Posts

ফিকশন

রুশার বিপিএটিসি স্মৃতি

January 31, 2026

MST. MOKARROMA SHILPY

17
View

প্রথম দিন: রুশার বিপিএটিসি যাত্রা

রুশা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। দূর থেকে ভেসে আসা সবুজ আর শান্ত পরিবেশটাকে সে গভীরভাবে অনুভব করছে। অথচ এই প্রশান্তির পেছনে তার কতশত সংগ্রাম, কত অনিশ্চয়তা!

বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও চাকরিতে যোগ দেওয়া নিয়ে যে দীর্ঘ বছরের বৈষম্যের পাহাড় ডিঙাতে হয়েছে, তা শুধু সে-ই জানে। কত রাত নির্ঘুম কেটেছে, কত হতাশার দিন পেরিয়ে অবশেষে যখন আলোর দেখা মিলল, তখনও দ্বিধা কাটেনি—"সব ঠিকঠাক হবে তো?" কিন্তু জীবনে কখনো হাল ছাড়েনি রুশা, এবারও ছাড়েনি।

সাভারে বিপিএটিসিতে আসার দিনটাও সহজ ছিল না। দুই হাতে ছোট্ট দুটি সন্তান, আর মনের ভেতর বিশাল এক দায়িত্ববোধ। বাসায় অসুস্থ স্বজনদের ফেলে আসার যন্ত্রণা ছিল, কিন্তু সে জানত—এটা তার জন্য, তার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য।

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন সে বিপিএটিসিতে পৌঁছালো, তখন শরীর যেন ভেঙে পড়ার উপক্রম। কিন্তু ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিপাটি সাজানো পরিবেশ দেখে তার মন এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। প্রশিক্ষণের কষ্ট তো আছেই, কিন্তু এখানে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

ডরমিটরির ১৫তলা ভবনের সামনে দাঁড়াতেই রুশার মনে পড়ল BPATC ওয়েবসাইটেই তার জন্য বরাদ্দকৃত রুম নম্বর ছিল, সেটি হল "দোতলার ২০৬ নম্বর রুম। মা প্রশিক্ষণার্থী বলে দোতলায় রুম দিয়েছে। এই সামান্য বিষয়টাও রুশার চোখে কৃতজ্ঞতার অশ্রু এনে দিল।



 

ক্লাসের ব্যাগ

ডরমিটরিতে ঢুকেই ক্লান্ত রুশা তার রুমের দরজা খুলেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।রুমটি বেশ পরিচ্ছন্ন। টেবিলের ওপর একটা নীল অফিসিয়াল ব্যাগ।

রুশা ব্যাগটা হাতে নিয়েই চোখ চকচক করে উঠল। গাঢ় নীল ব্যাগের ওপর আকাশী রঙের অক্ষরে লেখা "BPATC"—প্রতিষ্ঠানটির লোগো খোদাই করা! ভেতরে চোখ রাখতেই একগুচ্ছ চমক: বিপিএটিসির লোগো সম্বলিত বড় ক্লাস খাতা, একটা কোর্স ব্রোশিউর, ছোট্ট একটা কলম রাখার পার্স, কলম, পেন্সিল, ইরেজার—সবকিছুই যেন একেবারে গোছানো ও পরিপাটি।

রুশা মনে মনে হাসল, "এটা তো একেবারে স্কুলের প্রথম দিনের মতো!" কবে শেষবার নতুন খাতা, কলম হাতে নিয়েছে মনে নেই। ব্যাগটা শক্ত করে ধরে রুমের বিছানায় বসে পড়ল। নতুন জায়গায় আসার শঙ্কা, দুশ্চিন্তা যেন একটু কমে এল। তার মনে হলো, "এই প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তা দারুণ!"

খুশি মনে বাসায় ফোন করল। হাসি ঝরঝর কণ্ঠে বলল, "বিপিএটিসি বেশ পরিপাটি একটা প্রতিষ্ঠান। ওরা শুরুটাই দারুণ করেছে!"

কোর্স কারিকুলাম ও ব্রোশার

রুশা যখন ক্লাস ব্যাগের মধ্যে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে অবাক হচ্ছিল, তখন ব্যাগের নিচে আরো একটি বই বের হলো। সেটা ছিল "Course Curriculum & Brochure"—বিপিএটিসির পক্ষ থেকে ৭৭তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট।

এটা হাতে নিয়ে রুশা খুব মনোযোগ দিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতে শুরু করল। প্রথমেই চোখে পড়ল কোর্সের বিস্তারিত সব তথ্য ও গাইডলাইন। Foundation Training Course কি, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, কোর্স টি কীভাবে সাজানো হয়েছে, কয়টি মডিউল, কোন মডিউলের কয়টি ক্লাস, ক্লাস গুলো কীভাবে হবে, মূল্যায়ন পদ্ধতি,কোর্স ম্যানেজমেন্ট টিম, প্রশিক্ষণার্থীদের করণীয় কি—সব কিছুই স্পষ্টভাবে লেখা ছিল। রুশা বুঝল এটা শুধু একটি সাধারণ ব্রোশার নয়।

কোর্সের মাধ্যমে কীভাবে কাজের জায়গায় দক্ষতা অর্জন করা হবে, কোন কোন সেশন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কোন কোন পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে—সব কিছু পরিষ্কারভাবে সাজানো ছিল। রুশা অনুভব করলো, এই কোর্সের প্রতিটি অংশ তার জন্য এক নতুন দিক উন্মোচন করবে। তার সামনে এত কিছু শিখতে হবে, তবুও সে প্রস্তুত ছিল।

রুশা তখনই ঠিক করল, কোর্স ব্রোশিউর এর প্রতিটি পৃষ্ঠা মনোযোগ দিয়ে পড়বে, কারণ এটাই তার সফলতার প্রথম সোপান। মনে মনে বলল রুশা, "এটাই  আমার এই কোর্সের পথপ্রদর্শক।"



 

