Posts

উপন্যাস

ত্রি-রমনী (পরিচ্ছেদ ০৭)

July 7, 2025

M. Khanam

22
View

মারজিয়া বাসায় ঢুকেই সরাসরি চলে যায় ওর বাবা-মায়ের রুমে। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে  জিজ্ঞেস করে, আম্মু, কি করছো? 

মিলি তাকিয়ে হাসিমুখে বলে, মারজু—আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছিস? খাটের পাশে হিসাবের খাতা নিয়ে বসে ছিল মিলি। এ মাসের হিসাব-নিকাশ মিলাচ্ছে। মারজিয়া এসে মায়ের পাশে বসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিলি বলে, এ মাসে সব মিলিয়ে কয়েক হাজার টাকা বেশি খরচ হয়ে গেল। 

মারজিয়া মাথা ঘুরিয়ে বাবা কোথায় আছে দেখার চেষ্টা করে। সাদিককে ঘরে দেখতে পায় না। বাবা কোথায় মা? 

মাগরিবের নামায পড়তে গিয়েছিল, বলল একসাথে একটু বাজার হয়ে আসবে। টুকটাক জিনিসপত্র লাগত বাসার জন্য।

আমাকে বললেই পারতে! আমি নিয়ে আসতাম।

তুই পুরোদিন হাসপাতালে খেঁটে আবার কোথায় বাজারে ধাক্কা খাবি! ওসব তোর বাবা সামলে নিবে। একটু হাঁটাহাঁটি করলে তার শরীরটাও ভাল থাকবে। সামান্য থেমে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, তুই কিছু বলতে এসেছিলি? মেয়ের দিকে কৌতুহলের দৃষ্টিতে তাকায় মিলি। মারজিয়া একখানা বড় শ্বাস নিয়ে হাসিমুখে মিলির দিকে তাকায়। মিলি মৃদুকণ্ঠে মারজিয়ার হাত ধরে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে? বল আমায়। 

আজ সন্ধ্যায় বাসায় একজন মেহমান আসবে—এক ছেলে। 

মিলির চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। ঠোঁট বাকিয়ে মস্ত বড় একটা হাসি দেয় সে। কে সে? তোর সাথে হাসপাতালে কাজ করে? 

মারজিয়া বুঝতে পারে তার মা কি ভাবছে। আমার জন্য আসবে না—আলুর জন্য। মারজিয়া হাসি দিয়ে বলে। 

মিলির হাসি মুখটা শংকায় রূপান্তরিত হয়। আলুর জন্য? কে? 

মারজিয়া মায়ের হাত ধরে তার চোখের দিকে তাকায়। বলে, ছেলেটার সাথে আমি দেখা করেছি। আমার বেশ ভাল লেগেছে। আলুর সাথে একসাথে পাশ করেছে, একই কোম্পানিতে কাজ করে। আলুকে খুব ভালবাসে। আমি ওকে আজ সন্ধ্যায় বাসায় আসতে বলেছি। খানিকটা বিভ্রান্তির সাথে বলে, তোমরা ওর সাথে কথা বলে দেখো। তোমাদের পছন্দ হলে, এরপর আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারব। 

মিলির চোখে-মুখে চিন্তা। সে মারজিয়ার থেকে চোখে সড়িয়ে পাশে তাকিয়ে থাকে। কি বলবে ভাবতে থাকে। মারজু, তোদের তিন বোনকে আমি যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছি। এবং সেটা বিশ্বাস থেকেই দিয়েছি। মিলি দুশ্চিন্তামাখা চোখে বলে, তোরা আমার বিশ্বাস ভাঙ্গিস না!

মারজিয়া মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে আশ্বাস দেয়। তুমি একদম দুশ্চিন্তা করো না, মা। আমার বিশ্বাস তুমি যখন ছেলেটাকে দেখবে, এসব আর তোমার মাথায় থাকবে না!


