আলিশা বাড়িতে ঢুকেই নিজের ঘরে চলে যায়। কোথায় যাবে বুঝতে না পেরে আনিসা ডাইনিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হয় মারজিয়া যদি সত্যিই রাগের মাথায় আলিশাকে কিছু করে ফেলে! বড় বোনের প্রতি অঢেল ভালবাসা থাকলেও ভয়টাও কম না। অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা মাথার মানুষ তার বড় বোন। বুক ফাঁটে তবু মুখ ফুঁটে না। যেন ঠান্ডা মাথায় পুরো পৃথিবীকে নরকে পাঠাতেও মারজিয়ার বাজবে না। দরজা খোলার আওয়াজ শুনে সেদিকে তাকায় আনিসা।
মারজিয়া গাড়ি পার্ক করে ফেরত এসেছে। ঘরে ঢুকেই আগে বাবা-মায়ের ঘরের দিকে যায় সে।
আনিসা বিচলিত কন্ঠে বলে, আব্বু-আম্মু বাসায় নেই। ঘরে তালা দেওয়া ছিল।
মারজিয়া তার দিকে তাকায়। চোখ দুটো লাল শিকারী জন্তুর মত হয়ে আছে। গম্ভীর কণ্ঠে বলে, কেউ আসলে আমাকে না বলে দরজা খুলবি না। আলিশার ঘরের দিকে এগিয়ে যায় মারজিয়া।
আনিসা ঢোক গিলে মারজিয়াকে দেখে আলিশার ঘরের দরজা ঠেলতে। বিড়বিড় করে প্রার্থনা করে, ইয়া আল্লাহ, তুমি আলুর সহায় হয়ো!
সামান্য ঠেলে রাখা দরজাটাকে খুলে ভেতরে ঢুকে মারজিয়া। আলিশা খাটের উপর দুই পা ঝুলিয়ে দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
মারজিয়া এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। বলে, তোর লজ্জা লাগল না ওতগুলো মানুষের সামনে রাস্তায় একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে!
আলিশা মাথা তোলে না, চোখগুলো লাল হয়ে আছে তার যেন যে কোন মুহুর্তে কেঁদে দিবে।
এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে আমরা! আলু, তাকা আমার দিকে!
আলিশা ধীরে মাথা উপরে তুললেও মারজিয়ার চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি অন্যদিকে সড়িয়ে নেয়।
মারজিয়ার কণ্ঠ শান্ত হলেও তাতে রাগের ভাব বুঝা যায়। আর চোখ দুটো অসম্ভব রকম হিংস্র লাগছে। বলে, কতদিন যাবত চলছে এসব! তোর ভার্সিটির ক্লাসমেট, তখন থেকে চলছে এগুলো?
আনিসা চুপচাপ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে থাকে যাতে আলিশা এভাবেই চুপ করে থাকে।
মারজিয়া ধমকের সুরে বলে, আলু, তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আমি! বোনকে অপরাধীর মত মুখ নীচু করে বসে থাকতে দেখে ভাল বোধ হয় না মারজিয়ার। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কাল ওকে বাসায় এসে আব্বু-আম্মুর সাথে দেখা করতে বল। এরপর বিয়েশাদি করে যা মন চায় করে বেড়াস! আলোচনা শেষ ভেবে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায় সে।
হঠাৎ মৃদুকণ্ঠে আলিশা বলে, আমি বিয়ে করব না।
মারজিয়া বিস্ময়ের দৃষ্টিতে ফিরে তাকায়। বলে, বিয়ে করবি না মানে! তাহলে ওই ছেলের সাথে কেন ঘুরে বেড়াচ্ছিস!
ভাল লাগে ওকে তাই। কিন্তু বিয়ে করব না আমি ওকে—
মারজিয়ার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে যে আসলেই সঠিক শুনল কিনা। ঘুরে পেছনে তাকিয়ে আনিসাকে দেখে। তার চোখে-মুখেও বিস্ময়। মারজিয়া বিস্ময়ের সুরে বলে, ইউ স্লেপ্ট উইথ হিম? কথাটা জিজ্ঞেস করে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারে না মারজিয়া।
আলিশা হতভম্ব হয়ে বোনের দিকে তাকায়। আলিশার লাল চোখ দুটো বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
মারজিয়া বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে। কি ভেবেছিস তুই! এটা কি ইউরোপ-আমেরিকা! বাংলাদেশ এটা! দুই পাতা লিবারেলিজম পড়ে বেশি লিবারেল হয়ে গেছিস! আদেশের দূরে বলে, তুই কালকেই আমার সাথে হাসপাতালে যাবি চেকআপের জন্য!
