তার ঠোঁট যেন ডাঁসা জামরুলের লালচে রঙ ধারণ করেছে। আকারে পুষ্ট দুই কোয়া কমলার থেকে বেশি নয়। দাঁত যেন ডালিমের দানার মতো চকচকে। হাসিটা চালতা ফুলের মতো; হৃদয়ে ছোঁয়া দেয়, দোলা দেয়। চোখ? তালের শাঁসের মতো। টলটলে, জ্বলজ্বলে। যেন কালো মেঘের মতো ভ্রু-যুগলের তলায় শরতের সাদা মেঘের মতো ভাসমান। দেখতে কেমন? এখানে কবি ব্যর্থ! তবে তাকে দেখলে যেন পৃথিবীর তাবৎ আনন্দরা মনের মধ্যে লাফালাফি শুরু করে। মেয়েটি নিছক সাধারণ। স্বর্গের কোনো দেবী নয়। তবে প্রত্যেকটি মেয়েই কোনো না কোনো পুরুষের চোখে সাক্ষাৎ দেবী। যেমন তুষারের চোখে এই চঞ্চল হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটি।
স্কুল মাঠের কাছ ঘেঁষেই বাড়ি। অমাবস্যার ঘন অন্ধকার যেন তার চুলে। মেয়েটি ফর্সা আবার মলিন। ঠিক যেন চাঁদের রঙ। তবে ফ্যাকাসে নয়। মাঝে-মাঝে যেমন স্নিগ্ধ চাঁদ দেখা যায়, গোলাপি আভা; তেমনই। বলতে পার মোহিনী। আর মুখ? ছেলেবেলার দেখা কার্টুন চরিত্রের মতো, আনন্দ ঠিকরে দিচ্ছে যেন। দেখা বুঝি চোখের সুখ! সুন্দরী মেয়েরা স্বভাবতই হয় চঞ্চল। ছটফটে রূপ তাদের ঔজ্জ্বল্যকে তোলে ফুটিয়ে। অথচ মেয়েটি গম্ভীর, ধীর। মুখাবয়ব যেন হাসছে চাঁদের মতো। মেয়েটির চারদিকে যেন ছড়িয়ে যাচ্ছে আলো। মোহিত হওয়া বলাই বাহুল্য! মেয়েটির নাম জোছনা হলে মানাতো। কিন্তু সে যে আলাদা। নামটিও তেমন—তানুশকা। তার মুখাবয়ব কিংবা ধড়নের মতো গড়নও নজর কাড়বে সবার। লম্বাটেও নয় অথচ খাটো বলার সুযোগ নেই। ছিপছিপে নয় অথচ মোটা বলাও যাবে না। প্রথম দেখায় মেয়েটি যেন রূপকথার রাজকন্যার মতো।
এলাকায় তুষার নতুন। স্বভাবতই ভীরু। তানুশকাকে দেখে সে থমকায়। যেন তার মুখে হীরা-পান্না চমকায়। তুষার মেয়েটির সামনেই দাঁড়ায়। কথা বলতে চায়, অথচ তার জানা নেই উপায়। সে তাম্রমূর্তির মতো ঠায় থাকে দাঁড়িয়ে। এতকিছু সামনে রেখেও মেয়েটা বুঝি দেখছে না কিছুই। এমনই শান্ত। এমন মেয়ে ঠিক দেখা যায় না। তুষার কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতোই হঠাৎ সামনে দাঁড়ায়। মেয়েটি তুষারের দিকে কতটুকু তাকিয়েছে তা বোঝা ভার। শুধুমাত্র চোখে-মুখে এক জিজ্ঞাসু ঝলক নিয়ে শান্তভাবেই দাঁড়ায়। যেন সবকিছু স্বাভাবিক। হাসিমুখে প্রশ্ন করে, “বলবেন কিছু?”
তুষার যেন রূপকথার রাজ্য থেকে নশ্বর ধরণীতে ফেরে। প্রশ্নে বিব্রতবোধ করে। পথ ছেড়ে দাঁড়ায়। মেয়েটি কিন্তু সাথে সাথেই যায় না। উত্তরের অপেক্ষা করে। তুষার জানতে চায়, “এদিককার ডাকঘরটি কোথায়?”
