Posts

উপন্যাস

নদীর ওপারে আলো

January 21, 2026

Shoyeb Uddin

14
View

নদীর ওপারে আলো
গ্রামটার নাম কেউ মনে রাখেনি। মানচিত্রে তার কোনো চিহ্ন নেই, কিন্তু নদীর ধারে দাঁড়ালে বোঝা যায়—এই গ্রাম একদিন কারো অপেক্ষায় ছিল।
নদীটা ছিল ধূসর, ঠিক বৃদ্ধ মানুষের চোখের মতো। বর্ষায় সে হুংকার দিত, শীতে নীরব হয়ে পড়ে থাকত। নদীর ধারে প্রতিদিন বিকেলে এসে বসত নীলু। তার হাতে থাকত একটা ছেঁড়া খাতা, তাতে লেখা থাকত অগোছালো কিছু শব্দ—কখনো কবিতা, কখনো কেবল দীর্ঘশ্বাস।
নীলুর বাবা একসময় এই নদী পাড়ি দিয়ে শহরে গিয়েছিল কাজের খোঁজে। যাওয়ার সময় বলেছিল,
“ফিরব নীলু, নদীর ওপার থেকে আলো নিয়ে ফিরব।”
কিন্তু আলো আর আসেনি। মানুষটা হারিয়ে গিয়েছিল শহরের ভিড়ে, ঠিক যেমন তার নামটা হারিয়ে গিয়েছিল সরকারি কাগজে।
মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় চুলায় ভাত বসাতেন, আর নীলু জানালার পাশে বসে থাকত। বাতাসে যখন ভেজা মাটির গন্ধ আসত, তখন নীলু ভাবত—এই গন্ধ কি বাবার শরীরেও লেগে আছে?
একদিন গ্রামে খবর এলো—নদীর ওপারে নতুন সেতু হবে। সবাই খুশি, কারণ সেতু মানে বাজার, হাসপাতাল, স্কুল—সবকিছুর সহজ রাস্তা। কিন্তু নীলু খুশি হতে পারল না। তার মনে হলো, সেতু হলে বাবার ফিরে আসার গল্পটা অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। নদীটা আর অপেক্ষা করবে না।
সেতু তৈরির দিন নীলু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। শ্রমিকদের কোলাহলে নদীর শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে খেয়াল করল—নদীর জলে সূর্যের আলো পড়ে ঠিক বাবার কথার মতো ঝিলমিল করছে।
নীলু ছেঁড়া খাতাটা খুলে লিখল—
“আলো কখনো মানুষ হয়ে ফেরে না। আলো ফেরে স্মৃতি হয়ে।”
সেদিন প্রথমবার নীলু বুঝল, অপেক্ষা মানে শুধু ফিরে পাওয়া নয়—অপেক্ষা মানে নিজের ভেতর আলো জ্বালিয়ে রাখা।
সেতু দাঁড়াল। মানুষ পারাপার শুরু করল।
আর নীলু?
সে নদীর ধারে আর বসে থাকে না। সে এখন স্কুলে পড়ায়, শিশুদের শেখায় শব্দের মানে, অপেক্ষার মানে।
নদী আজও বয়ে চলে।
কিন্তু নীলুর ভেতরে আর কোনো অন্ধকার নেই।

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Shoyeb Uddin 4 days ago

    নদীর ওপারে আলো „