আলিশা খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরে হাসে। বলে, তোর বায়োলজির জ্ঞান ভাল বলে অন্যদের বায়োলজিতে ঢোকা বন্ধ কর, আপু!
আলু! তোর একটুও লজ্জা করছে না! একবারও তোর মাথায় আসছে না যে আনু তোকে দেখে কি শিখবে!
কেন! আমাকে দেখে কেন শিখবে! আমি কবে-কার রোল মডেল ছিলাম! তুই আছিস তো সে জন্য! আমাদের বড় বোন—ন্যায়ের দেবী, পবিত্রতার প্রতিক। তুই থাকতে আমার কি প্রয়োজন!
মারজিয়া বিস্ময়ের দৃষ্টিতে আনিসার দিকে তাকায়। কি বলবে কিছু বুঝতে পারে না। যেন তার মাথায় সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে।
বিষাদ কণ্ঠে বলে, তোর একবারও বাবা-মায়ের কথা মনে হচ্ছে না! কতটা কষ্ট করে, পুরো পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে, বাবার বিপক্ষে গিয়ে তোর যা যা পছন্দ সারাটা জীবন সে সব তোকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে মা। এইভাবে তার সব কষ্টের প্রতিদান দিচ্ছিস তুই! এইভাবে তার সবটুকু সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিতে চাচ্ছিস!
আলিশা হাসে। হাহ! তুই হয়ত বা কখনও খেয়াল করিস নি, আপু—মায়ের চোখ দুটো না, সবসময় তোকে দেখে। তার চিন্তা-চেতনার সবটুকু জুড়ে শুধু তুই আর তুই। আমি আর আনু কখনও তার চিন্তা রেখা পেরুতে পারি না। একটু থেমে বিষাদ কণ্ঠে বলে, আমি জীবনে কি করছি, কিভাবে চলছি, কার সাথে রাস্তায় ঘুরছি, তাতে মায়ের কিচ্ছু যায়-আসে না!
মারজিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে।
আনিসা দ্রুত এসে মারজিয়ার পাশে দাঁড়ায়। আলু, চুপ কর! কি যা তা বলে যাচ্ছিস! স্যরি বল আপুকে! তার চোখ ছলছল করে ওঠে। আড় চোখ মারজিয়াকে দেখে। মারজিয়ার মুখটা এতটুকু হয়ে গেছে, চোখগুলো যেন দুই যোগ দুইয়ের ফলাফলও খুঁজে পাচ্ছে না।
আলিশা চেঁচিয়ে বলে, স্যরি! স্যরি কেন বলব! বাচ্চা নাকি আমি! আমরা দুইজনই প্রাপ্তবয়স্ক, আমরা একজন আরেকজনকে পছন্দ করি! বিয়েই করতে হবে এমন কোনো কথা আছে নাকি!
মারজিয়া বলে, তোর কোনো ধারণা আছে এইসব কথা এই ঘরের বাহিরে গেলে মানুষ তোকে কি বলবে! এই সমাজ তোকে কোন চোখে দেখবে! আমাদের বাবা-মা গলায় ফাঁস দিয়ে মরে যাবে এই অপমান সহ্য করার চেয়ে!
মারজিয়ার সর্বদা শান্ত থাকা কণ্ঠ এতটা নিদারুন শোনায় যে আনিশার চোখে পানি চলে আসে। বড় বোনকে এতটা অসহায় সে কখনও দেখে নি। গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার। আলু, তুই কি যা তা বলছিস এসব! আপু ঠিক বলছে। বাবা এসব জানতে পারলে লজ্জায় মরে যাবে!
