Posts

গল্প

গল্প: নিঃশব্দ শিক্ষক

January 5, 2026

Moytri Roy

Original Author Moytri Roy

Translated by English

15
View

কিছু মানুষ কথা বলে জীবন শেখায়, আবার কিছু মানুষ নীরব থেকে মানুষ করে তোলে।

গল্প: নিঃশব্দ শিক্ষক

নতুন বছরের ভোর। জানালার ফাঁক গলে আসা নরম রোদ মেঝের ওপর, বাতাসে হালকা কাঁপুনি—যেন পুরোনো বছর বিদায় নিয়েছে, আর নতুন বছর জীবনে আনছে নতুন গল্প। এই সময় মানুষ পেছন ফিরে তাকায়, জানতে চায় শিকড় আর শেখাগুলো। আমি, অন্বেষা, বেড়ে উঠেছি এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। বিলাসিতা কম থাকলেও ভালোবাসার অভাব ছিল না। বাবা রোহিত শিখিয়েছেন শক্তি, মা সুদীপ্তা ধৈর্য আর নীরব সহানুভূতি। সেই দুইয়ের মাঝে বেড়ে ওঠা আমি। ছোটবেলার পার্ক ছিল আমার দ্বিতীয় জগৎ। প্রতিদিন বিকেলে বাবার সাথে পার্কে যেতাম। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে বাবা হেসে উড়িয়ে না দিয়ে শক্ত হাতে তুলে ধরতেন। বলতেন

— পৃথিবীতে কেউ হারতে আসে না মা, সবাই শিখতে আসে। পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোই জয়।

মা বেঞ্চে বসে থাকতেন, চোখে মিশ্র অনুভূতি—শান্তি ও ভয়। পড়ে গেলে ছুটে আসতেন না, কারণ বাবা আছেন। আমার চোখে ভরসা দেখলেই তিনি খুশি। মা নীরবে শিখিয়েছেন, কেউ ভাঙতে চাইলে চুপ থেকে শক্ত হতে হয়।

মায়েরা চিৎকার করে সাহস দেয় না, তারা নিঃশব্দে পাশে থাকতেন।

মাধ্যমিক পরীক্ষায় অপ্রত্যাশিত খারাপ ফল আমার স্কুল জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা ছিল। মনে হচ্ছিল জীবন থমকে গেছে। বাবার সামনে কাঁদতে কাঁদতে বসেছিলাম। বাবা চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, "একটা পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার মানে এই নয় যে তুমি খারাপ। তুমি চেষ্টা করেছ, সেটাই আসল। ভুল থেকে শেখা যায়। তুমি আবার চেষ্টা করবে।"

মা পাশে এসে মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন, "কাঁদো। কান্না দুর্বলতা নয়, সাহসের প্রতীক।"

সে রাতে বুঝলাম, বাবা আমাকে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন, আর মা ভেঙে যেতে দিয়েছেন। দুটোই জীবনে জরুরি।

আমি পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম এবং ভালো ফল করতে শুরু করলাম। সবাই খুশি হলেও মা সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন যেদিন আমি নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলাম। মায়ের হাসি আর হাতের স্পর্শ—এসব ছোট ছোট জিনিসই আমাদের জীবনকে শক্ত করত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নতুন চ্যালেঞ্জ আসে। আমি বড় হওয়ার, নিজের একটা স্থান তৈরি করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। ঠিক তখনই খবর আসে বাবার চাকরি চলে গেছে। সেদিন বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে যায়। বাবা চুপচাপ বসে ছিলেন, আর রান্নাঘরে মায়ের হাত কাঁপছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, বাবা ভয় পেয়েছেন, আর মা নীরবে সেই ভয় লুকাচ্ছিলেন।

রাতে মা বাবাকে বললেন— “চিন্তা কোরো না। আমরা একসাথে আছি। ধীরে হলেও চলবো।”

এই ছোট্ট “আমরা”—এই একটি শব্দেই মায়ের ভেতরের শক্তি স্পষ্ট হয়।মা শুধু পরিস্থিতি সামলাননি, তিনি বিশ্বাসে বিশ্বাস যোগ করেছিলেন।

আমি বাবার পাশে গিয়ে বলি—
“বাবা, তুমি আমাকে শিখিয়েছ, পড়ে গেলেও উঠে দাঁড়াতে হয়। আজ তোমার সময়। আমি পাশে আছি।”

বাবার চোখে জল।আমি দেখলাম, সেই মানুষটা যিনি সবসময় বলতেন—“ভয় কোরো না”—তিনি নিজে ভয় পাননি, মায়ের পাশে এসে দাঁড়ানোতে।পরের দিন বাবার নতুন ব্যবসা শুরু হলো। আমি পড়াশোনার ফাঁকে সাহায্য করি। মা হিসাব রাখেন, খরচ সামলান, অল্পকে বড় করে তোলেন। দিন কাটে। সমস্যা আসে, হার মানার সুযোগও আসে, কিন্তু আমরা হাল ছাড়ি না।