 

অন্ধকার রুমে খাটের এক কোনায় বসে আছে আলিশা। চোখে-মুখে কোনো অনুভূতি নেই। চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে। 

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে মারজিয়া। ঘরের বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে বলে, আজ অফিসে যাস নি কেন? তার কথায় কান না দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে আলিশা। মারজিয়া হেঁটে আলমারির কাছে যায়। আলমারি থেকে জামা-কাপড় বের করে ছুড়ে মারে আলিশার গায়ে। গম্ভীর কণ্ঠে বলে, হাত-মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নে। বাসায় মেহমান আসছে! 

আলিশার বুকের ভেতরটা ধুক করে ওঠে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কে আসছে? তার জন্য আমাকে কেন সেজেগুজে যেতে হবে! উঠে বসে ভয়ার্তক দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকায়। 

মারজিয়া হেঁটে এসে বিছানার পাশে বসে। মৃদুকণ্ঠে বলে, জায়েদ আসছে—তোকে দেখার জন্য।  মারজিয়া তাকিয়ে আলিশার মুখোভঙ্গি দেখার চেষ্টা করে। 

তুই মিথ্যা বলছিস! আম্মু কখনও ওকে আসতে দেবে না।

তাহলে যেয়ে আম্মুকেই জিজ্ঞেস কর! মারজিয়া উঠে চলে যেতে শুরু করে। 

আলিশা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে ডাকে, আপু! মারজিয়া ঘুরে পেছনে তাকায়। আলিশার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মারজিয়া মৃদু হাসে। 

জাকি আসছে, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নে। এভাবে ভিখারিনী সেজে ওর সামনে ভুলেও আসিস না! হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় মারজিয়া।

জড়োসড়োভাবে সোফায় বসে আছে জাকি। পাশেই আলিশা বসা। সামনাসামনি সোফায় সাদিক এবং মিলি বসে এক দৃষ্টিতে জাকিকে দেখে যাচ্ছে। দুই পাশের দুই সিঙ্গেল সোফায় মারজিয়া আর আনিসা বসা। এ যেন চারিদিক থেকে শিকারকে ধরে ফেলা। বলির পাঠার জন্য সামনে কিছু নাস্তা-পানিও আছে। 

কৌতুহলী কণ্ঠে মিলি জিজ্ঞেস করে, বাবা, তোমার উচ্চতা কত? 

প্যারেডের সৈনিকের মত উত্তর দেয় জাকি, ছয় ফুট চার ইঞ্চি, আন্টি। 

সাদিক বলে, এ তো বিশাল! 

আলিশা বলে, জাকি ছোটবেলা থেকে বাস্কেটবল খেলে, আব্বু। ও তো ন্যাশনালে খেলার সুযোগ পেয়ে ছিল কিন্তু পড়াশোনার জন্য পরে আর খেলে নি। 

মিলি গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, তুমি যে এখানে এসেছো তোমার বাবা-মা জানে?

জী।

কিছু বলে নি তারা? 

অল দ্যা বেস্ট—বলেছে। জাকির কথা শুনে কোনোভাবে হাসি চেপে রাখে মারজিয়া ও আনিসা।

সাদিক বলে, গ্রামের বাড়ি কোথায় তোমাদের?

টাঙ্গাইল।

বাবা কি করেন?

আমার বাবা-মা দুইজনই সরকারি চাকুরিজীবী। 

মিলি বলে, দেখো, বাবা, তোমরা দুইজনই প্রাপ্তবয়স্ক। নিজেদের ভালো-মন্দ বুঝো। তাই নিজেরা আলোচনা করে আমাদের জানালেই বোধহয় ভাল হয়। মিলি সাদিকের দিকে তাকায় যা বলেছে তাতে সাদিকের আপত্তি আছে কিনা বুঝার জন্য। সাদিক এক পলকে জাকির দিকে তাকিয়ে আছে। 

কথা-বার্তা শেষ করে ঘর থেকে বের হয় জাকি আর আলিশা। গ্যারাজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে  থাকে। 

জাকি বলে, তোকে না জানিয়ে আসা উচিৎ হয় নি জানি কিন্তু—দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাকি। বলে, আর কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আলিশা তাকিয়ে জাকিকে দেখে। একদিনে মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে তার। হাত বাড়িয়ে ধীরে জাকির হাতটা ধরে। জাকিও তাকে জড়িয়ে ধরে। অবশেষে যেন জানে পানি এসেছে তার। ধীরে বলে, এখন ভেতরে চলে যা। নাহলে আঙ্কেল-আন্টি খারাপ মনে করবে। কাল অফিসে আসবি না?

