Posts

বিশ্ব সাহিত্য

ভিনদেশে

January 21, 2026

মোঃ আনোয়ার পারভেজ

Original Author আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

Translated by মো. আনোয়ার পারভেজ

51
View

শরতের পুরো সময়টা জুড়ে সেখানে যুদ্ধ চলছিল, কিন্তু আমরা আর সেখানে যাইনি। মিলানে শরৎ ঠাণ্ডা আর সন্ধ্যাও নেমে আসত খুব তাড়াতাড়ি। তখন বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠলে রাস্তার লাগোয়া জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগত। দোকানের বাইরে শিকার করা প্রচুর পশু-পাখি ঝুলানো থাকত, শেয়ালের পশমের ওপর গুড়িগুড়ি তুষার ঝরে পড়ত, বাতাসে তাদের লেজ দুলত। শক্ত, ভারি আর ফাঁকা হরিণ ঝুলত, ছোট ছোট পাখিও দুলত, বাতাসে সেগুলোর পালক এদিক-ওদিক উলটে যেত। সেই শরৎটা আদতেই বেশ ঠাণ্ডা ছিল। হাওয়াটা বয়ে আসত পাহাড় থেকে।

প্রতিদিন বিকেলবেলায় আমরা সবাই হাসপাতালটায় হাজির হতাম। গোধূলিবেলায় শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হেঁটে এই হাসপাতালে আসার অনেকগুলো পথ ছিল। পথগুলোর দুটো ছিল খাল বরাবর, আর খালগুলো ছিল দীর্ঘ। হাসপাতালে ঢুকতে খালের উপরের অন্তত একটা সেতু পার হতে হতো। তিনটা সেতুর মধ্যে একটা বেছে নেওয়ার ব্যাপার ছিল। একটার ওপর এক মহিলা বাদাম ভাজতেন। তার কাঠ-কয়লার উনুনের সামনের জায়গাটায় দাঁড়ালে বেশ গরম লাগত- পকেটে বাদাম ঢুকালে পকেটটাও পরে বেশ গরম হয়ে উঠত। হাসপাতালটা অনেক পুরোনো আর সুন্দর ছিল- একটা গেট দিয়ে ঢুকে হেঁটে উঠোন পেরিয়ে অপর প্রান্তের আরেকটা গেট পার হতে হতো। শবযাত্রা সাধারণত শুরু হতো উঠোন থেকে। পুরোনো হাসপাতালটা ছাড়িয়ে ছিল নতুন ইটের প্যাভিলিয়ন- সেখানে আমরা প্রত্যেক বিকেলে  জড়ো হতাম; বেশ ভদ্রভাবে ‘ব্যাপারটা কী’ গোছের আলাপে মশগুল থাকতাম, তারপর মেশিনে বসতাম- সেগুলো এক ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দিত।

আমি যে মেশিনে বসতাম ডাক্তার সেখানে এসে জিগ্যেস করতেন, ‘যুদ্ধের আগে তুমি কী করতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে? কোনো খেলা প্র্যাকটিস করতে?’

আমি বলতাম, ‘হ্যাঁ, ফুটবল।’

তিনি বলতেন, ‘ভালো। তুমি আগের চেয়েও ভালো ফুটবল খেলতে পারবে।’

আমার হাঁটু ভাঁজ হতো না, হাঁটু থেকে ডিমহীন গোড়ালিটা পর্যন্ত সোজা হয়ে ঝুলত; মেশিনটা ছিল হাঁটু ভাঁজ করা আর নাড়ানোর জন্য- ট্রাইসাইকেল চালানোর সময় যেমনটা হয় আর কি! তবুও ভাঁজ হতো না, উল্টো ভাঁজের জায়গাটায় এসে মেশিনটা একপাশে হেলে পড়ত। ডাক্তার বললেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একজন ভাগ্যবান যুবক। আবার তুমি সেরা খেলোয়াড়দের মতো ফুটবল খেলতে পারবে।’

