অফিসের নীচে আলিশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে জাকি। আলিশা ধীর পায়ে এসে জাকির পাশে দাঁড়ায়। জাকি আলিশার দিকে তাকায়। অন্যান্য দিনের চেয়ে তাকে চুপচাপ লাগছে। বসবি কোথাও?
আলিশা না-সূচক মাথা নাড়ে।
জাকি হাতের হেলমেটটা পরতে পরতে বলে, বাইকে ওঠ তাহলে। বাসায় পৌঁছে দেই তোকে। নাকি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত? বাসায় সমস্যা হবে আমি দিয়ে আসলে?
আলিশা অবাক হয়ে জাকির দিকে তাকায়। সে ভেবেছিলো জাকি তাকে গতদিনের বিষয় নিয়ে নানা কথা বলবে, তার অনেক জিজ্ঞাসা থাকবে। কিন্তু জাকি যখন অন্যান্য দিনের মতই আচরন করছে তখন আলিশার মনে খানিকটা ভয়ের সঞ্চার হয়।
বসি কোথাও?
জাকি আলিশার দিকে তাকিয়ে বলে, বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে না?
তোর সাথে আরেকটু থাকতে ইচ্ছা করছে।
জাকি হেলমেটটা খুলে বাইকে ঝুলায়। আলিশার হাত ধরে পাশের ক্যাফেতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে। দুপুরে খেয়েছিস ঠিকমতো?
হুম।
কিছু হয়েছে? এমন মনমরা লাগছে কেন?
উহু—
জাকি উদ্বিগ্ন হয়ে আলিশার দিকে তাকায়।
ক্যাফের কাউন্টারের উপরের ডিজিটাল মেনুর দিকে তাকিয়ে কি অর্ডার দেবে ভাবতে থাকে জাকি। পেছনে তাকিয়ে একবার আলিশাকে দেখে। আগের মতই মনমরা হয়ে বসে আছে সে। সামনে তাকিয়ে সাতপাঁচ না ভেবে একখানা রেড ভেলভেট পেস্ট্রি ও মোকা অর্ডার করে আলিশার জন্য আর সাথে নিজের জন্য একটা আমেরিকানো। খাবার আসার পর আলিশা এক চোখে কেকটার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর জাকির দিকে তাকাল।
জাকি বলে, মিষ্টি কিছু খেয়ে মুড ভাল কর। এরপর বল কি হয়েছে? আলিশা চোখ ছোট ছোট করে জাকির তাকিয়ে থাকে এরপর নীচের দিকে না তাকিয়েই চামচ উঠিয়ে কেকটা খাওয়া শুরু করে। জাকি তার চিনি ছাড়া তিক্ততাপূর্ণ আমেরিকানোতে চুমুক দিতে দিতে আলিশাকে দেখে। কেউ কিছু বলে না। কেকটা অর্ধেকটা খেয়ে আলিশা চুপচাপ বসে থাকে। জাকি বলে, কি হয়েছে?
তুই আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছিস না কেন?
কোন ব্যাপারে?
আলিশা কিছু না বলে জাকির দিকে তাকায়। তার চোখ-মুখ দেখে মনে হয় এখনই কেঁদে দিবে। জাকি মৃদু হাসে।
হাসছিস কেন?