বাবার ব্যবসা ধীরে ধীরে দাঁড়ায়। ছোট্ট দোকান, কয়েকজন নিয়মিত গ্রাহক, আর আমাদের চেষ্টা—সব মিলিয়ে জীবন এগোতে থাকে। তখন বুঝি, জীবনের বড় জয় মানে বড় কিছু অর্জন নয়।

জয় মানে ভেঙে না পড়ে একসঙ্গে দাঁড়ানো।“

মনে পড়ে, একবার দোকানে এক খদ্দের বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। বাবা চুপ থাকায় আমি রেগে গিয়ে কারণ জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, "প্রতিক্রিয়া না দিলেও মানুষ বোঝে। সময় সব ঠিক করে দেয়।"

মায়ের চোখে ছিল শান্তি। তিনি জানেন, বাবা শক্ত—তিনি নীরবে জয়ী হন। প্রতি বছর নতুন বছরের রাতে আমরা তিনজন ছাদে দাঁড়াই, চারপাশে আতশবাজির আলো আর শব্দ।হঠাৎ আমি বলি— “বাবা, মা, নতুন বছরে তুমি কী চাও?”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ থাকেন।
“আমি চাই, তুমি নিজের ওপর বিশ্বাস হারিও না। পৃথিবী অনেক সময় বলবে—তুমি পারবে না। তখন আমার কথা মনে রেখো।”

মা হেসে বললেন—
“আর আমি চাই, তুমি নিজের ভেতরের শক্তি চিনে নাও। কখনও ভয় পেও না।”

সেই রাতে আমি বুঝেছিলাম—বাবা শক্তি, মা ধৈর্য, আর আমি তাদের সমন্বয়। এই তিন মিলে মানুষের ভিত্তি রচিত হয়। বছরগুলো পেরিয়ে যায়। বাবা ছোট ব্যবসা চালান, মা সর্বদা পাশে থাকেন, আর আমি নিজের কর্মজীবন গড়ে তুলি। আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—একসাথে থাকা মানেই শক্তি, পরস্পরের জন্য অপেক্ষা করাই অদৃশ্য শক্তি।

ছেলেবেলার পার্কে পড়ে যাওয়া, স্কুলের খারাপ ফল, কিংবা চাকরি হারানো—আজ সবই যেন গল্প। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের ভিত গড়েছে। আমি জানি, একদিন বাবা-মা আর থাকবেন না। তবে তাদের শেখানো কথা, নীরব অপেক্ষা, আর বিশ্বাস—চিরকাল আমার মধ্যে বেঁচে থাকবে।

যে পরিবারে বাবা শক্তি ও মা সহনশীলতার প্রতীক, সেই পরিবারের সন্তান কখনো প্রকৃত পরাজয় মানে না।

নতুন বছরের সকালে নীরব ঘর। হাতে চায়ের কাপ, জানালার পাশে আমি। বাবা ছাদে,  দূরে তাকিয়ে আছেন। মা রান্নাঘরে, চোখে স্নেহ। এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই আজ মূল্যবান। উপলব্ধি করি, জীবনের বড় শিক্ষা হয়তো বড় অর্জনে নয়, বরং ভালোবাসাপূর্ণ ছোট ছোট নিয়মিত মুহূর্তগুলোতে—যেখানে বিশ্বাস, সমর্থন, অপেক্ষা মিশে আছে।

মনে পড়ে, ছোটবেলার বিকেলে পার্কে পড়ে গেলে বাবা হাত ধরে তুলতেন, শান্তভাবে পাশে বসতেন। সেই নীরব সাহস আজও আমার জীবনের ভিত্তি। আজ যখন নিজেকে দৃঢ় মনে হয়, বাবার চোখে সেই বিশ্বাস দেখি, মায়ের চোখে ধৈর্য। তারা জানেন আমি বড় হয়েছি, তবুও ছোট ছোট অভ্যাসে নীরবে পাশে আছেন। বাবা হঠাৎ বলেন, “অন্বেষা, মনে আছে আমরা তোমাকে প্রথম হাঁটতে শিখিয়েছি?”
আমি হেসে মাথা নাড়ি।
“হ্যাঁ বাবা, আমি বারবার পড়েছিলাম।”
তিনি হাসেন, চোখে সেই অহংকার।
“ঠিক সেই অনুভূতিটাই জীবনে সবকিছুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ—পড়ে যাওয়া আর উঠে দাঁড়ানো।”