পরের মেশিনে একজন মেজর বসতেন, তার হাতটা হয়ে গিয়েছিল একটা শিশুর হাতের মতো ছোট। ডাক্তার যখন তার হাত পরীক্ষা করতেন, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপতেন। দুটো চামড়ার ফিতার মধ্যে তার হাতটা ঝুলানো থাকত, ফিতাগুলোর উপর-নিচ উঠানামার সঙ্গে সঙ্গে তার শক্ত আঙুলগুলোও নড়াচড়া করত। ডাক্তারকে বলতেন, ‘আমিও কি ফুটবল খেলতে পারব, ক্যাপ্টেন-ডাক্তার?’ তিনি একজন বড় অসিক্রীড়াবিদ ছিলেন- যুদ্ধের আগে ইতালির সবচেয়ে বড় অসিক্রীড়াবিদ।

ডাক্তার পেছনের এক ঘরে তার অফিসে গিয়ে একটা ছবি নিয়ে ফিরতেন, সেটা ছিল একটা হাতের ছবি- অনেকটা মেজরের হাতের মতোই যেটা শুকিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছিল- মেশিনে কোর্স করার আগে। পাশে ছিল মেশিন-কোর্স  করার পরের ছবি- একটু বড়। মেজর তার সুস্থ হাত দিয়ে ছবিটা ধরে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ‘কোনো দুর্ঘটনা?’ মেজর জিগ্যেস করলেন। 

‘একটা কারখানার দুর্ঘটনা,’ ডাক্তার বললেন।

‘বেশ মজার ব্যাপার, বেশ মজার,’ মেজর ছবিটা দেখে ডাক্তারকে ফিরিয়ে দিলেন।

‘আপনার বিশ্বাস হয় না?’

‘না,’ মেজরের উত্তর।

তিনজন যুবক প্রত্যেকদিন সেখানে আসত। তারা আমারই বয়সী ছিল। তারা তিনজনই মিলানের বাসিন্দা ছিল। তাদের একজনের ইচ্ছা ছিল আইনজীবী হওয়ার, আরেকজনের চিত্রকর, আর শেষজনের ইচ্ছা ছিল সৈনিক হওয়ার। মেশিনের কারিকুরি শেষ হওয়ার পর আমরা কখনো কখনো হেঁটে হেঁটে স্কালার পাশে ক্যাফে কোভার দিকে যেতাম। আমরা কম্যুনিস্ট কোয়ার্টারের মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত রাস্তাটা বেছে নিতাম, কারণ সংখ্যায় আমরা ছিলাম চারজন। আশেপাশেরা লোকেরা আমাদের ঘৃণা করত, কারণ আমরা অফিসার ছিলাম। হেঁটে যাওয়ার সময় মদের দোকান থেকে কেউ কেউ বলে উঠত, ‘অফিসাররা নিচ!’ আরেকটা ছেলে মাঝে মধ্যে আমাদের সঙ্গে হাঁটায় যোগ দিত, আমাদের সংখ্যা দাঁড়াত তখন পাঁচে।  তার মুখের উপর একটা কালো রুমাল বাঁধা থাকত, কারণ সে তার নাক হারিয়েছিল আর মুখমণ্ডলটা নতুন করে গড়ার দরকার হয়েছিল। সে মিলিটারি একাডেমি থেকে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিল, এবং প্রথমবারের মতো সন্মুখসারিতে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে আঘাত পেয়েছিল। তার মুখ ঠিকঠাক করা হয়েছিল, কিন্তু নাকটা পুরোপুরি আগের মতো করা যায়নি। সে একটা বনেদি পরিবারের সন্তান ছিল। দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়েছিল, একটা ব্যাংকে চাকরি করত। কিন্তু সেটা অনেকদিন আগের কথা আর তখনো আমরা কেউ জানি না ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে। আমরা কেবল এইটুকু জানতাম সবসময়ই যুদ্ধ চলছে, কিন্তু আমরা কেউ তাতে যোগ দিচ্ছি না। 