আমার হাতে যতটুকু ছিল আমি করেছি। এখন বাকিটা তোর হাতে। বার বার জিজ্ঞেস করে তোকে চাপে ফেলে আমার কোনো লাভ নেই।
তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি—আলিশাকে কথাটা শেষ করতে দেয় না জাকি।
আমি জানি। তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে না। অন্তত আমাকে দিতে হবে না।
জাকি একটু থামে। আলিশার সামনে থেকে কেকের প্লেটটা টেনে নিজের দিকে আনে। চামচটা উঠিয়ে ছোট এক টুকরো কেক কেটে চামচে তোলে।
টুকরোটা আলিশার দিকে এগিয়ে ধরতে ধরতে বলে, তোর সিদ্ধান্তের উপর আমার ভরসা আছে। তোর পদ্ধতি সবসময় সঠিক না হলেও তুই কখনও ভুল কিছু করিস না।
মিষ্টি একখানা হাসি দিয়ে আলিশার মুখের সামনে কেকের টুকরোটা ধরে চোখের ইশারায় খেতে ইঙ্গিত করে।
আলিশার চোখ দুটো ছলছল করে। সামান্য সামনে ঝুঁকে কেকটা খেয়ে নেয় সে। ধীরে ধীরে কেকটা চিবুতে চিবুতে নীচের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে। অশ্রুসজল চোখে উপরে তাকিয়ে মৃদুকণ্ঠে বলে, আমাকে কি আগে আঙ্কেল-আন্টির সাথে যেয়ে দেখা করতে হবে?
জাকির চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। কেন?
কথা বলার জন্য। তোর বাবা-মারও তো আমাকে পছন্দ হতে হবে, নাকি?
পৃথিবীতে ৭০৯৯টি ভাষা আছে। যার ভেতর পাঁচটিতে জাকি হায়দার পারদর্শী। কিন্তু সেই মুহুর্তে সে কোনো ভাষাতেই নিজের মনের অনুভূতি ব্যক্ত করার উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেল না। ছয় ফুট চার ইঞ্চির বিশাল দেহী মানবটি ছলছল চোখে তার সামনে বসা রমনীর দিকে তাকিয়ে রইল। এক মুহুর্তের জন্য জাকি নিজেকে খুঁজে পেল এগার বছর পূর্বের সেই রৌদ্রতপ্ত সকালে যেদিন সে আলিশাকে প্রথম দেখেছিলো। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছিলো যেন একটি বার এই মেয়েটি ঘুরে তাকে দেখে।
কিন্তু আলিশা হোসাইন যে নিজের লক্ষ্য ছাড়া জীবনে আর কোথাও তাকায় না। তার দিকেও তাকায় নি। আজ আলিশার তার সামনে বসে আছে। ভালবাসাপূর্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। জাকির সবকিছু স্বপ্নের মত মনে হতে শুরু করে। হারতে অপছন্দ করা দুটি মানুষ সামনা-সামনি বসে নিজেদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত লক্ষ্যের দিকে ছলছল চোখে হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে।
মাইক হাতে কথা বলতে বলতে স্টেজে হাঁটতে থাকে আনিসা। শান্ত কণ্ঠে বলে, আমি একটা কোম্পানিতে চাকরি করি। কোম্পানির নাম অবশ্যই আমি বলব না। কিন্তু এটা বলি যে এই কোম্পানিতে এপ্লাই করার অন্যতম কারন ছিল এর ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর আমার সবচেয়ে পছন্দের অভিনেত্রী— সিলভি সিনহা।
নামটা শোনার সাথে সাথে পুরো হলের দর্শক হর্ষধ্বনি দেয়।
আনিসা একটু থেমে হাসে। আমি শুনেছিলাম সিলভি প্রায়ই অফিসে আসে। কিন্তু আমার ভাগ্য দেখেন, আমি জয়েনিংয়ের আগেই উনি দেশ ছেড়ে চলে গেলেন।
দর্শকেরা জোরে জোরে হাসতে শুরু করে।
আনিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এখন অফিসে সিলভির জামাই মানে আমার বস এবং আমি, দুইজনই সিলভির দেশে আসার অপেক্ষায় বসে থাকি।
দর্শকেরা হো হো করে হাসে।
আমি যেদিন ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলাম, ইন্টারভিউ বোর্ডে আমার বসও ছিলেন। সেদিন ওনাকে দেখে আমার খুব ঈর্ষা বোধ হয়েছিল। আমি সিলভির হিউজ ফ্যান। দর্শক সারীতে ইশারা করে বলে, এনি ফ্যানবয়েজ অব সিলভি?
