মামুন-কবিতা দম্পত্তির দুই ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে প্রিয়তি মারজিয়ার চেয়ে দুই বছরের বড়। তার বিয়ে হয়েছে বেশ অনেক বছর হল, দুইখানা ছেলে-মেয়েও আছে। তার স্বামী ইকরাম বিদেশ থাকার কারনে বাবার বাড়িতেই বেশি থাকা হয় তার। ছোট ছেলে পিয়াল পড়াশোনা শেষ করে একখানা চাকরি করছে। প্রিয়তির ঘরে বসে আছে তিন বোন। বিছানায় ঘুমিয়ে আছে প্রিয়তির বড় মেয়ে আর ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে সে।
মারজিয়া বোনের পাশে বসে তার ছেলের মোটা মোটা গালগুলোতে গুতাগুতি করে। প্রিয়তি বিরক্ত হয়ে ছেলেকে সরিয়ে নেয়। অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছি, উঠাস না তো! পেছনে বিছানায় অর্ধ শোয়া হয়ে আছে আনিসা। সামনের ডিভানটাতে বসে আছে আলিশা। প্রিয়তি বোনদের চেহারাগুলো একটু দেখে বলে, এইসব কাহিনী এই গুন্ডাটাকে নিয়ে, তাই না! পেছন থেকে একটা প্যাম্পাস নিয়ে আলিশার মুখে ছুড়ে মারে প্রিয়তি। প্যাম্পাসটা আলিশার মাথা লেগে নীচে পরে যায়। নির্বিকারভাবে বসে থাকে আলিশা। তার চেহারা যেন চিৎকার করে করে অনন্ত জলিলের সংলাপ বলছে, মৃত মানুষকে কখনও কথা বলতে দেখেছো!
দরজার পর্দা সড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢোকে পিয়াল। আনিসার মাথায় বারি দিতে দিতে বলে, তোকে এতবার ফোন করেছি, ধরিস নি কেন! আনিসা কিছু না বলে পাশ থেকে একটা বালিশ নিয়ে নিজের মুখের উপর চেপে ধরে ঘোঙড়ানোর আওয়াজ করে।
প্রিয়তি তার কোলের ছেলেকে ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, বাবুকে একটু নে।
পিয়াল হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আলিশার পাশে বসে। পা দিয়ে আলিশার পায়ে বারি দিয়ে বলে, কি হয়েছে কি সবার! টায়ার্ড নাকি! কেউ কিছু বলে না।
কবিতা ঘরে ঢোকে। বলে, সবাই ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে চলে আয়! তাড়াতাড়ি! যেন আর একবারও ডাকতে না হয়!
খাওয়ার সময় মিলিকে দেখতে পায় না তারা। কবিতা জানায় যে মিলি আর সে একসাথে পরে খাবে। কোনোভাবে দুটো খেয়ে নেয় তারা। খাবার যেন গলা দিয়ে নামছে না কারোই।
মামুন খাবার চিবাতে চিবাতে বলে, এই যা হচ্ছে বুঝলি, মারজু, সব তোর কারনে! তুই যদি সময়মত বিয়েটা করে নিতি, আজ তোর ছোট বোনদের নিয়ে তোর বাবার এত দুশ্চিন্তা হত না। একটু থেমে গলার জোর বাড়িয়ে বলে, এখনও সময় আছে, একটা ভাল ছেলে দেখে বিয়ে করে ফেল! মারজিয়া কিছু না বলে প্লেটের খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকে।
খাওয়ার পর প্রিয়তির ঘরে শুয়ে পড়ে মারজিয়া। পিয়ালের ঘরে জায়গা হয় আলিশা আর আনিসার। পিয়াল সামনের রুমের সোফায় কাঁথা-বালিস নিয়ে শুয়ে আছে।
রাতে আলিশা এক নাগাড়ে কাঁদতে থাকে। আনিসা গম্ভীর কণ্ঠে বলে, তখন বার বার বললাম যা-তা বলিস না। এখন খারাপ লাগছে কেন! কি সাধারনভাবে বলে দিলি যে মা সবসময় আপুর দিকে তাকিয়ে থাকে—প্রথম সন্তান তার, স্বাভাবিকভাবেই প্রথমের প্রতি ভালবাসা একটু বেশি থাকে বাবা-মায়ের। মা এটা শুনলে কতটা কষ্ট পাবে, জানিস! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মাথায় আসলেই সব মুখে আনতে হয় না, আলু!
