মারজিয়া কান্নারত হামিদার নানিকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত। তখন মহিলা ডাক্তারটি মারজিয়ার দিকে এগিয়ে আসে। হাসি মুখে বলে, মারজিয়া না?
মারজিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। যেন মনে করার চেষ্টা করছে কিভাবে এই মহিলা তাকে চিনে। এরপর মৃদু কন্ঠে বলে, নাহার?
হ্যাঁ! এই গরীরের হাসপাতালে কি ভেবে, ম্যাডাম? বলতে বলতে মারজিয়াকে জড়িয়ে ধরে নাহার।
মারজিয়া একটু বিব্রত বোধ করে। স্কুল-কলেজ-মেডিকেল কলেজে, কোনো জায়গাতেই তার এমন কোনো বন্ধু-বান্ধবী ছিল না যাদের দেখলেই তার খুশিতে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করবে। এইরকম সখ্যতার সম্পর্ক তাদের ছিল না। তবে মারজিয়ার যতদূর মনে পড়ে নাহার মেয়েটা খারাপ ছিল না। হালকা করে নাহারের পিঠে ছোঁয়া দেয় সে।
আলিঙ্গন ছেড়ে নাহার বলে, তোকে এখানে দেখব, একদমই ভাবি নি। নাহার হামিদাদের দিকে একবার তাকায়। তোর পরিচিত নাকি?
ওমনই। আজই পরিচয় হল আর কি।
তোমাদের ভাগ্য ভাল যে এমন একজনের সাথে হুট করে আজ পরিচয় হয়েছে। উনি রক্ত না দিলে তোমার মেয়েকে বাঁচানো যেত না! একটু থেমে এদিক-ওদিক তাকিয়ে রাগী সুরে বলে, আর কোথায় সেই জামাই তোমার!
হামিদার নানি চুপ করে চেয়ে থাকে।
নাহার মারজিয়ার দিকে তাকায়। আমার রুমে চল তাহলে? ওখানে ফ্যানের নীচে বসবি। এখানে তো অনেক গরম, এসিটেসি নেই। নাহার হাসতে হাসতে বলে, তোর তো এসির অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা এখন।
মারজিয়া হামিদার দিকে তাকায়। হামিদা করুন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি ওদের সাথে কিছুক্ষণ থাকি।
ঠিক আছে। থাক তাহলে। আমি রুম হয়ে আসছি। কত বছরের ক্যাচআপ করা বাকি আছে! হুজুগে মারজিয়ার হাতটা খানিকটা নাড়িয়ে নাহার চলে যায়।
নাহার চলে গেলে হামিদার নানি এগিয়ে এসে মারজিয়ার সামনে দাঁড়ায়। কাদো কাদো কণ্ঠে বলে, আপনে না থাকলে আমার মাইয়াডার আইজ কি হইত! আপনি ফেরেসতা হইয়া আসছেন আমগোর লইগা— মারজিয়ার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে লুটিয়ে পরে হামিদার নানি। নানির অবস্থা দেখে হামিদাও জোরে জোরে কান্না শুরু করে।
মারজিয়া হামিদার নানিকে সামলানোর চেষ্টা করে। তাকে উঠিয়ে পাশের চেয়ারে এনে বসায়। নিজেও তার পাশে বসে তার হাত করে সান্ত্বনা দিতে থাকে। মৃদুকণ্ঠে বলে, আপনার মেয়ে জামাই এখন কোথায়?
হামিদার নানি শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলে, হঠাৎ কইল হামিদার বলে খুব ক্ষিধা লাগছে, ওরে কিছু খাওয়ায়ে আনি। বইলা হামিদারে লইয়া যে গেল আর আইলো না। এখন শুনতাছি ওরেও বলে রাস্তায় ফেলায়ে গেছে গা। বলে আবারও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে হামিদার নানি। ফুঁপায়ে ফুঁপায়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, হারামজাদাটা আমার মাইয়াটারে সারাদিন গাইল পারে, কথায় কথায় মারে। আমি কতবার মাইয়াটারে কইছি ওরে ছাইড়া দিতে। তিন বাসায় কাজ করে, যে টাকা পায় সেই সব টাকা ওই হারামজাদা লইয়া চা-বিড়ি খাইয়া উড়ায়। ওরে আমি পুলিশে দিমু। আমার মাইয়ার যদি কিছু হয়— ওরে আমি ছাড়মু না!
