রাত সবে এগারোটা কিন্তু সম্পূর্ণ বাসস্ট্যান্ডটা খালি। আসেপাশেও তেমন মানুষ নেই, শুধু খানিকটা দূরে একজন পুরুষ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মারজিয়া আসেপাশে তাকায়। কয়েকটি প্রাইভেট কার ছাড়া রাস্তায় আর কিছুই চলছে না। দেখে মনে হয় যেন গভীর রাত হয়ে গেছে। শহরের ব্যস্ততম একটা রাস্তার এই অবস্থা কেন বুঝতে না পেরে এদিক-ওদিক তাকায় সে। খানিক বাদে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হেঁটে মারজিয়ার কাছে আসে। মারজিয়া দেখেও না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
লোকটি বলে, ম্যাডাম? কণ্ঠটা পরিচিত লাগে মারজিয়ার। ঘুরে তাকাতেই দেখে লোকটি আর কেউ না তার বিভাগ সহকারী উসমান। মারজিয়া বিভ্রান্তির দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। উসমান তার মোবাইলটা এগিয়ে মারজিয়াকে দেখাতে দেখাতে বলে, আজ বাস-সিএনজির স্ট্রাইক চলছে, ম্যাডাম। কিছুই আসবে না।
মারজিয়া বলে, আপনি কি বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন?
জী—তবে এখন মনে হচ্ছে হেঁটে যেতে হবে।
আপনার বাসা কাছে এখান থেকে?
খুব দূরে নয় তবে হেঁটে যাওয়ার মত এতটাও কাছে নয়। কিন্তু কি করার—
মারজিয়া উল্টো ঘুরে হাটা শুরু করে। বলে, হাসপাতালে ফেরত চলে যাওয়া যায়।
উসমানও তার পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে। আপনার বাসা বেশ দূরে?
নাহ, তবে হেঁটে যাওয়ার মত এতটাও কাছে না। দুইজন চুপচাপ হেঁটে আবার হাসপাতালে ফেরত আসে।
মারজিয়া হেঁটে ব্রেক রুমের দিকে যায়। উসমান দূর থেকে তাকিয়ে মারজিয়াকে হেঁটে যেতে দেখে। ব্রেক রুমের সোফায় একা বসে ব্যাগে থাকা একটা প্রোটিনবার চিবুতে থাকে। তার চোখ দুটো ক্লান্তিতে বন্ধ হয়ে আসতে চায়। ভাবে কিছু একটা খেয়ে অন-কল রুমে যেয়ে ঘুমাবে। দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে ঘুম চোখে তাকায়।
দরজায় ট্রে-তে খাবার হাতে উসমান দাঁড়িয়ে আছে। ম্যাডাম, আসব? মারজিয়া মাথা নেড়ে অনুমতি দেয়। উসমান সাবধানতার সাথে ভেতরে আসে। টেবিলে ট্রে-টা রেখে মৃদুকণ্ঠে বলে, আপনি সম্ভবত কিছু খান নি। তাই আপনার জন্য ক্যাফে থেকে খাবার নিয়ে এলাম।
মারজিয়া তাকিয়ে খাবারের ট্রে-টা দেখে। সামান্য সাদা ভাত, অল্প মশলা দিয়ে রান্না করা সিদ্ধ মুরগীর বুকের মাংস, ঘন ডাল আর একটা পাঁচ-মিশালি সবজি। মৃদুস্বরে বলে, আপনার অফিস আওয়ার তো শেষ। আমার খাবারের প্রয়োজন হলে আমি অন-ডাউটি কাউকে বলতে পারতাম।
উসমান খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে, এরপর থেকে খেয়াল রাখব, ম্যাডাম।
মারজিয়া খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকে। ক্লান্তকন্ঠে বলে, ধন্যবাদ।
সকালের সিডিউলড অপারেশনের পর বিকালের হুট করেই আসা অপারেশনটা তার দিনকে স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ করে দিয়েছিল। হুটহাট অপারেশনের দায়িত্ব চলে আসা তার জীবনের দৈনন্দিন অংশ, তাই এটা খুব বেশি প্রভাব ফেলে নি তার ক্লান্তিতে। তবে পরিকল্পনা বহির্ভূত গাড়িটা নষ্ট হওয়া এবং পায়ে হেঁটে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যেয়ে কোনো ফলাফল ছাড়াই আবার পায়ে হেঁটে হাসপাতালে ফেরত আসাটা দীর্ঘদিনের ব্যস্ততার পর একদম জানের উপর দিয়ে গিয়েছে বলেই মারজিয়ার বোধ হয়।
ক্যান্টিনটা নীচতলার এক কোনে। লিফট থেকে আরও খানিকটা হাঁটতে হয়। সেটুকু হাঁটার শক্তি খুঁজে পাচ্ছিলো না সে। তবে ক্ষুধাও লেগেছিল। ভেবেছিলো চারতলায় উঠে কাউকে খাবার এনে দেওয়ার জন্য বলবে কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে ক্লান্ত শরীরে ক্ষুধায় কাতর হয়ে প্রোটিন বারটা চিবুচ্ছিলো সামান্য শক্তি সঞ্চারের আশায়। ক্লান্ত হাতে চামচটা উঠিয়ে খাওয়া আরম্ভ করে মারজিয়া। উসমান তখনও দাঁড়িয়ে আছে মারজিয়ার সামনে।
সামান্য ভাতে ডাল মাখিয়ে মুরগী-সবজি নিয়ে দুই চামচ মুখে দিল মারজিয়া। এরপর সামনে তাকিয়ে উসমানকে দেখল। কিছু বলবেন?
