সকাল চারটায় বাসার প্রথম অ্যালার্মটা বাজে আলিশার ঘরে। উঠে হাতমুখ ধুয়ে নামায পড়ে সোজা রান্নাঘরে চলে যায় সে। চুলায় বড় সাইজের একখানা পাতিলে কিছুটা পানি দেয়। পানি গরম হয়ে গেলে তাতে আটা ঢেলে ভাতের চ্যারার সাহায্যে ভাল করে পানির সাথে মিশিয়ে নেয়। এরপর বড় একখানা ঢেকছিতে গরম পানি মেশানো আটাটা ঢালে। সেটা চ্যারা দিয়ে নেড়েচেড়ে ঠান্ডা করে নেয়। এরপর হাত দিয়ে মেজে মেজে ডো তৈরি করে। অল্প অল্প ডো নিয়ে রুটি বেলা শুরু করে। রুটি বেলা শেষ করে নিজের ঘরে যেয়ে ট্রাক স্যুট বদলে নেয়। জিম ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায় আলিশা। তার জিম বাসা থেকে কাছেই। কিছুটা পরে বাড়ির অন্যান্যরাও ফযরের নামাযের উদ্দেশ্যে জেগে ওঠে। সাদিকও মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হয়।
আনিশা নামায শেষে ঘর থেকে বেড়িয়ে সোজা রান্নাঘরে যায়। ফ্রিজ থেকে আলু, পটল, গাজর বের করে নিয়ে সেগুলো ধুয়ে, ভাজির জন্য কুচি কুচি করে কাটতে থাকে। কাটাকুটি শেষ করে চুলায় বসিয়ে দিয়ে ঘর থেকে ইয়োগা ম্যাট এনে বারান্দায় ইয়োগা করতে শুরু করে।
নামায শেষে কয়েক পাতা কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস মারজিয়ার। অভ্যাসটা তার মাকে দেখেই শেখা। মিলি এখনও প্রতি সকালে কোরআন তেলাওয়াত করে। তেলাওয়াত শেষে ঘর থেকে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বের হয়ে আসে। সোজা রান্নাঘরে যায়। চুলায় একখানা চায়ের পাতিল বসিয়ে তাতে পানি দেয়। সাথে ভাজিটাও হয়েছে কিনা দেখতে থাকে। পানিটা ফুটে উঠলে একটা মগে পানি ঢেলে নেয়। কেবিনেট থেকে একখানা গ্রিন টির টিব্যাগ নিয়ে মগের পানিতে দেয়। টিব্যাগটা খানিকটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে এরপর মগের গ্রিনটি টুকু একখানা সিপারে ভরে নেয়। ভাজিটা হয়ে গেলে সেটা উঠিয়ে সেই চুলায় তাওয়া বসিয়ে রুটি ছেকতে শুরু করে। দুটো রুটি ছেকে একখানা থালায় তোলে। একটা বাটিতে সামান্য ভাজি নিয়ে রুটির থালা সহ ডাইনিং টেবিলে আসে। ঝটপট খেয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে। সকাল সাড়ে ছয়টার ভেতর তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়।
ততক্ষণে সাদিকও ফিরে আসে। মিলিও কোরআন তেলাওয়াত শেষ করে রান্নাঘরের দিকে যায়। বাকি রুটিগুলো ছেকতে আরম্ভ করে। চারখানা বাটিতে ভাজি বেরে ডাইনিংয়ে নিয়ে আসে। আনিসা ইয়োগা শেষ করে গোসলের উদ্দেশ্যে রুমে চলে যায়। আলিশাও ফিরে এসে গোসলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।
আনিসা তোয়াল মাথায় রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের পাতিলে পানি দেয়। পানি খানিকটা গরম হলে তাতে গুড়া দুধ দিয়ে নারিয়ে-চাড়িয়ে মিশিয়ে নেয়। খানিক পরে আলিশাও চুল মুছতে মুছতে রুম থেকে বেড়িয়ে আসে। বারান্দায় তোয়ালটা শুকাতে দিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। মগে খানিকটা চিনি-কফি নিয়ে চামচ দিয়ে সেটাকে বেশ অনেকক্ষণ যাবত মাখিয়ে ঘন করে। এরপর চুলার দুধ উপর থেকে মগে ঢেলে দেয়। পুরো মগ জুড়ে ফেনা হয়ে আসে আর আলিশার মুখে বিরাট একখানা হাসি। প্রতি সকালেই ফেনা হয়, তবুও এই চিনি-কফির মিশ্রণের ফেনা হওয়াটা দেখতে যেন তার বড্ড ভাল লাগে। বাকি দুধে