বিকেলের নরম আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকছিল। কাঠের পুরোনো টেবিলটার ওপর রাখা খামটা আর খোলা হয়নি বহুদিন। তবু প্রতিদিন কাজ শেষে ফিরে এসে রাহুল খামটার দিকে তাকায়। আজও তাকাল। কিন্তু আজ আর নিজেকে থামাতে পারল না।
খামটা খুলতেই হাত কেঁপে উঠল।
“প্রিয় রাহুল,
যেদিন এই চিঠিটা পড়বে, সেদিন আমি হয়তো আর তোমার পাশে থাকব না…”
চোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার।
মা চলে গেছে আজ তিন বছর। হাসপাতালে শেষ রাতটা রাহুল চাকরির ইন্টারভিউয়ের জন্য বাইরে ছিল। ফিরে এসে শুনেছিল—“আর নেই।” সেই কষ্ট, সেই অপরাধবোধ আজও বুকের ভেতর ভার হয়ে আছে।
চিঠিতে মা লিখেছিল,
“তুমি নিজেকে দোষ দিও না বাবা। আমি জানি তুমি অনেক চেষ্টা করছ। সংসারের জন্য, নিজের জন্য। মা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় সুখ তোমাকে লড়াই করতে দেখা।”
রাহুল ছোট্ট একটা ঘরে একা থাকে। ঢাকায় চাকরি করে, কিন্তু মাস শেষে টাকা বাঁচে না। চারদিকে মানুষের ভিড়, অথচ ভেতরে প্রচণ্ড একাকীত্ব। প্রতিদিন মনে হয়—সব ছেড়ে চলে যাবে কোথাও।
মায়ের চিঠির পরের লাইনগুলো পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল।
“জানো রাহুল, মানুষ হারে তখনই, যখন সে নিজেকে হার মানে। দুঃখ, ব্যর্থতা, অপমান—এগুলো পথের ধুলো। এগুলো ঝেড়ে ফেলতে শিখতে হয়।”
রাহুল জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার ধারে একটা ছেলে চা বিক্রি করছে। বয়স হয়তো দশ কি এগারো। তবু চোখে ক্লান্তি নেই, বরং একরকম দৃঢ়তা।
চিঠিতে শেষের দিকে মা লিখেছিল,
“একদিন তুমি সফল হবে, খুব বড় কিছু না হলেও একজন ভালো মানুষ হবে। সেটাই আমার স্বপ্ন।”
সেই মুহূর্তে রাহুল বুঝতে পারল—সে এতদিন শুধু নিজের কষ্ট দেখেছে, মায়ের বিশ্বাসটা দেখেনি।
পরদিন অফিসে গিয়ে সে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করল। রাতে বাড়ি ফিরে অনলাইন কোর্সে ভর্তি হলো। ধীরে ধীরে নিজেকে গড়তে লাগল। সময় লাগল, ব্যর্থতাও এলো, কিন্তু সে আর থামল না।
আজ তিন বছর পর, রাহুল একটা ছোট্ট সাফল্য পেয়েছে। বড় কিছু নয়—তবু নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। সে আবার সেই খামটা হাতে নেয়।
মায়ের চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে,
“আমি পারিনি সব ঠিক করতে মা, কিন্তু হাল ছাড়িনি। যেমনটা তুমি চেয়েছিলে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো। ঠিক যেমনটা সেদিন ছিল।
কিন্তু আজ, রাহুল আর একা নয়।
তার ভেতরে আছে মায়ের বিশ্বাস—যেটা কখনো মরে না।