ক্লান্ত চোখে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে মারজিয়া। গাড়িতে মৃদু আওয়াজে সূরা আর-রহমান চলছে। হঠাৎ করে গাড়ির সামনে কিছু একটা চলে আসে। মারজিয়া দ্রুত ব্রেক করে। অল্পের জন্যে দুর্ঘটনা হয় না। দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির সামনে একটা পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা মেয়েকে দেখতে পায়। বাচ্চাটা ব্যাথা না পেলেও ভয়ে কান্না করতে থাকে। মারজিয়া এগিয়ে যায় বাচ্চাটার কাছে। আসেপাশের আরও কয়েকজন পথচারী এগিয়ে আসে।
মারজিয়া আদরমাখা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, বাবু, তুমি ঠিক আছো? আসেপাশে তাকিয়ে বলে, তোমার আম্মু কোথায়?
বাচ্চাটার পরনে পুরানো একটা ফ্রক, তেল দিয়ে উপরে উঠিয়ে কমলা রঙয়ের একটা ব্যান্ড দিয়ে চুল বাঁধা। বাচ্চাটা কাঁদতে থাকে। মারজিয়া বুঝতে পারে না কি করবে তাই বাচ্চাটাকে রাস্তার পাশে দাড়া করিয়ে গাড়িটা পার্ক করে। এরপর ফিরে এসে বাচ্চাটাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। রাস্তার পাশের দোকান থেকে বাচ্চাটার জন্য চিপস-আইসক্রিম কিনে আনে। চকলেট আর কোন আইসক্রিমটা দেখে অবশেষে বাচ্চাটার কান্না থামে। কথা না বাড়িয়ে সাথে সাথে আইসক্রিমটার প্যাকেট ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করে সে। মারজিয়া তাকিয়ে তার খাওয়া দেখে। বাচ্চাটার নাক বেয়ে সর্দি পড়ছে। মারজিয়া ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে সেটা মুছে দেয়। বাচ্চাটা মায়া চোখে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসে। মারজিয়াও হাসে।
অবশেষে মুখ খোলে বাচ্চাটা। বলে, আব্বা কখনও আমারে এইসব আইসক্রিম কিন্না দেয় নাই। এইগুলানের নাকি অনেক দাম!
তোমার নাম কি?
হামিদা। মিষ্টি একখানা হাসি দিয়ে বাচ্চাটা বলে।
তোমার আব্বু-আম্মু কোথায়?
মায় হাসপাতালে। আমার একখান ছোড বোন হইব। একটু থেমে বলে, আব্বা এইখানেই ছিল, আমারে রাস্তার পাশে বসতে বইলা হঠাৎ যেন কই চইলা গেল। বাচ্চাটা আইসক্রিমটা নামিয়ে গোমরা মুখে নীচে তাকিয়ে থাকে। মারজিয়া এক মুহুর্ত কিছু একটা ভাবে। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়।
আমার সাথে আসো। মারজিয়া হামিদার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আদরমাখা কণ্ঠে বলে। হামিদা হাত বাড়িয়ে মারজিয়ার হাতটা ধরে। মারজিয়া ওকে নিয়ে পাশের দোকানটাতে যায়।
মারজিয়া দোকানদারকে বলে, ভাই, এক কাপ কফি দিয়েন। হামিদার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি আর কিছু খাবে?
হামিদা মাথা নাড়িয়ে না বলে। তবে তার চোখ কিন্ডার জয়ের প্যাকেটটার দিকে আটকে আছে।
মারজিয়া হেসে বলে, ভাই, একটা কিন্ডার জয়ও দিয়েন। মারজিয়া দুইশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দেয়।
দোকানদার মারজিয়ার হাত থেকে টাকাটা নিয়ে নীচের ড্রয়ারে ভাংতি খুঁজতে খুঁজতে বলে, ওর বাপ-মায়ের কোনো খোঁজ পাইলেন, আপা?
ওর আম্মু আসেপাশের কোনো একটা হাসপাতালে আছে বলল। একটু দেখে আসি সেগুলোতে।
গাড়ির দরজাটা খুলে হামিদাকে উঠতে বলে। হামিদার দুই হাত, মুখ মেখে সদ্য কেনা কিন্ডার জয়টা খাচ্ছে। গাড়ির দিকে তাকিয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকে। এত সুন্দর ঝকঝকে, পরিষ্কার গাড়িতে উঠতে তার ইতস্তত বোধ হয়। তার সীট নষ্ট হলে যদি মারজিয়া তাকে মারে! ভয়ে ভয়ে মারজিয়ার দিকে তাকায় হামিদা। মারজিয়া তাড়া দিয়ে বলে, ওঠো!