মুখে কালো সিল্কের রুমাল বাঁধা ছেলেটা ছাড়া আমাদের সবারই এক ধরনের মেডেল ছিল। ছেলেটা কোনো মেডেল পাওয়ার মতো যথেষ্ট সময় ফ্রন্টে কাটায়নি। ফ্যাকাশে মুখের লম্বা ছেলেটি যে কিনা একজন আইনজীবী হতে চেয়েছিল, সে ছিল আরডিটির একজন লেফটেন্যান্ট এবং আমাদের প্রত্যেকের পাওয়া মেডেলের সমান তিনটি মেডেল পেয়েছিল। সে বেশ বড় একটা সময় মৃত্যুর কাছাকাছি কাটিয়েছিল এবং কিছুটা বিচ্ছিন্ন গোছের ছিল। আমরা প্রত্যেকেই একটু বিচ্ছিন্ন গোছের ছিলাম এবং প্রত্যেক বিকেলে হাসপাতালে কাটানো ছাড়া এমন কোনো মিল আমাদের মধ্যে ছিল না যা আমাদের একত্রিত করতে পারে। যদিও শহরের এই নিষ্করুণ এলাকা দিয়ে মদের দোকান থেকে ভেসে আসা আলো আর গানের মধ্য দিয়ে এবং কখনো কখনো ফুটপাতে নারী পুরুষের ভিড় থেকে বাঁচতে ধাক্কাধাক্কি করে রাস্তায় নেমে অন্ধকারে হেঁটে কোভার দিকে যেতে যেতে নিজেদের এমন এক সুতোয় বাঁধা বলে ভাবতাম যা আমাদের যারা ঘৃণার চোখে দেখত তারা বুঝতে অপারগ। 

আমাদের কথা বললে আমরা সকলেই কোভার ব্যাপারটা বুঝতাম। সেটা বেশ সমৃদ্ধ, উষ্ণ আর অনুজ্জ্বল আলোয় আলোকিত, কখনো কখনো মুখর আর ধোঁয়ায় ভরা। টেবিলগুলোতে মেয়েরা খাবার পরিবেশন করত, দেওয়ালে লাগানো র‍্যাকে ছবিভরা পত্রিকা ঝুলানো থাকত। কোভার মেয়েগুলো খুব কড়া দেশপ্রেমিক ছিল, আর আমি দেখেছি ইতালির সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক হলো ক্যাফের মেয়েরা- আমি বিশ্বাস করি তাদের দেশপ্রেম এখনো অটুট। 

সঙ্গীরা প্রথমদিকে আমার মেডেলের ব্যাপারে বেশ বিনয়ী ছিল, জিগ্যেস করত মেডেল পাওয়ার মতো আমি কী কীর্তি গড়েছি। জবাবে আমি তাদের মধুর ভাষায় লেখা আমার কাগজপত্র দেখাতাম। লেখাটা ‘ভ্রাতৃত্ব’ আর ‘আত্মত্যাগ’ এর মতো শব্দে পরিপূর্ণ ছিল কিন্তু বিশেষণগুলো বাদ দিলে সত্যিকার অর্থ দাঁড়ায় যে, আমাকে মেডেল দেওয়া হয়েছে কারণ আমি ছিলাম একজন আমেরিকান। কাগজ দেখানোর পর আমার প্রতি তাদের ব্যবহার একটু বদলে গিয়েছিল- যদিও শত্রুর বিরুদ্ধে এক অর্থে আমি তাদের বন্ধুই। আমি তাদের বন্ধু কিন্তু কাগজপত্রে আমার কৃতিত্বগুলো পড়ার পর তাদের বিবেচনায় আমি আর তাদের একজন রইলাম না, কারণ তাদের ব্যাপারটা ভিন্ন ছিল আর মেডেলগুলোর যোগ্য হওয়ার জন্য তাদের অনেক কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। এটা সত্য যে, আমি আঘাত পেয়েছিলাম কিন্তু আমরা সকলেই জানতাম যে, আঘাত পাওয়াটা প্রকৃতই একটা দুর্ঘটনা। আমি আমার ফিতাগুলো নিয়ে কখনোই লজ্জিত ছিলাম না,যদিও কখনো কখনো ককটেলের সময় শেষে আমি কল্পনা করতাম যে, আর ছেলেরা মেডেল পাওয়ার মতো যা করেছে আমিও সেগুলো করেছি; কিন্তু রাতে জনশূন্য রাস্তা ধরে ঠাণ্ডা হাওয়ায় বন্ধ দোকানের পাশ দিয়ে রাস্তায় আলোর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতে করতে ঠিকই বুঝতাম যে, আমি কখনো তাদের কাজগুলো করতে পারতাম না আর মরণকে আমি ভীষণ ভয় পাই। রাতে বিছানায় একা শুয়ে মরণের কথা মনে এলেই ভীষণ ভয় ধরত আর ভাবতাম আবার যদি ফ্রন্টে যেতে হয় কী দশাই যে হবে আমার!

