Story

বিকেলের রোদ ও কিছু পুরোনো ধুলো

July 13, 2025

Zidan

259 views


সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই কেমন যেন থমথমে ছিল। কারওয়ান বাজারের মোড়ে জ্যামে আটকে থাকা অবস্থায় অনিরুদ্ধের মনে হলো, এই শহরটা আসলে একটা মস্ত বড় ঘড়ি। এখানে সবাই সেকেন্ডের কাঁটার সাথে দৌড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ জানে না তারা ঠিক কোথায় পৌঁছাতে চায়।

অনিরুদ্ধ পেশায় একজন আর্কিটেক্ট। বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়। ঢাকা শহরের বুকে বড় বড় কর্পোরেট ভবন আর বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের নকশা করা তার কাজ। কাঁচ আর কংক্রিটের সেই জাঁকজমকপূর্ণ কাঠামোর আড়ালে মানুষের মনগুলো যে কতটা সস্তা আর ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে, সেটা সে প্রতিদিন নিজের অফিসেই টের পায়। সপ্তাহের সাতটা দিনই তার কাটে ল্যাপটপের স্ক্রিন, ক্লায়েন্ট মিটিং আর সাইট ভিজিটের ব্যস্ততায়।

ফোনের রিংটোনটা বেজে উঠতেই অনিরুদ্ধর ভাবনায় ছেদ পড়ল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে তার ছোট বোন অনিন্দিতার নাম। অনিন্দিতা থাকে সিলেটে, তার শ্বশুরবাড়িতে।

"হ্যালো, অনু? কী খবর রে?" অনিরুদ্ধ গাড়ির এসিটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
ওপাশ থেকে অনিন্দিতার গলাটা কেমন যেন ভারী শোনাল, "ভাইয়া, তুই কি আজকেও খুব ব্যস্ত?"
"আরে না, বল। সাইটে যাচ্ছি। কী হয়েছে?"
"বাবা কাল রাতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। প্রেসারটা অনেক নেমে গিয়েছিল। ডাক্তার এসে দেখে গেছেন, এখন অবশ্য একটু ভালো। কিন্তু বাবা বারবার তোর কথা জিজ্ঞেস করছেন। তুই শেষ কবে বাড়ি এসেছিস, মনে আছে তোর?"

অনিরুদ্ধ চুপ করে রইল। গত দেড় বছরে সে মাত্র একবার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে গেছে, তা-ও মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার জন্য। প্রতিবারই যাওয়ার কথা হলে কোনো না কোনো জরুরি মিটিং বা প্রজেক্ট সাবমিশনের অজুহাত চলে আসে।

"আমি এই উইকেন্ডেই আসছি, অণু। বাবাকে বলিস চিন্তা না করতে," অনিরুদ্ধ মৃদু স্বরে বলল। কিন্তু সে নিজেই জানত না, সামনের শুক্রবারে তার একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সাথে ডিল ফাইনাল করার কথা আছে।

২.
অফিসে পৌঁছেই অনিরুদ্ধ দেখল তার টেবিলের ওপর ফাইলের পাহাড়। লাঞ্চের সময় যখন সে কফি কাপে চুমুক দিচ্ছিল, তখন তার চোখ গেল জানালার বাইরে। বহুতল অফিসের কাঁচের ওপারে দেখা যাচ্ছে একটা জীর্ণ পুরোনো ছাদ। সেখানে একটা ছোট টবে কয়েকটা শিউলি ফুলের গাছ। একটা ছোট ছেলে, সম্ভবত কোনো গৃহকর্মীর সন্তান, খুব যত্ন করে গাছটায় জল দিচ্ছে।