হামিদা বিব্রতবোধের সাথে বলে, আমার পায় তো ময়লা।
তাতে কি হয়েছে! জলদি ওঠো! অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। মারজিয়া হাসি দিয়ে ওকে কোলে তুলে সীটে বসিয়ে দেয়। হামিদা নড়েচড়ে আরাম করে বসে। এত বড় গাড়িতে সে কখনও চড়ে নাই। মারজিয়া গাড়ি চালানো শুরু করে। হামিদা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে বাতাস অনুভব করে। তার চোখে-মুখে প্রশান্তি। সে যে এক অজানা-অচেনা মহিলার সাথে আছে, বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তা যেন তার মনেই নেই। হঠাৎ গাড়ি থেমে যায়।
কাছের সরকারি হাসপাতালে চলে এসেছে তারা। মারজিয়া গাড়ি থেকে নেমে হামিদাকেও নামায়। বলে, দেখো তো, এই হাসপাতালেই কি আছে তোমার আম্মু?
হামিদা চোখ বুলিয়ে পুরো হাসপাতালটাকে দেখে, আসেপাশের দোকানপাট দেখে। হেসে বলে, আরে হ, ওই দোকানটা থেইকাই তো আব্বা বিড়ি কিনছিলো! মারজিয়া একখানা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। কিন্তু এই প্রশান্তি দীর্ঘ হয় না।
রিসেপশন থেকেই হামিদার মায়ের খবর পেয়ে যায় মারজিয়া। সেখানে মারজিয়ার দেখা হয় হামিদার নানির সাথে। তার কাছ থেকে জানতে পারে হামিদার মাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে। তার অবস্থা খুব বেশি একটা ভাল না। হামিদার নানি মৃদু বিলাপ করে করে অপারেশন থিয়েটারের বাহিরে কান্না করছে। হামিদার বাবাকে কোথাও দেখতে পায় না সে।
অপারেশন থিয়েটার থেকে এক নার্স বের হয়ে তাড়া দিয়ে বলে, রুগীর অবস্থা ভাল না। অনেক ব্লিডিং হচ্ছে। এখনই রক্ত লাগবে! হামিদার নানি তার কমলা রঙয়ের ময়লা শাড়ির আচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। নার্স আবারও তাড়া দেয়, রক্ত দেওয়ার মত কেউ আছে? রুগীর স্বামী কই?
পালাইছে! ওই হারামজাদা পালাইছে! হামিদার নানি চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। মারজিয়া হামিদার দিকে তাকায়।
মারজিয়া নার্সকে জিজ্ঞেস করে, রক্তের গ্রুপ কি?
ও পজিটিভ— দ্রুত রক্ত লাগবে না হলে রুগীকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।
আমার ব্লাড গ্রুপ ও পজিটিভ।
আমার সাথে আসেন। নার্স মারজিয়াকে আগা-গোড়া একবার দেখে তারপর হাঁটা শুরু করে।
মারজিয়া বেডে শুয়ে আছে। তার হাত থেকে একটু একটু করে রক্ত ব্যাগে জমা হচ্ছে। নার্সটা আড় চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি হন রুগীর?
মারজিয়া নির্বিকার চোখে তাকায়। বোন বলতে পারেন।
নার্স হাসে। আসলে তো কিছুই হোন না, তাই না? মারজিয়া আর কিছু বলে না। নার্স গম্ভীর মুখে বলে, অবস্থা বেশি সুবিধার না। মনে হয় মা নাহয় বাচ্চা একজন বাঁচব না— বা দুইজনই। সাত মাসও হয় নায়।
প্রিম্যাচুর ডেলিভারি? মারজিয়া অবাক চোখে তাকায়।
ঠ্যালায় পড়ে করতেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ধীরে বলে, ওই পিচ্চির নানি বলতেছিল, তার মেয়ের পেটে লাথি মারছে ওই হারামজাদা। অনেক মারছে, মেয়ে বেহুশ হয়ে গেছিলো, রক্ত বের হওয়া শুরু করছে। হাসপাতালে আনার পর ডাক্তার যখন বলছে অবস্থা খারাপ— তখন পিচ্চির নানি বলছে যে তার মেয়ের কিছু হইলে ওরে পুলিশে দিবে। এরপরই মেয়ের বাহানা কইরা ভাগছে! নার্স সুইটা খুলে মারজিয়ার হাতে তুলা চেপে দেয়।
মারজিয়া নির্বিকারভাবে তাকিয়ে থাকে। রক্তের ব্যাগটা নিয়ে নার্সটা দ্রুত পায়ে চলে যায়। মারজিয়া ওখানেই বসে থাকে। ব্যাগে ভাইব্রেশন বোধ করে। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখে আনিসা ফোন করছে।
আনিসা ফোনের ওপাশ থেকে বলে, হ্যালো, আপু। কি অবস্থা তোর?
হ্যালো, আনু, মাকে বলিস আমার আসতে আজ একটু দেরী হবে।
ইমার্জেন্সী রুগী আছে কোনো?
মারজিয়া দরজার দিকে তাকায়। মৃদু কন্ঠে বলে, হ্যাঁ।
ঠিক আছে। তুই খাওয়াদাওয়া করে নিস, নিজের খেয়াল রাখিস।
ফোনটা রেখে ধীর পায়ে আগায় মারজিয়া। করিডোরে এসে কান্নারত হামিদার নানির পাশে দাঁড়ায়। তার কাধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেয়। হামিদা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেও কাঁদছে। খুব বেশি কিছু না বুঝলেও সে বুঝতে পারে তার মা অসুস্থ।