ভোর রাতের পিটি: এক অসম যুদ্ধ

৫.৩০ বাজে, পিটি তে যেতে হবে, কিন্তু তার জন্য আলাদা পোশাক,সাদা টিশার্ট,সাদা ট্রাউজার,সাদা ট্রাক শুট, সাদা কেডস,সাদা মোজা,,রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কেউ অপ্রস্তুত হয়ে দেখে ফেললেই ভয় পাবে,,৫.৫০ এ পিটি শুরু হয় বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে, এক সেকেন্ড দেরি হলেই শোকজের লাভ লেটার চলে আসে। এখানে সবাই লাইন ধরে আসে, এসেও লাইনে দাড়াতে হয় রোল ক্রম অনুযায়ী, আবার কয়েকজন লাইন ধরে হেঁটে সবার সামনে গিয়ে লাইন ধরেই জাতীয় সঙ্গীত গায়, শপথ পাঠ করে, আবার লাইনে এসে দাঁড়িয়ে যায়, শেষে লাইন ধরেই তাদের হাঁটতে হয়, হাঁটা শেষ হলে ঐ গ্রাউন্ডে এসে আবার লাইন ধরে কিছু ব্যায়াম করিয়ে কর্তৃপক্ষ ৭টায় ক্লাসের জন্য ছেড়ে দেয়। রুশা খুব চেষ্টা করে যাতে এক সেকেন্ড ও দেরি না হয়, কিন্তু তার যে দুটো ছোট্ট ছোট্ট সন্তান, সারাদিন তাকে না পেয়ে তারা যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে-অস্বস্তিতে থাকে, তাই রাত হলেই তার মাকে কেউ ছাড়তে চায়না, তারা তখন ঘুমাতেও চায়না, যেন সারা রাত জেগে মাকে‌ পাহারা দেয় দুভাইবোন,আবার যদি মা চলে যায়, এভাবেই রুলার প্রতিটি রাত কাটে নির্ঘুম, কিন্তু কর্তৃপক্ষ কি আর সেসব বুঝবে ?

একদিন প্রায় সারারাত নির্ঘুম থেকে রাত সাড়ে হঠাৎ একটা ঝিমানি এসেছিল মাত্র, কিন্তু সেই ঝিমানি কী ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে, কে জানত?

চোখ খুলে দেখল ৫:৫০!

গলার ভেতরটা শুকিয়ে গেল। আর কোনো কিছু বোঝার সময় নেই। হাতের কাছে যা পেল, তাতেই সাদা ট্র্যাকসুট, সাদা কেডস, সাদা মোজা পরে দৌড় দিল বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। মাত্র দু মিনিটে তৈরি হয়েও রুশা পিটি গ্রাউন্ডে যেতে যেতেই ৫.৫৩ বেজে গেছে, তবুও রক্ষে নেই তাকে লেট মার্ক করা হল; অপমান করা হল !শোকজ দেয়া হল!  রুশার চোখে অশ্রু জমে উঠল, কিন্তু বিপিএটিসির বাতাসে কান্নার মূল্য নেই। এখানে কেবল শৃঙ্খলাই সত্য, আবেগ নয়। কেউ তো জানেনা, রুশা কি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কেন তার এটুকু দেরি হল, কেউ ভাবলো না রুশার দেহ-মনের ব্যথার কথা, দারুণ কষ্ট পেল রুশা!

কিন্তু সে হার মানবে না!

রুশা জানে, সে সহজেই ভেঙে পড়ার মানুষ নয়। তার জীবন তো এমনই—অসংখ্য বাধা, সংগ্রাম, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আজ এখানে পৌঁছেছে। একটা দেরির জন্য সে হেরে যাবে?

“না, আমি আরও শক্ত হবো। দ্বিগুণ মনোযোগ দেবো প্রশিক্ষণের প্রতিটি ইভেন্টে। আমি হেরে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমাকে জিততেই হবে, কারণ আমি একজন মা।”

রুশা চোখের জল মুছে নিল। সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হবে, কিন্তু সে প্রস্তুত। এক নতুন চ্যালেঞ্জ, এক নতুন দিনের জন্য!


 

ড্রেস কোড ও শাড়িকাহন

বিপিএটিসিতে প্রশিক্ষণ মানেই শুধু ক্লাসরুম আর পরীক্ষা নয়; এটি এক অনুশাসনময় জীবনের সূচনা, যেখানে পোশাকও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একাডেমিক, স্পোর্টস, সাঁতার ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট ড্রেস কোড অনুসরণ করতে হয়। পুরুষ প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট শার্ট-প্যান্ট, ব্লেজার বা টাই আর নারীদের জন্য শাড়ির বিষয়টি ছিল বেশ আলাদা এক অভিজ্ঞতা।

প্রথম দিন থেকেই শাড়ির সঙ্গে এক নতুন রকম সম্পর্ক তৈরি হলো। শাড়ি পরার বিষয়টি যেমন অনেকে আগে থেকেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন, তেমন অনেকের জন্য এটি ছিল এক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সকাল সকাল শাড়ি পরে যথাসময়ে ক্লাসে পৌঁছানো ছিল একধরনের অভিযান! একদিকে শাড়ির কুঁচি ঠিকঠাক রাখা, অন্যদিকে রুটিনের সঙ্গে তাল মেলানো—এই সবকিছুই ছিল একরকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

শাড়ি মানেই শুধু আনুষ্ঠানিক পোশাক নয়, এটি হয়ে উঠেছিল একধরনের অভিব্যক্তি। রুশার জন্যে ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 

রুশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে । এত সকালে শাড়ি পরতে হবে, সেটা ভাবলেই যেন বুকের ভেতর একরকম কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। বাসায় উৎসবের দিন ছাড়া শাড়ি পরার তেমন অভ্যাস ছিল না। আর আজ? বিপিএটিসির কঠোর শৃঙ্খলায় বাঁধা নতুন জীবন, যেখানে শাড়িই তার সঙ্গী।

শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতেই সময় দেখল, ৮.১০ বেজে গেছে , আজকের রুটিন টা আবার দেখে নেয়,আজকের ক্লাস রুম কোনটা? "অডিটোরিয়াম" মনে মনে দোয়া পড়তে থাকে; ৮.২৫ এ ক্লাসে থাকতে হবে, “রুশা, তুমি পারবে? ক্লাসে লেট হলে তো হাতে লাভ লেটারে ধরিয়ে দেবে কর্তৃপক্ষ , লাভ লেটারে মানেই নেগেটিভ ইমপ্রেসন”

রুশা ব্যস্ত হাতে শাড়ির আঁচল সামলে নিল, মাথায় হিজাব টা কোনরকমে পেঁচিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখে নিল।তারপর হাতে ব্যাগ নিয়ে ক্লাসের দিকে হাঁটতে লাগল, এই হাঁটা তার না হাঁটা না দোড়। এভাবেই শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়, যেখানে শাড়ি শুধু পোশাক নয়, এটা তার ধৈর্য আর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার প্রতীক।

