আমার বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে তো চেনেন তাই না ? ঐযে কবি। গাট্টাগোট্টা, মুখ ভর্তি সাধুদের মত শুভ্র দাঁড়ি আর সাদা আলখাল্লা পড়ে যে সারাবছর গায়ের ভেতর বাতাসের চাষ করে – এবার নিশ্চয় চিনেছেন ? আগে কেউ চিনতো না তাকে , ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল নামের একটা পুরস্কার কিভাবে যেন পেয়ে গেল, তারপর থেকে স্বনামধন্য।
কবিতা লিখে ব্যাটা আসলে বিখ্যাত হয় নাই, হইসে মুখের দাড়ির কারনে। বানার্ড শ নামে আমার আরেকবন্ধু ছিল। রবীর সাথে দিলাম পরিচয় করায়ে, শ আমার কানে কানে এসে বলে, ‘ ওমন সুন্দর দাড়িও যে মানুষের হতে পারে তা জানা ছিল না !’
- তোমার কি হিংসা হচ্ছে বন্ধু ?
- তা একটু হচ্ছে বন্ধু !
- লম্বা দাঁড়ি মানে উকুনের আবাস্থল, বুঝলে বন্ধু ?
আমাদের আলাপ শুনে, এক ইন্ডিয়ান টেকো দুইজনের কথার মাঝে ঢুকে বলে, ‘ অহিংসা পরম ধর্ম – see me clean shaved ! ’ টেকোর নাম নাকি মহাত্বা গান্ধী, চোখে দেখি হ্যারি পটারের চশমা লাগাইসে !
যাজ্ঞে - রবীর একটা কবিতা আজকাল ফেসবুকে খুব হিট হয়েছে – পড়েছেন নিশ্চয় ?
“ জীবন যখন শুকায়ে যায়
করুণাধারায় এসো -
সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,
গীতসুধারসে এসো …”
গানের পিছের কাহিনী জানেন ?
পিএইচডি করে দেশে ফিরেছি। ক্রান্তিকাল, সন্ধ্যা হলেই ঢাকা শহরকে চেনা যায় না। ছিচকে চোরে শহর জুড়ে আতংক। চোরের পাহাড়ার লোকজন রাতজেগে এলাকা পাহাড়া দেয়। মোহাম্মাদপুরের লোকজন নাকি বিরাট ঢেগে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি পাকায়। রাস্তায় ব্যাটমিন্টন খেলে। ভাবখানা এমন, মোহাম্মাদপুর ছিনতাই করে - মোহাম্মাদপুরকে ছিনতাই করবে কে ?
এমন একদিনে রবী বলে, ‘রাকীব বন্ধু আমার, চল আজ তোমায় আবেশে নিয়ে আবেশায়িত করি !’
- সোজা বাংলায় কথা বললে কি তোমার গায়ে চুলকানি লাগে ?
থতমত খেয়ে বেচারা বলে – মিরপুরে আবেশ হোটেলে এক পাকিস্তানী পেশোয়ারী বীফ নাকি পাওয়া যাচ্ছে। নো মসলা, অনলি ঘি দিয়ে রান্না। সেটা না খেলে নাকি সে যে ব্রাহ্মণ তা লোকে বিশ্বাস করছে না, রবীকে ভাবছে হিন্দু !
আমরা দুই বন্ধু মিরপুরের আবেশ হোটেলে গেলাম মসলা ছাড়া রাঁধা পাকিস্তানী পেশোয়ারী বীফ খেতে। দিলাম অর্ডার, সাথে রুমালী রুটি।
আপনি কি জানেন, রুমালি রুটির নাম কেন ‘রুমালি’ ? নামটা এসেছে রুমাল থেকে। রুমালী রুটি আসলে খাবারের জন্যে আবিষ্কার করা হয়নি। মুঘল আমলে আমাদের মত খাবারের বেলায় টিস্যু বা ন্যাপকিন ছিল না। তারা এই নরম ময়দায় বানানো রুমালি’তে খাবারের ফাকে ফাকে আঙ্গুল মুছতো। রুমাল আর কি। একদিন এক রানীসাহেবা মনের ভুলে রুমালী ছিড়ে মুখে দিয়ে দেখেন, ‘আরি বাহ – খেতে তো মজা !’ সে থেকে আঙ্গুল মোছার ন্যাকড়া হয়ে গেল রুমালি রুটি – রেসিপি একই !