মারজিয়া চুপচাপ সব শুনে। উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে হামিদাকে দেখে। কিছুক্ষণ পর নাহার আসলে ক্যান্টিন থেকে কিছু খাবার কিনে হামিদা আর ওর নানির জন্য দিয়ে নাহারের রুমে যায়।
রাত বারোটা বাজতে চলল। নাহার আর মারজিয়া তার রুমে বসে কফির ওয়ান টাইম কাপে চুমুক দিচ্ছে। হঠাৎ নাহারের ফোন বেজে উঠল।
নাহার বলে, একটু দাড়া। নাহার ফোনে কথা বলতে থাকে।
মারজিয়া এদিক-ওদিক তাকিয়ে নাহারের রুম দেখে। টেবিলের উপর নাহারের পরিবারের একখানা ছবি। এক মেয়ে, স্বামী নিয়ে সুন্দর ছোট একখানা সংসার।
নাহার ফোন রেখে মারজিয়াকে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। বলে, আমার মেয়ে— এবার ফাইবে উঠল, পড়াশোনার বেশ চাপ। সামান্য হেসে বলল, তো তোর কি অবস্থা বল? বাচ্চাকাচ্চা?
মারজিয়া কিছু না বলে বিব্রত একখানা হাসি দিল।
নাহার চোখ কপালে তুলে খানিকটা চেঁচিয়ে বলে, ডোন্ট টেল মি, তুই এখনও বিয়ে করিস নি! মারজিয়া শুধু হাসে। নাহার মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে মারজিয়ার দিকে। একটু থেমে বলে, বয়ফ্রেন্ড?
মারজিয়া না-সূচক মাথা নাড়ে।
নাহার অবিশ্বাসের চোখে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফিসফিসের বলে, ক্যাজুয়াল? মারজিয়া শব্দ করে হাসে। নাহার বিস্ময়ের সুরে বলে, তাহলে কেমনে কি, ভাই! সবটা বায়োলজি কি পড়াশোনাতেই হবে নাকি! একটু থেমে বলে, আমাদের ব্যাচের সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি নিজেই তো থার্ড ইয়ারে বিয়ে করছি। ছেলেরা কয়েকজন আছে করে নি, তবে তাদের সবার গার্লফ্রেন্ড নাহয় ক্যাজুয়াল পার্টনার আছে। তুমি কোথা থেকে এলে ঋষি মারজিয়া!
মারজিয়া মলিন একখানা হাসি দিয়ে বলে, করা হয় নি, এই আর কি।
মারজিয়ার কষ্ট করে টানা হাসিটা দেখে নিজের বিস্মিতভাবটা খানিকটা সামলে আনে নাহার। হেসে বলে, আন্টিদের মত প্রশ্ন করছি, তাই না? আসলে আমি এখন আন্টিই।
সমস্যা নেই।
এমন তো নয় যে ছেলেদের তোকে পছন্দ না। তাহলে কেন? কাউকেই পছন্দ হল না?
মারজিয়া নাহারের ফ্যামিলি ফটোটার দিকে তাকিয়ে তার স্বামীর দিকে ইশারা করে বলে, অর্থোপেডিক্স— নামটা খেয়াল নেই।
রায়হান।
হুম, রায়হান আর তুই যখন একসাথে থাকিস, কি নিয়ে কথা বলিস?
নাহার একটু ভাবে। অনেক কিছু নিয়েই কথা হয়। তেমন বিশেষ কিছু নেই। কাজ, দিন-দুনিয়া, মেয়ে, আমাদের ভবিষ্যৎ। বিয়ের অনেক বছর হয়ে গেছে তো, প্রেম-ভালবাসার কথা এখন আর ওত হয় না। নাহার হাসে।
একসাথে মুভি-সিনেমা দেখিস?
দেখা হয় মাঝেমাঝে।
শাহরুখ খানকে চিনিস তোরা?
হ্যাঁ, চিনি। কেন বল তো?
আমি বেশ ভেবেছি। ভেবে বুঝেছি, মানুষ দিন শেষে শুধু আরেকজন মানুষের সাথে থাকতে চায়। তাদের পেশার সাথে না, তাদের হাই আইকিউ মগজের সাথে না। শুধু একজন মানুষ যার সাথে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে কথা বলা যাবে। আর যখন কথা বলতে মন চাবে না তখন চুপচাপ দুইজনের পছন্দের একখানা মুভি ছেড়ে বসে থাকবে।
নাহার বিভ্রান্তির সাথে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে না মারজিয়া কি বলছে। তো? কি হয়েছে তাতে?