বিপিএটিসিতে শাড়িগুলো পড়তে হত কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে, "কোনদিন কি রং এর শাড়ি", "কি ধরনের শাড়ি", "কি সুতার তৈরি- সুতি নাকি সিল্ক?" সপ্তাহের প্রতিটি দিনের জন্য শাড়ির রং ঠিক করে ঘোষণা দিল কর্তৃপক্ষ। রুশা পড়ল আরেক বিপাকে! একে তো বহুদিন শাড়ি পড়ার অভ্যেসটা নেই, প্রয়োজন ও হয়নি, তার ওপর ঐ নির্দিষ্ট রং এর শাড়ি মাত্র দুদিনে ম্যানেজ করাও তো একটা চ্যালেঞ্জ। আবার সেই রং গুলোও খুব বিদঘুটে, সচরাচর এই রং এর শাড়ি কেউ পড়ে না।  মনে মনে একটু ক্ষুব্ধ হল, কিন্তু তা হয়ে লাভ ই বা কি? অগত্যা অনলাইনে কিছু শাড়ি অর্ডার করল; ম্যাচিং করে ব্লাউজ-পেডিকোট-হিজাব ও কিনতে হলো।  রুশার কাছে বিষয়টি যেন " হাতি মারতে কামান দাগা"রং মতো হয়ে গেল।

তবে বাঙালী মেয়েদের জন্য শাড়িটাই যেন একমাত্র পোশাক, যা পড়ে প্রতিটি মেয়েই যেন নারী হয়ে উঠে; তার সমস্ত সৌন্দর্য যেন ফোয়ারার মত উপচে পড়ে; করিডোর ধরে লাইন ধরে ডানপাশ দিয়ে যখন সব নারী প্রশিক্ষণার্থীরা হেঁটে ক্লাসে যায়,তখন ঐ হাঁটা টাও এক উৎসবে পরিণত হয়। মনেহয় "প্রজাপতিরা সব একই রং এর ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে"।

 "নতুন জীবন, নতুন নিয়ম... শাড়ির ভাঁজের মতোই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়।


 

লাইন ধরে হাঁটা: নতুন শৃঙ্খলা

প্রথম দিনের ক্লান্তিটা তখনো পুরোপুরি কাটেনি।  ভোর রাতেৎঅ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙতেই রুশা দেখল, বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দ্রুত পিটির পোশাক পরে নিচতলায় নামল। আজ থেকে শুরু অফিসিয়াল ট্রেনিং লাইফ—সব কিছু নিয়মের ভেতরে বাঁধা।

ডরমিটরি থেকে বের হয়েই রুশা একটু থমকে গেল। প্রশিক্ষণার্থীদের সাদা রঙের সারি এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করেছে। সবাই নির্দিষ্ট নিয়মে হাঁটছে, তাড়াহুড়ো থাকলেও কারও আলাদা পথ নেই। এ যেন ছন্দবদ্ধ এক জীবন।

রুশা এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে গেল। এতদিনের স্বাধীন চলাফেরার পর হঠাৎ এত শৃঙ্খলার মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া কি সহজ হবে? কিন্তু এটাই তো বিপিএটিসির নিয়ম! তার মনের প্রশ্নের উত্তর যেন পাশের একজনই দিয়ে দিল, "আপা, এখানে সবকিছু নিয়ম মেনে করতে হয়, এমনকি হাঁটাটাও!"

রুশা হাসল। সত্যিই, এখানে প্রতিটি ধাপেরই আলাদা শৃঙ্খলা আছে। ধীরে ধীরে সে লাইনের সঙ্গে তাল মেলাল। হয়তো পুরো প্রশিক্ষণটাই এমন হবে—একটা নতুন নিয়মে বাঁধা জীবন, যেখানে শৃঙ্খলাই সাফল্যের প্রথম ধাপ।


 

ক্যাফেটেরিয়া স্মৃতি

রুশার দিন শুরু হতো ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সকাল ৭টা বাজতে না বাজতেই ছোটাছুটি শুরু—বাচ্চাদের গুছিয়ে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে দৌড়। ক্যাফেটেরিয়ার প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়ত কর্মব্যস্ত রান্নাঘর, যেখানে কর্মীরা চুলোর আগুনের উত্তাপে নীরবে তাদের কাজ করে যাচ্ছেন। মেস কমিটির সদস্য হিসেবে রুশার দায়িত্ব ছিল খাবারের মান, পরিমাণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবকিছু দেখা।

প্রথম দিকে রুশা বুঝতেই পারেনি, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনের খাবার ব্যবস্থাপনা কতটা কঠিন হতে পারে। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না করা, খাবার পরিবেশন, তারপর প্লেট-গ্লাস ধোয়া—সব কিছুতেই ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা আর পরিশ্রমের ছাপ। ক্যাফেটেরিয়ায় নির্দিষ্ট প্লেটে, নির্দিষ্ট কাটা চামচ, চাকু ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক ছিল। প্রথমদিকে এতে কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও ধীরে ধীরে বিষয়টা অভ্যাসে পরিণত হয়।

মাঝেমধ্যে খাবারের মান নিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ উঠত। কেউ বলত মাংস কম, কেউ বলত সবজিতে লবণ বেশি, আবার কেউবা মাছের কাঁটায় বিরক্ত হয়ে ক্যাফেটেরিয়া রেজিস্টারে মন্তব্য লিখে রাখত। রুশা লক্ষ্য করেছিল, খাবারের মান সামান্য উঠানামা করলেই এই রেজিস্টারে যেন একেকটা ঝড় বয়ে যায়!

তবে ক্যাফেটেরিয়ার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দিন ছিল মেস নাইট। সেদিন পুরো হল আলোর সাজে সাজানো হতো, বিশেষ মেনু থাকত, আর প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝেও অন্যরকম আনন্দ কাজ করত। মনে হতো, ক্লান্তি ভুলে সবাই এখানে একসঙ্গে উদযাপনে মেতে উঠেছে।

কিন্তু রুশার মন খচখচ করত অন্য এক কারণে—খাবারের অপচয়। প্রতিদিন খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশগুলো দেখলে তার খারাপ লাগত। একদিন রান্নাঘরের এক কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করেছিল, "এই খাবারগুলো কী করা হয়?" উত্তরে শুনেছিল, "অনেকটা ফেলে দিতে হয়, কিছুটা স্টাফদের মাঝে ভাগ হয়।"

তখনই রুশার মাথায় একটা ভাবনা আসে—বিপিএটিসি'তে যদি একটা বায়োগ্যাস প্লান্ট করা যায়? ক্যাফেটেরিয়ার উচ্ছিষ্ট খাবার আর রান্নাঘরের বর্জ্য দিয়ে যদি গ্যাস উৎপাদন করা যায়, তাহলে রান্নার জন্য বাইরের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো যেত! শুধু রান্না নয়, বিদ্যুতের চাহিদার একাংশও পূরণ করা সম্ভব হতো। ভাবনাটা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু এই আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য কত কিছু দরকার!

রুশা জানত, এসব পরিবর্তন একদিনে হয় না, কিন্তু নতুন কিছু ভাবা তো দোষের নয়! বিপিএটিসি তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, হয়তো একদিন এই ক্যাফেটেরিয়াই হবে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার অনন্য দৃষ্টান্ত!



