মাঘ মাসের তৃতীয় দিন। সকালবেলা রান্নাঘরে ভাত রাঁধতে রাঁধতে অতন্দ্রিলা মনে মনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চালাচ্ছে আজ গোসল করবে কি না। একপাশে পাচের ঘরে নামতা পড়ছে শিমু; আর অন্য পাশে অন্ধ সত্যজিৎ সাপের মতো কুঁকড়ে পড়ে আছে। সত্যজিৎ আর অতন্দ্রিলার বিয়ে হয় ছয় বছর আগে। অতন্দ্র্রিলার বাবার দুই বিঘা জমি দেখে সত্যজিৎ লোভ সামলাতে পারেনি ভেবেছিল অতন্দ্রিলার বাবা সমরেশ তাকে জমির অংশীদার বানাবে।কিন্তু অতন্দ্রিলার বাবা জুয়াতে জমি বন্ধক রেখে এখন সবকিছু হারিয়ে পথে। সত্যজিৎ আর অতন্দ্রলার মাঝে এখন প্রেমের কোন সম্পর্ক নেই আগেও ছিল না তবে মাসখানেক আগে সত্যজিতের ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। অটো চালানোর সময় একটি বাসের সাথে এমন ভাবে ধাক্কা খায় যে হাত-পা আহত হওয়ার সাথে সাথে দুটি চোখ হারিয়ে ফেলে। এখন সে নিয়ম মত ঘরের এক কোনায় স্থান রেজিস্টার করে সাপের মত শুয়ে থাকে। তবে অতন্দ্রিলাকে দেখলে বোঝা যায় সে ভেতর দিয়ে মুচকি মুচকি হাসে কারণ একবার সত্যজিৎ শিমুর পেন দিয়ে তার চোখে গর্ত করে দিয়েছিল। শুধু একবার না অনেকবারই সত্যজিৎ অতন্দ্রিলার গায়ে হাত তুলেছে আর তার দাগ অতন্দ্রিলার শরীরে জল ছাপের মত থেকে গেছে। অতন্দ্রিলা র এখন সব শয়ে গেছে, কেউ তাকে গালি দিলে সে কিছু মনে করে না। শরীরকে কোনো মতো চালিয়ে তিন বাসাতে কাজ করে কারণ সেই শিমুকে মানুষের মতো মানুষ বানাতে চায়। সে মানুষরূপি জানোয়ার তার জীবনে বহু দেখেছে তার সন্তানকে সে মানুষ বানাবে এই লক্ষ্য ঠিক করেছে। সে যে বাসায় কাজ করে সে বাসায় বেশিদিন টিকতে পারে না কারণ তার একটু হাত মারার অভ্যাস আছে। কিন্তু এক বাসায় তার সুনাম অনেক রাজসিংহের বাসায়। রাজ সিংহ পেশায় হোমিও ডাক্তার। স্ত্রী, এক বড় ছেলে নিয়ে পশ্চিম পাড়াতে থাকে। বাবরি চুল, কণ্ঠস্বর মোটা, মস্ত বড় একটি চশমা পড়ে চশমার ওপর দিয়ে চোখের কাজল রেখা দেখা যায় । অতন্দ্রিলা রাজসিংহ কে দেখতে নিয়ম মত ওই বাড়িতে যায় কোনো কাজে গাফলতি করে না। রাজসিংহের স্ত্রী পেশায় একজন শিক্ষক বলে সারাদিন বাইরে থাকেন। রাজ সিংহ বাসার এক ঘরে রোগী দেখেন। মাঝে মাঝে অত বলে ডাক দেওয়া মাত্রই অতন্দ্রিলা চায়ের কাপ নিয়ে দৌড়ে যায় ।কারণ নিয়মমত রাজসিংহ একটি আবদারই করে। চায়ে চুমুক দেওয়ার পর আ্যাহ! শোনার জন্য অতন্দ্রিলা মিনিট খানিক অপেক্ষা করে। রাজসিংহ বিব্রতকর মুখ নিয়ে যখন তাকায় অতন্দ্রিলা লজ্জা পেয়ে আবার রান্না ঘরে ঢুকে পড়ে। ঘর ঝাড়ু দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য ঘরের চেয়ে রাজসিংহে ঘর ঝাড়ু দিতে বেশি সময় লাগে তার। সে প্রায়ই ভাবে এক লোকের দুই বউ থাকলে দোষ কোথায়। আবার হিংসা করে বলে ওই বেটি কেন ওর বউ হবে ওকে তো মুন চায় ইঁদুরের বিষ খাওয়ায় মাইরা ফেলি। একদিন রাজসিংহের জন্মদিন ছিল। রাজ সিংহের প্রিয় রং লাল তাই অতন্দ্রিলা ভেবেছিল লাল রঙের শাড়ি পড়ে যাবে। কিন্তু তার কাছে দুজোরা রং চটা শাড়ি ছাড়া কোন শাড়ি নেই। পাশের বাসার মমতাজ খালার এক টকটকে লাল শাড়ির প্রতি তার আগে থেকেই লোভ ছিল। সে জানত সোজা মুখে চাইলে মমতাজ খালা জীবনেও দিবেনা। তাই তাকে গোয়াল ঘর পরিষ্কার করতে হয়, দুপুর থেকে সন্ধ্যা অব্দি মমতাজের পা টিপতে হয়। আরো ভেবেছিল জসিমের দোকানের মিষ্টি নিয়ে যাবে। অনেকদিন ধরে টাকাও জমা করে রেখেছিল কিন্তু শিমুর মন খারাপ থাকায় শিমুকে তার খেলনা কিনে দিতে হয়। শিমু অনেক লক্ষী ছেলে তার মন খারাপ তখন থাকে যখন সত্যজিৎ তাকে পরপুরুষের মাল বলে গালি দেয়। মিষ্টি ছাড়াই রাজ সিংহের জন্মদিনে গিয়েছিল অতন্দ্রিলা। রীতিমত সব কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার নজর ছিল রাজসিংহের দিকে। সে ভেবেছিল রাজ সিংহ তাকে দেখে মুগ্ধ হবে , তাকে দেখে আ্যাহ! করে উঠবে কিন্তু সেটা হয়নি। রাজসিংহের সর্বক্ষণে চোখ ছিল তার স্ত্রীর দিকে। অতন্দ্রিলার মনটা যেন সেদিন থেকেই অনেক খারাপ। আজ সে রাজ সিংহের বাড়িতে কাজ করতে যাইনি। যাবে বলে তার মন বলছে না। আঁচলে ইঁদুরের বিষ বাধা আছে। কি করবে ভাবছে। শিমু পাচের ঘরের নামতা পড়েই যাচ্ছে । এরমধ্যে সত্যজিৎ ম*** ম*** বলে চিল্লিয়ে উঠলো।অতন্দ্রিলা কিছুক্ষন সহ্য করার চেষ্টা করল, চুপ থেকে ভাত বেড়ে দিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু সত্যজিতের চিল্লানো থামলো না। অতন্দ্রিলা কোথায় যাবে বুঝে না পেয়ে এক জঙ্গলে পুকুর ধারে গিয়ে বসলো। দুপুর থেকে রাত হতে চললো সে স্থান ত্যাগ করার কোন ইচ্ছা প্রকাশ করলো না। আর এদিক পারাবাসি হায় হায় করে মরল।