শেষ অংশ : ফিরে পাওয়া ঠিকানা
অচেনা সেই নারীর কান্নায় সামিরার বুক কেঁপে উঠল। কিছু বলার আগেই আকাশ ধীরে এগিয়ে এসে বলল, — “সামিরা, ভয় পেও না। আমরা তোমারই মানুষ।”
তারপর একে একে সব কথা খুলে বলল তারা—হাসপাতাল, হারিয়ে যাওয়া শিশুকন্যা, বিশ বছরের অপেক্ষা, আর এক মায়ের নিঃশ্বাসে জমে থাকা না-বলা কান্না।
সামিরা নির্বাক হয়ে শুনছিল। চোখের সামনে যেন পুরো জীবনটা ভেঙে ভেঙে জোড়া লাগছিল।
মা আবার তার হাত ধরে কাঁপা গলায় বললেন, — “মা রে, তোকে আমরা কোনোদিন ভুলিনি। শুধু… খুঁজে পাইনি।”
এরপরের দিনগুলো বদলে গেল ধীরে ধীরে। তিন ভাই—আকাশ, অয়ন আর ছোট অনিল—সামিরাকে ঘিরে ধরল ভালোবাসার অদৃশ্য এক বৃত্তে। এতদিনের শূন্যতা তারা পূরণ করতে চাইছিল না, তারা শুধু পাশে থাকতে চাইছিল।
অফিসে সেই দিন প্রমোশন পেল না সামিরা। বসের পক্ষপাতিত্ব নতুন কিছু ছিল না। আগের মতো ভেঙে পড়েনি সে। চুপচাপ রেজিগনেশন লেটার জমা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় মনে হয়েছিল—কিছু দরজা বন্ধ হওয়াই নতুন পথের শুরু।
কয়েক মাস পর সে যোগ দিল তাদের পারিবারিক কোম্পানিতে। নিজের যোগ্যতায়, নিজের পরিশ্রমে। ভাইদের ছায়ায় নয়—পাশে দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে সামিরা প্রমাণ করল, সে শুধু হারিয়ে যাওয়া কোনো গল্প নয়, সে নিজেই একটি শক্ত অধ্যায়।
সবচেয়ে শান্ত সময়গুলো আসত পাহাড়ে। অনিলের সাথে মাঝে মাঝেই হাইকিংয়ে যেত সে। কুয়াশা ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সামিরা বুঝত—জীবন সবসময় সমতল হয় না, কিন্তু উপরে উঠলে দৃষ্টিটা পরিষ্কার হয়।
মা এখনো মাঝেমধ্যে কাঁদেন। তবে সেই কান্না আর শূন্যতার নয়— ফিরে পাওয়ার।
একদিন সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামিরা ভাবল—
সে আর একা নয়।
তার একটি পরিবার আছে।
একটি ঠিকানা আছে।
আর নিজের মতো করে গড়ে তোলা একটি ভবিষ্যৎ।
হারিয়ে যাওয়া মেয়েটি আর নেই।
এখন সে শুধু সামিরা—ভালোবাসায় ফিরে আসা, নিজের জীবনের পূর্ণ মালিক।
21
View