মারজিয়ার পরনে সবুজ স্ক্রাব। অপারেশন টেবিলে হালকা নীল রঙয়ের কাপড়ে রুগীর সম্পূর্ণ শরীরটা ঢাকা। শুধুমাত্র মাথার ডান পাশের সামান্য একটু জায়গায় কাপড়টা কাঁটা। সেই জায়গায় চুল সেইভ করে একখানা চিকন পাইপ মেশিনের মাধ্যমে তার মাথার ভেতর ঢুকানো। মারজিয়া বার বার উদ্বিগ্ন চোখে মনিটরের দিকে তাকাচ্ছে।
অমি এবং উসমান দুইজনেরই চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে জ্ঞান ‘প্যারাসিট্যামল দুইবেলা’– এর মাঝেই সীমাবদ্ধ।
ওয়াসিম তাকিয়ে তাদের বিভ্রান্তিভরা চেহারা দেখে। মৃদু হেসে ধীরে বলে, এখানের স্ক্রিনে দেখুন। ওই ছোট মেশিনটা দেখতে পাচ্ছেন? উসমানও ঘুরে তাকায়। অমি মাথা নাড়ে। এটাকে আইসিপি বলে। এর মাধ্যমে মস্তিকের ভেতরের প্রেসার পরিমাপ করা হয়। সার্জন হোসাইন বার বার মনিটরে সেটাই দেখছেন।
উসমান ঘুরে মারজিয়ার দিকে তাকায়। মাথায় সার্জিক্যাল টুপি, মুখে মাস্ক—শুধু উদ্বিগ্ন চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে তার। সেই চোখে বার বার মনিটর দেখছে সে।
ওয়াসিম মৃদু কণ্ঠে বলে, প্রেসার বেড়ে গেলে সেটা বিপদজনক। তখন আমাদের ক্রানিসেক্টমি করতে হবে। মাথার ভেতরের একটা অংশ কেটে জায়গা করে দিতে হবে। ওয়াসিম শান্ত গলায় ভয়ানক অপারেশনটার বর্ননা দিতে থাকে আর বাকি দুইজন অবাক হয়ে শুনতে থাকে। হঠাৎ একটা বীপের আওয়াজ শোনা যায়।
তীব্র বীপের আওয়াজে মারজিয়ার স্থির চোখ দুটো সামান্য নড়ে ওঠে। চেহারার উদ্বিগ্নভাবটা নির্বিকার হয়ে যায়। মনিটরের দিকে একবার তাকিয়ে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের দিকে তাকায়। ধূসর রঙয়ের স্ক্রাব পরিহিত লোকটি মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা হেলিয়ে তাকে আশ্বাস দেয়। মারজিয়া সাথে সাথে চোখ ঘুরিয়ে অপারেশন থিয়েটারের অন্যান্য সকলের দিকে একবার তাকায়। সার্জনের চোখে চোখ পড়তেই সকলে একযোগে নতুন কিছুর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
গ্যালারী থেকে উদ্বিগ্ন চোখে অমি অস্থির হয়ে ওঠে। কি হল? উসমানও অস্থিরতার সাথে ওয়াসিমের দিকে তাকায়।
ওয়াসিম বলে, ইনট্রাক্রেনিয়াল প্রেশার বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে।
এখন কী হবে?
মাথার একটা অংশ কেটে কিছুটা জায়গা করে দেওয়া হবে, যাতে মাথার ভেতরে রক্ত জমাট না বাঁধে। দেখতে থাকুন। ওয়াসিম হাসে।
উসমান অস্থিরতার সহিত নীচে তাকায়। এরপর স্ক্রিনে দেখে।
নীল রঙয়ের স্ক্রাব পরিহিত একজন অপারেশন সহকারী জীবানুনাশকে ঢুবানো একখানা রেজার নিয়ে সর্তকতার সাথে চুলগুলো শেইভ করে জায়গাটাকে বেশ কয়েকবার ভাল ভাবে জীবানুমুক্ত করে দেয়। সে সড়ে গেলে মারজিয়া এসে রুগীর মাথার কাছে দাঁড়ায়। স্থির চোখে রুগীর মাথার চুলহীন অংশটার দিকে তাকায়। অপারেশন থিয়েটারটা একদম নিশ্চুপ। শুধুমাত্র ভেন্টিলেটরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। পাশ থেকে স্ক্রাব নার্স নিঃশব্দে একখানা স্ক্যালপেল মারজিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়। মারজিয়া একখানা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্থির হাতে সেটি রুগীর মাথার উপর ধরে। নিপুণতারসহিত স্ক্যালপেলের সাহায্যে মাথার ত্বকটি চিরে নেয়। তার হাতের সাদা গ্লাভসে লাল লাল রক্তের ছোট ছোট ফোঁটা দেখতে পাওয়া যায়। স্ক্যালপেলটি সরিয়ে রেখে একটি ফোর্সেপস তুলে নিয়ে সাবধানে পেশী এবং টিস্যু সরিয়ে দেয়। এই পর্যায়ে মাথার খুলিটা দেখা যায়।
নীল স্ক্রাব পরিহিত সহকারীটি তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি সাকশন ডিভাইস ব্যবহার করে রক্তগুলো সড়ানোর কাজ করে। এসময় স্ক্রাব নার্স একটি উচ্চ-গতির ড্রিল মারজিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়। মারজিয়া সাবধানতার সাথে ড্রিলটির সাহায্যে মাথায় তিনটি গর্ত করে। নীরব রুমটাতে ড্রিল মেশিনের আওয়াজটার প্রতিধ্বনি হতে থাকে। স্ক্রাব নার্স একখানা মায়ো কাঁচি এগিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে খুলির নির্দিষ্ট অংশটা কেটে ফেলে মারজিয়া। হাড়ের অংশটুকু সড়িয়ে ইলেক্ট্রোকটারি যন্ত্র দিয়ে রক্তনালীটি কৌটারাইজ করেন।