মেডেল পাওয়া ছেলে তিনটা ছিল শিকারি বাজপাখির মতো, কিন্তু আমি নই, যদিও যারা কখনো শিকার করেনি তাদের কাছে আমাকে বাজপাখির মতো মনে হতে পারে; ছেলে তিনটার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার ছিল, তাই আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম। কিন্তু যে ছেলেটা প্রথম দিনেই ফ্রন্টে আঘাত পেয়েছিল তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব টিকে গিয়েছিল, কারণ সে কখনো জানত না তার কী পরিণতি হতে পারত; তাই সে কখনো ওদের একজন হয়ে উঠতে পারত না, আর আমি তাকে পছন্দ করতাম কারণ আমি মনে করতাম হয়তো সে কখনো একটা বাজপাখি হয়ে উঠতে পারত না। 

মেজর, যিনি একজন সেরা অসিক্রীড়াবিদও ছিলেন, এ ধরনের সাহসিকতার ধার ধারতেন না, তাই আমরা যখন মেশিনে বসতাম তিনি একটা বড় সময় ব্যয় করতেন আমার ব্যাকরণ শুদ্ধ করার পেছনে। আমি যেভাবে ইতালিয়ান বলতাম তিনি তার বেশ প্রশংসা করতেন, আর আমরা কথাও বলতাম বেশ স্বচ্ছন্দে। একদিন আমি বলেই ফেললাম যে আমার কাছে ইতালিয়ান ভাষা এতই সহজ মনে হচ্ছে যে আমি এটা শেখার ব্যাপারে বেশি উৎসাহ পাচ্ছি না, সবকিছুই এত সহজে বলা যায়। মেজর বললেন, ‘বেশ তো, তুমি তাহলে ব্যাকরণের ব্যবহার শিখছো না কেন?’ তাই আমরা ব্যাকরণের সীমানায় ঢুকলাম আর অল্পদিনের মধ্যেই ইতালিয়ান ভাষাটা আমার কাছে এমন কঠিন হয়ে গেল যে পুরাদস্তুর ব্যাকরণসম্মত না হওয়া পর্যন্ত আমি তার কাছে কথা পাড়ার সাহসই সঞ্চয় করে উঠতে পারতাম না। 

মেজর খুব নিয়মিতভাবে হাসপাতালে আসতেন। তিনি আসেন নি এমন কোনো দিনের কথা আমার মনে পড়ে না, যদিও আমি নিশ্চিত মেশিনগুলোর ওপর তার আস্থা ছিল না। এমন একটা সময় এলো যখন আমাদের কারোরই মেশিনগুলোর উপর আস্থা রইল না, একদিন মেজর বলেই ফেললেন, এগুলো কোনো কাজের না। মেশিনগুলো নতুন কেনা হয়েছিল, আর আমরাই ছিলাম এগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণের পাত্র। এটা ছিল একটা নির্বুদ্ধিতা, মেজর বললেন, ‘আর দশটার মতো এটাও একটা তত্ত্ব।’ আমারও ব্যাকরণ শেখা হয়নি, মেজর বলেই ফেললেন, আমি একটা মাথামোটা গাড়ল, আমার পেছনে সময় দেওয়াটা তার বোকামিই হয়েছে। তিনি ছোটখাটো গড়নের মানুষ ছিলেন, ডান হাত মেশিনে ঢুকিয়ে চেয়ারে সোজা হয়ে বসতেন, ফিতাগুলো তার আঙুলসহ উপরনিচে উঠানামা করত, আর তিনি সোজা সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ‘যুদ্ধ শেষ হলে, যদি শেষ হয়ই, তুমি কী করবে? শুদ্ধ ব্যাকরণে বলবে!,’ মেজর আমাকে জিগ্যেস করলেন।

‘আমি আমেরিকায় চলে যাব।’

‘বিয়ে করেছো?’

‘না। কিন্তু আশা আছে করব।’

‘বোকার হদ্দ তুমি,’ মেজর বললেন। বেশ রেগে গেছেন বলে মনে হলো। ‘মানুষের বিয়ে করা উচিত নয়।’

‘কেন সিনর ম্যাগিওর?