আলিশা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আনিসা দুশ্চিন্তামাখা চোখে বোনের দিকে তাকায়।
আলিশাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, থাক, কাঁদিস না এখন। কাল আপুর কাছে মাফ চেয়ে নিস।
কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে যায় সে কিন্তু আনিসার আর ঘুম আসে না।
প্রিয়তির পাশে শুয়ে আছে মারজিয়া। চোখে ঘুম নেই। তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। প্রিয়তি ফোনে ফিসফিস করে তার স্বামীর সাথে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর কথা শেষ করে মারজিয়ার দিকে তাকায় সে।
অভিমানের সুরে বলে, স্বামী কাছে না থাকলে মেয়েদের কোনো সংসার হয় না, বুঝলি! কখনও প্রবাসী বিয়ে করবি না! না খেয়ে থাকলেও যেন দিন শেষে জামাই ঘরে ফেরত আসে।
মারজিয়া মৃদু হেসে বলে, শুনে তো মনে হল না ঝগড়া করলে, তাহলে এত রাগ কিসের!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয়তি। বলে, স্বামী দেশে নেই তাই শ্বশুর বাড়ির মানুষ গোণাতেই ধরে না। বাবার বাড়ি এসে পড়ে থাকি সেটাও তাদের ভাল লাগে না। আমার একটা সংসার হল না। কত শখ ছিল দিন শেষে স্বামী বাড়ি আসবে, তার খেদমত করব, মান-অভিমান করব, সে ভাঙ্গাবে—কিচ্ছুই হল না!
ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, দুই দুইটা বাচ্চা একা জন্ম দিয়ে, একা পেলে পুষে বড় করছি! ইকরামকে এতবার বললাম যে দেশে আসো। ছোটখাটো কিছু একটা করে দুইবেলা খেতে পারলেই আমার চলবে। কণ্ঠে খানিকটা রাগ ভাব এনে বলে, দেশে চলে আসবে এই কথা শুনে আমার শ্বাশুড়ি আর ননসরা যা তা বলেছে আমায়। বাবার কাছে বলে গেছে আমি নাকি কানপরা দিয়ে তাদের ছেলের রোজগাড় বন্ধ করতে চাই।
হতাশার সুরে বলে, মানুষ বলে না যে বাবা-মারা নিঃস্বার্থ হয়, তারা আমাদের ভাল চায়—মিথ্যা কথা বলে! আমি খুব ভাল করে জানি আমার শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি কখনও ইকরামকে দেশে আসতে বলবে না। তারা জানে যে ইকরাম দেশে আসলে এত বেতন পাবে না, তাদের রাজার হালের এই জীবন যাপন করতে পারবে না। দুই দুইটা বোনের বাড়ি, তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে সব খরচ ইকরাম চালায়। এদিকে আমার বাচ্চারা বছরে একদিন বাবার চেহারা পর্যন্ত দেখতে পায় না, বাবাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারে না।
কণ্ঠে জড়তা চলে আসে প্রিয়তির। ছলছল চোখে বলে, বাবু হওয়ার পর এতদিন ইকরামকে কাঁদতে দেখেছি জানিস। ছেলেটার বয়স দুই বছর হতে চলল, এখন পর্যন্ত বাবার হাতের একটু স্পর্শ পায় নি! আমার শ্বশুড় বাড়ির মানুষেরা এগুলা কখনও বুঝবে না। তাই আমি খুব ভাল করে বুঝচ্ছি কেন ফুপি এত দৃঢ় সিদ্ধান্তে আছে আলিশাকে নিয়ে। শ্বশুড় বাড়ি ভাল না হলে মেয়েদের জীবনটা আযাব হয়ে যায় রে। প্রিয়তি চোখ মুছতে মুছতে মারজিয়ার দিকে তাকায়।
মারজিয়া হেসে বলে, এত এত চোখের পানির পরও তোমরা ধরে ধরে মেয়েগুলোকে বিয়ে দিতে চাও।
সমস্যাটা বিয়ে না। সমস্যা আসেপাশের মানুষগুলো। বিয়ে দেওয়ার পর ছেলেমেয়েদের জীবনে নাক না গলালেই সুখে সংসার করতে পারে তারা।
বুঝলাম।
তো কি ঠিক করলি? বিয়েশাদি করবি?
দেখি—
তোর কি সমস্যা বল তো! এত এত ছেলে এতগুলো বছরে দেখলি—বিস্ময়ের সুরে বলে, একটা ছেলেও পছন্দ হল না এটা কিভাবে সম্ভব!
কাউকেই পছন্দ হয় নি কে বলল!
পছন্দ হয়েছিল? কাকে?
হয়েছিল একজনকে—কিন্তু তার আমাকে পছন্দ হয় নি।
কিহ! কে সে?