ঠিক আছে! তাহলে কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। আমি কালই এ বাড়ি থেকে দূরে কোথাও চলে যাই, যেখানে সাদিক হোসাইন সাহেবকে কেউ চিনে না। কেউ জানবে না আমি কে—কার মেয়ে! সেখানে যেয়ে আমি আমার মত করে বাঁচি। তাহলে আমরা সবাই খুশি থাকব।
আলু! তুই—অতিমাত্রায় রেগে যাওয়ায় আর কথা বলতে পারে না মারজিয়া। মুখে সব শব্দ আটকে আসে। ঘাড়ে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
আনিসার ফোন বেশ কিছুক্ষণ যাবত বাজছে, তাদের মামাতো ভাই পিয়ালের ফোন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সে ফোন ধরছে না।
ফোনে না পেয়ে অবশেষে পিয়াল ম্যাসেজ দিয়েছে—ফুপা-ফুপি আমাদের বাসায় এসেছে। অনেক ঝগড়া চলছে এখানে। তোরা তাড়াতাড়ি আমাদের বাসায় আয়!
আনিসা বিভ্রান্তিভরা কণ্ঠে বলে, আপু—পিয়াল ভাই ম্যাসেজ করেছে। বাবা-মা নাকি মামার বাসায়। ভাই বলল অনেক ঝগড়া চলছে নাকি ওখানে!
মারজিয়া আর আলিশা অবাক হয়ে আনিসার দিকে তাকায়।
সাঁজানো-গোছানো একখানা বসার ঘর। সামনা-সামনি সোফায় বসে আছে মিলি এবং সাদিক। সাদিকের পাশে মিলির বড় ভাই, মামুন সাহেব। মিলির বাবা-মা ইন্তেকাল করেছেন বেশ কয়েক বছর হল। বাবার বাড়ি বলতে এখন শুধু এই এক ভাই আছে তার। পাশে ডায়নিংয়ে খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত মামুনের স্ত্রী কবিতা। সবার চেহারাতেই দুশ্চিন্তার ছাপ।
সাদিক কষ্টের সহিত বলে, মামুন ভাই, আর কেউ না জানুক আপনি তো জানেন, এই তিনটা মেয়েকে বড় করতে, আজ তারা যেখানে আছে সেখানে তাদের নিয়ে যেতে আমি কতটা কষ্ট সয়েছি। একটু থেমে কণ্ঠে কষ্টের পরিমান বারিয়ে বলে, যৌথ পরিবারে থেকে সবার কথা উপেক্ষা করে আমি মেয়েদের জন্য তাই করার চেষ্টা করেছি যা মিলির ভাল মনে হয়েছে। আমার ভাই-বোনরা তাদের ছেলেদের জন্যও যা করতে পারে নি তা আমি আমার মেয়েদের জন্য করেছি। এই কথা অস্বীকার করতে পারবে মিলি!
ডাইনিং থেকে মিলির ভাবী কবিতা বলে, এ কথা তো মিলি অস্বীকার করছে না, সাদিক। ও সবসময় বলে যে বাবার সাপোর্ট ছিল বলেই তার মেয়েরা আজ ক্যারিয়ারে এত ভাল জায়গায় আছে।
সাদিকের চোখেমুখে বিরক্তি। একটা মানুষের জীবনে ক্যারিয়ারই সব! আমার কি ইচ্ছা করে না যে আমার মেয়েদেরও ঘর-সংসার হোক! মরার আগে আমার নাতি-নাতনিদের মুখগুলো অন্তত দেখে মরি!
সাদিকের কাঁধে হাত দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেয় মামুন। এভাবে বলছো কেন, সাদিক!
আর কি বলব, ভাইয়া! মারজিয়া ইন্টার্নি করার সময় আপনার বন্ধুর ছেলের জন্য ওকে দেখতে এসেছিল, মনে আছে আপনার? কিছুদিন আগে বাজারে সেই ছেলেটার সাথে দেখা হল আমার। দুইটা ফুটফুটে ফুলের মত ছেলেমেয়ে হয়েছে তার। খানিকটা রাগী চোখে মিলির দিকে তাকায় সে। কি কমতি ছিল ওই ছেলের মাঝে! আমার কলিজাটায় টান লেগে গিয়েছিলো, ভাইয়া। আজ ওই ফুটফুটে বাচ্চাসহ সুন্দর সংসারটা আমার মেয়েটার হতে পারত! কিন্তু নাহ! একের পর এক ছেলেদের বাদ দিয়ে গেছে ও। কেউই ওর যোগ্য না!