অধিকাংশ পুরুষেরাই হাত তোলে।
আনিসা স্টেজে খানিকটা আধবসা হয়ে প্রথম সারীর একজন পুরুষকে জিজ্ঞেস করে, আপনার কি সিলভি সিনহাকে মাঝেমাঝে দেখতে মন চায়?
লোকটা তার হাতের মোবাইলটা অন করে ওয়ালপেপারে অভিনেত্রী সিলভি সিনহার একটা ছবি আনিসাকে দূর থেকে দেখায়।
আনিসা বিস্ময়ের সাথে উঠে দাঁড়িয়ে জোরে বলে ওঠে, দেখেন ওয়ালপেপারে ছবি দিয়ে রাখছে, ট্রু-ফ্যান! একটু থেমে কণ্ঠে আবার শান্ত ভাব এনে বলে, আমার বস বাস্তব জীবনে ‘ওম শান্তি ওম’ ঘটায়ে ফেলছে। পুরো দেশ যে মহিলাকে দূর একটু দেখতে চায়, তার পাশে উনি ঘুম থেকে উঠে। কণ্ঠে খানিকটা দুষ্টামি ভাব এনে বলে, যদিও এখন পারতেছে না।
দর্শকেরা হাততালি দিয়ে হাসতে থাকে।
আনিসা স্টেজের মাঝ বরাবর যেয়ে আসন দিয়ে বসে। আজকে আমরা প্রেম-ভালবাসা নিয়েই কথা বলব। আমার ছোটবেলা থেকেই ডিজনি প্রিন্সেসদের মত একটা প্রেমকাহিনীর শখ। একদিন উড়ন্ত ঘোড়ায় চড়ে কোনো রাজকুমার আসবে, আমাকে এই নাইন টু ফাইব র্যাটরেইসের অত্যাচার থেকে দূরে নিয়ে যাবে।
দর্শক সারী থেকে এক মেয়ে চিৎকার করে বলে, আমারও!
আনিসা তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়। ধীরে বলে, আমার বস দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নামকরা ধনী ব্যবসায়ী। আগে ওনার সব ইন্টারভিউ বিজনেস নিয়েই হইত। এখন ওনাকে ওনার বউয়ের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। ওনার একই ইন্টারভিউ বিজনেস এবং শোবিজ দুই পাতায় ছাপে। আমি তার প্রত্যেকটা ইন্টারভিউ পড়ি আর অবাক হই, কি অমায়িকভাবে তিনি তার বউয়ের তারিফ করে। চেহারায় খানিকটা গম্ভীরতা এনে বলে, এমনখানা স্বামী পেতে কোন ধরনের কালজাদু করতে হয়?
দর্শকসারী থেকে এক ছেলে চিৎকার করে বলে, সিলভি সিনহা হতে হয়!
আনিসা দর্শকের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সাথে বলে, কাঁটা ঘায়ে মরিচ মাখাইয়ো না তো!
দর্শকেরা হর্ষধ্বনি করে হাসে।
আনিসা একটা হাসি দিয়ে বলে, সত্য কথা সর্বদা তিতা। তাই সবসময় সুগারকোট করে বলবা। যেমন, সিলভি সিনহাকে তার জামাই তখন থেকেই পছন্দ করে যখন সে সিলভি সিনহা ছিল না। মানে সিলভিই ছিল কিন্তু এত জনপ্রিয় ছিল না—আমার বস তার ইন্টারভিউয়ে অনেকবার বলেছেন যে সে ছোটবেলা থেকেই সিলভি সিনহাকে পছন্দ করে। তার মডেলিং ডেইজের ছবি-ভিডিও থেকে শুরু করে, তার প্রত্যেকটা ইন্টারভিউ, অ্যাড-মুভি তার কাছে এখনও আর্কাইভ করা আছে। শুনে হোলসাম লাগে নাকি ক্রিপি, আমি একটু বিভ্রান্ত।
দর্শকেরা জোরে হেসে উঠে।
আমার বস যখন বলে তখন আসলে ক্রিপি লাগে না। কারন ক্রিপিনেসের সংজ্ঞা হচ্ছে যখন মানুষটা দেখতে অসুন্দর হয়, অসুন্দর মানুষের নিঃশ্বাসও ক্রিপি।
দর্শকেরা হর্ষধ্বনি করে সম্মতি জানিয়ে হাসতে থাকে।
আনিসা হেসে জোর দিয়ে বলে, নাহ, সত্যি! আপনি কখনও সুন্দর কোনো মানুষকে ‘ক্রিপি’ বিশেষন পাইতে দেখেছেন? ভাই, মেয়েদের জেফরি ডেহমারকেও কিউট লাগে। ব্যাটা লিটেরাললি মানুষ মাইরা খাইত!