উসমান খানিকটা ইতস্তত বোধের সাথে টেবিলের উপর একখানা বড় চকলেট বার রাখে। বলে, আপনি সাহায্য না করলে বোধহয় আমি কখনওই নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে পারতাম না। ধন্যবাদ, ম্যাডাম।
মারজিয়া তাকিয়ে চকোলেট বারটা দেখে। হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়া থেকে কেনা বিদেশি চকলেট। দামটা একদমই কম হওয়ার কথা নয়। মারজিয়া এক চামচ ভাত মুখে দিতে দিতে বলে, চকলেটের জন্য ধন্যবাদ তবে আমি মিষ্টি জিনিস পছন্দ করি না। এটা আমার নাম বলে ক্যাফেতে ফেরত দিয়ে দিবেন।
উসমানের মুখটা খানিকটা দুঃখী হয়ে যায়। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে চকলেটটা আবার নিয়ে পকেটে ভরে। বলে, একখানা কথা জিজ্ঞেস করব, ম্যাডাম?
মারজিয়া মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। বলে, বলুন।
আপনি তো জয়নালকে ঠিকই 'তুমি' করে বলেন, তবে আমার বেলায় কেন 'আপনি' ব্যবহার করেন? বয়স বা পজিশন কোনোটাতেই তো আপনি আপনার উপরে না।
মারজিয়া খানিকটা হাসে। বলে, যে আপনাকে লবিং করে এখানে এনেছে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে 'আপনি' বলি।
উসমানের লজ্জা বোধহয়। সে মাথা নীচু করে মৃদুস্বরে বলে, আমি জানি কাজটা সঠিক না, তবে চাকরিটার আমার খুব প্রয়োজন ছিল।
প্রয়োজন কার থাকে না, উসমান সাহেব? কিন্তু সবার আপনার মত কানেকশন থাকে না।
উসমান তাকিয়ে মারজিয়াকে দেখে। নির্বিকারভাবে খাবার চিবুচ্ছে। উসমান খানিকটা অভিমানের সুরে বলে, আপনি যখন আমাকে এতটাই অপছন্দ করেন তাহলে আমাকে সাহায্য কেন করলেন?
মারজিয়া চামচ দিয়ে সামান্য তরকারি নিয়ে ভাতের সাথে মাখাতে মাখাতে বলে, আমি আপনাকে অপছন্দ করি না, আপনার এখানে আসার পদ্ধতিটাকে অপছন্দ করি। আর আমি শুধু যেটা সঠিক সেই কাজটা করেছি। এখানে আপনার উপকার হওয়াটা সম্পূর্ণ কাকতালীয়।
উসমানের খানিকটা রাগ অনুভব হয়। মনে মনে ভাবে, কেমন মেয়ে মানুষ! কোনো রস-কস নাই! বিরক্তির সাথেই মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে তার ভাত খাওয়া দেখতে থাকে।
মারজিয়া বলে, আপনি কি আরও কিছু বলবেন?
উসমান একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, চাকরিটা ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এছাড়া আমি আর কি করতে পারি?
মারজিয়া খানিকটা অবাক হয়। মুখ তুলে উসমানের দিকে তাকায়৷ উসমানের গালগুলো রাগে-অভিমানে খানিকটা ফুলে ফুলে আছে। চোখগুলো দেখে মনে হয় এখনই অভিমানে কেঁদে ভাসিয়ে দেবে। এক মুহুর্তের জন্য উসমানের সাথে আলিশার মিল খুঁজে পায় সে। বিষয়টা ভাবতেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে মারজিয়ার।
বলে, নিজের কাজটা ভালভাবে শিখুন। যেভাবেই আসুন না কেন, নিজের কাজটা ভাল জানলে মানুষের আর তাকে নিয়ে অভিযোগ থাকে না।
উসমান মাথা নাড়ে।
মারজিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মলিন, সাধারণ জামাকাপড় পরনে, চুলগুলোও খানিকটা এলোমেলো। পায়ের জুতাটা ভালোই ঘষেছে বলেই মনে হয়। প্যান্টের পকেট থেকে চকলেটের বারটা উঁকি দিচ্ছে। মারজিয়া এক পলক ঘড়ির দিকে তাকায়। ঘন্টার কাটা বারোটা পেরিয়ে আরও কিছুটা গিয়েছে। মৃদুস্বরে বলে, বসো।
উসমান অবাক চোখে তাকায়। ভাবে, মাত্র 'তুমি' করে বলল! ধীর পায়ে দূরত্ব বজায় রেখে সোফায় বসে সে।