ঘুমাও তো এখন। আমার সকালে হাসপাতালে যেতে হবে।
প্রিয়তি খুব আগ্রহ নিয়ে মারজিয়াকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, এইইই! বল না! শুধু এইটুক বল যে কেন পছন্দ হয় নি?
মারজিয়া তার দিকে তাকায়। তার চোখ দুটো নির্বিকার। শান্ত কণ্ঠে বলে, কারন আমি শাহরুখ খানকে চিনতাম না।
প্রিয়তি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মারজিয়ার দিকে। এরপর হাসতে শুরু করে। খুব কমেডি হল! ঘুমা! প্রিয়তি হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ে। মারজিয়া তাকিয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে।
বারান্দার চেয়ারে মোবাইল হাতে বসে আছে জাকি। চেহারায় তার দুশ্চিন্তার ছাপ। জাকির মা এসে তার পাশে দাঁড়ায়। কাঁধে হাত দিয়ে আদরমাখা কণ্ঠে বলে, এখনও ঘুমাস নি যে?
জাকি পেছনে ফিরে মায়ের দিকে তাকায়। মৃদু আর্তনাদ করার মত করে বলে, মা—হাত ধরে তাকে সামনের চেয়ারে বসায়। আলুর ফোনের অপেক্ষা করছিলাম।
তুই ফোন করে নে। সামান্য হেসে বলে, ঝগড়া হয়েছে, বুঝি?
করেছি। ফোন বন্ধ বলছে। একটু থেমে ইতস্তত কন্ঠে বলে, ঝগড়া না ঠিক—দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাকি। আজকে ওর বড় আপু ওকে আমার সাথে রাস্তায় দেখেছে। ওর বাসায় আমাদের ব্যাপারে জানে না। তাই একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে যে সব ঠিক আছে কিনা।
কি করতে দেখেছে তোদের? মা তাকিয়ে থাকে তার ছেলের দিকে। জাকি তার মায়ের দিকে ইতস্তত চোখে তাকিয়ে কিছু না বলে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জাকির মায়ের চোখে-মুখে খানিকটা গম্ভীরতা আসে। মৃদুকণ্ঠে বলে, বাবা, সমাজ যতই উন্নত হোক, মেয়েদের প্রতি সমাজের একটা গোঁড়ামি সবসময় থেকে যায়। যাকে ভালবাসিস তাকে সম্মানও তো করতে হবে নাকি! সম্মান ছাড়া কোনো সম্পর্ক টিকে থাকে না!
জাকি অভিমানের সুরে বলে, আমি তো প্রেম করতে চাই না ওর সাথে। কিন্তু বিয়ের কথা তুললেই ও বিষয় বদলে দেয়। যেন সে বিয়ে করতে চায় না আমাকে। কিছু খুলেও বলে না। মাঝেমাঝে মনে হয় ও হয়ত আমাকে নিয়ে সিরিয়াস না, আমিই তো সবসময় ওর পিছে পড়েছিলাম। নিরাশার সুরে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলে, ওর কি ছেলের অভাব হবে!
জাকির মা ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলের চোখে-মুখে হতাশা-বিরক্তির মিশ্রণ। অজান্তেই ঠোঁটের কোনে একখানা হাসি দেখা যায় তার। ছেলের হাতটা ধরে বলে, আমার এত বছরের বিবাহিত জীবনে কি শিখেছি জানিস? সম্পর্কে কখনও অনুমান করতে হয় না। বিভ্রান্তির সৃষ্টি অন্যতম কারন হচ্ছে অনুমান, যা তিলে তিলে সম্পর্কটা নষ্ট করে দেয়। হাত দিয়ে ছেলের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিতে দিতে বলে, যা বুঝতে পারছিস না, প্রশ্ন কর। কথা বল দুইজনে। কেন ও বিয়ের বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছে বুঝার চেষ্টা কর। জাকির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলে, ভাল যখন বেসেছিস, এতটুক তো করতেই হবে! জাকি দুঃখী চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
নিঃশব্দে ছেলের পেছনে এসে দাঁড়ায় জাকির বাবা। তোর মা একদম ঠিক বলছে। জাকি পেছনে ফিরে বাবাকে দেখে। জাকির কাঁধে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বাবা বলে, পৃথিবীটা অনেক অসুখের জায়গা। অন্তত এখানে নিজের পছন্দের মানুষের সাথে অসুখী থাকা উচিৎ! বাবা-মায়ের কথা শুনে জাকি কিছুটা ভরসা ফিরে পায়। ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি দেখা যায় তার।