Posts

উপন্যাস

ত্রি-রমনী (পরিচ্ছেদ ২১)

February 14, 2026

M. Khanam

7
View

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কানের দুলটা পরতে পরতে মনের অজান্তেই একবার জাকির কথা ভাবে আলিশা। ঠোঁটের কোনে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে তার। 

পেছনে খাটের উপর বসে আনিসার চোখে কাজল লাগিয়ে দিচ্ছে মারজিয়া। একবার আলিশার দিকে তাকিয়ে বলে, জাকির বাবা-মা কি করে? 

আলিশা বোনের দিকে ঘুরে তাকায়। ড্রেসিং টেবিলের উপর খানিকটা আধবসা হয়ে বলে, সরকারি চাকরি করে। 

কি ধরনের সরকারি চাকরি? 

তা তো বলতে পারছি না। 

মারজিয়া অবাক হয়ে আলিশার দিকে তাকিয়ে বলে, একটা ছেলের সাথে প্রেম করে বেড়াচ্ছিস তার বাবা-মা কি করে তাও জানিস না!

আলিশা বিরক্তির সাথে বলে, বাবা-মা কি করে এসব কে জিজ্ঞেস করে! 

সাধারন মানুষেরা—

আনিসা মৃদুস্বরে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, সাধারন মানুষেরা করে না। মারজিয়া রাগ চোখে ছোট বোনের দিকে তাকায়। আনিসা সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে আলিশার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, আলু, তোকে কি সুন্দর লাগছে— শাড়িটা যা মানিয়েছে না তোকে!

আলিশা ঘুরে আয়নায় তাকায়। আগাগোড়া নিজেকে একবার দেখে। ঘাড় নীল রঙয়ের একখানা শাড়ি পরেছে সে, তার সবচেয়ে পছন্দের রং। শাড়িখানা মারজিয়ার উপহার দেওয়া। সামান্য কোঁকড়া চুলগুলো ঘাড়ের উপর ছেড়ে দেওয়া। কানে মায়ের সোনার কানের দুল আর হাতে চিকন চুড়ি। চোখে গাড় কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙয়ের লিপস্টিক। চোখের গাড় কাজলটা তার চেহারার মায়াটা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মারজিয়া হাসিমুখে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

মিলি চাপানো দরজাটা ঠেলে রুমে ঢুকে। কই, তোদের হলো? জাকিরা চলে এসেছে। মারজু আয়! বলতে বলতে এক নজর আলিশার দিকে তাকায় সে। এগিয়ে এসে হাসিমুখে মেয়ের দিকে তাকায়। গালে আলতো করে হাত ছুঁইয়ের বলে, মাশাল্লাহ। আল্লাহ তোকে অনেক সুখে রাখুক। আলিশা মায়ের হাতটা ধরে তাতে চুমু খায়। চোখটা ছলছল করে ওঠে তার। 

বসার ঘরের বড় সোফাতে বসে আছে জাকি ও তার বাবা-মা। জাকির মা, জিনিয়া কবির যথেষ্ট সুন্দরী একজন মহিলা। বয়স পঞ্চাশের অধিক হবে তবে চেহারায় লাবণ্য এখনও বিদ্যমান। ধূসর রংয়ের একখানা জামদানি শাড়ি পরনে তার। ব্লাউজটা কলার দেওয়া। চুলগুলো পেছনে নীচু করে বাঁধা। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। এক নজর দেখেই বোঝা যায় যে তিনি উপরস্থ কোনো পদেই চাকরি করেন। জাকির বাবা নাসিফ হায়দার সাহেবও যথেষ্ট সুঠাম দেহের অধিকারি। পাশাপাশি বসে থাকা জাকি ও নাসিফ সাহেবকে যেন পয়সার এপিঠ-ওপিঠ মনে হয়– শুধু সময়ের ব্যবধান। তবে হাসলে জাকির চেহারায় তার মায়ের চিত্রও খানিকটা ফুটে ওঠে। 