আলিশা ধীরে মাথা নাড়ে।

কাল কথা হবে তাহলে। আলিশার কপালে নিঃশব্দে চুমু খেয়ে বিদায় জানায় জাকি। 

বাসায় এ নিয়ে আর কোনো কথা হয় না। রাতে নির্ঘুম চোখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে মারজিয়া। যেন রাজ্যের চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ অল্প অল্প করে ডাইনিংয়ে জ্বালানো আলো তার ঘরে প্রবেশ করে। দরজায় দাঁড়ায় আনিসা।

মৃদুকণ্ঠে আনিসা বলে, আপু, ঘুমাচ্ছিস?

না, আয়। উঠে বসে মারজিয়া। 

কোল বালিশ হাতে এগিয়ে আসে আনিসা। আমি আজ তোর কাছে ঘুমাই?

মারজিয়া সড়ে গিয়ে খাটে জায়গা করে দেয়। আনিসা তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে কোলবালিশ কোলে নিয়ে শুয়ে পড়ে। 

মারজিয়া একবার তার দিকে তাকিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে। তার মনে পড়ে বাসস্ট্যান্ডে আনিসাকে কিছুটা বিচলিত লাগছিল। ভাবে–হয়ত নতুন নতুন অফিস জীবনে মানিয়ে নিতে ছোট বোনের কষ্ট হচ্ছে। বলে, অফিস কেমন চলছে?

ভাল। বেতনটা একটু বাড়ালে কাজ করে শান্তি লাগত।

মাত্র জয়েন করেছিস। জয়েনিংয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন এমনই থাকে। আস্তে আস্তে বাড়বে।

আনিসা পাশ ফিরে মারজিয়াকে দেখে। মারজিয়ার চোখ দুটো সবসময় কেমন যেন অনুভূতিহীন লাগে। আনিসার খুব অফিস নিয়ে, জীবন নিয়ে, এত এত ঝামেলা নিয়ে অভিযোগ করতে ইচ্ছা করে বোনের কাছে। কিন্তু মারজিয়ার অনুভূতিহীন চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ভাবে–তার জীবনে যতই ঝামেলা থাক, বড় বোনের চেয়ে বোধহয় কমই আছে। মানুষটার সোস্যাল লাইফ বলতে কিচ্ছু নাই। দিন-রাত হাসপাতালে মগজ ঘষে এসে বাসার ঝামেলা পোহাতে হয়। তার উপর আসতে যেতে সবার কাছে বয়স বেড়ে যাচ্ছে, বিয়ে করছে না-হচ্ছে না, তার জন্য ছোট বোনদের বিয়েতেও সমস্যা হচ্ছে, এত দেরীতে বিয়ে করলে বাচ্চাকাচ্চারা মা বলবে নাকি নানি—এসব শুনতে হয়। চিন্তাগুলো মাথায় আসতেই নিজেকে সুখী মনে হয় আনিসার। তাই অভিযোগের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বড় বোনের দুশ্চিন্তাগুলো বোঝার চেষ্টা করে। বলে, আপু, সত্যি করে বল তো, তোর জাকি ভাইকে কেমন লেগেছে?

ভাল।

আমি না হিসেবেই মিলাতে পারছি না। জাকি ভাই আমার দুলাভাই হবে!

কেন?

ভার্সিটিতে অনেক নামডাক ছিল তার। খেলাধুলা করত, পড়াশোনায় ভাল ছিল। মেয়েরা পাগল ছিল তার জন্য। 

আমাদের আলু কি কম নাকি! 