মামুনের দিকে তাকিয়ে আফসোসের সুরে বলে, আজ পর্যন্ত মিলিকে আমি মারজিয়াকে দুই লাইন বলতে শুনলাম না এ ব্যাপারে। কি চায় আপনার বোন! সারাটা জীবন আমার মেয়েগুলো ঘরে বসে থাকুক!
সামনের সোফায় মাথা নীচু করে বসে আছে মিলি। কবিতা মিলির পাশে বসতে বসতে বলে, মারজিয়াকে তো সবাই বুঝায়, সাদিক। ওর নিজেরও তো একটা মন-মর্জি আছে নাকি! জোর করে মেয়ে বিয়ে দিবে নাকি!
নাহ, ভাবী। আমি শুধু কারনটা জানতে চাই। কি কারনে তাদের কাউকে পছন্দ হয় না! কি চায় তারা! নিরাশার সুরে বলে, আমাকে সমস্যাটা জানালে না আমি একটা সমাধান বের করতে পারব!
মিলির দিকে তাকিয়ে রেগে বলে, আমি শুধু মিলির মুখ থেকে শুনতে চাই কি কমতি আছে আমিরের পরিবারে, ওর ছেলের মাঝে যে তারা যোগ্য না আলিশার জন্য! পুরো পরিবার কানাডা থাকে, বিয়ের পর আলুকেও নিয়ে যাবে। আলুর যে কর্মক্ষেত্র তাতে বাংলাদেশের চেয়ে কানাডাতে ও হাজার গুনে ভাল চাকরি পেয়ে যাবে। পারুল ভাবী নিজে থেকে পছন্দ করে আলুকে তার ছেলের বউ করতে চাচ্ছে।
মামুনের দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দেওয়ার সুরে সাদিক বলে, আর দেখা হলেই তো বিয়ে হয়ে যায় না। আমি শুধু চাচ্ছিলাম আমিররা বাসায় আসুক আগামীকাল, জায়েদকে আলু দেখুক, ওরা কথা বলুক। আমি নিজে আমিরের সাথে খোলামেলা কথা বলে নেব যাতে বিয়ের পর আলুর চাকরি-বাকরিতে কোনো প্রকার সমস্যা না হয়। চোখ গরম করে আবার মিলির দিকে তাকায়। কিন্তু নাহ! আপনার বোন কিছুতেই তাদের বাড়ি আসতে দিবে না! আমার হাত থেকে টেলিফোন টেনে নিয়ে গেছে সে! আমি শুধু এই উদ্ধতার কারনটা জানতে চাই!
সাদিক তার কথা শেষ করে মিলির দিকে তাকিয়ে থাকে জবাবের আশায়।
মামুন ধমকের সুরে বোনকে জিজ্ঞেস করে, উত্তর দিচ্ছিস না কেন? শুনতে পাস নি সাদিক কি জিজ্ঞেস করল!
মিলি নির্বিকারভাবে সাদিকের দিকে তাকায়। যেন সাদিকের এত এত অভিযোগের কোনো ভিত্তিই নেই। শান্ত কণ্ঠে বলে, তুমি একবারও ভেবে দেখেছো, ওই বিয়ে বাড়িতে এত এত মেয়ে থাকতে তাদের আলুকেই কেন পছন্দ হল! কেন মারজুকে পছন্দ হল না, আনুকে পছন্দ হল না!
কেন মানে কি! আমাদের মেয়ে মাশাল্লাহ সুন্দর দেখতে। তারা যেমন মেয়ে তাদের ছেলের জন্য খুঁজছে তেমন মনে হয়েছে ওকে তাই!
