Posts

নন ফিকশন

রবীন্দ্র সরোবরে যেভাবে নেমে এলো ইন্দিরা রোড

January 25, 2026

সাজিদ রহমান

6
View

শুরুটা কিভাবে করি?

আচ্ছা, কারফিউ এর মধ্যে মানিক মিয়া রোডে পুলিশের দাবড়ানির কথাটাই না হয় পাড়ি। হল ছেড়ে পুর্ব রাজাবাজারে উঠেছি। কিছুদিন বাদে বাড়ির মালিক (সাবেক এক মন্ত্রীর কাজিন ও এপিএস) বললেন, ইন্দিরা রোডের নতুন বাসায় উঠতে পারি। বাড়ির কাজ তখনও চলছে। সেখানে গিয়ে উঠলাম।

২০০৭ সাল। মসনদে ১/১১ এর সরকার। ঢাকা ভার্সিটি কাণ্ডের জেরে কারফিউ চলছে। এর মধ্যেও আমরা গিয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছি মানিক মিয়াতে। ভাবখানা এমন সদ্য পাশ ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিয়ে পার পেয়ে যাবো। রাস্তা ফাঁকা, বাইরে অল্প কিছু মানুষ। হঠাৎ করে পুলিশ ও আর্মি চলে আসে। মুহুর্তের মধ্যে একশন। আমরা মাইর থেকে বাঁচার জন্য প্রাণপণে দৌড়াচ্ছি। এক বাসার গ্যারাজে ঢুকেছি। ভাবলাম, এবার বোধহয় নিরাপদ। কিন্তু না, বাহিনী সেখানেও হামলা করে।

২।

বাড়িওয়ালার সাথে গ্যাঞ্জাম লেগে গেছে। হুদাই। পরের মাসে বাসা ছাড়তে হবে। আমরা বুদ্ধি পাকালাম। মিস্ত্রির কাছ থেকে ডিজাইন নিলাম। আমরা নিশ্চিত রুলস ভায়োলেশন হচ্ছে। সেটা ধরে বাড়িওয়ালাকে সাইজ করবো। গোপনে বিম কলাম ছেড়ে দেয়া স্পেস মাপলাম। খুব একটা লাভ হলো না। বাসাও পাচ্ছিনা। কেউ ব্যাচেলর ভাড়া দেবে না।

ইয়াকুব ভাইকে পাঠানো হল। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মিশুক। শত্রুও পছন্দ করে ফেলে উনাকে। উপরে গেলেন। তখন তিনি বাংলালিংকে চাকরি করেন। এ কথা শুনে বাড়িওয়ালা তাকে পছন্দ করে ফেললেন। ভাগ্নির সাথে বিয়েরও প্রস্তাব দিয়ে রাখলেন।

৩।

বিয়ের প্রস্তাব আগালে হয়ত সেখানে আরও কিছুদিন থাকা হত। ইয়াকুব ভাই জাতির স্বার্থে নিজেকে বলি দিলেন না। নতুন বাসা খুঁজতে হচ্ছে।

এক বাড়ির গেটে গিয়ে জানতে পারলাম, মালিক ইঞ্জিনিয়ার, বড় এক কোম্পানির মালিক। কিন্তু গেটে বলে দেয়া আছে, নো ব্যাচেলর। গার্ডকে রাজি করালাম। আমরা ইঞ্জিনিয়ার শুনলে আপনার ম্যাডাম রাজি হবেন। ইন্টারকমে ধরিয়ে দিলেন। খুব কায়দা করে কথা বলছি। ইমোশন মাখিয়ে। মিনিট খানেকও সময় দিলেন না। ধমক খেয়ে ফোন রাখলাম। দেখি, বাড়ির বিদেশি কুকুরটাও বড় জিব্বা বের করে আছে। সেখান থেকে ভেগে গেলাম।

এর প্রায় ৪ বছর পর সেই কোম্পানিকে পাইলাম। ঠিকাদার হিসেবে। একদিন সুযোগ পেয়ে শোনালাম সেই গল্প। সবাই খুব মজা পেলেন, খুব হাসি ঠাট্টা চলল।

(বাম হতে)  সাকিউল সনি, পার্থ চক্রবর্তী, লেখক, মইনুল মোহাম্মদ ও ইয়াকুব আলী 

৪।

বুয়া ছিল। তিনি বাজার করেন। হিসেব রাখেন। আমরা খুশি। চিকিৎসা করাতে মইনুলের ভাবী এসেছেন। ডিম ভাজির বিপরীতে ডিমের খোসা কম। ওজা এসেই সাপের রোগ ধরে ফেললেন। এরপরেও অবশ্য বুয়া চাকরিতে বহাল ছিলেন। আমরাও নাখোশ ছিলাম না।

৪।

পার্থ ও সনি চাকরি করে না। আমি CESD তে , মইনুল CVTech এ কাজ করে। কাজ তেমন কিছু না। মোবাইল টাওয়ারের কাজ সুপারভিশন। সাইটে গিয়ে ছবি তোলা। অফিসে এসে মিশরীয় বসকে বুঝিয়ে দেয়া। মইনুল ফাঁকি দেয়াতে চ্যাম্পিয়ন। অফিস থেকে ঘনঘন ফোন দেয়। মইনুল কখনও জোর স্পিডে ফ্যান চালিয়ে কিংবা টিভির যে পয়েন্টে কোন চ্যানেল নাই, শুধু শো শো শব করে, সেটার কাছে গিয়ে ফোন ধরে। বাইরে সাইটের আওয়াজ বোঝাতে। আমিও ফাঁকি দেই, তবে ওর লেভেলে কখনও পৌছুতে পারিনি।

এরকম অসংখ্য গল্পের সংকলন আমাদের ইন্দিরা রোডের জীবন।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে যে যার মত কাজে কাজে ছিটকে গেছি। ইন্দিরা রোড বাসার প্রাণ ইয়াকুব ভাই থাকেন সিডনি তে। এরকম অসম্ভব প্রাণচঞ্চল ও দুর্দান্ত ভালো মানুষ দেশে এসেছেন। একটা আড্ডা অবধারিত ছিল। প্রথম দফায় মধুর ক্যান্টিনে বসি। সিঙ্গারা চা খেয়ে চলে আসি রবীন্দ্র সরোবরে।

একে একে মইনুল পার্থ সনি এসে যোগ দেয়। বহু দিনপর সেখানে ইন্দিরা রোডের স্মৃতিরা এসে ঝাঁপ খুলে দেয়। বাস্তবিক অর্থে আমরা ফিরে যাই বছর বিশেক আগে। ইন্দিরা রোডের সেই বাসায়। মিস করেছি মাহমুদ ভাই, শাহজাহান আর আরিফকে।

এমন সন্ধ্যা যেন আবারও ফিরে আসে। অশেষ ধন্যবাদ ইয়াকুব ভাইকে। সুদূর সিডনি থেকে এসে একটা গোটা সন্ধ্যাকে রাঙ্গিয়ে দিলেন।

Comments

    Please login to post comment. Login