‘আমাকে ‘সিনর ম্যাগিওর’ ডাকবে না।’

‘মানুষের বিয়ে করা উচিত নয় কেন?’

‘সে বিয়ে করতে পারে না। সে বিয়ে করতে পারে না,’ মেজর রাগত স্বরে বললেন। ‘যদি এমন হয় যে, তাকে সর্বস্ব হারাতে হবে, তাহলে নিজেকে তার এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না যেখানে তা হারাতে হবে। তার উচিত এমন জিনিস খোঁজা যা তাকে হারাতে হবে না।’ 

তিনি কথাগুলো বললেন বেশ তিক্ততা মিশিয়ে, রাগত স্বরে। বলার সময় সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

‘কিন্তু সে সবকিছু হারাবেই বা কেন?’

‘সে হারাবেই,’ মেজর বললেন। তিনি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর নিচে মেশিনের দিকে তাকালেন, ঝাঁকি মেরে ছোট্ট হাতটা ফিতাগুলো থেকে বের করে নিলেন, উরূতে বেশ জোরের সাথে চাপড় মারলেন। ‘সে হারাবেই,’ তিনি প্রায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমার সঙ্গে তর্ক করবে না।’ তারপর তিনি মেশিন অ্যাটেন্ডেন্টকে ডাকলেন, ‘এই ফালতু জিনিসটা বন্ধ করে দাও।’

তিনি হাল্কা ব্যায়াম আর ম্যাসাজের জন্য পাশের রুমে চলে গেলেন। আমি তাকে ডাক্তারের কাছে ফোনটা ব্যবহার করতে পারবেন কি না জিগ্যেস করতে শুনলাম। তারপর তিনি দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। যখন ফিরে এলেন আমি অন্য একটা মেশিনে বসেছিলাম। তিনি হাতা-কাটা জামা, মাথায় টুপি পরেছিলেন, সোজা আমার মেশিনের দিকে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আমি খুব দুঃখিত।’ তার ভালো হাতটা দিয়ে আমার কাঁধ চাপড়ালেন। ‘আমি খ্যাপব না। এইমাত্র আমার স্ত্রী মারা গেছেন। আমাকে ক্ষমা করো।’

তার জন্য আমার ভীষণ খারাপ লাগল। বললাম, ‘আহ্‌, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত।’

তিনি নিজের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। বললেন, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি মানতে পারছি না।’

তিনি আমাকে ছাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কাঁদতে লাগলেন। ‘আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।’ তার গলা ধরে এলো। কাঁদতে কাঁদতে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে সোজা হয়ে সৈনিকসুলভ ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন, তারপর মেশিনের পাশ দিয়ে হেঁটে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলেন। 

ডাক্তার আমাকে বললেন যে, মেজরের স্ত্রী খুব কমবয়সী ছিলেন। যুদ্ধে একেবারে অকর্মণ্য হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মেজর তাকে বিয়ে করেন নি। নিউমোনিয়া হয়েছিল। অল্প কিছুদিন ভুগেই মারা গেছে। কেউ ভাবেও নি যে মারা যাবে। মেজর তিনদিন হাসপাতালে এলেন না। তারপর স্বাভাবিক সময়েই এলেন, উর্দির হাতায় একটা কালো ফিতা লাগিয়ে। ফিরে এসে দেখলেন দেওয়াল জুড়ে বড় বড় ফ্রেমে বাঁধা ছবি টাঙ্গানো হয়ে গেছে- মেশিন ব্যবহার করার আগের এবং মেশিন ব্যবহার করে পরে ঠিক হওয়ার ছবি। মেজর যে মেশিনটা ব্যবহার করতেন তার সামনে ছিল তারই আঘাতের ধরনের তিনটা ছবি যেগুলোকে পরে মেশিনে ঠিক করা হয়েছিল। আমি জানি না ডাক্তার ওগুলো কোথা থেকে জোগাড় করেছিলেন। আমার সবসময়ই মনে হতো, মেশিনগুলো আমরাই প্রথম ব্যবহার করছি। মেজরের কাছে ছবিগুলোর কোনো গুরুত্ব ছিল না, কারণ তিনি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। 

…………………….*…………………….

Comments

    Please login to post comment. Login