সেই দৃশ্যটা অনিরুদ্ধকে এক ঝটকায় তার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। ময়মনসিংহের সেই টিনের চালের বাড়ি, যার উঠোনে একটা বিশাল শিউলি গাছ ছিল। শরৎ আর হেমন্তের সকালে পুরো উঠোন সাদা ফুলে ভরে থাকত। তার বাবা, যিনি ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ভোরে উঠে সেই ফুলগুলো কুড়াতেন আর অনিরুদ্ধকে বলতেন, "প্রকৃতির এই সহজ সুন্দর জিনিসগুলোকে ভালোবাসতে শেখো অনু। এগুলোই দিনশেষে মনে শান্তি দেয়।"

তখন অনিরুদ্ধ বাবার এই কথাগুলোকে খুব সাধারণ ভাবত। তার স্বপ্ন ছিল বড় শহরে গিয়ে বড় মানুষ হওয়া, অনেক টাকা উপার্জন করা। আজ সে বড় মানুষ হয়েছে, শহরের নামী ক্লাবে তার যাতায়াত, কিন্তু প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তাকে একটা ঘুমের ওষুধ খেতে হয়।

সেদিন বিকেলে অনিরুদ্ধ একটা মস্ত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। সে তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকে বলল, "শুক্রবার থেকে রবিবারের সব মিটিং ক্যানসেল করো। আমি ঢাকার বাইরে যাচ্ছি।"
অ্যাসিস্ট্যান্ট অবাক হয়ে বলল, "স্যার, কিন্তু শুক্রবার তো সেই কোরিয়ান কোম্পানির সাথে..."
"আমি বলেছি ক্যানসেল করতে," অনিরুদ্ধর গলাটা ছিল শান্ত কিন্তু দৃঢ়।

৩.
শুক্রবার সকালে নিজের গাড়িটা গ্যারেজে রেখে অনিরুদ্ধ বাসে করে রওনা দিল। সে চেয়েছিল এই যাত্রাটায় কোনো লাক্সারি না থাকুক, ঠিক যেভাবে সে ছাত্রজীবনে বাড়ি ফিরত।

বাস যখন মহাখালী টার্মিনাল ছেড়ে গাজীপুরের রাস্তা ধরল, তখন অনিরুদ্ধর মনে হলো সে একটা বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়েছে। দুপাশের ইট-পাথরের জঙ্গল পেরিয়ে যখন আস্তে আস্তে সবুজ ধানক্ষেত আর শালবন দেখা দিতে শুরু করল, তখন তার বুকের ভেতরটা হালকা হতে লাগল।

বিকেলের দিকে বাস যখন তাকে ময়মনসিংহের চেনা মোড়টায় নামিয়ে দিল, তখন সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। একটা চেনা সোঁদা মাটির গন্ধ তার নাকে এলো। সে একটা রিকশা নিল। চেনা গলি, চেনা মোড়ের চায়ের দোকান—সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে, শুধু মানুষগুলো কেমন যেন একটু বুড়িয়ে গেছে।

বাড়ির লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই অনিরুদ্ধর চোখ ছলে উঠল। উঠোনের সেই শিউলি গাছটা আর নেই, কয়েক বছর আগে ঝড়ে ভেঙে পড়েছিল। বারান্দার ইজি চেয়ারটায় বসে আছেন তার বাবা, আশুতোষ বাবু। গায়ে একটা পুরোনো শাল জড়ানো, হাতে চশমা। চোখ দুটো আধা-বোজা।

অনিরুদ্ধ পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। "বাবা..."

আশুতোষ বাবু চমকে চোখ খুললেন। চশমাটা চোখে দিয়ে ভালো করে তাকিয়েই ওনার মলিন মুখটা এক অদ্ভুত আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি কাঁপতে কাঁপতে চেয়ার থেকে ওঠার চেষ্টা করলেন। অনিরুদ্ধ দ্রুত গিয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরল। ওনার শরীরটা কত ছোট আর দুর্বল হয়ে গেছে, অনিরুদ্ধ আগে কখনো খেয়াল করেনি।

"অনু! তুই এসেছিস বাপ? না বলে কয়ে?" বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

"হ্যাঁ বাবা। কদিন ছুটি নিলাম," অনিরুদ্ধ ওনার পাশে মেঝেতে বসে ওনার শুকনো হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিল।

