আমাদের আলোচ্য পাঠক জীবনের এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন যখন যত বড় লোমহর্ষক ঘটনার খবরই উঠে আসুক না কেন তিনি বিপর্যস্ত বা বিচলিত বোধ করেন না। অবলীলায় তিনি পত্রিকার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উলটে যেতে পারেন- তা খবরের ছবি বা শিরোনামে ‘পাশবিক’, ‘অমানবিক’ কিংবা ‘পৈশাচিক’ ইত্যাকার দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষক যত বিশেষণই যুক্ত থাকুক না কেন। খবরটি এড়িয়ে অন্যসব কেজো খবরের বাক্সে বাক্সে তিনি তল্লাশি চালিয়ে যেতে পারেন নির্দ্বিধায়।
কিন্তু উপস্থিত মুহূর্তে শিরোনাম বা গোটা বিষয়বস্তু নয়, শুধুমাত্র ছবি, তাও একজন সাদামাটা কিশোরের, তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শিরোনাম না পড়েই তিনি মনে মনে প্রশ্ন করেন- কবে থেকে পাঠ্য বইয়ে মুদ্রিত ছবির ঢঙে ছবি ছাপানো শুরু করল এইসব সংবাদপত্রগুলো? শৈশবে, কৈশোরে তিনি পাঠ্য বইয়ে যেমন প্রকৃতি, জীবজানোয়ার বা মানুষের ছবি মুদ্রিত দেখেছেন- এই সাদামাটা কিশোরের ছবিটিও ঠিক তাই! পেছনে অস্পষ্ট পশ্চাদপট, বৃক্ষের সজীবতাসূচক সবুজের হাল্কা ছোঁয়া- এমন ছবিই তো পাঠ্য বইয়ে থাকত, তাই না? শৈশব কৈশোরের গণ্ডিতেই আবদ্ধ তাদের অবস্থিতি, যা আমাদের আলোচ্য পাঠক পার করে এসেছেন অনেক আগেই- যদিও ইদানিং নাতি-নাতনিদের পাঠ্য বইয়ের কল্যাণে সেই ধূসর অতীতের স্মৃতিতে প্রাণ ফিরে এসেছে। নাতি-নাতনিদের হঠাৎ হঠাৎ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর ঘাঁটতে গিয়ে তিনি এখনকার বইয়ের ধরণ, বিষয়বস্তু, অঙ্গসজ্জা সম্পর্কেও বেশ ওয়াকেবহাল।
সুতরাং শিরোনাম ও বিস্তারিত পড়ে ও বুঝে ধারণা তৈরি হওয়ার আগেই আলোচ্য পাঠকের মনে নিজের ও নাতি-নাতনিদের শৈশব, কৈশোরের ছায়া ও গন্ধ সেঁটে যায় কিশোরের ছবিটির সাথে । আচ্ছন্ন মনে পাঠক শিরোনামটা পড়েন- ‘আটত্রিশ টুকরো কঙ্কালের রহস্য উদঘাটন’। পড়তে শেখার আগের পাঁচ-ছয় বছর বাদ দিয়ে বিগত পয়ষট্টি বছর অর্থাৎ তেইশ হাজার সাতশত পঁচিশের কম-বেশি দিনের জীবনে তিনি প্রায় সমান সংখ্যক বারই দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টেছেন। অনেক পাশবিক, মর্মন্তুদ ঘটনার খবর পড়ে তিনি অনেক বার শিউরে উঠেছেন, এভাবে শিহরিত হতে হতে একসময় অনুভূতির ধারও খুইয়ে ফেলেছেন- তাও অনেক বছর হবে- ঠিক কবে- মন তা চিহ্ন দিয়ে রাখেনি। আস্তে আস্তে একসময় অনুভূতিশূন্য এক জড় পিণ্ডে পরিণত হয়ে গেছেন। অনুভূতির সাথে গভীর সংশ্লেষ না রেখে রীতিমাফিক পত্রিকাটির পাতা উল্টাতে গিয়েও উপস্থিত মুহূর্তে তিনি ব্যর্থ হন, কিশোরের ছবিটার দিকে আরেকবার চোখ যায় তার। তিনি শিরোনামের খোলস ভেঙে বিস্তারিত পড়তে শুরু করেন।
