পাঠ–৩ : *অচেনা পরিচয়ের ছায়া*
কাজ, বাসা, অফিস—এই তিনটির বাইরে কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই সামিরার। ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই এক বিকেলে পুরনো দিনের ছায়া হয়ে হাজির হলো রনিতা।
ক্যাফের কোণার টেবিলে বসে রনিতা সামিরার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
— “বিশ্বাস করতে পারছিস, এত বছর পর আবার দেখা! তুই তো একেবারেই বদলে গেছিস রে।”
সামিরা হালকা হাসল।
— “জীবন মানুষকে বদলাতে বাধ্য করে রনিতা।”
— “তবুও তোরে দেখে ভালো লাগছে।তুইতো ঢাকায় এসে কারো সঙ্গে যোগাযোগই রাখিস না।”
— “রাখার মতো মানুষই তো ছিল না,” সামিরার কণ্ঠটা একটু ভারী হয়ে এলো।
রনিতা গসিপ ভালোবাসে—এটা সামিরা ছোটবেলা থেকেই জানে।
কথায় কথায় রনিতা তার আরেক বান্ধবী সিমির কাছে সামিরার গল্প শুরু করল।
সিমি অবাক হয়ে বলল,
— “মানে সত্যিই বাচ্চা বদল হয়েছিল?”
— “হ্যাঁ রে! শুধু বদল না, একটা বাচ্চা চুরিও হয়েছিল,” রনিতা গম্ভীর গলায় বলল।
সিমি জিজ্ঞাসা করল,"কোথায় ঘটেছিল এই ঘটনা । "
— “ইন্টারন্যাশনাল কেয়ার হাসপাতালে।”
সিমির কপাল কুঁচকে গেল।
— “নিশ্চিত তো? নামটা কোথাও শুনেছি মনে হচ্ছে।”
— “একদম নিশ্চিত। তিনটা পরিবার জড়িত ছিল। পরে এই ঘটনার জন্য হাসপাতালটাই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিশ বছর পর সব সত্যি প্রকাশ পায়।”
— “এত বড় ঘটনা, অথচ আমি কিছুই শুনিনি!”
রনিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “এইসব কথাকি মানুষ ঢোল পিটিয়ে বলে। আমি তো সামিরার কাছ থেকেই শুনেছি। যেদিন সে সব বলেছিল, সেদিন কত কেঁদেছিল রে! সবচেয়ে কষ্টের ছিল—তার নিজের পরিবারও তাকে ফেরত নেয়নি, চৌধুরী পরিবারও তাকে চলে যেতে বলেছিল।”
রনিতার কথার মাঝেই সিমির মাথায় বারবার হাসপাতালের নামটা ঘুরতে লাগল।
সেই রাতে শুয়ে শুয়ে হঠাৎ করেই সিমির মনে পড়ল—এই নামটা সে মামাবাড়িতে শুনেছে। আরও মনে পড়ল, তার মায়ের কথা—জন্মের সময় তার এক মামাতো বোন চুরি হয়ে গিয়েছিল।ওই সময়ই সিমি ওই হাসপাতালের নাম শুনেছিল।
“তাহলে কি…?”
সিমির বুক ধক করে উঠল। সেদিন রাতে তার আর ঘুম এলো না।
পরদিন ভোরেই সিমি মামাবাড়ি চলে গেল। তাকে দেখে সবাই অবাক।
— “এত সকালে?” মামি প্রশ্ন করলেন।
সিমি কিছু বলতে পারছিল না। ভাবছিল,যদি মামিকে সব বলি আর সবশেষে কিছু না মেলে?মামির যে রাগ,তখন মামা বাড়ির ধারে কাছে ও আসা যাবে না।
মামা বিদেশে। তিন মামাতো ভাইয়ের মধ্যে বড়—আকাশ—সকালের নাস্তা খেতে ডাইনিং টেবিলে বসেছে। সিমি ধীরে কাছে গিয়ে বলল,
— “আকাশ ভাই, আমি আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
সব কথা শুনে আকাশ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
— “আমি খোঁজ নিচ্ছি সিমি। যদি সত্যি কিছু থাকে, সেটা জানা দরকার।”
কয়েকদিনের মধ্যেই আকাশ সব নিশ্চিত করল। পাঁচ বছর আগে তদন্তে বের হয়েছিল—ইন্টারন্যাশনাল কেয়ার হাসপাতালে চুরি হওয়া মেয়েটি আসলে তাদের পরিবারেরই সন্তান। আর সেই মেয়েটিই—সামিরা।।(৫ বছর আগে যখন সব কিছু জানা যায় ওই সময় আকাশের পরিবার দেশের বাহিরে ফেমেলি ট্রিপে গিয়েছিল। ওই সময় বাড়ির লেনলাইনে কল দিয়েছে তাই কেউ উত্তর দিতে পারেনি।)
সেদিন রাতে আকাশ বাবা-মায়ের সামনে সব বলল।
মা বাবাকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠলেন,
— “আমার মেয়েটা বেঁচে আছে?”
সামিরা চুরি যাওয়ার পরে তার মা তিন মাস পাগল হয়েগিয়েছিল।সময়ের সাথে তিনি নিজেকে সামলে নিলেও।সামিরার কথা মনে করলে এখনও তিনি কান্না করে
— “আমি এখনই ওকে দেখতে চাই,” মা কাঁপা গলায় বললেন।
পরদিন সকালেই তারা সামিরার বাসার দিকে রওনা দিল।
সেই সময় সামিরা অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। আজ প্রমোশনের ঘোষণা। তার মাথায় একটাই চিন্তা—এইবার যদি বঞ্চিত হয়?
ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল।
— “এই সময় আবার কে?” বিরক্ত হয়ে দরজা খুলল সামিরা।
সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ আর তার বাবা-মা।
দরজা খুলতেই অচেনা এক মহিলা সামিরাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
সামিরা হতভম্ব।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
“এই মানুষগুলো কারা?
সামিরার জীবনে কি এবার ফিরে আসবে শান্তি, নাকি আরও নতুন কিছু আপেক্ষা করছে তার জন্য?