Posts

গল্প

“দিপালী"

January 24, 2026

ইবনুল কল্পনা

7
View

আমাদের গ্রামের নাম শমসেরপুর। সবুজ প্রকৃতি ও সরল মানুষের বসবাসে গঠিত এই গ্রামখানি আমার শৈশব ও কৈশোরের প্রথম স্মৃতিসমূহের নীরব আশ্রয়স্থল। সবে মাত্র প্রাথমিক শিক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটাইয়া আমি মাধ্যমিক শিক্ষার স্তরে পদার্পণ করিয়াছি। আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা চারজন—মাতা, পিতা, আমি এবং আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সেলিম।
 

পিতা গ্রামীণ হাটের দিনে দই, চিড়া, মুড়ি, খই, খুরমা, মটকা প্রভৃতি খাদ্যসামগ্রী বিক্রয় করিয়া হালাল রিজিক উপার্জন করেন। মাতা গৃহে অবস্থান করিয়া হাঁস, মুরগি, গরু ও ছাগল লালন-পালনের মাধ্যমে সংসারের কাজে সহায়তা করেন। এই গৃহপালিত প্রাণীগণ যেন আমাদের পরিবারেরই এক নীরব অংশ—যাহাদের সঙ্গে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সুখ-দুঃখ জড়াইয়া রহিয়াছে।
 

আমার একটি অতি প্রিয় ছাগল আছে—তাহার নাম দিপালী
 

সেদিন ছিল সোমবার। বিদ্যালয় হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া দিপালীকে সঙ্গে লইয়া আমি মাঠে গমন করিয়াছিলাম, তাহাকে ঘাস খাওয়াইবার উদ্দেশ্যে। হঠাৎ দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে প্রবল বায়ু প্রবাহিত হইতে লাগিল। অল্প সময়ের মধ্যেই আকাশমণ্ডল ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। প্রকৃতির শান্ত রূপ মুহূর্তেই যেন কঠোর ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করিল—বৈশাখের কালবৈশাখী ঝড় আসিবার ইঙ্গিত স্পষ্ট হইয়া উঠিল।


পার্শ্ববর্তী গৃহের জরিনা খালাও তাহার গরু কালুকে লইয়া মাঠে অবস্থান করিতেছিলেন। আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তনে কালু ভীত হইয়া উন্মত্তের ন্যায় গৃহাভিমুখে ছুটিতে লাগিল। জরিনা খালাও তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে দৌড়াইয়া নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়া গেলেন। আমিও আর বিলম্ব না করিয়া দিপালীকে লইয়া দ্রুত গৃহাভিমুখে প্রত্যাবর্তন করিলাম।
 

গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম—মাতা খোলা উঠানে গ্রামের খাল হইতে আহরিত পুটি মাছ আলু ও পেঁয়াজসহ রান্নায় রত। কনিষ্ঠ ভ্রাতা সেলিম স্নেহভরে মায়ের কাজে সহায়তা করিতেছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই রান্না সম্পন্ন হইল এবং আমরা সকলে গৃহাভ্যন্তরে আশ্রয় গ্রহণ করিলাম।
 

ইতিমধ্যে প্রবল বর্ষণ আরম্ভ হইয়াছে। সন্ধ্যা ঘনাইয়া চারিদিকে গভীর অন্ধকার নামিয়া আসিল। হারিকেনের ক্ষীণ আলো প্রজ্বলিত করিয়া আমি ও সেলিম পাঠাভ্যাসে মনোনিবেশ করিলাম। দিপালীও আমাদের নিকটেই শান্তভাবে অবস্থান করিল—যেন সেও এই নিরাপদ পরিবেশে স্বস্তি অনুভব করিতেছে।

ক্ষণে ক্ষণে জানালার ফাঁক দিয়া বিদ্যুৎচমকের আলো গৃহমধ্যে ঝলক দিতেছিল। সেই সময় পার্শ্ববর্তী গৃহ হইতে জরিনা খালার কন্যা ঝুমা ও তাহার ভ্রাতা জনি আমাদের গৃহে আগমন করিল। আমরা চারজন একত্র হইয়া আমার নতুন বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা লইয়া কথা বলিতে লাগিলাম এবং মাঝে মাঝে থমকাইয়া কালবৈশাখীর গর্জন শ্রবণ করিতেছিলাম।
 

কিছুক্ষণ পরে মাতা সস্নেহে মুড়ি মাখাইয়া আমাদের জন্য লইয়া আসিলেন। আমরা হাসি-আনন্দে, খেলাধুলার ফাঁকে সেই সহজ খাবার গ্রহণ করিলাম। মায়ের হাতের প্রস্তুত খাদ্যে যে মমতা ও বরকত নিহিত, তাহা হৃদয় দিয়াই অনুভব করা যায়।
 

পরিশেষে সিদ্ধান্ত হইল—ঝুমা ও জনি সেই রাত্রিতে আমাদের গৃহেই অবস্থান করিবে। আমরা চারজন গিয়া জরিনা খালাকে বিষয়টি জানাইয়া আসিলাম। রাত্রিতে পুটি মাছের তরকারি ও ভাত গ্রহণ করিয়া গল্প করিতে করিতে কখন যে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হইলাম, তাহা অনুভব করিতে পারিলাম না।
বহিরঙ্গে তখনও বৃষ্টি ঝরিতেছে, মেঘের গর্জন অবিরাম

বহিরঙ্গে তখনও বর্ষণ অব্যাহত, মেঘের গর্জন অবিরাম—
আর শমসেরপুরের একখানি সাধারণ বৈশাখী রাত্রি স্মৃতির পাতায় চিরকালের জন্য অসাধারণ হইয়া রহিল।

Comments

    Please login to post comment. Login