Posts

ফিকশন

ত্রিশঙ্কুর পথে এক অদম্য যোদ্ধা

January 31, 2026

MST. MOKARROMA SHILPY

9
View

অধ্যায় ১: নির্ঘুম রাতের আর্তনাদ

রাত বাজে তিনটা। চারদিকে নিস্তব্ধতার এক মরুদ্যান,বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (BPATC) প্রশিক্ষণার্থীদের  ডরমিটরির যেন । প্রশিক্ষণার্থীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন—ক্লান্ত শরীর বিছানায় ছড়িয়ে দিয়েছে সবাই। কিন্তু ৭৭তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের এক নারী প্রশিক্ষণার্থীর জন্য এই নীরবতা শুধুই এক মরীচিকা।

তার কক্ষে আলো জ্বলছে, বিছানায় ছড়িয়ে আছে তার দুই অবুঝ সন্তান—তিন বছরের ছেলে ও দেড় বছরের মেয়ে। কেউ ঘুমাতে চায় না, কেউ খেতে চায় না। একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে, ছোটাছুটি করছে, চকোলেট আর আইসক্রিমের জন্য কান্নাকাটি করছে। মা তাদের কোলে টেনে নিতে চায়, শান্ত করতে চায়, কিন্তু নিজের শরীর আর সহ্য করতে চায় না। তার দুচোখে ভীষণ ক্লান্তি, অথচ বিশ্রামের সুযোগ নেই।

কেননা, ভোর পাঁচটায় তাকে পিটি সেশনে ছুটতে হবে। একবার দেরি করলেই শোকজ লেটার, অবর্ণনীয় অপমান। এই শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রায় এক মুহূর্তও অবহেলা মানে কঠিন শাস্তি। কিন্তু দুই অবুঝ সন্তানের কি তা বোঝার সাধ্য আছে?

প্রতি রাতের মতো আজও সে সন্তানদের দোলনায় দোলায়, ঘুম পাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে, কখনো চোখের জল মুছে, কখনো বুক চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদে।

অধ্যায় ২: সময়ের চাবুক

দিনের সূর্য ওঠার আগেই তার যন্ত্রের মতো ছুটতে হয়—নিখুঁত সময় মেপে প্রাতরাশ, তারপর ক্লাস, ড্রাইভিং, স্পোর্টস, সাঁতার, মধ্যাহ্নভোজ, আবার ক্লাস, সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়ার আগে নৈশভোজ। প্রতিটি ইভেন্টে এক সেকেন্ড এদিক-সেদিক হলেই শাস্তি।

প্রতিদিনের মতো আজও ক্লাসে বসে সে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ মন তার হাজার মাইল দূরে। বড় ছেলেটা কি ঠিকমতো খাচ্ছে? ছোট্ট মেয়েটা কি আবারও কান্নাকাটি করছে? গৃহসহকারী কি আদৌ তাদের ঠিকমতো সামলাতে পারছে?

এই গৃহসহকারীও তো বয়সে প্রবীণ, তিনি নিজেই শ্বাসকষ্টের রোগী। কী করবে সে? এ ছাড়া তো কোনো উপায় ছিল না! বাড়িতে কাউকে রেখে আসতে পারেনি, স্বামীর উচ্চ রক্তচাপ, বাতের ব্যথা, মাইনর স্ট্রোক হওয়া শরীর নিয়ে সেও তো নিজের যত্ন নিতে পারে না।

কিন্তু প্রশিক্ষণের কড়া নিয়ম তো এসব বোঝে না! সময় মেপে থাকতে হয়, নিখুঁত হতে হয়, নয়তো অপমানের চাবুক নেমে আসে নির্দয়ভাবে।

অধ্যায় ৩: জীবনের বোঝা

প্রশিক্ষণের প্রতিটি দিন দুঃসহ, প্রতিটি রাত নিদ্রাহীন। তবুও এত কষ্ট সহ্য করেও তার হৃদয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে তখন, যখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ আসে।

মা বহুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। প্রশিক্ষণে আসার আগে তিনি মায়ের যত্ন নিয়েছিলেন, কিন্তু যখন BPATC-তে এলেন, তখন মাকে একা রেখে আসতে বাধ্য হন। মায়ের অসুস্থতা বাড়তে থাকে, কিন্তু দূর থেকে কিছুই করতে পারেন না। ফোনে যতবারই জানতে চান, উত্তর আসে—"ভালো আছেন, চিন্তা কোরো না!"

কিন্তু একদিন হঠাৎ খবর আসে—মা আর নেই।

তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিমেষেই নিঃশেষ হয়ে যায়। মাথা ঝিমঝিম করে, পা কাঁপতে থাকে। তিনি দৌড়ে গিয়ে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ান, যেন নিজের ভারসাম্য রাখতে পারেন। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে, চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যায়।

শেষবারের মতো মাকে দেখতে পেলেন না। শেষ বিদায়ের সময় তার হাতটা ধরতে পারলেন না।

তার পৃথিবী থমকে গেলেও প্রশিক্ষণ থামবে না, সময় থামবে না, তার সন্তানদের চাহিদাও থামবে না। তাই বুকের ভেতর যন্ত্রণা চেপে তাকে আবারো ফিরে আসতে হলো সেই কঠোর বাস্তবতায়।

অধ্যায় ৪: আত্মসংগ্রাম

প্রশিক্ষণের শেষ দিন ঘনিয়ে আসে। সবার ফলাফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু তার নাম প্রথম সারিতে নেই।

কেউ কেউ তাকিয়ে থাকে করুণার দৃষ্টিতে, কেউ ফিসফিস করে বলে—"ও তো পারেনি!" কেউ বোঝে না, কেন পারেনি। কেউ বোঝে না, এই ‘না পারার’ পেছনে কত রাতের কান্না, কত অভাবের কষ্ট, কত দুশ্চিন্তার ভার জমা আছে।

রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে।

এই জীবন কি সত্যিই পরাজয়ের?

না!

সে জানে, তার সংগ্রাম এখানেই শেষ নয়। এই লড়াই চলবে। সে পরাজিত হতে আসেনি, সে এসেছে বিজয়ী হতে।

সে নিজেকে প্রশ্ন করে—প্রশিক্ষণে প্রথম না হতে পারলে কী? তার জীবনের পরীক্ষা কি কেবল এই ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ?

না!

সন্তানদের হাসিমুখ, তাদের নিরাপত্তা, নিজের অদম্য লড়াই—এটাই তার সবচেয়ে বড় জয়।

একদিন সে প্রমাণ করবে, একজন মা শুধু সন্তানের জন্মদাত্রী নয়, একজন মা মানে এক অদম্য যোদ্ধা।

কারণ জীবন তাকে যে ত্রিশঙ্কুর অবস্থায় ফেলেছে, সেই অবস্থা থেকে সে একদিন মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসবে।

এই যন্ত্রণার রাত একদিন শেষ হবে।

তার চোখ দুটো চকচক করছে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত হলেও তার ভেতরের লড়াই আজও জীবন্ত।

কারণ সে জানে, সত্যিকারের জয় কখনোই সহজে আসে না।

Comments

    Please login to post comment. Login