সামনাসামনি সোফায় বসে আছে সাদিক। সাদিকের বয়স ষাট পেরিয়েছে। সময়ের সাথে পিঠটা খানিকটা বেঁকিয়ে গেছে। ফর্সা চেহারাটায় ছোপ ছোপ চাপ দাড়ি। যৌবনে যে তিনি একজন সুদর্শন পুরুষ ছিলেন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে সংসারের দায়িত্ব-দুশ্চিন্তার এক ঝড় যে তার উপর দিয়ে গেছে তা চোখের নীচের ভাজে হাজারো গল্পের মত ফুটে ওঠে। 

মিলি চা-নাস্তার ট্রে হাতে বসার ঘরে ঢোকে। ঘিয়া রংয়ের একখানা টাঙ্গাইল সুতির শাড়ি পরনে তার। চুলগুলো খোপা করা, আচলটা মাথায় টেনে দেওয়া। সামান্য সোনার গহনা পরনে যা খুব ভাল করে না তাকালে চোখেও পড়ে না। একুশ বছর বয়সে সাদিকের সাথে এরকমই একখানা পারিবারিক মহলে দেখা হওয়ার মাধ্যমে বিয়ে হয় তার। শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি, ভাসুর-ননদ, স্বামী, তিন মেয়ে— সব সামলাতে সামলতে কবে যে পঁয়ত্রিশটি বছর কেটে গেছে তা মিলি হয়ত জানেও না। যৌবনে অসাধারণ সুন্দরী ছিল সে। প্রথম দেখাতেই সাদিকের পুরো পরিবারের পছন্দ হয়েছিলো তাকে। 

মায়ের সৌন্দর্য তিন মেয়ের চেহারায় বিদ্যমান। মিলির অসম্ভব সুন্দর হাসিটা হুবুহু মারজিয়া পেয়েছে। তার চেহারার মায়াটাই আলিশার চেহারায় ফুটে ওঠে। আনিসার দুষ্টুমি মাখা, চঞ্চল চোখদুটো যেন ঠিক তার মায়ের অনুরূপ।  

শরবতের ট্রে-টা টেবিলে রাখে মিলি। হাসিমুখে জাকির বাবা-মায়ের দিকে তাকায়। 

জিনিয়া বলে, আপা, আপনি অনুগ্রহপূর্বক কোনো কষ্ট করবেন না। বসুন, আমরা কথা বলতেই তো এসেছি।

মিলি হাসিমুখে সাদিকের পাশে বসতে বসতে বলে, জী, অবশ্যই। 

রান্নাঘর থেকে নাস্তার আরেকটা ট্রে হাতে ঘরে ঢোকে মারজিয়া। সাদিক হাসি মুখে পরিচয় করিয়ে দেয়, আমার বড় মেয়ে, মারজিয়া। 

মারজিয়া সালাম দিয়ে পাশের সিঙ্গেল সোফাটাতে বসে। 

খানিক বাদেই আলিশাকে নিয়ে আনিসা বসার ঘরে আসে। এতক্ষণ জাকি খানিকটা লাজুক মুখে মাথা নীচু করে বসে ছিল। আলিশা আসতেই জাকির হাতে নাড়া দেয় তার মা। 

জাকি মুখ তুলে আলিশাকে দেখে। 

জাকির মা উঠে গিয়ে আলিশার হাত ধরে তাকে নিজের পাশে বসায়। উচ্চতায় হবু শ্বাশুড়ির থেকে বেশ লম্বাই সে। 

জিনিয়া হেসে বলে, আমার ছেলের পছন্দ যে ভাল হবে তা আমার জানা ছিল। কিন্তু এতটা ভাল হবে তা আমি ভাবি নি। একটু থেমে সাদিক আর মিলির দিকে তাকিয়ে বলে, ভাই-আপা, আপনাদের ব্যাপারে জাকির কাছ থেকে আমরা বেশ শুনেছি। আর আলিশাকে তো আমাদের পছন্দই। এখন আপনাদের যা জিজ্ঞাসা আছে আমাদের নিঃসংকোচে বলুন। 

মিলি আর সাদিক একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। দুইজনই ঘুরে বড় মেয়ের দিকে তাকায়। মারজিয়া বাবা-মায়ের সাথে চোখ মিলিয়ে ঘুরে জাকির বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, জাকিকে আমরাও যতটুকু দেখেছি আমাদের ভালো লেগেছে। তাছাড়া আমাদের আলুর— অপ্রস্তুত হয়ে একটু থামে মারজিয়া। সামান্য হাসিমুখে আলিশার দিকে তাকায়। 