তানুশকা এবার ছেলেটির দিকে তাকায়। লম্বা দেহের সাথে লম্বা চুল। মুখে ছোট ছাঁটা চাপদাড়ি। বিনয়ী হাসি যেন ঠোঁটের সাথেই লেগে আছে। ঠোঁট বেদানাকোয়ার মতো রঙ, যেন রক্ত জমাট। চোখ মাটির সাথে খেলছে যেন। কথার তালে তালে সমান অঙ্গভঙ্গি তাকে আলাদা করেছে। মেয়েদের মতোই রক্ষণশীল। যেন প্রতিমুহূর্তে নিজেকে সংবরণের চেষ্টায়। হাতে চিঠির খাম নেই। চিঠির চলও নেই। অথচ খুঁজছে ডাকঘর। অন্তর্জালের এই ফাঁদে এখনও যে পুরোপুরি কেউ আটকায়নি—এটা ভেবেই আনন্দ হয় তানুশকার। তানুশকা কখনো চিঠি লেখেনি। কাকে লিখবে? তবে নানীর কাছে চিঠি পাওয়ার আনন্দের কথা শুনেছে। ছোট্ট তানুশকা চিঠি পাবার স্বপ্ন দেখেছে। মনে পড়ে তানুশকার। আচ্ছা, ছেলেটি কাকে চিঠি লেখে? হয়তো বাবাকে নয় প্রেয়সী, অথবা অন্য কেউ। ভাবনায় কেটে যায় অনেকটা সময়। বুঝতে পেরে লজ্জিত হয় তানুশকা। ছেলেটি ভাবলেশহীন। তাকে দেখছে নাকি কিছু ভাবছে বোঝা যায় না। তানুশকা হাত বাড়িয়ে দেখায়, “ঐ যে ওদিকটায় কিছুদূর এগিয়ে পাঠাগারের বামপাশে।”
পাঠাগার!—ছেলেটি চমকানোর সুরে আশ্চর্যভঙ্গিতে বলল। যেন হঠাৎই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সাফল্য বা বহুকাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তু নিজ থেকেই কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাবভঙ্গি এমনই।
“হ্যাঁ। পাঠাগার। সমবায় পাঠাগার।”
উত্তর শুনে আবারো যেন খুশির ঝলক লাগে ছেলেটির শরীরে। এমন প্রফুল্ল কাউকে দেখে তানুশকাও প্রফুল্লবোধ করে। সাধারণত তানুশকা অপরিচিত কারো সাথে দীর্ঘ আলাপে যায় না। কিন্তু ছেলেটিকে অবহেলা করতে ইচ্ছে হয় না। ভালো লাগে। ভাবে কথা চালিয়ে নেবে যতক্ষণ ছেলেটিকে আনন্দিত মনে হয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মানুষের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে কি-না!
“সমবায় পাঠাগার আবার কেমন?” ছেলেটি প্রশ্ন তোলে।
“আপনি বেশ আগ্রহী দেখছি!” তানুশকা বিদ্রূপ করে।
ছেলেটি নির্বিকার। ঠোঁটের সাথে হাসি আছে ঝুলে। হাসিটিকে প্রশস্ত করে বলল, “এলাকায় আমি নতুন। আমার কোনো বন্ধু নেই। বইয়ের মতো এমন আপন বন্ধুর খোঁজ পাওয়ার আগ্রহ তো থাকবেই। তাও পাঠাগার, বন্ধুমেলা!”
ছেলেটির উত্তরে তানুশকা খুশি হয়। ভাবে বইয়ের থেকে ভালো বন্ধু এখন ঠিক পাওয়া দুষ্কর। নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব। শুধুমাত্র প্রেমিক মনোভাব রাখলেই, বই দেবে প্রশান্তি। তানুশকা জবাব দেয়, “ঠিক বলেছেন। লেখকরা তাদের লেখার মাধ্যমে হয়ে ওঠে পাঠকের বন্ধু। আর শতাব্দীর সবথেকে জ্ঞানে-গুণীর একাংশের যিনি বন্ধু হবেন, তিনি মানুষ হবেন-ই।”
“সমবায় পাঠাগারের পদ্ধতিটা কেমন?”
“একদমই সাধারণ। ঠিক সমবায় সমিতির মতো। হতে হবে সদস্য। সদস্য হতে হলে সমিতিকে দিতে হবে যেকোনো দু'টি বই। বই জমা দেওয়ার বিনিময়ে মিলবে সদস্যকার্ড। কার্ড দেখিয়ে যেমন পড়তে পারবে বই, তেমনই নিতে পারবে বই ঋণ, নির্দিষ্ট সময় শেষে তা ফেরত দিতে হবে সুদ সমেত।”
“মহৎ কাজে সুদের মতো নিকৃষ্ট ব্যবসায়ী ফাঁদ কেন!”
“ফাঁদ, ঠিক তা নয়। এটা একটি সম্পদ বৃদ্ধির পদ্ধতি। যা লাইব্রেরিকেও সমৃদ্ধ করবে, আবার পাঠককেও করবে সন্তুষ্ট। প্রত্যেক পাঠককে ঠিক বিশটি বই ঋণ দেবার পরেই তার থেকে সুদ হিসেবে ধার্য করা হবে একটি বই। যা তার ইচ্ছেমতো দিতে পারবে। যেকোনো ঘরানার, যেকোনো মূল্যের।”
“তার মালিকানা?”
