Posts

উপন্যাস

ত্রি-রমনী (পরিচ্ছেদ ১৪)

October 1, 2025

M. Khanam

18
View

রাত বেড়ে যাওয়ায় আর বাসায় যায় না মারজিয়া। নিজ হাসপাতালেই আবার ফেরত আসে। নিজের রুমে যেয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকে। রক্ত দেওয়ার কারনে মাথাটা ঝিম ধরে আছে। খানিকটা দুর্বলও বোধ হয় তার। কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে আসেপাশে তাকায়। যেন কিছু একটা খুঁজছে। উঠে রুম থেকে বের হয়ে হেঁটে স্টোররুমের দিকে যায়। 

বিশাল একখানা স্টোররুম, বড় বড় সেলফ বিভিন্ন ধরনের বস্তুতে ভর্তি। মারজিয়া হেঁটে সোজা স্টোর রুমের শেষে চলে যায়। সেখানে এক কোনায় বড় একখানা কার্টুনে কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মাঝ থেকে টেনে একখানা নেক-পিলো বের করে। চলে আসবে ঠিক তখনই কিছু একটা পড়ার আওয়াজ পেয়ে পাশে তাকায় মারজিয়া। স্টোর রুমের অন্য প্রান্তে বাহির থেকে আসা আলোর বিপরীতে দুইজন মানুষের সিলুয়েট দেখতে পায়। ফিসফিস করে কথা বলা এক নারীকণ্ঠও কানে আসে তার। বিষয়টা মারজিয়ার জন্য নতুন না। এর পূর্বেও স্টোর রুমে অপ্রস্তুত-বিব্রতকর অবস্থায় ডাক্তার-নার্স-স্টাফদের দেখেছে সে। 

আধ আলো আধ অন্ধকারে মারজিয়া দেখে এই দুইজন আর কেউ না, নিউরোলজি বিভাগের ডাক্তার শিরিন এবং নিউরোসার্জারি অর্থাৎ তার বিভাগেরই স্টাফ উসমান। আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে দুইজন— মারজিয়ার চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত ডাক্তার শিরিনের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে রুমের অন্য পাশ দিয়ে ছুটে বের হয়ে যায় উসমান। ডাক্তার শিরিন খানিকটা সড়ে গিয়ে নিজের পোষাক ঠিক করতে থাকে। মারজিয়া পেছনে ফিরে উসমানকে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখে। নিজেকে সামলে নিয়ে বের হয়ে আসে সে রুম থেকে। 

চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজের রুমে বসে আছে মারজিয়া। চোখের সামনে স্টোর রুমের দৃশ্যটা ভেসে উঠতেই চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে সে। টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে সময় চেক করে। ছয়টা প্রায় বাজতে চলল। কিছুক্ষণ পরই সকালের শিফটের ডাক্তাররা আসা শুরু করবে। মারজিয়া উঠে ড্রয়ার থেকে একটা ছোট প্লাস্টিক ব্যাগ বের করে। তাতে টুথপেস্ট, ব্রাশ, ফেসওয়াস, প্যাড ইত্যাদি টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হয়েছে। ব্যাগটা নিয়ে ওয়াসরুমের দিকে এগিয়ে যায় মারজিয়া।  


 

কম্পিউটারের সামনে বসে মনোযোগ সহকারে কাজ করছে আনিসা। পরনে একখানা ধূসর রংয়ের কুর্তি আর ঢোলা কালো প্যান্ট। গলায় একখানা শিফনের কালো ওরনা প্যাঁচানো। সামনের চুলগুলো উপরে উঠিয়ে ছোট একখানা কাকড়া দিয়ে আটকানো, পেছনের চুলগুলো পিঠের উপর ছাড়া। ডান পা-টা নাড়াতে নাড়াতে কাজ করছে সে। 

হঠাৎ পাশ থেকে তার কলিগ শৈলী বলে ওঠে, এই বস আসছে— আনিসা কাজ থামিয়ে হালকা কাধ বাঁ পাশে হেলিয়ে তাকায়। করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছে মেস্ট্রো গ্রুপের সিইও রাকিন মুস্তাফিন। সাথে আরও দুই-তিনজন কর্মচারী। কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করতে করতে আসছে সে। স্বভাবে খানিকটা সোসিওপ্যাথ হলেও তার অসাধারণ মনভুলানো সৌন্দর্য্য সব ছাপিয়ে যায়। আনিসা এক নজরে রাকিন মুস্তাফিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মৃদুকণ্ঠে বলে, এমন একখানা শখের পুরুষ পেতে কি করতে হয়?

শৈলী বলে, সিলভি সিনহা হতে হয়—

আনিসা বিরক্তির সহিত শৈলীর দিকে তাকায়। শৈলী তার কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার ভান করে মাথা নাড়ায়। আনিসা হতাশাভরা কণ্ঠে বলে, দুনিয়াটা এত নিষ্ঠুর কেন! শুধু সুন্দর নারীরাই সুন্দর পুরুষ পাবে! এ কেমন বিচার! দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। 

শৈলী হেসে বলে, বেচারার তো বোধহয় দিন খুব খারাপ কাটছে এখন। বউ দেশে নেই। আনিসা কিছু একটা বলতে যাবে তখন পেছন থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ ডেকে ওঠে, মিস হোসাইন?

