Posts

গল্প

ছোটগল্প: ওয়ার্ক ফ্রম হোম

June 13, 2025

M. Khanam

16
View
ওয়ার্ক ফ্রম হোম


এত আওয়াজ করছো কেন! দেখতে পাচ্ছো না বাবা কাজ করছি! যাও! ওদিকে যেয়ে চুপচাপ বসে থাকো! একটা আওয়াজও যেন না শুনি আমি! রাগে চিৎকার করে তার দুই ছেলেকে বলতে থাকে তৌফিক। 

মুখ কালো করে বাচ্চা দুটো বসার ঘরের সোফার উপর যেয়ে বাবার কথা মত চুপচাপ বসে থাকে। 

রান্নাঘর থেকে বাবার কথায় কষ্ট পাওয়া তার দুই সন্তানকে দেখেন তাদের মা লিমা। কোরেন্টাইনের কারনে স্কুল বন্ধ, পুরোদিন বাসায় বাচ্চারা আর কতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকবে! তার উপর তৌফিক তার পুরো অফিসটাই এখন ঘরে নিয়ে এসেছে৷ ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নামে এক মানসিক অত্যাচার চলছে তৌফিকের উপর।

বেশি কিছু না ভেবে লিমা এক কাপ চা বানায়। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে তৌফিকের ঘরে যায়। আস্তে করে চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রাখে। 

তৌফিকের সে দিকে খেয়াল নেই। সে একমনে নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। 

লিমা কিছুক্ষণ সেখানেই দাড়িয়ে থাকে, তৌফিককে দেখে। তার কপালের ভাজে কত শত চিন্তা তা গোণার চেষ্টা করে। কিন্তু যার চিন্তা সে ছাড়া আর কেউ কি বুঝে! 

কিছুক্ষণ পর তৌফিক তার দিকে তাকায়। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবে?

লিমা একখানা মিষ্টি হাসি দেয়। বলে, তোমার আমাদের কলেজের মহসিন স্যারের কথা মনে আছে? 

তৌফিক ল্যাপটপে কিছু টাইপ করতে করতে উত্তর দিল, হ্যাঁ, মনে আছে। কেন, কিছু হয়েছে?

স্যার সবসময় বলতেন, নতুন কিছু করার আগে সেই কাজ আগে যারা করেছেন তাদের সাথে আলোচনা করতে হয়। এতে করে ভবিষ্যতে ঘটা সমস্যাগুলোর সম্পর্কে আমরা আগেই প্রস্তুত হতে পারি।

তৌফিক কাজ করতে করতে বলল, হ্যাঁ, বলতেন তো। হঠাৎ এটা কেন মনে পরল?

তুমি ঘর থেকে অফিসের কাজ কবে থেকে করছো বল তো? 

তৌফিক একটু থেমে লিমার দিকে তাকায়। 

লিমা মিষ্টি করে বলে, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হো’–এ আপনার অভিজ্ঞতা কত দিনের, মশাই?

মজা নিচ্ছো?

আহা! বলই না!

এই তো হল বেশ কিছুদিন৷

লিমা একটু হেসে তার বইয়ের সেল্ফের উপর হাত দিয়ে বলে, বারো বছর– ঘর, সংসার, বাচ্চাকাচ্চা সামলিয়ে বারো বছর যাবত এই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করছি।

আলতো করে সেল্ফের বইগুলোর উপর হাত বুলায় সে। তার আঙ্গুল সরতেই দেখা যায় বইয়ের গায়ে লেখা লেখকের নাম, ‘লিমা ইসলাম’। 

তৌফিকের চোখ দুটো সামান্য নড়ে ওঠে। এক মুহুর্তের নিরবতা স্থান নেয় সেখানে। তৌফিক মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে, কিভাবে কর বল তো? বিরক্ত লাগে না? মনে হয় না সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে যাই?

অবশ্যই করে।

তখন কী কর?

লিমা অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপটা তৌফিকের দিকে আগিয়ে দিয়ে বলে, এক কাপ গরম গরম চা খেয়ে নিজের মাথাটাকে ঠান্ডা করি৷ 

তৌফিকের হাতের উপর হাত রেখে বসার ঘরে বসে থাকা তার দুই অভিমানী ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে, দিন শেষে এইসব কাজ তো আমরা নিজেদের সুখের জন্যই করি।

দুই ছেলে পাশাপাশি মুখ কালো করে বসে আছে৷ বাবা বকেছে, খেলতে মানা করেছে। 

তৌফিক তার দুই ছেলেকে দেখে। তাদের হাসিমাখা, দুষ্ঠামিভরা মুখটা এখন গোমরা হয়ে আছে। দিন শেষে এই অফিস, কাজ সবই তার পরিবারের সুখের জন্যই করে সে। কিন্তু সেই কাজই তার বাচ্চাদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে, সে ভাবে৷

ল্যাপটপটা বন্ধ করে তার ছেলেদের কাছে যায় তৌফিক। লিমাও পেছনে পেছনে আসে। বাবাকে দেখে অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নেয় দুই ছেলে। 

লিমা বলে ওঠে, তুমি যেন কী বলছিলে? কোরেন্টাইন শেষ হলে কোথায় ঘুরতে যাব আমরা? সুন্দরবন? না– সিলেট যাওয়ার কথা বলছিলে, তাই না?

বড় ছেলে ঘুরে লাফ দিয়ে উঠে বলে, সিলেট না, সুন্দরবন যাব! বাঘ দেখব।

ছেলেদের মুখে হাসি ফুঁটে। পুরো পরিবার একসাথে বসে সুন্দরবন যেয়ে কী কী করবে সেই গল্প করে৷ 

কাজ তো কখনও শেষ হবে না, কিন্তু এই কাজ আমরা যাদের জন্য করি তারা সারাজীবন আমাদের সাথে থাকবে না। তাই তাদের স্থান হওয়া উচিৎ সকল কাজের উর্ধ্বে। 

ভালবাসার মানুষগুলো কাছে থাকলে জীবনের কঠিন থেকে কঠিনতম সময়ও স্রোতের গতিতে কেটে যায়।

Comments

    Please login to post comment. Login