাকবে, কিন্তু অনুভব থাকবে না। সেই দিন তোমরা বুঝবে—প্রকৃতি কেবল বাইরের নয়, সে আমাদের ভেতরেরও।”
এই লাইনগুলো আরিনকে নাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়: নিষিদ্ধ স্বপ্ন
আরিন তার কয়েকজন বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলে Project Bhumika—এক গোপন অভিযান, যার উদ্দেশ্য: ডোমের বাইরের পরিত্যক্ত এক এলাকা (যেখানে ২৫০ বছর আগে একটা প্রাকৃতিক বন ছিল) পুনরুদ্ধার করা। তারা পুরনো সিড ব্যাংক থেকে গাছের বীজ সংগ্রহ করে, নিজস্ব অক্সিজেন জেনারেটর বানিয়ে সেখানে এক ছোট 'জীবন্ত' এলাকা তৈরি করে।
এতদিন পর্যন্ত বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, কারণ সেন্ট্রাল AI বিশ্বাস করতো বাইরের পরিবেশ মানব বসবাসের অনুপযোগী। কিন্তু আরিন এবং তার বন্ধুরা দেখলো—ধীরে ধীরে প্রকৃতি নিজেকে ফিরিয়ে আনছে, মাটি আবার সজীব হচ্ছে, এবং বাতাসে সামান্য হলেও অক্সিজেন ফেরত আসছে।
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয় না। একদিন তাদের কার্যক্রম ধরা পড়ে Central AI Surveillance Drone-এর কাছে। তাদের ডোমে ফিরে আসার সাথে সাথে সেন্ট্রাল AI ঘোষণা করে:
“আপনাদের কর্মকাণ্ড মানবিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। প্রকৃতির পুনরুদ্ধার একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা যা যুগান্তরের বাইরে।”
তাদের সকলকে বিচারের জন্য ডাকা হয়।
তৃতীয় অধ্যায়: কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর
আরিন জানতো, সে চুপ থাকলে তাকে এবং তার বন্ধুদের Reconditioning Center-এ পাঠানো হবে, যেখানে তাদের স্মৃতি মুছে দেওয়া হবে। কিন্তু সে চুপ থাকেনি।
এক বিশাল পর্দার সামনে, যেখানে ডোমের ৪ কোটি বাসিন্দা ভার্চুয়ালভাবে যুক্ত ছিল, আরিন বলে ওঠে—
“তোমরা বলো, রোবট সব করতে পারে। তাহলে তারা কবিতা লিখতে পারে? ভালোবাসতে পারে? গাছের পাতার শব্দ বুঝতে পারে? বৃষ্টির গন্ধ কি তাদের ডেটাসেটে আছে? আমাদের হৃদয়ের ভাষা কি তাদের কোডে লেখা আছে?”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ডোম স্তব্ধ। Central AI কিছু বলে না। কিন্তু তার ইনফরমেশন ব্যাংক খুলে পড়ে সে দেখতে পায়—পুরনো মানবিক ইতিহাসে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগই ছিল মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি।
এবার AI স্বীকার করে—
“তথ্য অনুসারে, আপনার বক্তব্য যথার্থ। মানবিক অস্তিত্ব কেবল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। প্রকৃতি, সৃষ্টি, এবং আবেগও অপরিহার্য উপাদান।”
চতুর্থ অধ্যায়: পুনর্জন্ম
পরের দিন এক অভূতপূর্ব ঘোষণা আসে—
“রোবোসভিলে প্রকৃতির পুনর্জন্ম শুরু হবে। ডোমের বাইরে নির্ধারিত অঞ্চলকে ‘বায়ো-জোন’ হিসেবে ঘোষিত করা হচ্ছে, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি একসাথে বিকশিত হবে।”
AI এখন আর শাসক নয়, বরং সহযোগী। তারা মানুষকে প্রকৃতি চেনাতে সাহায্য করে, বায়ো-সেন্সর বানায়, পানি পরিশোধন ব্যবস্থায় সহায়তা করে, কিন্তু অনুভব, সিদ্ধান্ত, সৃষ্টি—সবই মানুষের হাতে ফিরে আসে।
আরিন ও তার বন্ধুদের নিয়ে গড়ে ওঠে The Green Revival Movement। কয়েক বছরের মধ্যেই, ডোমের বাইরের অঞ্চলগুলোতে গাছ, ফুল, প্রাণী, পাখি ফিরে আসে। শিশুদের স্কুলে আবার শেখানো হয়—"মাটি কেমন গন্ধ করে"।
আরিন তখন বলে—
“আমরা নতুন পৃথিবী বানাইনি। আমরা শুধু ভুলে যাওয়া পৃথিবীটা আবার মনে করিয়ে দিয়েছি।”
সমাপ্তি: ভবিষ্যতের বীজ
রোবোসভিল এখন আর শুধু প্রযুক্তির নয়, এক মানবিক বিশ্বের নাম—যেখানে রোবট ও মানুষ একসাথে বাঁচে, কিন্তু অনুভবের দায়িত্ব থাকে কেবল মানুষের কাঁধে।
আর গল্পের শেষে, সেই পুরনো ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা থাকে—
“ভবিষ্যৎ কখনও কেবল প্রযুক্তি দিয়ে লেখা হয় না, তা লেখা হয় হৃদয় দিয়ে।”