একযুগেরও বেশি সময় ধরে রুটিন জীবন ছেড়ে ভিন দেশে। ইট পাথর বিটুমিনের জীবন ফেলে ফের ছাত্র জীবন শুরু। ক্যালেন্ডারে তখন এপ্রিল ২০১৯। মাস তিনেক হয়েছে গিল্ডফোর্ডে এসেছি। অন্যে এক দেশে, ভিন্ন এক পরিবেশে।
ভার্সিটির স্টাগহিল ক্যাম্পাস মূলত একটা টিলার মধ্যে অবস্থিত। বেশ ছিমছাম, পরিপাটি করে সাজানো। একপাশে ছোট কিন্তু চমৎকার একটা লেক। লেকের পাশে বসে আছি। মন ভীষণ রকম বিক্ষিপ্ত। আশেপাশের সৌন্দর্য মোটেও স্পর্শ করছে না।
২।
কিছুক্ষণ আগে লাইব্রেরি বিল্ডিং এর মুদির দোকান (গ্রোসারি শপ) এ ঢু মারি। থরে থরে সাজানো অনেক জিনিস। একপাশের তাকে হরেক রকমের এলকোহল। ৫-৬ পাউন্ডে এক বোতল এলকোহল পাওয়া যায় (বেশি দামেরও আছে)। অভ্যেস নেই, ও জিনিস কেনা হল না। এর বদলে এক প্যাকেট সিগারেট নিলাম। এক প্যাকেটের দাম মাত্র ১৪ পাউন্ড, সাথে লাইটার ২ পাউন্ড ( সর্ব মোট প্রায় ২০০০/- টাকা))। সিগারেট কেনার অনেক হ্যাপা। বয়সের প্রমাণ দিতে আইডি কার্ড দেখাতে হয়েছে।
ক্লাশ শেষে লেকের পাড়ে বসে সিগারেট টানছি। একবার ভাবি, ধুর কী করতে মরতে
এসেছি এতদূর। শুরুটা হয়েছিলো, পড়াশোনার চাপে। দ্বিতীয়ত, হঠাৎ করে পরিপাটি কিন্তু নিঃসঙ্গ জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছি। অফিসে নিজের স্টাফ, ঠিকাদারের সাথে হাউকাউ নেই। বিকেলে টেনিস নেই। সন্ধ্যায় বন্ধু কলিগদের সাথে ফুটপাথে বসে টঙের চা নেই। দুধে ভাতে নয়, সুন্দর জীবনের উৎপাতে অতিষ্ঠ।
৩।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ি ছেলে সাফিনকে নিয়ে। ওর বয়স তিন বছর ছোঁয় ছোঁয়। সারাদিন দৌড়ায়। প্রচুর কথা বলে। মোবাইলে ভিডিও কলে কথা বলি। দুই একটা বাক্যের পরে সে জানতে চায়, আব্বু তুমি আসো। কবে আসবে?
প্রথম কয়েক দিন বলেছি, এই তো চলে আসবো। আর কয়েক দিন পর। এভাবেই চলছে। বলি, কিন্তু যাই না। প্রায় সময় কাঁদে।

সাফিয়া বোঝে। আব্বু দেশে নাই। কয়েক মাস পরে ওরাও গিল্ডফোর্ডে যাবে। কিন্তু সাফিনের বুঝ অতদূর পৌঁছায় না। ওর হিসাব মেলে না। একদিন বলে বসে, আব্বু আর কোনদিন আসবে না (মানে ওর আব্বু মারা গেছে)। শুধু মোবাইলে দেখা যাবে। আমার সাথে মোবাইলে কথা হয়। কথা শেষ হলে এই কথা বলে। তখনও আমি জানি না।
৪।
ওদের দেশে ফেলে এসে মন এমনিতে খারাপ। দিন কয়েক বাদে ওর মা এই কথা বলে ফেলে। শুনে খুব আবেগে আক্রান্ত হই। কোনভাবে মন বসাতে পারি না। তখনও সেখানে প্রচণ্ড শীত। ঠাণ্ডা লেগে যায়, অসুস্থ হয়ে পড়ি।
একবার ভাবি, দেশে চলে যাই। দুই দিনের দুনিয়ায় এত প্যারা নিয়ে লাভ নেই। মাছুমা বলে, সাফিয়া স্কুলে সবাইকে বলেছে। জুলাই মাসে লন্ডনে যাবে। ওর আশা অপূর্ন থেকে যাবে। দাঁতে দাঁত চাপলাম, বুকে বাধলাম পাথর।
জুলাই মাসে দেশে এসে ওদের নিয়ে গেলাম। দেশে আসার আগেই বাসা ভাড়া করেছি। এর আগে ভার্সিটির ডর্মে থেকেছি। ওরা যাওয়ার পরে গণেশ উল্টে গেলো। আগের ঠিক উল্টা অনুভূতির জন্ম হল। ওদের অবস্থা আরও এক কাঠি সরেস। ওরা দেশে ফিরতে অনিচ্ছুক, ওখানেই থেকে যেতে চায়।
৫।
সেই জীবন থেকে ফিরে আসার অর্ধযুগ পেরিয়ে গেলো। ফেসবুকের কল্যাণে ওয়ালে ভেসে আসলো সেই সময়টা। যেকোন অবস্থায় উপভোগ করতে পারলে জীবন বড়ই সুন্দর। লাইফ ইজ বিউটিফুল।