পারফরম্যান্স শেষ করে কর্নারের একটা টেবিলে বসে কোল্ড ড্রিংকস খাচ্ছে আনিসা। মাঝেমাঝে কয়েকজন এসে তার সাথে কথা বলছে। এক মধ্যবয়স্ক মহিলা হাসিমুখে এগিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে বলে, আমি উত্তরা থেকে শুধুমাত্র তোমার স্ট্যান্ডআপটা দেখার জন্য এসেছিলাম। খুবই ভাল ছিল। নেক্সট শো এর আপডেট ইন্সতাতে জানিও।
আনিসাও হাসি মুখে তার সাথে হাত মেলায়। আসার জন্য ধন্যবাদ। অবশ্যই জানিয়ে দিব।
মহিলাটি চলে গেলেই সামনে দাঁড়ানো এক ছেলের দিকে নজর পড়ে আনিশার। ছেলেটি হাসি দিয়ে এগিয়ে আসে।
আনিসা বলে, আমি ভাবলাম আজ আপনি আসেন নি।
ছেলেটি মৃদু শব্দ করে হাসে। বলে, আপনার শো আর আমি আসব না, এমনটাও সম্ভব?!
তো, কেমন লাগল?
সবসময়ের মত। অসাধারণ।
দুইজনই হাসে। তাদের চোখে-মুখে সামান্য লজ্জার আভা। যেন নতুন নতুন প্রেমের সূচনা। ছেলেটির নাম নাবিদ। মাস খানেক আগে আনিসার আরেক শো-তে তাদের প্রথম পরিচয় হয়।
দিনটি ছিল শনিবার। শো শেষে আনিসা কাউন্টারে বসে একখানা আইস টি পান করছে আর উদাসীন চোখে তার বয়সী অন্যান্যদের জীবন উপভোগ করতে দেখছে। তখনই ধীর পায়ে এগিয়ে আসে নাবিদ। বলে, শো-টা খুবই ভাল ছিল।
আনিসা আড় চোখে নাবিদের দিকে তাকায়। পা থেকে মাথা স্ক্যান করার মত একবার দেখে নেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদুকণ্ঠে বলে, ধন্যবাদ।
গল্পগুলো খুবই মজাদার ছিল। আমি নাবিদ—বলতে বলতে আনিসার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় নাবিদ।
আনিসা সোজা হয়ে নাবিদের দিকে মনোযোগ দিয়ে বসে তার সাথে হ্যান্ডশেক করে। বলে, আনিসা।
নাবিদ হাসে। বলে, জী, আনিশা হোসাইন, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, শুনলাম এতক্ষণ আপনাকে।
আমার জীবন একখানা খোলা বই হয়ে গেছে। সবাই সব জানে।
নাবিদ শব্দ করে হাসে। পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলে, অন্তত আপনার কাছে বলার মত অনেক গল্প আছে।
সবার জীবনেই গল্প আছে। তফাৎ শুধু কিছু মানুষ গল্প বলতে পারে আর কিছু মানুষ পারে না। আনিসা হাসি দিয়ে নাবিদের দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে, আপনার ব্যাপারে কিছু বলবেন নাকি আমাকে অনুমান করে নিতে হবে?
নাবিদ বলে, নাম তো বললামই। এমবিএ শেষ করে এখন একখানা এমএনসিতে আছি ছয় বছর হল। বর্তমানে বন্ধুদের সাথে একটা স্টার্টআপের চিন্তাভাবনা করছি।
অ্যানুয়াল কত আপনার?
জী? নাবিদের মনে হল ভুল কিছু শুনেছে। দশ মিনিটের আলাপে কোনো মেয়ে যে বেতন জিজ্ঞেস করবে এমন অভিজ্ঞতা তার পূর্বে হয় নি।
আনিসা মাথা চুলকে, ভ্রু কুঁচকে বলে, এমবিএ থেকে এমএনসি, ভাল বেতন পাওয়ার কথা আপনার। আমিও একখানা এমএনসিতে আছি, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ড, এখনও ইন্টার্ন পর্যায়ে তাই বেতন নামেমাত্র আর কি।
নাবিদ হাসে। বলে, জী, বেতন ভাল। এই জন্যই চাকরিটা ছাড়ছি না।
কত? একটা ধারণা দিন শুধু।
নাবিদ হালকা হেসে বলে, ট্যাক্সের পর নয় এর কাছাকাছি— একখানা প্রোমোশনের কথাবার্তা চলছে, সেটা হলে হয়ত দশ পেরুবে।
আনিসা অবাক হয়ে নাবিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
নাবিদ ডাকে, আনিসা?
আনিসা টেবিলে থাকা বরফ গলে পানি হয়ে যাওয়া আইস টি-টা এক ঢোকে গিলে ফেলে। এরপর নাবিদের দিকে তাকিয়ে বলে, ইঞ্জিনিয়ারিং করে বড় ভুল করেছি! এমবিএ করা উচিৎ ছিল! আমার তো টেনেটুনেও পাঁচের কাছে যাবে না!