 

রুশার ক্লাসের দিনগুলি– MOD (Manager of the Day) ও ক্লাস শেষে তার বক্তব্য


 

রুশা প্রথম ক্লাস ছিল যেন কোর্স ব্রোশিউর এর উপরেই, পড়ানো হল "Organization Structure" আবার এই দিনেই এক অদ্ভুত নিয়মের সাথে পরিচিত হলো। এখানে প্রতিদিন একজন MOD থাকবে," যা হলো Manager of the Day। এটি ক্লাসের দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা, প্রতিদিন রোল নম্বর অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে। MOD-এর দায়িত্ব ছিল সহজ না। তার হাতে ছিল ক্লাসের পুরো শিডিউল—ক্লাসের সময় ম্যানেজ করা, শিডিউল অনুযায়ী সেশন পরিচালনা, এবং ক্লাসের শেষ দশ মিনিট আগে একটা বেল বাজানো, তারপর শেষ মিনিটে দুটি বেল বাজানো। ক্লাস শেষে, MOD-এর আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল—স্পীকারকে Vote of Thanks জানানো এবং পরবর্তী ভোজনপর্বে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো। রুশার রোল ডি-৪০২ হওয়ায়, দ্বিতীয় দিনে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে রুশা একটু উদ্বেগেই ছিল। "কীভাবে আমি এই দায়িত্ব পালন করবো?" মনে মনে ভাবছিল। তবে, সময় চলে যাওয়ার সাথে সাথে তার ক্লাসের  সহকর্মীদের সহযোগিতায় দায়িত্বটা যেন তার কাছে মঞ্চে উঠে দাঁড়ানোর মতো সহজ মনে হল। 

ক্লাস শেষ হওয়ার পরে, যখন বেলটা বাজল, রুশা দাঁড়িয়ে গিয়ে স্পীকারকে "Vote of Thanks" জানাল এবং পরবর্তী ভোজনের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের দায়িত্বটি শেষ করল।

কিছুটা হতাশ, কিছুটা মুগ্ধ, কিছুটা ভয়—এই সব অনুভূতি নিয়ে রুশা বুঝতে পারল, এটা ছিল তার প্রথম পদক্ষেপ—এখন থেকে সে নিয়মিতভাবে এই দায়িত্ব পালন করবে, এবং প্রতিদিন কিছু না কিছু শিখবে।

এভাবেই দিন যায়, রুশা নিয়মিত ক্লাস করে। মাঝেমাঝে কিছু ক্লাস তার খুব ভালো লাগে, কিছু ক্লাস পানসে লাগে, কিছু ক্লাস খুব বিরক্ত লাগে আবার কিছু ক্লাস এতই হালকা লাগে যে চোখে ঘুম চলে আসে। কিন্তু ঘুমালেই বিপদ! হঠাৎ করে কানের কাছে‌ কে যেন ফিসফিস করে " You are in a session now, not a place for sleep" অমনি হন্তদন্ত হয়ে ক্লাসে ফিরে আসে রুশা। আবার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে ক্লাসের বেশীর ভাগ প্রশিক্ষণার্থী ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ কেউ নাকে শব্দ করে ঘুমাচ্ছে। রুশা কি যেন ভাবে আর হাসে। সে হাসির রহস্য কেউ জানতে পারেনা।

তবে এই একঘেয়েমির ক্লাস গুলো রুশার কাছে মনেহয় যেন তার মেধাবী সহকর্মীদের গবেষণাগার, যেখানে কেউ চুপ করে গল্পের বই পড়ছে, কেউ কেউ কবিতার বই পড়ছে, কেউ খাতায় আঁকিবুঁকি করছে, কেউ দারুন সব চিরকুট লিখছে, কেউ হাতের লেখা সুন্দর করার চর্চা করছে, কেউ কেউ নিজেই গল্প-কবিতা-গান-নাটক লিখছে। রুশা অবাক হয় সবার প্রতিভা দেখে। মনে মনে আপ্লুত হয় এত প্রতিভাবানদের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করে। আর নিজেকে নিজেই বলে " তোমার কি প্রতিভা আছে দেখাও তবে বুক ফুলিয়ে"।

স্পোর্টসের দিনগুলো

বিপিএটিসির কঠোর নিয়মের মধ্যে যেটা রুশার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল, সেটা হলো স্পোর্টস। দিনের ব্যস্ততা আর ক্লাসের চাপে যখন মাথাটা ভার হয়ে আসত, তখন বিকেলের ওই সংক্ষিপ্ত সময়টুকু ছিল যেন মুক্তির এক জানালা। যদিও সময়টা ছিল খুব কম—শুরু করতে না করতেই শেষ হয়ে যেত। মনে হতো, ঠিকমতো গতি পেলেই হুইসেল পড়ে যায়!

রুশা আগে ব্যাডমিন্টন আর টেবিল টেনিস খেলত, কিন্তু এখানে এসে প্রথমবারের মতো হাতে নেয় ভলিবল আর হ্যান্ডবল। শুরুতে একটু অস্বস্তি লাগলেও দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে গেল। খেলতে খেলতেই বুঝতে পারল, শুধু মজাই নয়, এ খেলাগুলোতে বেশ ভালোই করতে পারত, যদি আর একটু বেশি সময় পেত!

তবে বিপিএটিসির খেলার মাঠ নিয়ে একটা বড় সমস্যা ছিল—এটি পুরোপুরি সমতল নয়। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু—ফলে হঠাৎ করেই পা মচকে যেত কারও না কারও। রুশার চোখের সামনেই বেশ কিছু সহকর্মী বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। কেউ গোড়ালির লিগামেন্ট ছিঁড়েছে, কেউ হাঁটুতে আঘাত পেয়েছে। এতকিছুর পরও কেউ কি খেলা বাদ দিয়েছে? মোটেও না! বরং সবাই আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে মাঠে নামত।

রুশার দল ছিল "অপরাজিতা", আর নামের মতোই তারা ভলিবলে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পেরেছিল। খেলার সময় মাঠে একরকম যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে নেমেছিল তারা। পয়েন্ট হারালেই দলগত চিৎকার, পয়েন্ট পেলেই উল্লাস—এ যেন এক অন্যরকম উত্তেজনা!