আনিসা চা পাতা ঢেলে দেয়। ধীরে ধীরে সাদা দুধটা চায়ের বাদামি রঙ হয়ে যায়, তবে পাতিলের কর্নারে কিছুটা দুধের সাদা ফেনা থেকে যায়। আনিসা চামচ দিয়ে নেড়ে ভালভাবে চা পাতিটা মিশিয়ে দেয়। চা হয়ে গেলে এক কাপ চা কাপে ছেকে নিয়ে বাকি চায়ে দুই চামচ চিনি মিশিয়ে নেয়। চা ছেকে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে এসে বাবা-মায়ের প্লেটের পাশে রাখে। চিনি ছাড়া চা-টা নিজের প্লেটের পাশে রাখে। সবাই মিলে নাস্তা করে। সাদিক পত্রিকা হাতে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। নাস্তা শেষে রেডি হয়ে দুই মেয়েসহ বাবা অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
দুই হাতের দুটো করে আঙ্গুল রুগীর দিকে এগিয়ে দিয়ে মারজিয়া বলে, একটু শক্ত করে আমার আঙ্গুলগুলো আঁকড়ে ধরবেন। হাতে তার নীল রঙয়ের গ্লাভস পরা। বয়স্ক পুরুষটি তার কথা মত আঙ্গুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। মাথার উপরের অংশটা ব্যান্ডেজ করা তার।
মারজিয়া আদর মাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করে, বাবা, আজ কি বার?
আদো আদো করে উত্তর দেয় রুগীটি, রবিবার—বুঝা যায় কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার।
কোথায় আছি এখন আমরা?
হাসপাতালে।
আমি কে বলুন তো? মিষ্টি একখানা হাসি দিয়ে লোকটির দিকে তাকায় মারজিয়া।
সার্জন হোসাইন—আমার অপারেশন করেছো।
মারজিয়া পকেট থেকে ছোট একটা সাদা লাইট বের করতে করতে বলে, আমি এখন আপনার চোখটা একটু দেখো নেব। হালকা একটু লাইট দিব, আপনার সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন। মারজিয়া লাইটটা তার চোখের সামনে ধরে। লোকটা চোখ বড় বড় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মারজিয়া তার পিউপিলগুলো পরীক্ষা করতে থাকে। আরও বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে।
আপনি একদম ঠিক আছেন। সবকিছু ঠিকঠাক কাজ করছে, কোনো প্রকার সমস্যা নেই। রোগীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একখানা হাসি দেয় মারজিয়া। বিদায় জানিয়ে বলে, আমি আসি তাহলে এখন? আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন। পাশে রিপোর্ট হাতে দাঁড়ানো নার্সের দিকে তাকায়। পাশে রুগীর পরিবার দাঁড়ানো। নার্সের দিকে তাকিয়ে বলে, প্রতি পনের-বিশ মিনিট পর পর জিসিএসটা চেক করতে হবে, এর রিপোর্টটা আমাকে দিবেন। একটু থেমে রোগীর পরিবারের দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলে, সেই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে কোথায় শিফট করা হবে সে সিদ্ধান্ত নিব আমরা। আশা করছি আইসিইউ বা এইচডিআরের প্রয়োজন হবে না। হাসি মুখে পরিবারের সদস্যদের জানায় মারজিয়া, দুইদিন বাদে একটা সিটি স্ক্যান করতে হবে। সিটি স্ক্যানের রিপোর্টটা ভাল আসলে এরপর আমরা নিশ্চিত থাকতে পারব।
ইমারজেন্সি ইউনিট থেকে বের হয়ে আসে মারজিয়া। সাথে দাঁড়িয়ে থাকা নার্সের দিকে তাকায়।
নার্স বলে, ম্যাডাম, আমি রিপোর্টগুলো আপনার টেবিলে রেখে আসি। মারজিয়া মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানায়।
একজন সাদা এপ্রোন পরিহিত ডাক্তার পেছন থেকে আসে। বলে, আরেকখানা হাই-প্রোফাইল কেস? শুনলাম উনি নাকি কোন প্রতিমন্ত্রীর শ্বশুর?