আমি মানুষের সাথে কথা বলতেই জানি না।
অ্যাঁহ?
দিন-দুনিয়া সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আমি শাহরুখ খানকে চিনি না। কখনও তার কোনো মুভি দেখি নি। কিন্তু জেরোমে থেকে ব্রেইন্সটিন— সবার বই আমার কয়েকবার করে পড়া আছে। আমার দুনিয়া এতটুকুই। আমি এর বাহিরে কিছু চিনি না, কিছু জানিও না। মারজিয়া একটু থামে। আমার বোনও ইঞ্জিনিয়ারিং করছে, ওরও বেশ এক্টিভ স্টাডি লাইফ কিন্তু তবুও সে জানে পৃথিবীতে কি চলছে, কোন সেলিব্রিটি কাকে বিয়ে করছে। আমার দুই বোন যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলে, আমারও ইচ্ছা করে ওদের সাথে কথা বলতে, গল্প করতে— কিন্তু আমি বুঝিই না ওরা কি নিয়ে কথা বলছে।
নাহার অবাক দৃষ্টিতে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মারজিয়া নাহারের দিকে তাকিয়ে বেদনা ভরে সুরে বলে, সব ছেলেরই হয়ত ইচ্ছা করে বউয়ের সাথে শখ-আহ্লাদ করতে। কিন্তু আমি তেমন মেয়েই নই। চাইলেও হতে পারব না। শুধু শুধু কেন একটা ছেলের জীবন নষ্ট করব! মারজিয়া চুপ করে নীচে তাকিয়ে থাকে।
নাহার বলে, তোকে দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিন বাদে একদম অকারনে এতগুলো কথা বলেছিস।
মারজিয়া খানিকটা অবাক হয়ে নাহারের দিকে তাকায়। তার কথা সত্য। শেষ কবে কারন ছাড়া সে এতগুলো কথা বলেছে তার মনে পড়ে না। সে মৃদু হাসে।
নাহার হেসে বলে, সত্যি বলতে আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে চিনবি না। তুই একটুও বদলাস নি দেখে ভাল লাগল। নাহার মিষ্টি একখানা হাসি দিয়ে মারজিয়ার দিকে তাকায়।
মারজিয়াও তার দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে, বাচ্চাটার বাবার বিরুদ্ধে কি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
যদি তার পরিবার নেয় তো হবে। তবে কি জানিস, এখানে এমন কেস দিনে অনেক আসে। কারো মেরে হাত ভেঙ্গে দিয়েছে, কারো নাক, তো কারো কপাল— দিন শেষে দুইজন একসাথে হাতে হাত দিয়েই বের হয়ে যায়। তাই ওর নানি যতই পুলিশের ধমকি দেক, তুই ওমন কিছু আশা করিস না। এগুলো মেয়ে হয়ে জন্মানোর অভিশাপ, বিশেষ করে গরীব ঘরের মেয়ে।
মারজিয়া তাকিয়ে নাহারকে দেখে। সে ভাবে, তারা দুইজনেই ডাক্তার কিন্তু তাদের দুইজনের অভিজ্ঞতা একদম ভিন্ন। মারজিয়ার ওঠা-বসা হয় দেশের প্রথম স্তরের ধনীদের সাথে। এরা সবাই শিক্ষিত, নিজেদের মানবাধিকার এবং রোগ দুটো সম্পর্কের তাদের ধারণা বিস্তর। ডাক্তারকে এত নিখুঁতভাবে রোগের বর্ননা দেয় যেন তারাই অর্ধেক ডাক্তার। শুধু কনফারমেশন নিতে এসেছেন যে তার চিহ্নিত রোগটিই তার হয়েছে কিনা।
অন্যদিকে এই সরকারি হাসপাতালের ঝুলন্ত ফ্যানের কড়কড় আওয়াজের মাঝে রোগীর রোগের বিবরন দেওয়ার অপারগতাও মাথা ধরার কাজ করে। একটা উপসর্গ সঠিক করে বলতে পারে না, দুটো নির্দেশনা সঠিকভাবে মানতে পারে না। এ যেন দুই পৃথিবী।
নাহারকে বিদায় জানিয়ে চলে যায় মারজিয়া। যাওয়ার আগে হামিদার নানির কাছে কিছু টাকা ও তার মোবাইল নাম্বার দিয়ে আসে যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করার জন্য।