“অবশ্যই পাঠাগারের। পাঠাগার যেহেতু সকলের, সেহেতু মালিকানাও সকলের। ঋণ প্রদান, সুদ সমেত গ্রহণের মাধ্যমে চক্রবৃদ্ধিহারে সমৃদ্ধ হবে পাঠাগার।”
“মন্দ নয় ব্যাপারটা। কিন্তু উৎসাহী লোকেদের বই পড়তে হলেও কি বই জমা দিয়ে সদস্য হতে হবে?”
“তেমন নয়। এখানেও একটা পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। দু'টি বই জমা দিয়ে যদি কেউ আশাহত হয়, তবে সমবায় পাঠাগারের প্রতি মানুষের তৈরি হবে অনাগ্রহ। সেজন্য মাত্র দুই টাকায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে টিকেটের। যতদিন সদস্যকার্ড না হচ্ছে ততদিন কিনতে হবে টিকেট। মাস শেষে টিকেট দিয়ে হবে লটারি। ভাগ্যবান পাঁচজনকে দেওয়া হবে ফ্রি সদস্যকার্ড। আর বাকি টাকা খরচ হবে মাসিক সেরা পাঠকের পুরস্কারের জন্য। এতে করে বই পড়ার আগ্রহ বাড়বে। আর আগ্রহীরা যাচাই করে সদস্য হতে পারবে।”
“দারুণ বুদ্ধি। কিন্তু পাঠাগারের জন্য প্রথম অর্থায়ন কে করেছিল?”
“আমরাই। আমাদের পাড়ার স্কুলের পুনর্মিলনীতে সাবেক একশজন ছাত্র-ছাত্রী মিলে স্কুলেই গঠন করেছিলাম সমবায় পাঠাগার। সহজ পদ্ধতি। সকলে দু'টি বই জমা দিয়েছে। তারপর বই ঋণ, সুদ প্রদানের মাধ্যমেই চক্রবৃদ্ধিহারে এখন সহস্র বইয়ের সমৃদ্ধ পাঠাগার।”
“বেশ বুদ্ধি। চাইলেই কোনো উৎসাহী ছাত্র-ছাত্রীর দল অথবা এলাকার তরুণ-প্রবীণরা মিলে তৈরি করতে পারে এমন একাধিক পাঠাগার। আলোকিত হতে পারে সবাই।”
“একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের পাশের মহল্লার তরুণরা মিলেও বানিয়েছে এমন এক পাঠাগার।”
“এই সহজ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সবখানে অলিতে-গলিতে সমবায় পাঠাগার তৈরি হলেই আলোকিত হবে সবাই। দেশটা তবেই খাঁটি সোনার হবে। ঔজ্জ্বল্য ছড়াবে। কেননা বই-ই একমাত্র পারে মানুষের মধ্যকার আসল মানুষকে খুঁজে বের করায় সাহায্য করতে।”
“ঠিক তাই।”
“আমি তবে পাঠাগারের দিকেই যাই। চিঠিখানা আপনি রাখুন।”
বলেই ব্যাগ থেকে একটি খাম বের করে তুষার। তানুশকার হাতে গুঁজে দিয়েই সামনে হাঁটতে আরম্ভ করে। মুহূর্তেই আড়াল হয় চোখের। সামনে দেখা যায় বিখ্যাত সেই শশী মিষ্টান্ন ভান্ডার। ছেলেটি সেখান থেকে মোড় ঘুরে এগিয়ে চলে পাঠাগারের দিকে। তানুশকা দেখে চিঠিতে নেই প্রাপকের ঠিকানা। রঙিন একটুকরো কাগজে লেখা ছোট্ট চিরকুট—
“প্রত্যেক মানুষ এক জীবন্ত বই। যা ক্ষণে-ক্ষণে সংশোধিত হয়, পরিমার্জিত হয়। অন্য এক বইয়ের সাথে মিলে অর্জন করে পূর্ণতা। তখন ঐ দু'টি বই জীবনের জন্য শ্রেষ্ঠ পাঠাগার। শুধু পড়তে জানতে হয়। পাল্টাতে জানতে হয়। ধাপে-ধাপে সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে করতে হয় পরিমার্জিত সংস্করণ। সফলতা আসে তবে। আচ্ছা, তুমি কি আমার পরিপূরক বই হবে?”
পাখিরা নীড়ে ফিরে যায়। গোধূলির সময়। সূর্য অস্ত যায়-যায়। তানুশকার কল্পনায় ছেলেটি ফিরে আসে। ইচ্ছে হয় হুন্ডিতে সই করে দেয় তার হৃদয়। তানুশকা কি এমন ছিল? মানুষ কি এতটা দ্রুত বদলায়? ভাবতে ভাবতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ভাবে হ্যাঁ, মানুষ দ্রুতই বদলায়।