৪.
সেদিন রাতে অনেকদিন পর অনিরুদ্ধ ল্যাপটপ বা ফোন ছাড়া ডিনার করল। মায়ের হাতের সাধারণ ডাল, আলুভর্তা আর রুই মাছের ঝোল যেন পৃথিবীর যেকোনো ফাইভ স্টার হোটেলের খাবারের চেয়ে সুস্বাদু ঠেকল।

রাতের খাবার শেষে বাবা আর ছেলে বারান্দায় গিয়ে বসলেন। আকাশে তখন এক ফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। চারপাশ নিঝুম, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ঢাকার সেই যান্ত্রিক কোলাহলের পর এই নীরবতা যেন অনিরুদ্ধর কানে এক মধুর সঙ্গীতের মতো লাগল।

আশুতোষ বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "জানিস অনু, মাঝে মাঝে খুব একা লাগে। তোর মা চলে যাওয়ার পর এই বাড়িটা বড্ড বড় মনে হয়। অনিন্দিতা তো তার সংসারে ব্যস্ত। আর তুই তো মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার, কত বড় বড় দালান তুলছিস শহরে।"

অনিরুদ্ধ মাথা নিচু করে বলল, "দুঃখিত বাবা। আসলে কাজের এত চাপ থাকে..."

"আমি তোকে দোষ দিচ্ছি না রে পাগল," বাবা হাসলেন, এক পরম স্নেহের হাসি। "আমি জানি এই যুগের নিয়মটাই এমন। টিকে থাকতে হলে দৌড়াতে হয়। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস অনু, যে দালান মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দেয়, তা যদি নিজের ভেতরের মানুষটাকেই গ্রাস করে নেয়, তবে সেই দালানের কোনো মূল্য নেই। তুই কত বড় আর্কিটেক্ট হলি, সেটা দিয়ে আমি তোকে বিচার করি না। তুই কতটা শান্তিতে আছিস, সেটাই আমার কাছে আসল।"

বাবার এই একটা কথা অনিরুদ্ধর বুকের ভেতরের সব অহংকার আর জটিলতাকে এক নিমেষে ধুয়ে মুছে দিল। সে বুঝতে পারল, সে এতদিন যে সাফল্যের পেছনে ছুটছিল, তা আসলে একটা মরীচিকা।

৫.
পরের দুটো দিন অনিরুদ্ধ ফোনে কোনো অফিসের কল ধরল না। সে বাবার সাথে বাজারে গেল, পুরোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিল, আর বিকেলে বাবার সাথে নদীর পাড়ে গিয়ে বসল। সেখানে বসে নদীর শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, মানুষের আসলে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না সুখী হওয়ার জন্য। একটুখানি সময়, কিছু চেনা মানুষ আর মনের শান্তি—এই তো জীবন।

রবিবার বিকেলে যখন তার ঢাকায় ফেরার সময় হলো, তখন আশুতোষ বাবু গেট পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। ওনার হাতে একটা ছোট প্লাস্টিকের কৌটো, তাতে বাড়িওয়ালাদের গাছ থেকে পেড়ে আনা কিছু তাজা লেবু আর মায়ের হাতের তৈরি আচার।

"আবার আসিস বাবা, সময় পেলে," আশুতোষ বাবু বললেন। ওনার চোখে এবার আর কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু এক বুক আশীর্বাদ।

অনিরুদ্ধ বাসে উঠে জানালার পাশে বসল। বাস যখন আবার ঢাকার দিকে ছুটতে শুরু করল, তখন অনিরুদ্ধর পকেটে ফোনটা অনবরত কাঁপছিল অফিসের নোটিফিকেশনে। কিন্তু এবার আর সে অস্থির হলো না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে, এবার ঢাকায় গিয়ে সে তার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বারান্দায় একটা মস্ত বড় শিউলি ফুলের টব বসাবে। আর প্রতি মাসে অন্তত একবার, এই ফেরার পথটায় সে আবার ফিরে আসবে।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login