নাবিদ শব্দ করে হেসে দেয়। আপনি এখনও প্রোবেশন পিরিয়ডে আছেন। আমি ছয় বছর ধরে চাকরি করছি!
আনিসা তাকিয়ে তাকে হাসতে দেখে। এটা-ওটা নিয়ে তাদের কথা চলতে থাকে আরও কিছুক্ষণ।
বাসায় আসার পর ইন্সটাগ্রামে সেদিনের শো-এর রেস্পন্স দেখতে ঢোকে আনিসা। নোটিফিকেশন ভর্তি লাভ রিয়্যাক, কমেন্ট এবং ফলোর মাঝে অল্প একটু খানি ইংরেজি বর্নমালায় লেখা, ‘itz-me-nabid’। আনিসা ফলো ব্যাক দেওয়ার কিছুক্ষণের ভেতরই ম্যাসেজের নোটিফিকেশন আসে। ম্যাসেজে লেখা, ‘ঠিকমতো বাসায় পৌঁছিয়েছেন?’ এখান থেকেই শুরু। অনবরত চ্যাট, মাঝে মাঝে ফোনে আলাপ, আর শোয়ের দিনগুলোতে দেখা তো হচ্ছেই।
আজকের শোয়ের পর তাদের আবার দেখা। ধীর গতিতে গল্প করতে করতে রাস্তায় হাঁটছে তারা।
নাবিদ বলে, এভাবে বসের নামে কমেডি করছেন, বিষয়টা চাকরিতে প্রভাব ফেলবে না।
আনিসা হাসে। এত ছোট পরিসরের কমেডি তাদের পর্যন্ত পৌছাবে কি করে! আর এগুলো সোস্যাল মিডিয়ারতেও দিব না। তাই আশা করি তারা জানবে না।
আমি যদিও আজ কিছুটা ভিডিও করেছিলাম। ভেবেছিলাম সোস্যাল মিডিয়াতে দিব।
নো, প্লিজ। আমার চাকরি চলে যাবে।
দুইজনই হাসে।
নাবিদ বলে, চলে গেলেই ভাল হয়। তাহলে হয়ত আপনি আমার প্রস্তাবটা নিয়ে ভাববেন।
আনিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এখানে আমি এখন মানিয়ে নিয়েছি। সামনের মাসে চাকরিটাও পার্মানেন্ট হয়ে যাবে। তখন ইনক্রিমেন্টও পেয়ে যাব। উপরের দিকে তাকিয়ে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে—তাছাড়া আমার সাথে যারা কাজ করছে তাদের কারো ব্যাকগ্রাউন্ডই স্ট্রোং নয়। দুই-একটা প্রোজেক্টে চোখে পড়ার মত কাজ করতে পারলে হয়ত বা পরবর্তী বছরেই একটা প্রোমোশনের চেহারা দেখতে পারি। তখন বেতন দ্বিগুন হয়ে যাবে।
বুঝলাম। তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি আমাদের যোগাযোগটা থেমে যাওয়ার সময় হয়ে যাচ্ছে।
আনিসা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনার স্টার্টআপে যুক্ত না হলে আপনি যোগাযোগ রাখবেন না?
নাবিদ হাসে। বলে, তা কেন হবে? স্টার্টআপের কাজ পুরো দমে শুরু হলে ওতটা সময় পাব না। এই যে ঘুরাঘুরি, সোস্যাল মিডিয়াতে ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট করা, সেটা আর করতে পারব না। মুচকি হেসে বলে, তাই ভেবেছিলাম আপনি আমাদের সাথে যুক্ত হলে যোগাযোগটা থাকত। আমারও আপনার মত একজন দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলপার প্রয়োজন ছিল। নাবিদ আনিসার দিকে আশা নিয়ে তাকায়।
আনিসাও অবাক হয়ে নাবিদের কথা শোনে। এই একটা মাসে নাবিদ তাকে যতটা মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় বোধ করিয়েছে, সারা জীবনেও কেউ তা করায় নি।
আলিশার মত মুখ ফুটে না বললেও আনিসারও অবশ্যই মনে হয় পরিবারে সে অবহেলিত। বোনদের তুলনায় রূপ-গুন কোনো দিকেই সে এগিয়ে নয়। তাই ছোট থেকেই নিজের ভেতর কিছুটা কমতি-খামতি আছে—এটা মেনে নিয়েই বড় হয়েছে সে। কিন্তু কেন নিজেকে সে বোনদের সাথে তুলনা করতে যায় তা সে কখনও ভাবে না। মারজিয়া যখন দেশের তিনজন নারী নিউরোসার্জনের একজন, আলিশা যখন তার কর্মক্ষেত্রে একমাত্র নারী— এই তুলনা আনিসাকে বুঝায় যে সে বিশেষ নয়, তার ভেতরে কিছুর কমতি আছে। কিন্তু বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন।
দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভেতর থেকে নির্বাচিত কয়েক হাজার শিক্ষার্থীই মাত্র পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বেছে বেছে মাত্র শ-খানেক শিক্ষার্থী সুযোগ পায় দেশের নামকরা এই প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই–তে পড়ার। বোনদের মতো প্রথম সারীতে জায়গা না হলেও, খুব দূরে নয় সে। পাশ করার পরপরই, দেশের অন্যতম সেরা মাল্টি ন্যাশনাল প্রতিষ্ঠান, ‘মেস্ট্রো’—তে ইন্টার্ন করার সুযোগ পেয়ে যায়। তবুও তার মনে কিছুটা কষ্ট রয়ে গিয়েছে প্রথম পছন্দ ‘ইউনিকর্ন গ্রুপ’-এ চাকরি না পাওয়ার। রূপের দিক দিয়েও যে সে পিছিয়ে এমন কিছুই না। গায়ের রং-টা উজ্জ্বল শ্যামলা। চোখ দুটোতে এতটা মায়া ভরা, যে একবার দেখবে সে দেখতেই থাকবে। কিন্তু তুলনা সুন্দর থেকে সুন্দর মানুষকে অসুন্দর বোধ করায়। আর এই মিথ্যা বোধ-বিশ্বাস থেকেই মানুষ ভুল পথে পা বাড়ায়, ভুল মানুষের কাছে শান্তি খোঁজে।
আনিসা তাকিয়ে নাবিদের দিকে তাকায়। বলে, আমার পরিস্থিতিটা আপনাকে আমি আসলে বুঝাতে পারছি না। ওখানে গিয়ে আমার আবার নতুন করে স্যাটেল হতে হবে। আমি এখানে কাজ করি বা আপনার কোম্পানিতে, দুটোই আমার জন্য চাকরি।
আমার সাথে কাজ করাটা কি শুধুই চাকরি হবে?
আনিসা অবাক হয়ে তাকায়। তার কান দুটো লাল হয়ে যায়। আর কি হবে তাহলে?
না, মানে ভাবলাম, অন্য কিছুও তো হতে পারে। নাবিদও আর কিছু না বলে লজ্জায় এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। বাসস্ট্যান্ডে দুইজন দাঁড়ায় বাসের অপেক্ষায়। আনিসাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে নাবিদ চলে যাবে। বাসে উঠে জানালা দিয়ে নাবিদকে উদ্দেশ্য করে হাত নাড়ে আনিসা। নাবিদও হাত নাড়ে।
বাস চলে যায়। আনিসাকে ঘিরে ধরে শুন্যতা। মাথা ভরে ওঠে বিভ্রান্তিতে।
আনিসা সোফায় বসে মোবাইল চালাচ্ছে। আলিশা এসে মোবাইলে উঁকি দেয়। মোবাইলের স্ক্রিনে বাচ্চা হাতে সুদর্শন এক লোককে দেখা যায়। আনিসা ঘুরে আলিশার দিকে তাকিয়ে হাসে।
ফোনটা এগিয়ে আলিশাকে দেখাতে দেখাতে বলে, কিউট না?
হুম, সিলভি সিনহার কবে বাচ্চা হল?
আরে, বাচ্চার কথা কে বলছে! বাচ্চারা তো সবাই কিউট। বিরক্তির সাথে ফোনটা সড়িয়ে নেয় আনিসা। আর এটা সিলভির বাচ্চা না, রিফতি শাহর মেয়ে। আমার বসের গডচাইল্ড, প্রায়ই ওর সাথে ছবি দেয়। এত্তত্ত কিউট কিভাবে হয় একটা মানুষ! আলিশা টেনে আনিশার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বাচ্চাটাকে দেখে।
এগুলো কি ধরনের অসভ্যতা, আলু!
এটা পারসা হাসান আর রিফতি শাহয়ের মেয়ে?
আনিসা খানিকটা অবাক হয়ে আলিশার দিকে তাকায়। কেন? কোনো সমস্যা আছে?
না, কিছু না। মোবাইলটা ফেরত দিয়ে দেয়। মাথায় দামীর বলা কথাগুলো ঘুরতে থাকে আলিশার। চুপচাপ সোফায় বসে।
মারজিয়া নিজের রুম থেকে একটা বই হাতে বের হয়ে আসে। তার ভেজা চুলগুলো ঘাড়ের সাথে লেগে আছে। কোনো দিকে মনোযোগ না দিয়ে সোফাতে বসে। আলিশা উঠে গিয়ে রুম থেকে একটা গামছা এনে মারজিয়ার চুলগুলো মুছে থাকে। মুছতে মুছতে বলে, আপু, আগামী শুক্রবার তোর কিছুটা সময় হবে?
কেন?
জাকির বাবা-মা কথা বলতে বাসায় আসবে বলল।
ঠিক আছে। বই থেকে মুখ পর্যন্ত তুলে না মারজিয়া। আনিসা হাসি দিয়ে আলিশার দিকে তাকায়।