এটাই। আলুকে তাদের ছেলের জন্য যথার্থ মনে হয়েছে। সুন্দর, সুশীলা, শিক্ষিত—এককথায় সম্পূর্ণা খুঁজছে তাদের ছেলের জন্য। মারজিয়ার বয়স বেশি, আনিসার গায়ের রংটা একটু চাঁপা—এই জন্য তারা সম্পূর্ণা না। সাদিক অবাক চোখে মিলির দিকে তাকিয়ে থাকে। মিলি মৃদু হাসে। বলে, আলুও তো তোমার সম্পূর্ণা মেয়ে না, সাদিক। ও তো তোমার সেই মেয়ে যাকে নিয়ে তুমি ফুটবল খেলতে যাও। রাত জেগে যার সাথে নিজের পছন্দের ফুটবল ম্যাচ দেখো। ঘন্টা যাবত খেলাধুলা-রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে গল্প কর। মিলি একটু থামে। বিয়ে বাড়িতে দেখেছে তো, সম্পূর্ণা বাঙ্গালী নারীর মত শাড়ি পরা ছিল, পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো ছিল। যে মুহুর্তে তারা বুঝতে পারবে আলু তো প্রতিদিনের জীবনে এমন না, খানিকটা রগচটা, ছেলেদের মত উড়নচন্ডী স্বভাব, কথায় কথা তর্ক করে, সংসারী মেয়ের গুণ তার ভেতর নেই, তখন কি আর তাদের আলুকে পছন্দ হবে? উত্তরের আশায় স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে মিলি।
সাদিকের রাগে ভরা চোখ দুটো খানিকটা শান্ত হয়ে এসেছে। মৃদুকণ্ঠে বলে, এই জন্যই চাচ্ছিলাম ওরা বাসায় এসে আলুর সাথে কথা বলুক।
তারপর?
পছন্দ না হলে আমরা এগুব না—
ওকে আলু বলে ডাকি বলে সত্যিই বাজারের পণ্য বানিয়ে ফেলতে চাইছো? যে মানুষ এসে নেড়েচেড়ে ‘ঠিক মনের মত না!’ বলে চলে যাবে?
মিলি, তুমি শুধু শুধু বিষয়টাকে জটিল করছো। মারজিয়াকে কি ছেলেরা দেখতে আসে নি!
এসেছে! এবং এই জন্যই আমি আরও বেশি চাই না যে কেউ বাড়ি বয়ে এসে আমার মেয়েকে তাদের অযোগ্য বলে যাক। বা বিয়ের পর সারাটা জীবন আমার মেয়েকে কেউ এটা অনুভব করাক যে সে তাদের যোগ্য না, তাদের স্ট্যাটাসের সাথে যাচ্ছে না, তাকে শুধরানোর চেষ্টা করুক, তাকে সারা জীবন এটা অনুভব করাক যে সে ভুল—মিলির কণ্ঠ আটকাতে থাকে। চোখ ছলছল করে ওঠে। দৃঢ় কণ্ঠে বলে, আমার মেয়ে অন্য মেয়েদের থেকে আলাদা হতে পারে কিন্তু সে ভুল না। সম্মানের সহিত ভালবেসে যারা ঘরে নিবে তাদের ঘরেই পাঠাব আমার মেয়েকে। নয় মাস পেটে রেখে যখন জন্ম দিতে পেরেছি সারাটা জীবন ওর ঘরে বসে থাকার ভারটাও এই ঘাড়ে তুলে নিব। তাও শুধুমাত্র দায় এড়াতে বা সমাজ রক্ষা করতে—স্বামীর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলে, নাতিনাতনির শখ পূরণের খাতিরে যেখানে সেখানে মেয়ে বিয়ে দিব না! আমি বেঁচে থাকতে আমার মেয়েদের সাথে এই অন্যায় আমি হতে দিব না!
সাদিকের মনে খানিকটা অপরাধবোধ কাজ করে। মিলির গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। উঠে চলে যেতে নেয়। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার তিন মেয়ের দিকে নজর পড়ে তার। দৃষ্টি মেলাতে পারে না মেয়েদের সাথে। দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে যায় মিলি।
সাদিক ঘুরে মেয়েদের দেখে। কিছু বলতে পারে না সে। চুপচাপ বসে থাকে মাথা নীচু করে, তার চোখেমুখে অপরাধবোধ। আলিশার চোখদুটো নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারজিয়া ঘুরে আলিশার দিকে তাকায়।
কবিতা উঠে এসে মারজিয়াকে জড়িয়ে ধরে। আমার মামনিরা এসে গেছে। তিন মেয়েকে আদর করে ঘরে নিয়ে যায়।