
শহরের নামী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সায়েম চৌধুরী দীর্ঘ বিশ বছর পর তার জন্মভূমি 'শান্তিপুর' গ্রামে ফিরেছে। বিশ বছরে সায়েমের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে—গাড়ি হয়েছে, বিত্ত-বৈভব হয়েছে, কিন্তু মনের কোণে কোথাও যেন একটা খরা রয়ে গেছে। তার গ্রামে ফেরার উদ্দেশ্য কোনো আবেগ নয়, বরং খাঁটি ব্যবসায়িক। পৈতৃক ভিটেমাটি আর বিশাল ফসলি জমিগুলো বিক্রি করে দিয়ে সে শহরে একটি বিশাল কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স গড়ে তুলবে।
গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটার সময় সায়েম দেখল চারপাশটা কত বদলে গেছে। তবে বদলায়নি কেবল সেই বিশাল পুরনো বটগাছটা। বটতলায় পৌঁছাতেই সে থমকে দাঁড়াল। দেখল, তার ছোটবেলার খেলার সাথী কাসেম এখনও সেই পুরনো ভাঙা বাঁশিটা নিয়ে সুর তুলছে।
সায়েমকে দেখে কাসেম বাঁশি থামিয়ে জড়িয়ে ধরল। "সায়েম! তুই শেষমেশ আসলি? জানতাম মাটির টান তোকে ঠিকই ফিরিয়ে আনবে।" সায়েম একটু অস্বস্তি নিয়ে হাসল, কারণ সে জানে সে কেন এসেছে। কাসেম তাকে টেনে নিয়ে গেল তার মাটির বারান্দায়।
কাসেম আলমারি থেকে ধুলোবালি মাখা একটি পুরনো মাটির কলস বের করে আনল। সায়েমকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, "তোর মা মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে এই কলসটা আমার কাছে আমানত রেখেছিলেন। বলেছিলেন— আমার ছেলে যেদিন অনেক বড় হয়েও নিজের শেকড়কে ভুলে যাবে, সেদিন তাকে দিস।"
সায়েম উৎসুক হয়ে কলসটা খুলল। সে ভেবেছিল হয়তো পুরনো কোনো গয়না বা মোহর হবে। কিন্তু সিন্দুকটি খুলতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। ভেতরে কোনো ধন-রত্ন নেই; আছে কিছু শুকনো বকুল ফুল, সায়েমের ছোটবেলার ছিঁড়ে যাওয়া একটা ফুটবল আর তার নিজের হাতে আঁকা মা-বাবার একটি অগোছালো ছবি। ছবির নিচে মায়ের হাতের সেই পরিচিত অক্ষরে লেখা ছিল—
"শহরের ইটের দেয়াল তোকে সমৃদ্ধি দেবে সত্য, কিন্তু এই মাটির মমতা তোকে যে শান্তি দেবে, তা পৃথিবীর কোথাও পাবি না। শেকড় ছিঁড়ে কখনও সুখ পাওয়া যায় না রে বাজান।"
মুহূর্তেই সায়েমের চোখের সামনে তার ফেলে আসা শৈশব ভেসে উঠল। যে মাটির জন্য তার মা আজীবন লড়াই করেছেন, সেই মাটিকে সে স্রেফ টাকার লোভে বিক্রি করতে এসেছে? নিজের অজান্তেই সায়েমের চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল সেই বকুল ফুলের ওপর।
সায়েম সেদিনই তার মত বদলে ফেলল। সে জমি বিক্রি করার চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলল। সে ঠিক করল, এখানে কোনো কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স হবে না। বরং এই মাটিতেই সে গড়ে তুলবে একটি আধুনিক কৃষি গবেষণাগার এবং শিশুদের জন্য একটি পাঠশালা। সায়েম বুঝতে পারল, বড় বড় অট্টালিকা গড়ার চেয়ে মানুষের মনে আর নিজের শেকড়ে জায়গা করে নেওয়াই জীবনের আসল সাফল্য।
বিকেলের ম্লান রোদে দাঁড়িয়ে সায়েম অনুভব করল, তার হারানো শান্তি যেন দীর্ঘ বিশ বছর পর আবার ফিরে এসেছে।