ব্যাডমিন্টন আর টেবিল টেনিসেও রুশা ভালো খেলেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত জয়টা আর ধরা দেয়নি। হয়তো একটু বেশি অনুশীলন করলে পারত! তবে প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি প্রতিযোগিতা তার কাছে একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল।

স্পোর্টসের স্মৃতিগুলো রুশা কখনো ভুলতে পারবে না। এখানে শুধু খেলা হয়নি, হয়েছে বন্ধুত্ব, হয়েছে প্রতিযোগিতা, হয়েছে প্রাণখোলা হাসাহাসি। হয়তো ভবিষ্যতে অফিসের ব্যস্ত জীবনে এই সময়টুকু আর ফিরে আসবে না, কিন্তু বিপিএটিসির মাঠে কাটানো বিকেলগুলো রুশার মনে চিরকাল থেকে যাবে।

ডরমিটরি: রুশার নীরব সঙ্গী

প্রথম দিন যখন বিপিএটিসিতে পা রেখেছিল রুশা, তখন সবকিছুই ছিল নতুন, অচেনা। কিন্তু একটা জায়গার সঙ্গে সে খুব দ্রুতই গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলল—ডরমিটরি। পনেরতলা এই সুউচ্চ ভবনটি যেন এক বিশাল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে, প্রশিক্ষণার্থীদের যত কোলাহল, ক্লান্তি আর গোপন অনুভূতি নিজের মধ্যে ধারণ করে। রুশার জন্য এই বিল্ডিং শুধু থাকার জায়গা ছিল না, বরং তার অনুভূতির এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তার ঘর ছিল দোতলায়। প্রথম রাতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল—অচেনা ঘর, নতুন পরিবেশ, দুই সন্তানকে নিয়ে এক অনিশ্চিত যাত্রা। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখেছিল বিশাল বাগানটা, দিনের আলোয় সবুজ গাছের সারি আর রাতের অন্ধকারে আলোর নরম আভা যেন অন্য এক স্বপ্নীল সৌন্দর্য তৈরি করত।

এই ডরমিটরির দেয়ালগুলোর সামনে কেঁদেছে রুশা, আবার হাসতেও ভুলেনি। প্রশিক্ষণের চাপে যখন দমবন্ধ লাগত, একলা বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে একরাশ চিন্তা ঝেড়ে ফেলত। সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা,   রাতভোরে ঘুম থেকে উঠে পিটিতে যাওয়া-কখনো হেটে, কখনো বা দৌড়ে, ক্লাসে যাওয়া, এটার ভেতরের ক্যান্টিনেও জমা আছে কত স্মৃতি,,লিখতে গেলে বই লেখা যাবে, এর নিচতলায় আছে ইনডোর গেমস ও ব্যায়ামাগার, বাচ্চাদের নিয়ে রুশা ওখানে খেলত। দারুণ সব স্মৃতি এই ডরমিটরির ঘরগুলোতে লুকিয়ে আছে।

এখানেই প্রথমবার মাঝরাতে জরুরি অ্যালার্ম বাজিয়ে ড্রিলের ডাক পড়েছিল, সবাই আতঙ্কে দৌড়েছিল নিচে। এখানে থেকেই প্রথমবার প্রশিক্ষণের কঠোর নিয়মগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল রুশা।

তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে হয়তো সেই রাতগুলো, যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর গল্প গুলো,কত কারিশমা দেখাতে হয়েছে শুধু বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর জন্য, কত রাগ, অভিমান, হাসি কান্না জড়িয়ে আছে রাতের অন্ধকারে,, চারপাশে সবাই ঘুমায় শুধু রুশার বাবু দুটো বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকে, মা না ঘুমালে ওরা ঘুমাবে না, গো ধরে বসে, রুশার পড়াশোনা, এসাইনমেন্ট কিছুই ঠিক মত হয় না  যেন। রুশা ও রুশার সন্তান দের মতো এই বিল্ডিংটাও  যেন এক জেগে থাকে চাঁদের সাথে।সারাদিন প্রশিক্ষণার্থীদের কোলাহলে মুখর, আর রাত গভীর হলেই নীরব অভিভাবকের মতো মাথার ওপর ছায়া বিস্তার করে রাখে।

বিপিএটিসির দিনগুলো শেষ হয়ে গেলেও, ডরমিটরির স্মৃতি রুশার মনে চিরকাল অমলিন থাকবে।

সুইমিং পুল: রুশার প্রথম সাঁতার

বিপিএটিসির প্রতিটি দিনই ছিল নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা, কিন্তু রুশার জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল—প্রথমবার সাঁতার শেখা! সুইমিং পুলের দিকে তাকালেই তার মনে হতো, যদি সারাদিন এখানে কাটাতে পারত!

বিপিএটিসির সুইমিং পুলটি সত্যিই দারুণ—পরিপাটি, স্বচ্ছ নীল পানি, চারপাশে সবুজ গাছের শীতল ছায়া। প্রথম দিন যখন সাঁতারের জন্য নামতে হলো, রুশার মনে একসঙ্গে ভয় আর উত্তেজনা খেলে গেল। আগে কখনো পানিতে নামেনি, অথচ এখানে এসে নতুন কিছু শিখবে, ভাবতেই অন্যরকম একটা আনন্দ হচ্ছিল।

প্রথমবার যখন পুলের পানিতে শরীর ডুবিয়ে দিল, শীতল একটা অনুভূতি তাকে যেন নতুন করে বাঁচিয়ে তুলল। শুরুর দিকে একটু ভয় করছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রশিক্ষকের নির্দেশনা অনুসরণ করে হাত-পা নাড়তে নাড়তে পানির ওপর ভেসে থাকার কৌশল রপ্ত করল। কয়েকদিন পর তো যেন পুরো ব্যাপারটাই সহজ হয়ে গেল!

কোর্সের মাঝামাঝি সময়ে সাঁতারে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে মনে হতো, ইচ্ছে করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে কাটিয়ে দিতে পারে। একেক দিন বিকেলের ক্লাস শেষ হলেই ছুটে যেত পুলের দিকে। পানির মধ্যে ডুব, ভেসে থাকা, ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়া—সবকিছু যেন এক নতুন স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছিল রুশার জীবনে।

কিন্তু কোর্সের শেষদিকে ঠান্ডা পড়তে শুরু করল। পানিতে নামতে গেলেই শরীর কেঁপে উঠত, ঠান্ডা পানিতে নামার সাহস পেত না। তাই অনেকটা মন খারাপ করেই শেষ কয়েক সপ্তাহ সুইমিং পুলের দিকে শুধু তাকিয়ে থেকেছে, নামতে পারেনি।

তারপরও সুইমিং পুলের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো রুশার মনে অমলিন হয়ে থাকবে। এখানে সে শুধু সাঁতার শিখেনি, ভয়কে জয় করতেও শিখেছে। জীবনের প্রথম সাঁতার, প্রথম পানিতে ভেসে থাকার সেই অনুভূতি—এটা রুশা কখনোই ভুলবে

রুশার পরীক্ষা –

বিপিএটিসিতে রুশার প্রথম পরীক্ষা ছিল "Pre-Training Evaluation Test"। এটি মূলত প্রশিক্ষণার্থীদের IQ ও প্রাথমিক মেধা যাচাই করার জন্য ছিল। রুশা জানত যে এই পরীক্ষা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, তবে এটা তার জন্য একটু চাপের ব্যাপার ছিল। প্রথমদিনের অনুভূতি যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল, কারণ সে জানত—এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিপিএটিসি কতৃপক্ষ তার সামগ্রিক সক্ষমতা এবং মেধার গভীরতা বুঝতে চায়।

"এটা তো আমাকে প্রথম থেকেই যাচাই করার সুযোগ, আমি কি যথেষ্ট যোগ্য?" রুশা মনে মনে ভাবছিল, পরীক্ষার কাগজ হাতে নিয়ে।

পৃথকভাবে প্রস্তুতি না নিলেও, তার কাছে মনে হয়েছিল, এটি তার জন্য একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষায় যে প্রশ্নগুলো ছিল, তা শুধুমাত্র সাধারণ জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বেশিরভাগ প্রশ্ন ছিল আইকিউ সম্পর্কিত যা কি না মননের গভীরতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে তৈরি।

তবে, রুশা খুব বেশি না ভেবে সবার মতো তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে পরীক্ষা দিতে শুরু করেছিল। প্রশ্নগুলোর মধ্যে কিছুটা কঠিন হলেও, রুশা জানত যে মেধা পরীক্ষার মাধ্যমেই সে প্রমাণ করতে পারবে যে সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কতটা প্রস্তুত।

"বিপিএটিসি আমাকে যেভাবে বিচার করবে, সেভাবে আমি যেন নিজের সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি," মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সে।

পরীক্ষা শেষে রুশার মনে হয়েছিল—ভালো কিংবা খারাপ, সে তার ১০০% দেয়ার চেষ্টা করেছে। আসলেই, প্রথম পরীক্ষার শেষে তার একটাই অনুভূতি ছিল—"আমি প্রস্তুত, এবং আমি আরও ভালো করতে চাই!"

এখানকার পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা রুশার খারাপ লাগেনি, রোল অনুযায়ী seatplan থাকে, সেভাবেই বসে পরীক্ষা দিতে হয়, CMT পরীক্ষা পরিদর্শন করে, মূল্যায়ন কমিটি মূল্যায়ন করে। তবে একটি পরীক্ষার কথা রুশা ভুলতেই পারেনা, সেটি হল ১৮/০৩/২০২৫ এর পরীক্ষা-দুদিন হল রুশা মা হারা হয়, কিন্তু পরীক্ষা তো তাকে দিতেই হবে,রুশা কিছুই পড়েনি-পরীক্ষার হলে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে চারপাশে, মনের মধ্যে চাঁপা কষ্ট,ভেতরে ভেতরে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে,আর সময় চলে যায়, কি লিখবে বুঝতে পারে না। খুব আঁকুপাঁকু করে কোন রকমে কি সব লিখে খাতায় -পাশে দাঁড়ানো স্যার কে খুব অসহায় হয়ে জিজ্ঞেস করে স্যার, "জানিনা রেজাল্ট কি হবে, লিখতে হয় বলে লিখছি"।

বিপিএটিসির লাইব্রেরি: রুশার স্মৃতির ঝাঁপি

লাইব্রেরি। একটা নীরব জায়গা, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। কিন্তু রুশার জন্য লাইব্রেরি শুধু পড়ার জায়গা নয়, বরং একটা আশ্রয়স্থল, একটা সংগ্রামের নীরব সাক্ষী।

(১) পরীক্ষার আগের রাত: সংগ্রামের অধ্যায়

পরীক্ষার আগে রুমে পড়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ সারাদিন  ক্লাস, স্পোর্টস মাঠ, ড্রাইভিং এসব থাকায় দিনে পড়ার সুযোগ পায়না রুশা। এজন্য রাতেই পড়তে হয়। কিন্তু রুমে তো সে পড়তে পারেনা, কারণ সেখানে আছে তার ছোট্ট দুটি সন্তান, যারা সারাদিন মাকে না  পেয়ে রাত হলে যেন আঁকড়ে ধরে, "মা যদি আবার চলে যায়!

কিন্তু রুশাকে তো পড়তে হবে! পরীক্ষা বলে কথা!

তাই ঘড়িতে রাত সাতটা বাজলেই ব্যাগ কাঁধে তুলে লাইব্রেরির দিকে ছুটত সে। নিঃশব্দ পরিবেশ, চারপাশে বইয়ের সারি, পরীক্ষার আগের চাপ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ। কিন্তু রুশার মনে এক দ্বন্দ্ব ও চলে আসে—"বাচ্চারা ঘুমিয়েছে তো? আমাকে খুঁজছে না তো?"

তবুও সে পড়ে, নিজেকে প্রস্তুত করে, কারণ এখানে টিকে থাকার লড়াইটা সহজ নয়।

(২) এসাইনমেন্ট মানেই লাইব্রেরি, লাইব্রেরি মানেই কম্পিউটার ল্যাব!

বিপিএটিসিতে এসাইনমেন্ট মানেই গবেষণা, টাইপিং, রেফারেন্স, আর দীর্ঘসময় লাইব্রেরিতে বসে থাকা। নিজের রুমে বাচ্চাদের নিয়ে লেখা সম্ভব নয়, তাই লাইব্রেরির তৃতীয় তলার কম্পিউটার ল্যাবই তার শেষ ভরসা।

কম্পিউটারে বসে দ্রুত টাইপ করে, তথ্য খোঁজে, প্রেজেন্টেশন সাজায়। এদিকে সময় কম, আর কাজ অনেক। মাঝেমধ্যে মাউস ধরে হাত ব্যথা হয়ে যায়, চোখ ঝাপসা লাগে, কিন্তু কাজ থামানো যাবে না। কারণ এসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ সময় পেরিয়ে গেলে শাস্তি নিশ্চিত!

(৩) কালার প্রিন্টের জন্য অপেক্ষা: লাইনের যুদ্ধ

সব কিছু ঠিকঠাক করে ফেললেই তো হলো না! এসাইনমেন্টের জন্য কালার প্রিন্টও চাই!

এটাই আরেক যুদ্ধ।

কম্পিউটার ল্যাবের প্রিন্টারের সামনে লম্বা লাইন। সবাই প্রিন্ট নিতে চায়, কিন্তু মেশিন ধীরগতির। রুশা লাইনে দাঁড়িয়ে, অপেক্ষা করছে—"সামনে আর মাত্র তিনজন, এরপর আমার পালা!" কিন্তু হঠাৎ মেশিন বন্ধ! আরেকজন এসে বলে, "ইঙ্ক শেষ, একটু অপেক্ষা করুন!"

