> উপন্যাসের প্রথম অংশ: *শিকড়ের সন্ধানে*
*১. বাড়ি ছেড়ে আসা*
> রাত তখন প্রায় দুটো। ঢাকা শহরের অভিজাত চৌধুরী ভিলা নীরব, কিন্তু ভেতরের পরিবেশ থমথমে। সোফায় বসা সামিরা, দু'চোখে অবিশ্বাস আর বুক জুড়ে তীব্র হাহাকার। কয়েক ঘণ্টা আগেই সে জেনেছে, গত কুড়ি বছর ধরে যাদের বাবা-মা আর ভাই বলে জেনে এসেছে, তারা আসলে তার কেউ নয়। জন্মের সময় হাসপাতালের ভুলের কারণে সে বদলে গিয়েছিল।
> "আমরা দুঃখিত, সামিরা," মিসেস চৌধুরী ফিসফিস করে বললেন, কিন্তু তার চোখেমুখে কোনো মমতার চিহ্ন ছিল না। "আমরা চাই না আমাদের নিজের মেয়ে আদিবা তোমার কারণে ইনসিকিওর বোধ করুক। তুমি... তুমি বরং চলে যাও।"
> সামিরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই মানুষগুলো, যারা তাকে বড় করেছে, আজ এভাবে পর করে দিচ্ছে?
> তার বড় দুই ভাই, সম্রাট আর মহিত, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। মহিতের চোখে সামান্য জল থাকলেও সম্রাট ছিল নির্লিপ্ত।
> "ভাইয়া, তোমরাও কিছু বলবে না?" সামিরা কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল।
> সম্রাট শীতল কণ্ঠে বলল, "মা-বাবা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই ঠিক। আদিবার ভবিষ্যতের কথা আমাদের ভাবতে হবে।"
> মহিত এগিয়ে এল, "সামিরা, আমরা দুঃখিত। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। তোমার নিজের পরিবার তোমাকেও ফিরিয়ে নিতে চায়নি। এখানে থাকলে তোমার কষ্ট আরও বাড়বে।"
> সামিরার মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। ব্যাগ গুছিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসছিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে শেষবারের মতো বাড়ির দিকে তাকাল, যেখানে তার শৈশব, হাসি-কান্না, সব স্মৃতি জড়িয়ে। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ তাকে আটকালো না। একবুক কষ্ট নিয়ে সামিরা ঢাকা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো, পিছনে ফেলে এল তার কুড়ি বছরের সাজানো জীবন।
*২. নতুন ঠিকানা, নতুন কষ্ট*
> ঢাকা পৌঁছে সামিরা একটি ছোট ফ্ল্যাটে আশ্রয় নিল। নতুন কলেজ, নতুন পরিবেশ। কিন্তু কিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিল না। বাড়ি ছেড়ে আসার এক সপ্তাহ পরেই তার প্রথম অ্যাংজাইটি অ্যাটাক হলো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, বুক ধড়ফড় করছিল। ২০ বছরের একটা মেয়ের জন্য এই মানসিক ধকল সহ্য করাটা ছিল অসম্ভব। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, একাকীত্ব তাকে গ্রাস করছিল।
*৩. আবিরের আগমন*
> কলেজের নতুন ক্যাম্পাসে এক দুপুরে ক্যান্টিনে আবিরের সাথে তার দেখা হলো। আবির ছিল প্রাণবন্ত আর হাসিখুশি। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল এবং একসময় তা প্রেমে রূপ নিল। আবিরকে পেয়ে সামিরা যেন নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা খুঁজে পেল। আবিরের সান্নিধ্য তার মানসিক ক্ষতগুলোকে কিছুটা হলেও সারিয়ে তুলছিল। আবির তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল।
*৪. বিষাক্ত সম্পর্ক*
> কিন্তু এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। আবিরের প্রতি সামিরার ভালোবাসা ধীরে ধীরে আসক্তিতে পরিণত হলো। পরিবার হারানোর ভয় সামিরাকে সারাক্ষণ তাড়া করত, আর সেই ভয় থেকেই জন্ম নিল তীব্র সন্দেহ। আবির অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা বললেই সামিরা পাগল হয়ে যেত। আবিরের বন্ধুদের, বিশেষ করে তার বান্ধবীদের (রিতি ও মরিয়ম), সামিরা সহ্য করতে পারত না।
> একদিন বিকেলে আবিরের বন্ধু মানিক আর রোহানের সাথে দেখা করতে গেল আবির। সামিরাও জোর করে সাথে গেল।
> "আবির, চল আমরা ওই ক্যাফেতে বসি," রিতি এগিয়ে এসে বলল।
> সামিরা সাথে সাথেই রিতির দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল। আবির অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
> "রিতি, তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন?" সামিরা রেগে বলল। "আবিরের সাথে কথা বলার দরকার হলে সামনে এসে বলো, হাত ধরে টানছ কেন?"
> সবাই অবাক হয়ে সামিরার দিকে তাকাল। আবির দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। "সামিরা, কী বলছিস এসব? রিতি তো জাস্ট বলল।"
> রোহান বলল, "আরে সামিরা আপু, রিতি তো কিছু মনে করেনি। তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন?"
> সামিরা শান্ত হলো না। "তোমরা সবাই মিলে আবিরকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইছ, তাই না? আমি সব বুঝি।"
> আবিরের বন্ধুরা সেদিন কিছু না বললেও, এই ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটত। আবির বন্ধুদের সাথে মিশতে পারত না ঠিকমতো।
*৫. ভাঙন*
> সামিরা আর আবিরের সম্পর্ক প্রায় চার বছর ধরে চলছিল। আবির এই দমবন্ধ করা সম্পর্ক থেকে মুক্তি চাইছিল। একদিন রাতে আবির সামিরাকে ফোন করল।
> "সামিরা, আমার মনে হয় আমাদের আর একসাথে থাকা সম্ভব না," আবির শান্ত স্বরে বলল।
> সামিরা চিৎকার করে উঠল, "কী বলছিস তুই? আবির, আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না! তুই আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না!"
> "আমি আর পারছি না সামিরা। তোর সন্দেহ, তোর পাগলামি আমার জীবন বিষিয়ে তুলেছে। আমি মুক্তি চাই।"
> "আমি শুধরে নেব নিজেকে, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না!" সামিরা কাঁদতে কাঁদতে বলল।
> আবির ফোন কেটে দিল। সামিরা পাগলের মতো আচরণ করতে শুরু করল। সে আবিরের বন্ধুদের ফোন করে করে বিরক্ত করতে লাগল। মানিকের কাছে ফোন করে বলল, "তোরা আবিরকে আমার কাছে ফিরিয়ে দে, নয়তো আমি মরে যাব!"
> মানিকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। "সামিরা, আবির তোর সাথে থাকতে চায় না। জোর করে ভালোবাসা হয় না। ওকে শান্তিতে থাকতে দে।"
> সামিরা বুঝতে পারছিল না কী করবে। তার দ্বিতীয় আশ্রয়ও যেন ভেঙে যাচ্ছিল। পরিবার হারানোর কষ্ট আর আবিরের চলে যাওয়ার ভয় তাকে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত করে তুলল।
(উপন্যাসিকার প্রথম অংশ এখানে শেষ হলো। পরের অংশে সামিরার জীবন নতুন কী মোড় নেয়, তা লেখা হবে।)
38
View
Comments
-
Md Jamal Uddin 3 weeks ago
উপন্যাসটি আমার খুবই ভালো লেগেছে😊