আমাদের সামনে এলো পাকিস্তানের পেশোয়ারের রেসিপিতে রাঁধা, মসলা ছাড়া গরুর মাংস। ঘি দেখা যাচ্ছে। উপরে মরিচ কুচির সাথে ধনিয়া পাতার গার্নিশ দিয়েছে, হালিমে যেমনটা দেয়। মসলা নাই, তাই রং কোরমার মত কিছুটা। মানুষের আনাগোনা কম থাকলে নাকে হাল্কা ঘিয়ের গন্ধ টের পাওয়া যায়। সাথে দিয়েছে মস্ত এক আলু। এই আলু তেলে ভাজা না।
রুমালি রুটি ছিড়ে একটু ঘিয়ের ঝোলে মাখিয়ে খেলাম। চিবাই আর ডানেবামে তাকাই – স্বাদতো পাই না। রবীর মুখভর্তি দাঁড়ি – সে স্বাদ টের না পেলেও মানা যায়; লম্বা দাড়ির কারনে নিউরনের সেন্সর কাজ না করতেই পারে কিন্তু আমি তো ক্লিন শেভড ! মাংস ছিড়ে রুটিতে পুড়ি। কিছুক্ষন চিবাই। তাতেও স্বাদের দেখাসাক্ষাৎ নাই। নিজেকে মনে হচ্ছে পুরান দিনের গ্রামীণফোনের মডেল, যিনি গাছে উঠে ফোনের নেটওয়ার্ক খুজতেন !
ব্রাজিলের গরু দিল নাকি ? ব্রাজিল গরু জবাই করে ফ্রিজে ঢুকায়ে রাখে। এরপর মন চাইলে বিদেশে ফ্রিজ থেকে বের করে রপ্তানী করে। হতে পারে ২ বছর আগের গরু, তাই মসলা ভেতরে ঢুকে নাই। ও আচ্ছা, এই রেসিপিতে তো মসলা নাই ! ঘি দিয়েছে। লবন দিয়েছে। আর হয়তো ভুলে কিছু লবঙ্গ, এলাচ দিয়েছে। আর কি কিছু দিয়েছে ? আলু দিয়েও খেলাম, স্বাদ কই ?
আমাদের এলাকায় এক ছ্যাবলা একবার গান গাইতে স্টেজে উঠেছিল। কি বিচ্ছিরি তার গলা, নাই গলায় সুর, না আছে তাল – ব্যাটা গাধার গলায় হারমোনিয়াম নিয়ে প্যাপু করেই যাচ্ছে। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, এলাকার এক ভাই ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প হাতে স্টেজে উঠে গেলেন। গাতক তো ভয়ে তব্দা, না জানি কি মাইরটা খায়। ভাই তারে বলল, ‘ আরে না, আপনি আমাদের অতিথি। আপনি গান গাইতে থাকেন। আপনারে যে গান গাইতে আনসে আমি তারে খুজতেসি …’
আমিও আমার বন্ধু রবীকে খুজতেসি। পুরো নাম রবীন্ধনাথ ঠাকুর। আমার থেকে পালায়ে গিয়ে সে দেখি ফেসবুকে পোস্ট দিসে -
‘ বাসনা যখন বিপুল ধুলায়
অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়
ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র,
রুদ্র আলোকে এসো …’
আপনারা কেউ তার দেখা পাইলে বইলেন, আমি ‘শালা’কে আমি রুদ্র আলোকে খুজতেছি …
-রাকীবামানিবাস
৩০শে এপ্রিল,২০২৫
