
হেমন্তের বিকেলে যখন রোদের রঙ কাঁচা সোনার মতো হয়ে আসে, তখন নিস্তব্ধ পাহাড়ের কোলঘেঁষা গ্রামটিতে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা নেমে আসে। রাফি এই গ্রামেরই ছেলে, পেশায় সফটওয়্যার ডেভেলপার হলেও তার মন পড়ে থাকে পুরনো ইতিহাসে। গ্রামের এক কোণে পড়ে থাকা জরাজীর্ণ 'চৌধুরী ভিলা' যখন ভাঙার কাজ শুরু হলো, রাফি সেখানে গিয়ে হাজির হলো কৌতূহলবশত।
ইটের স্তূপ আর মাকড়সার জালের মাঝে সে খুঁজে পেল রূপালি রঙের একটি পকেট ঘড়ি। ঘড়িটি অদ্ভুত—তার সেকেন্ডের কাঁটাটি স্থির, কিন্তু মিনিটের কাঁটাটি চলছে উল্টো দিকে। বাড়িতে এনে ঘড়িটি পরিষ্কার করতেই তার গায়ে খোদাই করা ছোট একটি লেখা ফুটে উঠল: "সময় কেবল এগিয়ে যায় না, মাঝে মাঝে ফিরেও তাকায়।"
রাফি যখন ঘড়িটির নব (Knob) ঘোরাল, ঘরের ভেতরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে এল। দেয়ালের ওপর প্রজেক্টরের আলোর মতো একটা আবছা দৃশ্য ফুটে উঠল। ১৯৪০ সালের পোশাক পরা এক ভদ্রলোক ডায়েরিতে কিছু লিখছেন। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকানোর মতো করে বললেন,
"আমি জানি, এই ঘড়ি একদিন কারো হাতে পড়বে। আমি অনাথ আশ্রমের জন্য জমানো টাকাগুলো এই বাড়ির উত্তর দিকের দেয়ালে একটি লোহার সিন্দুকে রেখে গিয়েছিলাম। যুদ্ধের ডামাডোলে আমি সেগুলো দিয়ে যেতে পারিনি। যে এই ঘড়িটি পাবে, সে কি আমার এই শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করবে?"
দৃশ্যটি মিলিয়ে গেল। রাফির সামনে এখন এক মস্ত বড় দ্বিধা। সে যদি সিন্দুকটি খুঁজে পায়, তবে সে অনায়াসেই শহরের বিলাসবহুল জীবন বেছে নিতে পারে। কেউ জানবে না, কোনো প্রমাণ থাকবে না।
সারারাত রাফির চোখে ঘুম এল না। পরদিন ভোরে সে আবার সেই ভাঙা বাড়িতে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর উত্তর দিকের নোনা ধরা দেয়ালের আড়ালে সত্যিই একটি ছোট সিন্দুক খুঁজে পেল সে। ভেতরে পাওয়া গেল প্রচুর পুরনো মোহর আর কিছু প্রাচীন দলিল, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা।
রাফি মোহরগুলো নিয়ে শহরে গেল। কিন্তু কোনো জুয়েলারির দোকানে নয়, সে গেল সেই অনাথ আশ্রমে, যেটির নাম ওই লোকটির ডায়েরিতে উল্লেখ ছিল। আশ্রমটি এখন ভাঙাচোরা, অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার পথে। রাফি সিন্দুকটি তাদের হাতে তুলে দিয়ে পরিচয় দিল একজন অজ্ঞাত দাতা হিসেবে।
আশ্রম থেকে বের হওয়ার সময় রাফি পকেট থেকে সেই ঘড়িটি বের করল। দেখল, ঘড়ির উল্টো ঘোরা মিনিটের কাঁটাটি এখন একদম স্থির। আর যে সেকেন্ডের কাঁটাটি বছরের পর বছর বন্ধ ছিল, সেটি হঠাৎ 'টিক টিক' শব্দে সম্মুখপানে চলতে শুরু করেছে।
রাফি হাসল। সে বুঝতে পারল, অতীতের আটকে থাকা ঋণের বোঝা আজ মুক্ত হয়েছে, আর সেই সাথে তার নিজের জীবনের সময়ও এখন নতুন ছন্দে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি।