Novel

ত্রি-রমনী (পরিচ্ছেদ ২০)

December 19, 2025

300 views

মারজিয়ার খাওয়া শেষ। প্লেটটা খানিকটা ঠেলে টেবিলের ভেতরে রাখে। সামনের বোতলে রাখা পানিটা খেয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, তুমি খেয়েছো রাতে।

না, ম্যাডাম৷ সাংবাদিকদের সাথে বেশ কয়েকবার নাস্তা করেছিলাম তো ক্ষুধা লাগে নি।

হুম। এর আগে তুমি আফ্রিকাতে ছিলে?

জী, ম্যাডাম। একটা এনজিওতে কাজ করতাম, সেখান থেকে পাঠিয়েছিলো। পানি নেই, খাবার নেই, তীব্র গরম—ভালোই কষ্ট হয়েছিলো ওখানে। দেশে এসে শান্তি।

বাড়ি কোথায় তোমাদের?

রাঙ্গামাটি। আমার বাবা-মা, বড় ভাই-ভাবী, সবাই ওখানে থাকে।

এখানে একা থাকো?

নাহ, বোনের বাসা আছে, ফুপুর বাসা আছে, এক বন্ধুর বাসা আছে। বোন বের করে দিলে ফুপুর বাসায় যাই, ফুপু বের করে দিলে বন্ধুর বাসায় যাই। এভাবে চলছে আর কি। উসমান বলতে বলতে হাসে। 

মারজিয়া খানিকটা উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। 

উসমান বলে, ম্যাডাম আরেকটা বিষয় আপনাকে বলা হয় নি। আপনি ডীন স্যারকে সম্ভবত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলেছেন—আমি আসলে কোনো আইনি ঝামেলায় যেতে চাচ্ছি না।

কেন?

বিষয়টা এমন যে, কে আমাকে বিশ্বাস করবে! কে বিশ্বাস করবে যে আমার মত হাট্টাগাট্টা একজন পুরুষ মানুষ অবলা একজন নারীর কাছে যৌন হয়রানির স্বীকার হতে পারে।

মারজিয়া গম্ভীর মুখে উসমানের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, আমি বিশ্বাস করব। 

উসমান বিস্ময়ের সাথে তার মুখের দিকে তাকায়। 

মারজিয়া বলে, ডীনের কথা কানে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে সাহায্য করব।

উসমানের বিস্ময়ের সাথে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে অল্প একটু হাসি ফুটে। হাসিটা সুখের বদলে দুঃখের আভাসই বেশি দেয়। সে মুখ নীচু করে বলে, বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ।

উসমান? 

মারজিয়ার ডাক শুনে সামান্য মুখ তুলে সে। তার ডান চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে তার কালো প্যান্টের উপর পরে। 

মারজিয়ার চেহারায় খানিকটা অনুতাপ প্রকাশ পায়। সে উসমানের থেকে চোখ সড়িয়ে নেয়। হাত দুটো পায়ের কাছে এনে মুঠ করে ধরে বলে, আমার তখন তেরো বছর বয়স ছিল। আমার চাচাতো ভাইকে পড়াতে আমাদের বাড়িতে এক ভার্সিটি পড়ুয়া এলাকার ভাই আসত। আমিও মাঝেমাঝে আমার টুকটাক পড়ার বিষয় তাকে জিজ্ঞেস করতাম। 

উসমান তাকিয়ে মারজিয়ার কথা শুনতে থাকে। 

মারজিয়া মৃদুস্বরে বলে, সেদিন বাড়ির সবাই ফুপুর বাসায় গিয়েছিলো। আমার আর ভাইয়ার ফাইনাল তাই আমরা বাসায় বসে সেই ভাইয়ের কাছে পড়ছিলাম। ভাইয়াকে কিছুক্ষণ পড়ানোর পর সে বলল ভাইয়া যেন এখন বাহিরে বন্ধুদের সাথে খেলতে যায়। পরীক্ষা আগে খেলাধুলা করলে ব্রেন ভাল কাজ করে। আমার ভাই চলেও গেল। মারজিয়া খানিকটা থামে। আদও উসমান শুনতে আগ্রহী কিনা বোঝার তার দিকে তাকায়।

উসমান বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বলে দিচ্ছে এ গল্পের শেষটা সে জানে। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না। মৃদুকণ্ঠে বলে, তারপর?

মারজিয়া বলে, ভাইয়া চলে গেলে সে আমাকে অংকে সাহায্য করবে বলে ডাকে। আমার চেয়ারটা টেনে একদম তার পাশে বসায়। আমার লম্বা, ঘন চুল ছিল। সেই চুলগুলো ধরে তারিফ করতে লাগল। 

মারজিয়া থেমে উসমানের দিকে তাকায়। ছোট ছিলাম তো, এতকিছু বুঝতাম না। কিন্তু তার স্পর্শগুলো যে স্বাভাবিক না সেটুকু বুঝতে পারছিলাম। সারাটা রাত কেঁদে কেঁদে ভেবেছি কেন সে এমন করল! কাউকে কি বলব, বুঝতে পারছিলাম না। তাই ভাইয়াকে বললাম। সে উলটো আমার সাথেই রাগ করল। বলল, তোকে পড়ানোর টাকা তো সে নেয় না। এক তো তোকে ফ্রীতে পড়ায় উলটো তার নামেই খারাপ কথা বলছিস। লজ্জা করে না! কই আমার সাথে তো ভাই এমন করে না। তোর ভেতর এমন বিশেষ কি আছে যে তোর সাথে এমন করবে? 