কিশোরের নাম মিলন…… একটা রিকসা চালাত…… যাত্রী সেজে দু’জন খুনী তার রিকসায় চেপে বসেছিল……… এক নির্জন জায়গায় পৌঁছুলে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে…………। আলোচ্য পাঠক এ ধরণের ঘটনার খবর অনেক অনেক পড়েছেন- ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু শৈশব, কৈশোরের গন্ধেই হোক অথবা মহাজাগতিক কোনো উৎস থেকে বিচ্ছুরিত আলোর ছোঁয়া পেয়েই হোক- তার মস্তিষ্কের অনুভূবক্ষম কোষগুলোর কোথাও যেন দৃশ্যটা জ্বলে ওঠে। ‘কিশোর’ রিকসাচালক……… হয়তো খুব দক্ষভাবে রিকসা চালাতে শিখেনি……… পরিণত, দক্ষ রিকসাচালকের মতো রিকসাটাই শরীর ও জীবনের একমাত্র পরিচিতি হয়ে ওঠেনি এখনো……… রিকসাটা, কারো কারো বেলায় যেমন ঘটে, শরীরের সাথে একাত্ম অথবা শরীরেরই একটি অঙ্গ হয়ে যায়নি এখনো-------- নির্জন আলো-আধাঁরির রহস্যখচিত রাস্তায় টলমল করে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে………… পৃথিবীর তাবত অন্ধকারের ঝাঁপি মাথায় বয়ে বেড়ানো দুজন যাত্রীবেশী খুনী পেছনের আরামদায়ক আসনে উপবিষ্ট………… তাদের গল্পের ঢঙে পরিবেশিত প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে রিকসা টানছে কিশোর………। এমন একটা প্রশ্নও পাঠকের মনে উকিঁ দেয়- খুনী দুজন হাসি-ঠাট্টার কোনো প্রসঙ্গ কি উঠিয়েছিল?......... প্রেম, বিয়ে নিয়ে কোনো সরস মন্তব্য বা রসিকতা? (অনেকেই কিন্তু রিকসায় চলতে চলতে এমন সব প্রসঙ্গের অবতারণা করে বেশ মজা কুড়ান)……… তারপর হঠাৎ পেছন থেকে মাফলারটা ছুঁড়ে…………। আলোচ্য পাঠকের চোখ মুহূর্তের জন্য মুদে যায়, আতিপাতি করে বর্তমানে ফেরার জন্য আকুল হয়ে যান, বাস্তব, পার্থিব দু’একটা উপাদান খুঁজে পাওয়ার জন্য হাতড়ে বেড়ান………।
পেয়েও যান, রিকসাটা শহরের আরেক প্রান্তে অবস্থিত এক গ্যারেজে ত্রিশ হাজার টাকায় বেচে দেওয়া হয়েছে। …………’ত্রিশ হাজার টাকা!’ আলোচ্য পাঠক ঘোর লাগা চোখ মেলে তার শয়নকক্ষের চারদিক দেখতে থাকেন………… যে খাটে বসে তিনি পত্রিকাটা পড়ছেন তার দাম পাঁচ লাখ টাকার ওপরে……… শো-পিসগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, দেশ-বিদেশ থেকে কিনে আনা হয়েছে, কোনো কোনোটির দাম পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকার ওপরে ………… নিজের দিকে চোখ ফেলেন…… পরিহিত বস্ত্র, বিছানার চাদর, অন্যান্য কাপড়চোপড়ের দিকে নজর যায়……… দৈব চয়নের ভিত্তিতে খানকতেক তুলে নিলেই এরকম ত্রিশ হাজার টাকার একটা রিকসা কিনে নেওয়া যায়…………। শ্বাসরোধ করে হত্যার পর শরীরটা টুকরো টুকরো করা হয়েছে………। পাঠক শয়নকক্ষের ভেতর বাতাসের অভাব অনুভব করেন, নিজের অজান্তেই নিজের হাত-পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর চোখ ঘুরতে থাকে। ……… কঙ্কালটার আটত্রিশ টুকরো পাওয়া গেছে……………। পাঠকের বা হাতের আঙুল ডান হাতের আঙুলের গিঁটগুলো নেড়ে নেড়ে অস্তিত্ব খুঁজতে থাকে, শিরদাড়া বেয়ে একটা হিম-শীতল স্রোত বয়ে যায়, সাড়া শরীরে তা ছড়িয়ে যেতে থাকে। পাঠকের তীব্র শীত অনুভূত হতে থাকে………।