এই অপেক্ষাগুলোও রুশার জীবনের অংশ হয়ে যায়।

(৪) শিশু কর্ণার: মায়ের একটু প্রশান্তি

প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাচ্চারা যখন খুব বেশি জেদ করত, তখন রুশার গন্তব্য থাকত লাইব্রেরির দ্বিতীয় তলায়। সেখানে ছিল শিশু কর্ণার—একটু ছোট্ট জায়গা, কিন্তু শিশুদের জন্য এক দারুণ জগত।

ওখানে কিছু খেলনা ছিল, কয়েকটা রংচটা পুতুল, ছোট্ট একটা গাড়ি, আর একটা নরম বল। দুই ভাই-বোন সেগুলো নিয়ে খেলত, হাসত, আর রুশা মোবাইল বের করে ছবি তুলত, ভিডিও করত।

এই মুহূর্তগুলোই তো সবচেয়ে মূল্যবান!

(৫) পরীক্ষার জন্য বই তোলা

 রুশা লাইব্রেরি থেকে বইও নিয়েছে পরীক্ষার জন্য। কোন ক্লাসে র লেকচার ভালো ভাবে বুঝতে এটা করত রুশা‌।

আসলে বিপিএটিসির লাইব্রেরি শুধু জ্ঞানের জায়গা নয়, এটা রুশার জন্য নিরব সাক্ষী, তার সংগ্রামের গল্প, তার বাচ্চাদের সাথে ছোট ছোট আনন্দ, আর প্রতিদিনের লড়াইয়ের নিঃশব্দ সহযোগী।


 

বিপিএটিসির মেডিকেল সেন্টার: রুশার লড়াই ও নির্ভরতার জায়গা

বিপিএটিসির মেডিকেল সেন্টার রুশার কাছে শুধু একটি চিকিৎসা কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল তার সংগ্রামের আরেকটি নীরব সাক্ষী।

প্রথমবার সেখানে যাওয়াটা ছিল নিয়ম মাফিক, সিলেবাসের অংশ হিসেবে। সব প্রশিক্ষণার্থীকেই একবার করে মেডিকেল সেন্টার ঘুরিয়ে দেখানো হয়—কোথায় ডাক্তার বসেন, কোথায় ওষুধ মেলে, কখন কীভাবে চিকিৎসা পাওয়া যাবে। তখন এসব কিছুই রুশার কাছে সাধারণ মনে হয়েছিল।

কিন্তু পরের যাত্রাগুলো সাধারণ ছিল না!

হঠাৎ এক ভোরে—রুশার অসুস্থতা

রাতটা খুব কঠিন গিয়েছিল। এক মুহূর্তও ঘুমায়নি রুশা।

বাচ্চারা অসুস্থ ছিল, বারবার কেঁদে উঠছিল, বুকের ভেতর এক অজানা দুশ্চিন্তা চেপে বসেছিল। সারারাত তাদের সামলাতে সামলাতে কখন ভোর হয়ে গেছে, খেয়ালই করেনি।

ভোরবেলা, পিটি-তে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই মনে হলো চারপাশ যেন ঘুরে যাচ্ছে, চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসছে, আর পরের মুহূর্তেই ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল!

তার রুম গার্ল ছুটে এল, আতঙ্কিত হয়ে ডাকাডাকি করল। একটু পরে রুশা নিজেই সামলে নিলেও মাথার ভেতর কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল।

সঙ্গে সঙ্গে মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলো।

ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন—"আপনার শরীরের পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন, আপনি কি বিশ্রাম নিতে পারছেন?

রুশা তখন কিছু বলতে পারল না। সত্যিই তো, বিশ্রামের সময় কোথায় তার?

বাচ্চাদের অসুস্থতা: মায়ের আরেক দুশ্চিন্তা

এই ছয় মাসে রুশার বাচ্চারা বেশ কয়েকবার অসুস্থ হয়েছে। আর মা হিসেবে তার দুশ্চিন্তা সীমাহীন।

একদিন ছোট মেয়েটি হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে কাঁপতে লাগল। গা ছুঁয়ে বুঝল, খুবই গরম হয়ে গেছে শরীর। সঙ্গে সঙ্গে ওকে কোলে তুলে নিয়ে ছুটল মেডিকেলের দিকে। ডাক্তার দেখলেন, জরুরি কিছু নয়, কিন্তু মায়ের উদ্বেগ তো আর ওষুধে কমে না!

আরেকদিন মে

ছেলেটা প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগে কাশি-সর্দিতে কাহিল হয়ে পড়ল। ওকে নিয়েও মেডিকেল সেন্টারে যেতে হলো।

এই মেডিকেলই তখন রুশার সন্তানের নিরাপত্তার জায়গা, একটু স্বস্তির জায়গা।

সহযোগীর শ্বাসকষ্ট: এক ব্যস্ত দিনে রুশা দেখল,তার এটেনডেন্ট ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছেন। বুঝতে দেরি হলো না, শ্বাসকষ্টের সমস্যা তীব্র আকার নিয়েছে।

রুশা আর দেরি না করে তাকে ধরে ধরে মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে গেল। ডাক্তার তখনই কিছু ওষুধ দিলেন, অক্সিজেন দিলেন, একটু পরে একটু স্বস্তি ফিরে এসেছে।


 

বিপিএটিসির মেডিকেল সেন্টার রুশার কাছে শুধুই চিকিৎসার জায়গা ছিল না, এটি তাছিলর কষ্ট, উদ্বেগ আর লড়াইয়ের এক নীরব সঙ্গী। নিজ

মেডিকেল সেন্টার হয়তো ছোট একটা জায়গা, কিন্তু রুশার জীবনের অনেক গুরুত্বপর্ণ মুহূর্ত জড়িয়ে আছে এই নীরব ঘরটিতে।



 

মাল্টিপারপাস বিল্ডিং: রুশার প্রাত্যহিক প্রয়োজনের ঠিকানা

প্রশিক্ষণের শুরুতে মাল্টিপারপাস বিল্ডিং ছিল রুশার জন্য দ্বিতীয় আশ্রয়স্থল।

প্রতিদিনই সেখানে যেতে হতো—কখনো খাতা-কলম লাগছে, কখনো স্কেল বা মার্কার, আবার কখনো স্পোর্টস ড্রেস কিংবা সুইমিং ড্রেস কিনতে হচ্ছে। এগুলো তো ঠিক আছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—সাবান, শ্যাম্পু, তেল, নাস্তা, দুধ!

প্রথম কিছুদিন: প্রতিদিন মাল্টিপারপাসের দরজায় দাঁড়ানো

প্রথম কয়েক সপ্তাহ তো প্রতিদিনই মাল্টিপারপাস বিল্ডিংয়ের দরজায় রুশার দেখা মিলত।

"আজ তো সাবান শেষ, কাল আবার কলম হারিয়ে গেল, আরে! সুইমিং ড্রেস আনতে হবে তো!"