আনিসা হকচকিয়ে পেছনে তাকায়। 

খানিক দূরে দাঁড়িয়ে  থাকা পুরুষটি সিইও রাকিন মুস্তাফিনের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট মুস্তফা কামাল। অফিসে সিইওয়ের পরে সবচেয়ে দাপট তারই। অফিসের প্রতিটি কাজ তার টেবিল হয়ে সিইওর টেবিলে যায়। তাদের ব্যবহারেই বুঝা যায় যে সিইও তাকে অসম্ভব বিশ্বাস করেন। 

মুস্তফা কামালের চুলগুলো হেয়ার জেইল দিয়ে ডান পাশে হেলানো। তাকে সবসময় পরিপাটি, কড়কড়ে প্রেস করা ফরমাল জামাকাপড়ে দেখা যায়। তার ক্যাজুয়াল পোষাকও সাধারন মানুষের ফরমালের চেয়ে ভাল। জীবনে সবই আছে তার, শুধু সময়টাই নেই। 

আনিসা দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে তার কাছে এগিয়ে যায়। জী, স্যার?

ল্যাপটপ নিয়ে আমার রুম আসবেন। ডান হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে বা হাতের ঘড়ির উপর হালকা বারি দিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, টু মিনিটস— অর্থাৎ দুই মিনিটের ভেতর আসতে হবে। আনিসা দ্রুত টেবিল থেকে ল্যাপটপ নিয়ে কামালের রুমে ছুটে যায়। 

কামালের রুমটা সিইওর রুমের পাশেই। এই রুম থেকে সিইওর রুমে সরাসরি যাওয়ার একখানা দরজা আছে। রুমের সামনের দেয়ালটা স্বচ্ছ্ব কাচের, যাতে করে এই রুম থেকে কামাল অফিসের সবার উপর নজর রাখতে পারে। রুমটা বড্ড পরিপাটি করে সাজানো। বেশ সুন্দর একখানা মিষ্টি ঘ্রাণ আসে রুম থেকে। আনিসার বহুবার ইচ্ছা হয়েছে জিজ্ঞেস করার যে এই ঘ্রাণটা কিসের, কিন্তু এরকম স্মল-টক করার মত সম্পর্ক কামালের সাথে তার হয়ে ওঠে নি। 

কামাল গায়ের কোটটা খুলে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে নিজের চেয়ারে বসে। সামনে আনিসা ল্যাপটপ হাতে দাঁড়িয়ে  আছে। কামাল এক পলক তার দিকে তাকায়। এরপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে, বসুন। 

আনিসা একখানা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে, ধন্যবাদ, স্যার। 

আর ইউ এঞ্জয়িং ইউর ওয়ার্ক হিয়ার? 

ইয়েস, স্যার। 

গুড। আমি আপনার কাজটা দেখেছি। ল্যাপটপে ওয়েবসাইটটা খুলুন। হাত দিয়ে টেবিলের কলমদানির দিকে ইশারা করে বলে, ওখান থেকে একখানা কাগজ আর কলম নিয়ে নিন। 

আনিসা দ্রুত একখানা কাগজ আর কলম নিয়ে লেখার প্রস্তুতি নেয়। কামাল একের পর এক ভুল ও পরিবর্তনের লিস্ট বলতে থাকে। আনিসা দ্রুত হাতে লিখতে থাকে। প্রথম কাগজখানা শেষ হলে, আরেকখানা কাগজ নিয়ে লিখতে হয় তাকে। বলা শেষ করে আনিসার দিকে তাকায় কামাল। 

আনিসা বিভ্রান্তির সহিত লেখাগুলো দেখছে যেন কি হিসাব মিলছে না। 

কামাল মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, এনি প্রোবলেম, মিস হোসাইন?

আনিসা মাথা তুলে কামালের দিকে তাকায়। ইতস্তত বোধের সাথে বলে, স্যার, এখানের অধিকাংশই তো প্রথম ইন্টারফেসে ছিল। গত মিটিংয়ের ইনপুটের উপর ভিত্তি করে পরিবর্তন করেছিলাম। এগুলোই আবার আগের ফরমেটে নিয়ে যাব?  

হুম— কোনো সমস্যা আছে?

আনিসা এক মুহুর্ত কামালের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চেহারার অন্যমনস্ক ভাবটা আনিসার বিরক্ত লাগতে থাকে। চাঁপা গলায় বলে, নো, স্যার। 

কামাল টেবিলের উপর থাকা ল্যাপটপটা খুলতে খুলতে বলে, গুড। ব্যাক টু ওয়ার্ক দেন। আজকের ভেতর লাগবে এটা আমার। আনিসা চোখ বড় বড় করে কামালের দিকে তাকায়। তার চোখে রাগ এবং বিরক্তি দৃশ্যমান। কামাল ল্যাপটপে কিছু একটা করতে শুরু করে। সামান্য উপরে তাকিয়ে আনিসাকে দেখে। ওর ওমনভাবে তাকিয়া থাকা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে, হোয়াট? 

আনিসা গম্ভীর মুখোভঙ্গি ও কণ্ঠে বলে, গুড ডে, স্যার। মৃদু পায়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে সে। খানিকটা স্বজোড়েই নিজের টেবিলের উপর ল্যাপটপটা ফেলে। এরপর ধপ করে চেয়ারে বসে রাগে ফোঁসফোঁস করতে থাকে। 

শৈলী ঘুরে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বলে, এমা! হলটা কি? 

আনিসা রাগী সুরে বলে, সালা জেলের বোতল একটা। দেখে মনে হয় সম্পূর্ণ বোতল জেল মাথায় একসাথে ঢেলে এসেছে। মনটা চায় টাইটা ওর গলায় পেঁচিয়ে হ্যাঁচকা টান দেই। আনিসা রাগে ফোঁসফোঁস করতে থাকে। 

শৈলী তাড়াতাড়ি টেবিল থেকে পানির বোতল খুলে এগিয়ে দেয়, শান্ত হ, মা। আস্তে বল, স্যারের কানে গেলে পাছায় লাত্থি মেরে বের করে দিবে। আনিসা পানির বোতলটা নিয়ে চুমুক দিয়ে পানি খেতে খেতে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

Comments

    Please login to post comment. Login