তা না—আসলে ঠিকই বলেছো, আলুর সাথে অন্য কাউকে মানালেও, জাকি ভাইয়ের পাশে আলুর মত মেয়ে ছাড়া আর কাউকে মানাবে না। 

সেটা সে ভালোই জানে বলে মনে হল। 

আলুর সত্যিই বিয়ে হয়ে যাবে? আলুর! আনিসা কণ্ঠের বিস্ময়ে মারজিয়া হাসে। কথাটা শুনতেও যেন অদ্ভুত শোনালো তার কাছে। দরজা খোলার আওয়াজ হয়। আনিসা তাকিয়ে আলিশাকে দরজায় দাঁড়ানো দেখে। বলে, কি রে তুই ঘুমাস নি? আলিশা ধীর পায়ে হেঁটে এসে খাটের অন্য পাশ দিয়ে বিছানায় ওঠে। মারজিয়াকে ঠেলে তার পাশে শুয়ে পড়ে। মারজিয়াও চুপচাপ চেপে গিয়ে তাকে জায়গা করে দেয়। আলিশা কোনো কথা না বলে মারজিয়াকে জড়িয়ে ধরে তার গায়ে মুখ লুকায়। 

তিন বোনের ভেতর মারজিয়া উচ্চতায় সবচেয়ে খাটো। মেয়ে অনুযায়ী আলিশাকে বিশাল দেহী বলাই যায়। মারজিয়া নড়েচড়ে আরাম খোঁজার চেষ্টা করে। এমন সময় অপর পাশ থেকে আনিসাও তাকে জড়িয়ে ধরে। দুই বোনের মাঝে দমবন্ধ অনুভব করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মারজিয়া। কেউ কোনো কথা বলে না। মারজিয়া সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। চোখ বন্ধ করে ঘুমের রাজ্যে ঢুব দেয়। 

যখন দাদা-দাদি বেঁচে ছিল আর চাচা-চাচিরাও ওদের সাথে থাকত, তখন এভাবেই এক ঘরে তিন বোন ঘুমাত। খুব বেশিদিন হয় নি তাদের এই নতুন জীবনের। ভাগ্যটা তাদের বদলেছে মূলত মারজিয়ার কারনেই। এত এত অভিযোগ কিন্তু দিনশেষে ঘরের এই বড় মেয়েটাই তার জীবনের সবটা শখ-আহ্লাদ ত্যাগ করে শুধুমাত্র পরিবারের জন্য খেঁটেছে। যবে থেকে মারজিয়া কামাতে শুরু করেছে, ঘরের একটা মানুষকে কোনো খরচ দিতে দেয় না সে। বাবাকে বলেছে তার কামাইয়ের পুরো টাকাটা তার আর মায়ের জন্য রেখে দিতে, নিজেদের শখ পূরণ করতে। বোনদেরও তাই—সবাই যেন তাদের উপার্জন দিয়ে নিজেদের শখ পূরণ করে। মারজিয়ার তো কোনো শখ নেই, শখ তৈরির মত অবসরও তার ছিল না। তাই সে পরিবারের সবার প্রয়োজন পূরণ করুক। এটাই তার শখ—সবাইকে হাসি-খুশি আর সুস্থভাবে বাঁচতে দেখা। 

ফযরের আযান হচ্ছে। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে মারজিয়ার রুমের সামান্য খোলা দরজাটা চোখে পড়ে সাদিকের। গ্লাসটা হাতে এগিয়ে আসে দরজার দিকে। দরজা বন্ধ করতে যাবে তখনই আনিসাকে বিছানায় দেখে। হাত বাড়িয়ে নিঃশব্দে ঘরের বাতি জ্বালায় সে। দেখে তিন মেয়ে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে আছে। আনমনেই একখানা হাসি ফুটে তার ঠোঁটের কোনে। 

আধপাকা চুলগুলো খোপা করতে করতে ডাইনিংয়ের দিকে আসছিলো মিলি। সাদিককে দেখে মারজিয়ার ঘরে ঢোকে সে। কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করতে করতেই মেয়েদের অবস্থা চোখে পড়ে তার। চুপচাপ স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে  হাসিমুখে তার সন্তানদের শান্তিতে ঘুমাতে দেখে। 

সন্তানরা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, এরচেয়ে সুখের আর কি হতে পারে কোনো বাবা-মায়ের জন্য!

Comments

    Please login to post comment. Login