এই হাসপাতালে সাধারণ মানুষের আসার সামর্থ্য বা আছে কই! মারজিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একজন ইন্টার্ন মারজিয়াকে দূর থেকে দেখে দৌড়ে আসে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ডীন ডাকছে আপনাকে। মারজিয়ার তার দিকে একবার তাকিয়ে হাঁটা শুরু করে।
দরজাটা সামান্য খুলে অনুমতি চায় মারজিয়া, আসব? ওয়াসিম হাত দিয়ে আসতে ইশারা করে। জারিনও সামনে বসে আছে, একখানা রিপোর্ট উল্টে-পাল্টে দেখছে। মারজিয়া চেয়ার টেনে বসে।
ওয়াসিম গম্ভীর কণ্ঠে বলে, সরকারি হাসপাতাল থেকে একখানা চ্যারিটি অপারেশনের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। আগামীকাল রুগীকে শিফট করা হবে এখানে। আমরা চাচ্ছি কালকেই অপারেশনটা করে ফেলার জন্য। জারিন তার হাতের ফাইলটা মারজিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়। মারজিয়া রিপোর্টগুলোতে চোখ বুলাতে থাকে।
আমি চেষ্টা করি যতটা এভোয়েড করা যায়। আমি জানি যে তোমরা এখানের সার্জারিতেই কতটা ব্যস্ত থাকো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কিন্তু টুকটাক না করলেও হয় না। সরকারি হাসপাতালগুলোর সাথে সুসম্পর্ক না থাকলে টিকে থাকা মুস্কিল। ওয়াসিম মারজিয়ার দিকে আশা নিয়ে তাকায়। মারজিয়া বুঝতে পারে জারিন ইতিমধ্যে মানা করে দিয়েছে।
অল ফ্যামিলি হাসপাতালের টপ নিউরোসার্জন জারিন খান। ইংল্যান্ড থেকে ডাক্তারি পড়ে এসেছে। দেশ-বিদেশের মেডিকেলের দুনিয়াতে তার ভাল নামডাক আছে। পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক ডাক্তারই এত কম বয়সে নিউরোসার্জারিতে এতটা দক্ষ হতে পেরেছে। বিশ্বের নানা নাম করা হাসপাতাল থেকে তাকে আমন্ত্রণ পাঠানো হয়। কিন্তু দেশ ছেড়ে সে যেতে চায় না। তবে এটাই তার একমাত্র পরিচয় না। খান ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মারজিয়া খানের ছোট কন্যাও এই জারিন খান। এই সেই মারজিয়া খান, যার নামে মিলি তার বড় মেয়ের নাম রেখেছিল। চাইলেই জারিন কোনোভাবে পড়াশোনা শেষ করে পারিবারিক ব্যবসায়ের অংশ হতে পারত কিন্তু তা না করে সে পড়েছে পৃথিবীর অন্যতম কঠিন একটি বিষয়। ডাক্তারি যে পেশার চেয়ে জারিনের শখই বেশি তা মারজিয়া ভালোই জানে। অপারেশনের সময় এক প্রকার শয়তানি হাসি লেগে থাকে তার চেহারায়। এই জন্যই হাসপাতালের অনেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে তাকে ‘শয়তান/ডেভিল’ বলে ডাকে।
জারিন মৃদু কণ্ঠে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, হাই-রিস্ক অপারেশন, লো চান্স অব সার্ভাইবিং।
আই উইল ডু ইট। মারজিয়া ফাইলটা বন্ধ করে ওয়াসিমের দিকে তাকায়।
জারিন অনুভূতিহীন চোখে মারজিয়াকে দেখে।
ওয়াসিম হাসি মুখে বলে, গ্রেট! ইউ আর আওয়ার হিরো!
আর কিছু না থাকলে আমি উঠলাম। মারজিয়া বিদায় জানিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে।
জারিন চুপচাপ বসে তাকে বেড়িয়ে যেতে দেখে।