পাঠক জোর করে নিজেকে থামিয়ে দেন। পাঠ্য বইয়ের আদলে ছাপা কিশোরের ছবিটা থেকে চোখ জোর করে সরিয়ে নিতে চান, উপায় খুঁজতে থাকেন কীভাবে এই ছবিটা, শিরোনামটা, এতক্ষণ ধরে পঠিত খবরের অংশবিশেষটাকে জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে সযত্নে রচিত ‘অন্যদের’, ‘আমরা কি কেবল চেয়ে চেয়ে দেখব’, ‘দুঃখজনক’, ‘হৃদয়বিদারক’, ‘দেশটা, সমাজটা কোন দিকে যাচ্ছে’- এমন সব চিন্তা ও উদ্দীপকের ভাগাড়ে ছুঁড়ে দিয়ে নিজেকে সাফ-সুতরো রেখে বের হয়ে আসবেন। খুব একটা সাফল্য খুঁজে পান না, উল্টো বিস্মৃতিপরায়ন মন যেন খানিকটা খাবি খায়, ‘কিশোরের নামটা যেন কী’- গোছের একটা মুহূর্তিক প্রশ্ন একটু ঘুরপাক খেয়ে ‘মিলন’ নামের উত্তর নিয়ে দ্বিগুন শক্তি নিয়ে উঠে আসে এবং তার শিশু-কিশোর শ্রেণিভুক্ত নাতি-নাতনিদের নামের পাশে জায়গা করে নেয় (পাঠকের এক নাতনির নাম ‘মিলা’ও বটে)!
কিশোর মিলন পাঠকের নাতি-নাতনিদের পাঠ্য বইয়ের কোনো এক দুরূহ অধ্যায়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যেন- যেখান থেকে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দেওয়া হয়। নাতি-নাতনিরা এ ধরণের প্রশ্নে ভীষণ বিভ্রান্ত হয়ে যায়, তখন যেমন পাঠকের দায় চাপে সেগুলোকে সহজ করে বুঝিয়ে দিতে হবে, এখনো অনেকটা সেরকমই অনুভব করেন। কিন্তু দেখেন যে, উত্তর দেওয়ার আগে নিজেরই প্রস্তুতি নিতে হবে- ‘উদ্দীপকটি দিয়ে…………?’(নাতি-নাতনিদের কল্যাণে পাঠক শিক্ষকদের চেয়েও সৃজনশীল প্রশ্নের ধারা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত)।
পাঠক বিমূঢ় বোধ করেন, প্রশ্ন বা উত্তর কোনোটাই খুঁজে পান না। সেসব খুঁজে বের করতেই যেন পাঠক খবরের বাকি অংশের ওপর চোখ বুলাতে থকেন……পিবিআই তদন্ত করে উদঘাটন করেছে যে……… বর্ণ, চিহ্ন, শব্দের স্রোত বয়ে যেতে থাকে, পাঠকের মস্তিষ্কের সংবেদী কোষ পর্যন্ত সেগুলো পৌঁছুতে ব্যর্থ হতে থাকে, পাঠক শূন্য চোখে উদভ্রান্তের মতো চারদিকে তাকাতে থাকেন। কী যেন খুঁজতে থাকেন থরে থরে সাজানো সারা পৃথিবী চষে বেরিয়ে আনা পাথরের, কাঁচের, ধাতুর শো-পিসগুলোর মধ্যে…………… ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে সেগুলো………… শোকেসটার কাঁচ ভেঙে চুরমার করে সব লণ্ডভণ্ড করে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে তার…………। ঘরের বাতাস আরো কমে যেতে থাকে, পাঠকের অন্তর্গত শৈত্য পুরো শরীর গ্রাস করে ফেলে, থর থর করে কাঁপতে থাকে হাত, পা, পুরো শরীর। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, ধনে-মানে, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ পাঠক টলমল পায়ে খাট ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, শো-কেস পর্যন্ত এগোতে গিয়েও পারেন না, ধপ করে আবার খাটে বসে পড়েন। শরীরে প্রবহমান শৈত্যকে উপেক্ষা করেই টান মেরে সফেদ শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেষ্টা করেন, দুয়েকটা বোতাম ছিঁড়ে আসে। বৃদ্ধ পাঠক আরো টানাহেচড়া করতে থাকেন……… শীত আরো শক্তি নিয়ে চেপে বসে। বসে বসেই পাঠক পায়ের দিকে রাখা কম্বলটা টেনে পুরো শরীরটা তার ভেতরে গলিয়ে দেন, ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকেন আর বিড়বিড় করে এলোমেলো প্রলাপ আওড়াতে থাকেন……………।
…………………*…………………
২৭.০১.২৬।