উসমান অবাক চোখে পুরো প্রোসেসটা সামনের স্ক্রিনের ক্লোজআপে দেখতে থাকে। এরপূর্বে সে কখনও সরাসরি অপারেশন দেখে নি। এখান থেকে অপারেশন টেবিল যথেস্ট দূরে। হাতের নড়াচড়াটা ওতটা ভালভাবে দেখা যায় না। তবে ক্লোজআপে বুঝা যায় কতটা স্থির এবং নিপুণ সার্জন মারজিয়া হোসাইনের হাত দুটো।
কৌটারাইজের মাধ্যমে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেলে সবার চেহারায় সামান্য স্বস্তি দেখা যায়। যেন কঠিন কোনো গেইমের লেভেল ওয়ান সম্পূর্ণ হল। সামান্য পোড়া গন্ধে অপারেশন থিয়েটারটা ভরে ওঠে। মারজিয়া স্থির চোখে মস্তিকের ভেতরের থাকা সুরক্ষামূলক ডুরা ম্যাটার পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। মেটজেনবাম সিজরের দ্বারা মস্তিকের সুরক্ষা বহির্ঝিল্লিতে ছোট ছেদ করে আঘাতের কারনে ফুলে যাওয়া টিস্যুর অংশটুকুকে প্রকাশ করে। এতে করে ডুরা ম্যাটারে আটকে থাকা চাপটা প্রকাশের সুযোগ পেয়ে মস্তিকটি সামান্য ফুলতে শুরু করে।
ওয়াসিম মৃদুস্বরে বলে, এই প্রোসেসটা সঠিক সময়ে না হলে ব্রেনের ভেতরে রক্তজমাট বেঁধে যেতে পারে। এখন টিস্যুর ফোলা ভাবটা কমে আসলে আবার সবকিছু আগের মত বসিয়ে দেওয়া হবে। অপারেশন শেষ।
উসমান অবাক চোখে মারজিয়াকে দেখতে থাকে। কি নিপুণতার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা স্থির শরীরে কাজ করে যাচ্ছে সে।
অমি বিস্ময় কণ্ঠে বলে, এরপর তাহলে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারছি?
ওয়াসিম হাসে। বলে, আসল ভয়টা এরপরেই। ওনার আঘাতটা বেশ গুরুতর তাই সাধারনের চেয়ে হয়ত জ্ঞান ফিরতে বেশি সময় লাগবে।
আনুমানিক কতটা?
আটচল্লিশ ঘন্টার কম হবে না। অনেক সময় বাহাত্তর ঘন্টাও পেরিয়ে যায়। তবে এমনটা হলে একটু দুশ্চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। আশা করছি আটচল্লিশ ঘন্টার ভেতরই রুগী রেস্পন্স করতে শুরু করবে।
অপারেশন শেষে নিজের রুমে আধশোয়া অবস্থায় চেয়ারে বসে আছে মারজিয়া। দরজায় সামান্য টোকা দিয়ে রুমে ঢোকে একজন লোক। লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। মাথায় আধ-পাকা চুল। মারজিয়া সোজা হয়ে বসে মৃদুস্বরে বলে, সার্জন সাহা, আসুন।
সার্জন প্রদীপ সাহা এখানকার অন্যতম নামকরা একজন নিউরোসার্জন। জারিন খান এখানে আসার পূর্বে এ হাসপাতালের নামডাক তাকে নিয়েই ছিল। ধীর পায়ে রুমে ঢুকে একখানা চেয়ার টেনে বসে। কেমন বোধ করছো?
আলহামদুলিল্লাহ, ঠিক আছি।
আমি এসেছিলাম কালকের স্পাইন টিউমরের অপারেশনের ফাইলগুলো নিতে। মারজিয়া অবাক হয়ে সার্জন প্রদীপ সাহার দিকে তাকায়। প্রদীপ বলে, ওটা আমাকে শিফট করে দেওয়া হয়েছে।
মারজিয়া এক মুহুর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে টেবিল থেকে কয়েকটি রিপোর্ট এবং ফাইল বের করে এগিয়ে দেয়। আপনি এগুলো নিতে নিজে আমার কেবিনে এসেছেন, কাউকেই পাঠলেই হয়ে যেত।
ভাবলাম তোমার খোঁজ-খবরও নিয়ে যাই একসাথে।
ধন্যবাদ।
প্রদীপ সাহা এক মুহুর্ত মারজিয়ার ক্লান্ত চেহারাটার দিকে তাকিয়ে থেকে ফাইলগুলো নিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে। মারজিয়া আগের মতই আধশোয়া হয়ে চেয়ারে পরে থাকে। খানিকবাদে উঠে নিজের জিনিসপত্র গুছাতে আরম্ভ করে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। পার্কিং লটে গিয়ে গাড়িতে বসে সেটা চালু করার চেষ্টা করে। কিন্তু গাড়িটা চালু হয় না। বিড়বিড় করে বলে, এটার কি হল আবার। গাড়ি থেকে নেমে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।