দর্শক সারীর পুরুষেরা তীব্র ধ্বনিতে হেসে ওঠে।
আনিসা ইতস্তত হাসি দিয়ে বলে, ভাইয়েরা আমার, এত হাইসো না। পুরুষদেরও একই অবস্থা। সুন্দর মেয়ে দেখলে মাথা ঠিক থাকে না!
এবার নারী দর্শকেরাও হেসে ওঠে। পুরো হলে একসাথে হর্ষধ্বনিতে ছেয়ে যায়।
আনিসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, যেটা বলছিলাম যে আমার বসের করা কোনো কাজই ক্রিপি লাগে না। কারন তিনি অস্বাভাবিক মাত্রায় সুন্দর দেখতে। ওনাকে দেখলে মনে হয় দুই জামাই-বউ মিলে সৌন্দর্য্যের প্রতিযোগিতায় নামছে, কে বেশি সুন্দর! একটা দুষ্টামিমাখা হাসি দিয়ে বলে, উনি যদি বলে, ‘মিস হোসাইন আজকে থেকে আপনার সাপ্তাহিক ছুটি বন্ধ, আপনি সাতদিনই অফিসে আসবেন।’ আমি বলব, থ্যাংকিউ, স্যার!
দর্শকেরা হাততালি দিয়ে হাসতে থাকে।
আনিসা হাসতে হাসতে বলে, এই পরিমান সুন্দর হওয়া অপরাধের তালিকায় পড়া উচিৎ। আমার মত সাধারন চেহারার মানুষদের ডিস্ট্রাকটেড বোধ হয়। আনিসা খানিকটা নীচের দিকে তাকিয়ে চেহারার দুষ্টামি ভাবটা সরায়। কোমল একখানা হাসি দিয়ে বলে, তাদের কাহিনীটা পড়ে আমি বুঝতে পারি না তাদের ভেতর কে বেশি ভাগ্যবান—আমার অতি সুন্দর বস যে যেকোনো মেয়েকেই তার চেহারা ও অমায়িকতা দিয়ে পটায়ে ফেলতে পারত, কিন্তু তা না করে সে এতগুলো বছর একটা মেয়েকেই ভালবাসছে এবং অবশেষে তাকেই বিয়ে করছে। নাকি সিলভি সিনহা যে বারো বছরের সম্পর্কের ইতি ঘটার পর এমন একজনকে স্বামী হিসেবে পেয়েছে যে তাকে এরচেয়েও বেশি সময় ধরে নিঃস্বার্থভাবে এক তরফা ভাল বেসে গেছে?
আনিসা একটু থেমে দর্শকদের দিকে তাকায়। মৃদুস্বরে বলে, আমাদের আসলে কাকে ভালবাসা উচিৎ? যে আমাদের ভালবাসে নাকি যাকে আমরা ভালবাসি? আনিসা চুপচাপ কিছু মুহুর্ত দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
দর্শকসারীর সকলের চোখেমুখে একটা অস্থিরতা। কমেডি দেখতে এসে এ কি দর্শনে পড়ে গেলাম—এটাই যেন ভাবছে তারা।
আনিসা জোরে হেসে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, উত্তরটা সবাই ইন্সটাগ্রামে দিয়ে দিবেন! দ্যাট ওয়াজ মাই টাইম। ধন্যবাদ সবাইকে।