এভাবেই প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো কারণে ছুটতে হয়েছে মাল্টিপারপাসের দিকে।

বাচ্চাদের জন্যও কিছু না কিছু দরকার হত—দুধ, বিস্কুট, ছোটখাটো নাস্তা—সবই ওখান থেকে কিনতে হতো।

এতবার যাওয়া-আসায় সেখানে কাজ করা স্টাফরাও চিনে ফেলেছিল রুশাকে। কেউ কেউ মজা করে বলত, "আপা, আজ আবার কী শেষ হয়ে গেল?" রুশা তখন হাসতো, বলত, "নতুন কিছু না, সেই দুধ-নাস্তা আর কলমের গল্প!"

ডরমিটরির ক্যান্টিন: বদলে গেল রুটিন

এরপর যখন ডরমিটরির নিচে ক্যান্টিন খোলা হলো, তখন আর রুশার মাল্টিপারপাসে ছুটে যাওয়ার প্রয়োজন থাকল না।

এখন হাতের কাছেই পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় সব জিনিস। সময়ও বেঁচে যায় অনেকটা। তবুও মাল্টিপারপাস বিল্ডিংয়ের সঙ্গে রুশার স্মৃতিগুলো হারিয়ে যায়নি।

প্রশিক্ষণের শুরুতে যে ছোটখাটো প্রয়োজনীয়তার পেছনেও অলিখিত একটা যুদ্ধ করতে হতো, সেই দিনগুলোকে ভুলবে কীভাবে?


 

অডিটোরিয়াম: জ্ঞান, পরীক্ষা আর গানের মঞ্চ

বিপিএটিসির বিশাল ক্যাম্পাসে ডরমিটরির বাইরে যে ভবনটিতে ৭৭তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদের সবচেয়ে বেশি আনাগোনা, সেটাই অডিটোরিয়াম।

প্রথম থেকেই এটি হয়ে উঠেছিল রুশার দ্বিতীয় ঘর।

একদিনে কখনো তিনবারও এখানে আসতে হত। কখনো গেস্ট স্পিকারের ক্লাস, কখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘোষণা, আবার কখনো পরীক্ষা।

প্রশিক্ষণার্থীদের সংখ্যা ৬০৪ জন, তাই যেকোনো বড় ইভেন্ট মানেই অডিটোরিয়ামে জমায়েত।

সেকশন অনুযায়ী সবাই বসতো—কখনো সামনে, কখনো পেছনে, কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে। একেক দিন একেক জায়গায় বসার মজাই ছিল আলাদা!

অডিটোরিয়াম: গান, বিচারক আর প্রতিভার ঝলক

অডিটোরিয়ামের আরেকটি দারুণ স্মৃতি হলো গানের মঞ্চ।

ছোটবেলা থেকেই রুশা গাইতে ভালোবাসে। তাই বিপিএটিসিতে যেকোনো অনুষ্ঠান এলেই চেষ্টা করত অন্তত একবার মঞ্চে ওঠার।

কিন্তু এখানে সুযোগ পাওয়া এত সহজ নয়!

সরাসরি গান গাওয়ার সুযোগ নেই, বাছাই পর্বে টিকে থাকতে হয়।

প্রথমবার যখন জানল পাঁচজন বিচারক টেস্ট নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিযোগীদের বেছে নেবেন, তখন তার ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করেছিল।

গানের মঞ্চের অভিজ্ঞতা

রুশা যখন গাইল, বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে, এক অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল।

বাছাই পর্বে উত্তীর্ণ হলেই কেবল অফিশিয়াল ইভেন্টে অংশ নেওয়া যায়।

সে সুযোগ পেল!

তবে এখানেই চমক।

যত প্রতিভাবান শিল্পী সে এখানে দেখেছে, তেমনটা আগে খুব কমই দেখেছে।

প্রতিটি অভিনয় শিল্পী,গায়ক, আবৃত্তিকার, উপস্থাপক একেকজন অসাধারণ মেধাবী।

রুশা অবাক হয়ে দেখল, তার সহকর্মীদের মাঝে কত গুণী মানুষ লুকিয়ে আছে!

সে ভাবল, "এই কোর্সের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আসলে এই মানুষগুলো, এই প্রতিভার মেলা!"

অডিটোরিয়ামের শেষ স্মৃতি

প্রশিক্ষণের শেষদিকে যখন অনুষ্ঠানগুলো একে একে শেষ হয়ে যাচ্ছিল, তখন রুশার মনে হচ্ছিল,

এই অডিটোরিয়ামের দিনগুলোও তো একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে!

যেখানে জ্ঞান অর্জন করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে, যেখানে গান গেয়েছে—সব একদিন হারিয়ে যাবে!

কিন্তু মনের ভেতরে যা থেকে যায়, তা কি কখনো হারায়?


 

আই টি সি বিল্ডিং: জ্ঞানের আন্তর্জাতিক মিলনস্থল

বিপিএটিসির প্রশিক্ষণ ভবনগুলোর মধ্যে আই টি সি (আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র) ভবনটি ছিল এক অনন্য স্থাপনা।

এই ভবনটি মূলত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের জন্য ডিজাইন করা, তাই প্রতিদিনই এখানে বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষকরা আসতেন, প্রশিক্ষণ দিতেন।

আবার বিদেশ থেকেও প্রশিক্ষণার্থীরা আসতেন এখানে শিখতে।

রুশাদের ক্লাস: ছয়টি নির্দিষ্ট কক্ষ

যদিও পুরো ভবনটি বিশাল, রুশাদের ক্লাস হত মাত্র ছয়টি নির্দিষ্ট রুমে।

১. নিচ তলার মিনি অডিটোরিয়াম ২. দশ তলার ৯০১ ও ৯০২ 3. এগারো তলার ১০০১ ও ১০০২ 4. Cadence Hall

বিশেষ কিছু মুহূর্ত

Cadence Hall ছিল আধুনিক, প্রশস্ত এবং আরামদায়ক, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সেশনগুলো পরিচালিত হত।

রুশা লক্ষ্য করেছিল, রেক্টর স্যারও বেশিরভাগ সময় এই বিল্ডিংতেই থাকতেন।

প্রতিদিনের নিয়মমাফিক ক্লাসের বাইরেও, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের এই পরিবেশ যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছিল রুশার মনে।

এই ভবনের বিশেষত্ব

এখানে ক্লাস করতে এসে রুশা অনুভব করত, সে শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রশিক্ষণের এক অংশ।

এই ভবনের প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি কক্ষ যেন বহন করে বহু দেশের বহু জ্ঞানের স্মৃতি।

এটাই ছিল আই টি সি বিল্ডিং-এর আসল সৌন্দর্য।




 

Comments

    Please login to post comment. Login