আলিশা বড় বোনের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকায়। 

জাকির মা হেসে বলে, আলিশাকে যে সবাই আলু বলে ডাকে এ ব্যাপারে আমরা জানি। আলিশা খানিকটা অবাক হয়ে জাকির দিকে তাকায়। জাকির বাবা-মা যে তাদের ব্যাপারে জানত এটা আলিশার জানা ছিল, কিন্তু তাদের কথা শুনে এখন তার মনে হয় তারা হয়ত তার ধারণার চেয়ে একটু বেশিই জানে। 

আনিসা হাসতে হাসতে দুষ্টামিমাখা কণ্ঠে বলে, কিভাবে কিভাবে? জাকি ভাই বলেছে? 

মিলি খানিকটা চোখ রাঙ্গিয়ে ছোট মেয়ের দিকে তাকায়। জাকির মা হাসতে হাসতে বলে, ঠিক বলে নি। আমরা বুঝে গিয়েছিলাম। ফিরে আবার মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, এত ফিল্টার করতে হবে না। আলু হোক বা পটল, মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। 

মারজিয়া হাসিমুখে বাবা-মায়ের দিকে তাকায়। আবার ফিরে জাকির মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আলুর পছন্দ ছোটবেলা থেকেই ভাল। তার কি প্রয়োজন সেটা সে খুব ভাল করে বুঝে এবং শুধু সে দিকেই মনোযোগ দেয়। তাই আলুর যখন মনে হয়েছে জাকি তার জন্য সঠিক, আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে আমাদের দ্বিতীয়বার ভাবারও প্রয়োজন আছে। 

হাসিমুখে বড় বোনের দিকে তাকায় আলিশা। তার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে।

জাকির বাবা হেসে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, বেশ তো। তাহলে জাকি-আলিশাকে নিয়ে আর বলার কিছুই নেই কারো। আমাদের নিয়ে যদি কোনো জিজ্ঞাসা থাকে তাও নির্দ্বিধায় বলুন। ওদের সাথে আমরা দুই বুড়া-বুড়িও থাকব।

অন্য সবার চেহারায় হাসি থাকলেও সাদিকের চেহারায় কোনো হাসি নেই। বরং দুঃখভাব। বিষয়টা চোখ এড়ায় না জাকির। জাকি ইতিমধ্যে জেনেছে যে তার বন্ধুর ছেলের সাথে আলিশাকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা সে মনে পুষেছিল। খানিকটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জাকি বলে, আংকেল, আপনি ওকে যতটা আদরে-ভালবাসায় রেখেছেন, এতটা হয়ত কখনও চাইলেও আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু আমি চেষ্টায় কোনো কমতি রাখব না, এতটুকু কথা আমি আপনাকে দিচ্ছি। 

সাদিক তাকিয়ে জাকিকে দেখে। মৃদুস্বরে বলে, এ নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। আমার বড় মেয়ে যেটা বলল, আলু সবসময়ই জানত ওর জন্য কোনটা সঠিক। এই জন্য ওর জীবনের কোনো সিদ্ধান্তে আমি বা ওর মা কখনও হস্তক্ষেপ করি নি। যাই করত তাতেই খুব ভাল করত। ওর পড়াশোনা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনোদিন দুশ্চিন্তা করতে হয় নি। দুশ্চিন্তা ছিল শুধু ওর স্বভাব নিয়ে। প্রচন্ড একরোখা আর জেদি। 

জাকির মা হেসে বলে, ভাই, আপনি ওর কথা বলছেন? জেদি আর একরোখা কি আমাদের জাকি কোনো অংশে কম? উলটো আরও বেশিই হবে হয়ত। ওকে দেখতে এমন চুপচাপ লাগে। একটু থেমে মিলির দিকে তাকিয়ে বলে, আর মেয়ে মানুষ একটু একরোখা হতে হয়। নাহয় সমাজে টিকে থাকা দায় হয়ে যায়। 

মিলি তাকিয়ে জিনিয়াকে দেখে।


 

Comments

    Please login to post comment. Login