মারজিয়া খানিকটা থামে। এরপর আবার বলতে শুরু করে, ওর কথা শুনে আমিও ভাবলাম, আসলেই তো ভাইয়ার সাথে তো এমন করে না, তবে আমার সাথে কেন! অনেক ভাবার পর মনে হল, হয়ত আমার চুলের কারনে। আনমনেই নিজের চুলে হাত বুলাতে থাকে মারজিয়া। ভাইয়ার তো আমার মত এত সুন্দর লম্বা চুল নেই। পরদিনই মায়ের সেলাইয়ের কেঁচি দিয়ে নিজের লম্বা, ঘন চুল কেটে ফেলি। সাথে বোনেরটাও কেটে দেই। আমার ভয় হয়, যদি চুলের কারনে ওর সাথেও এমন হয়! 

মারজিয়া হাসে। বলে, কি কান্নাটাই যে করেছিলো আলু। তার এত শখের চুল। উসমানের দিকে তাকায় মারজিয়া। বলে, ওই লোকটা এই ঘটনার পরও বেশ অনেক মাস আমাদের বাসায় আসত ভাইয়াকে পড়াতে। আমাকে ডাকত। আমি প্রতিটা দিন ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতাম। অনেকবার ভেবেছি বাবা-মাকে বলি। কিন্তু আর বলতে পারি না। আমার মায়ের তিনটা মেয়ে ছিল। এমনিতেই সংসারে তার কোনো দাম ছিল না। তার উপর এমন কিছু শুনলে যদি দাদু আমাদের ঘর থেকে বের করে দেয়! কাউকে কিচ্ছু বলতে পারি নি। এখন খুব আফসোস হয়, কেন পারলাম না! কি ভয়ের সাথে আমার প্রতিটা দিন কাটত— 

মারজিয়া একটু থেমে উসমানের চোখের দিকে তাকায়। চেহারাটায় কষ্ট বিদ্যমান। বলে, ডীন বুঝবে না, জয়নাল বুঝবে না৷ জারিন-তকী-প্রদীপ স্যার, এই হাসপাতালের কেউ বুঝবে না তোমার উপর দিয়ে কি যাবে যখন প্রতিটা দিন এই চারতলায় ওই মহিলাটাকে তোমার দেখতে হবে।

উসমান হাসিমুখে বলে, কে বলে কেউ বুঝবে না? আপনি তো আছেন৷

মারজিয়া গম্ভীর চোখে তাকিয়ে থেকে বলে, উসমান, আমি শুধু বলার জন্য বলছি না। যতটা দূর যেতে হয় আমি যাব তোমার সাথে। আমি আজও অনুতাপে ভুগি যে কেন সেদিন আমি নিজের চুলকে দোষ দিয়েছিলাম, কেন বুঝি নি যে দোষ আমাদের না, দোষ এই বিকৃত মস্তিষ্কের অমানুষগুলোর!

উসমান হাসতে হাসত বলে, ভাগ্যিস বুঝেছেন। আমার তো চুল না, হাত ধরে টানাটানি করত। হাত দুটো কেটে ফেললে কিভাবে কি করতাম, বলুন তো! 

মারজিয়া কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে তার দিকে৷ 

উসমান হাসি থামিয়ে বলে, ধন্যবাদ, ম্যাডাম। এই যে আপনি আমার সাথে বহুদূর যাওয়ার কথা বলছেন, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। এসব আইনি ঝামেলা আমার কাজ না।

তবে তুমি কোনো পদক্ষেপ নিবে না বলছো?

পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী তারাই ম্যাডাম, যারা কিছু জানে না, কিছু বুঝে না। বুঝতে জানলে লবিং করে চাকরি পাওয়াতে কষ্ট লাগে, সেই চাকরিতে হয়রানীর স্বীকার হয়ে প্রতিবাদ করতে ভয় লাগে। না জানলে আমি দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতাম হাসপাতালে।

উসমান, তুমি—মারজিয়াকে কথাটা শেষ করতে দেয় না উসমান।

সোফা থেকে উঠে টেবিলের প্লেটটা হাতে নিয়ে বলে, রাত একটা বাজতে চলল, ম্যাডাম। আপনার সারাদিন অনেক ধকল গেছে। মেসে গিয়ে খানিকটা বিশ্রাম করুন। পকেটের চকলেটটা বের করে মারজিয়ার দিয়ে আবার এগিয়ে দিয়ে বলে, জানি আপনি পছন্দ করেন না, তবুও এখানা রাখলে আমার বেশ ভাল লাগবে। নিজে না খেলেও বাসায় ছোট কেউ থাকলে তাকে দিয়ে দিবেন।

মারজিয়া হাত বাড়িয়ে চকলেটটা নেয়। উসমান ধীর পায়ে নিঃশব্দে ব্রেক রুম থেকে বের হয়ে যায়। মারজিয়াও উঠে অন-কল রুমের দিকে আগায়। 

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login