মা আসে, চুলে হাত বুলিয়ে বলেন,
“আর মনে রেখো, তুমি কখনও একা নও। আমরা সবসময় তোমার পাশে আছি। যেকোনো ঝড়ে নিজেকে ভেঙে পড়তে দিও না। আমাদের বিশ্বাস তোমাকে শক্তি দেবে।”

 রাতে  ছাদে আমরা তিন জন দাঁড়াই। আকাশে রঙিন আলো।বাবা হঠাৎ চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“এবার তুমি নতুন জীবন শুরু করছ। মনে রেখো, জীবন শুধু অর্জনের জন্য নয়। জীবন হলো শেখার জন্য, অনুভব করার জন্য, এবং সাহসের জন্য।”

আমি চোখ বন্ধ করি।নিঃশ্বাসে সব প্রশান্তি অনুভব করি।সেই ছোটবেলার পার্কের মাটির নরম অনুভূতি, স্কুলের পরীক্ষার চাপ, বাবার সংগ্রাম, মায়ের ধৈর্য— সব মিলিয়ে এক নতুন শক্তি আমাকে ঘিরে রাখে। আমাদের গল্প শুধুই আমার নয়।এটি প্রতিটি পরিবারের গল্প।যেখানে বাবা শক্তি, মা সহনশীলতার প্রতীক, আর সন্তান সেই দুইয়ের সঙ্গে মিশে নিজের পথ খুঁজে নেয়।নতুন বছর মানে নতুন ক্যালেন্ডার নয়।নতুন বছর মানে নতুন শিক্ষা, নতুন উপলব্ধি।

আমি ঠিক করেছি বাবা মার নিঃশব্দ শিক্ষা, তাদের অপেক্ষা, তাদের বিশ্বাস—আমার ভিতর চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং সেই শিক্ষা আমি আমার সন্তানদেরও দেব।শিখাব—পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানো, বিশ্বাসে টিকে থাকা, একে অপরকে সমর্থন করা এই হল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

বাবা হঠাৎ চুপচাপ আকাশের দিকে তাকান।মায়ের চোখে ঠাণ্ডা এক আভা।আমি বুঝি—তাদের জীবন সংগ্রাম আর ভালোবাসার মিশ্রণ। তাদের নিঃশব্দ জীবন এখন আমার জীবনের ভিত তৈরি করেছে।

যে মানুষগুলো আমাদের ভেঙে না দিয়ে নীরবে পাশে থাকে, তারাই আমাদের প্রকৃত শিক্ষক।

নতুন বছর আসে, যায়।কিন্তু এই শিক্ষা থেকে যায়—পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানো, পরিবারকে শক্তি দেওয়া, ছোট ছোট মুহূর্তে ভালোবাসার মানে বোঝা।আমি জানি, একদিন আমার সন্তান হবে, তাদের চোখে সেই শিক্ষা ফুটবে এবং আমি গর্বের সঙ্গে বলব

— এই জীবন, এই শিক্ষা, এই পরিবার—এটাই আমাদের প্রকৃত সম্পদ।

আর আজ আমি বুঝি—আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয় পরিবারের পাশে থাকা এবং তাদের পাশে পাওয়ার শক্তি। 

প্রকৃত শক্তি হারানোর ভয়ে নয়, বরং পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ানোর সাহস এবং পাশে থাকা মানুষদের প্রতি বিশ্বাসে নিহিত।

এই গল্প  প্রতিটি বাবা, মা  ও সন্তানের; যাদের জীবন নিঃশব্দ ভালোবাসায় গড়া। নতুন বছর মানে পুরোনো শিক্ষাকে নতুন করে মনে করা। আর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: যে অপেক্ষা করতে জানে, সে কখনও হারে না। নতুন বছরে বাবা-মায়ের দিকে তাকালে বুঝি, আমাদের শক্ত হওয়ার পেছনে কত নীরব ত্যাগ  লুকিয়ে আছে।


*** নতুন বছরের জন্য একটি হৃদয়স্পর্শী গল্প। এটি ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সাহসের পাঠ শেখাবে এবং জীবনে নতুন প্রেরণা যোগাবে। আমার অন্যান্য বাংলা গল্প পড়তে চোখ রাখুন:

📖  প্রতিলিপিতে: https://bengali.pratilipi.com/user/moytri-roy-3iq2rk4000
💻 Digital Pencil: https://digitalpencilbd.blogspot.com/

🌸Talent Stage: Bangla Youtube Channel - https://www.youtube.com/@TSforeveryone 

    

***পারলে একবারের জন্য হলেও ওয়েবসাইট গুলোতে ঘুরে আসুন, আশা করি নিরাশ হবেন না।

Comments

    Please login to post comment. Login