গত বছর মে মাসের পর ফের রাজশাহীতে এসেছি। নওগাঁয় আড়াই বছর কাজ করার সুবাদে অসংখ্য বার আসতে হয়েছে। তখন থেকে রাজশাহী শহরকে একটু একটু করে চিনতে শুরু করি। এখানে আসলে মনে হয় দেশের বাইরের কোন শহরে আছি। নিঃসন্দেহে এটি একটি দারুণ অনুভূতি। এই দেশেও সুন্দর ও গোছানো শহর তৈরি করা যায়, রাজশাহী এর বাস্তব উদাহরণ। আজকে মনে পড়ে গেলো। প্রায় ৩০ বছর আগে এই শহরে প্রথম পা রেখেছিলাম।
খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারে তখন ১৯৯৬ সাল। আমরা দশম শ্রেণীর ছাত্র। শিশু একাডেমীর সাধারান জ্ঞান (দলগত) প্রতিযোগিতায় জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এরপর বিভাগ পর্যায়ে অংশগ্রহণ। সুখন, হাসান, প্রিন্স ও আমি, চার জনের দল, আর্মব্রান্ড আমার কাঁধে।
জেলার প্রোগ্রামে একটা ঝামেলা হয়। প্রতিযোগীদের প্রশ্ন করা হয়ে গেলে সেখানেই থাকার নিয়ম। আমাদের প্রশ্নোত্তর শেষ, বসে আছি। অন্যদের প্রশ্ন করার সময় খেয়াল করি, শারজাহ কাপ কোথায় অনুষ্ঠিত হয়? আমাদেরকে এই প্রশ্ন করা হয়নি। আমি আপত্তি জানাই। উনারা চেক করে দেখেন, আমাদের অভিযোগ সত্য। এই এক প্রশ্নের কারণে আমরা জেলা চ্যাম্পিয়ন হই। ফিরে আসি নিজ গৃহে। বিভাগে প্রতিযোগিতার সময় হয়ে আসে। আমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ জানালেন, তোমরা রাজশাহী চলে যাও। আয়োজকরা ওখানে সব রকমের ব্যবস্থা করেছে। নির্ধারিত দিনে পার্বতীপুর থেকে বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ধরে রাজশাহী চলে আসি।
ঠিকানা খুঁজে চলে যাই শিশু একাডেমী। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো একের পর এক চমক। জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছি। আমাদের জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে, হাতে একগুচ্ছ ফুলের তোড়া নিয়ে অপেক্ষা করে বিভাগীয় কর্মকর্তারা। পথ দেখিয়ে রুমে নেয়ার আগে লিভিং রুমে বসায়। আলাদা আলাদা গ্লাসে ঠাণ্ডা পানি, শরবত, সাথে বিভিন্ন প্রকার ফলমূল। খেয়ে সুন্দর মত রুম দেখিয়ে বলে, বাছারা অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছ। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নাও। বাবুর্চিকে বলা আছে। ছোট মাছের চচ্চড়ি, পটল দিয়ে দেশী মুরগীর ঝোল ও পাতলা মুগের ডাল রান্না করছে চানমিয়া বাবুর্চি।
স্যারদের কথায় মনে হয়েছিলো, আমাদের জন্য এরকম কিছু অপেক্ষা করছে। বিধি বাম। জানতে পারলাম, থাকা খাওয়া কোন কিছুর ব্যবস্থা নেই। আমাদের সাথে কোন গার্ডিয়ান নেই। হাতে যথেষ্ট টাকা নেই। হোটেলে থাকার মত। বাইরে খাওয়ার মত। আমাদের অন্তত দুই রাত থাকতে হবে। কারও সাথে যোগাযোগের কোন উপায় নেই। ত্রাতা হয়ে আসেন এক পুলিশ। তিনি হলেন প্রিন্সের মামা। ছোট পদে কাজ করেন। থাকেন ছোট এক কোয়ার্টারে। প্রিন্সের মামার বাসায় দুই রাত থাকলাম আমরা। রুমে ফ্লোরিং এর ব্যবস্থা করেন দেন মামী। বেশ আদর আপ্যায়ন করেন। ভাগনের বন্ধুদের নিজের ছোট বাসায় থাকতে দিয়েছেন। সাধ্যমত ভালো খাইয়েছে। মানুষ কত ভালো ছিল তখন। সে কথা এখনও ভুলিনি।
বিভাগের বৈতরণী পার হতে পারিনি আমরা। বিভাগ থেকে প্যাভিলিয়নে ফিরে আসি।
২।
ঠিক পরের বছর। ১৯৯৭ সাল। এসএসসির রেজাল্ট বেরিয়েছে। কলেজে ভর্তির জন্য দরকার প্রভিশনাল সার্টিফিকেট। একা চলে গেলাম রাজশাহী। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। আগেই শুনেছিলাম। সেই মোতাবেক দালাল ধরলাম। আজকে আর নামটা মনে করতে পারছি না। নির্দিস্ট ফি এর বাইরে অতিরিক্ত তিন/চার শ টাকা নিলেন। আমাকে অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে গেলেন।
বের হয়ে জানালেন, ছোটভাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। অফিসে কাজ চলছে। আমি কিছুক্ষণ পর এসে তোমার হাতে সার্টিফিকেট তুলে দিচ্ছি।
দুপুর হয়ে গেলো। খেয়ে নিলাম। বসে আছি। দালালের খবর নেই। নিজেই অফিসে ঢু মারলাম। কেউ কিছুই বলতে পারছে না।
বেলা শেষ হয়ে আসছে। আমার মাথা বিগড়ে গেলাম। খুঁজে খুঁজে সেই লোকের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। উনার ওয়াইফ ছিলেন বাসায়। সবকিছু বললাম। তিনি শেষে আক্ষেপ করে বললেন, হয়ত এতক্ষণে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে আছে। আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন।
অফিসে ফিরে আসলাম। জানতে পারলাম, অফিসের ফিও জমা দেয়নি। সব টাকা নিয়ে ভেগে গেছে। ভাবির এক আত্মীয় ছিলেন সম্ভবত বোর্ডের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। সকালে উনাকে পাই নি। ফের গেলাম। সব কিছু খুলে বললাম। আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। উনি উদ্যোগ নিলেন। ফি জমা দিলাম। উনার তাগিদে সার্টিফিকেট পেলাম।
তখন বেলা শেষ হয়ে এসেছে। পার্বতীপুর ফেরার আর কোন উপায় নেই। ভাইয়ার বন্ধু ফারুক ভাইয়ের বাসা খুঁজে বের করলাম। রাত্রি যাপন করলাম। পরদিন ভোরে ট্রেন ধরে বাড়িতে ফিরে আসলাম।
রাজশাহী । ১২ আগস্ট ২০২৫
262
View
Comments
-
Moriom Akhi
4 months ago
বিক্রি হয় কি?
-
Kazi Eshita
4 months ago
এখনও কি রাজশাহী যাওয়া হয়?